E-Paper

বহুবিধ বিচিত্র বিষয়ের মনোযোগী পাঠক

রাষ্ট্রনীতি, নৃতত্ত্ব, ইতিহাস, শারীরবিদ্যা, চিকিৎসা ছাড়াও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর আগ্রহী ছিলেন জ্যোতিষ, হস্তরেখা, দেশ-বিদেশের গুপ্তবিদ্যাসহ আরও নানা বিষয়ে। আজীবন সযত্নে রেখেছেন তাঁর সংগৃহীত বইগুলি।

কৃষ্ণা রায়

শেষ আপডেট: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:৩৬
জ্ঞানপিপাসু: আমৃত্যু নানা বিষয় অধ্যয়ন করেছেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।

জ্ঞানপিপাসু: আমৃত্যু নানা বিষয় অধ্যয়ন করেছেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।

পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কাছে আমাদের কাছে বহু ঋণ— বাংলা বর্ণ পরিচয়ের, আধুনিক বাংলা গদ্যের এবং বহুবিধ আধুনিক শিক্ষা ও সামাজিক সংস্কারের। কিন্তু পাঠক হিসেবে মানুষটিকে আমরা কতটা জানি? জীবনে অজস্র বৃত্তে লগ্ন থেকেও আকৈশোর তিনি পুস্তকপ্রেমী এবং আমৃত্যু পুস্তকের ক্রেতা।

কেমন বই পড়তেন বিদ্যাসাগর মশাই? তাঁর সংগৃহীত বইয়ের যত্ন এবং সংরক্ষণের কথা হয়তো অনেকেই জানেন। শেষ বয়সে, যখন জীবন-শেষের পরোয়ানা পেয়েছেন, তাঁর জীবনীকারেরা জানিয়েছেন, আলমারি বোঝাই বই দেখে চোখের জল ফেলেছেন। তাঁর স্বল্পায়ু জীবনে এই সব বই তো আর কোনও দিন পড়া হবে না। এ কথা জানিয়েছেন বিদ্যাসাগরের অন্যতম জীবনীকার বিহারীলাল সরকার। ভারতবর্ষের প্রকৃত ইতিহাস লিখবেন বলে প্রাচীনতম ও সেকালের আধুনিকতম ইতিহাসের বই সংগ্রহ করেও লিখে উঠতে পারেননি। মনোবাঞ্ছা অচরিতার্থ রয়ে গেল বলে অশ্রুপাত করেছেন। জানিয়েছেন আর এক জীবনীকার চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়।

সংস্কৃত পুঁথি অথবা সংস্কৃত সাহিত্য, শাস্ত্র সম্পর্কিত বই ছাড়াও তাঁর সংগ্রহে থাকা বইয়ের সম্ভার দেখলে বিস্মিত হতে হয়, বিশেষ করে জীবনের শেষ পর্বে যে সব বই সংগ্রহ করেছেন। অন্তত বইগুলির প্রকাশকাল সেই ইঙ্গিত দেয়। সংগ্রহ-তালিকায় ইংরেজি ভাষার বই বেশি, বাংলা বই তুলনায় নেহাতই নগণ্য। ওই সময় কী ধরনের বই তাঁকে আগ্রহী করত? তথ্যপ্রমাণ বলছে, জীবনের শেষ পর্যায়ে এমন অনেক বই কিনছেন, যেগুলি প্রকাশিত হয়েছে তাঁর মৃত্যুর মাত্র কয়েক বছর আগে। এই তালিকায় রয়েছে প্রাচীন মিশরের পটভূমিতে লেখা রোম্যান্টিক কাহিনি ‘দ্য ব্রাইড অব দ্য নাইল’(১৮৮৭)। সংগ্রহ করেছেন ১৮২৯ সালে চিনের পটভূমিতে লেখা এক ধনী চৈনিক বণিক আর ইংরেজ রমণীর প্রণয় কাহিনি ‘দ্য ফরচুনেট ইউনিয়ন’। এই বই থেকে পেয়েছেন চৈনিক সংস্কৃতির পরিচয়। সংস্কৃত ব্যাকরণ সাহিত্যের ছাত্র বিদ্যাসাগর নিজে জানতেন একাধিক ভাষা। মাতৃভাষা ছাড়াও নিষ্ঠাভরে চর্চা করেছেন ইংরেজি, হিন্দি এবং ওড়িয়া ভাষা। শেখার আগ্রহ ছিল গুজরাতি ভাষার, তাই কিনেছিলেন সেই ভাষার ব্যাকরণ। হিস্ট্রি অব ল্যাঙ্গুয়েজ অথবা হিস্ট্রি অব ইংলিশ লিটারেচার সম্পর্কিত বই যেমন সংগ্রহে রেখেছেন, তেমনই কিনেছেন শেক্সপিয়রের নাটক নিয়ে একাধিক প্রবন্ধের বই। ১৮৩১ সালে ফরাসি ভাষায় লেখা ভিক্টর হুগোর ‘নোতরদাম ডি প্যারিস’ ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়ে ১৮৮৮ সালে প্রকাশিত হলে সেটিও সংগ্রহ করেছেন। কিনেছেন ‘হিস্ট্রি অব ফিকশন’। গ্রিক কবি হোমারের অনুকরণে যে সব কাব্য লেখা হয়েছে, সেই সব কাব্যের উৎস ও রচয়িতাদের সম্বন্ধে সঙ্কলন ‘দ্য গ্রোথ অব দ্য হোমারিক পোয়েমস’ (১৮৮৫) বইটিও না কিনে পারেননি।

শিক্ষাবিদ বিদ্যাসাগরের শিক্ষা তথা শিক্ষাতত্ত্বের উপর অজস্র বই কেনাটা স্বাভাবিক। কিন্তু ব্রিটিশ সিভিল ও মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার জর্জ স্টিফেনসন, যাঁকে বিশ্বে প্রথম রেলওয়ে স্থাপনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব বলা যায়, তাঁর জীবন জানতে বাংলার এই সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিতের আগ্রহ বিস্মিত করে বইকি! আসলে তাঁর আগ্রহ ছিল বিশিষ্ট মানুষদের জীবনকথায়, না হলে আঠারো শতকে ভারত ভ্রমণে আসা পারস্যের কবি ও পণ্ডিত শেখ মহম্মদ আলির জীবনী তিনি সংগ্রহ করবেন কেন!

আজীবন আগ্রহ ছিল শিশুপাঠ্য বইয়ের প্রতি। তাই সংগ্রহে রেখেছেন প্রাচীন ল্যাটিন ভাষায় লিখিত উপকথা, যার উৎস ছিল গ্রিক ও রোমান ভাষার লেখক ফ্লাভিয়াস অ্যাভিয়ানার উপমাবহুল নীতিগল্প ‘ফেবলস অব অ্যাভিয়ানা’। এই সব গল্পে ছিল মানুষের চরিত্রের রকমফের নিয়ে বিস্তর ব্যাখ্যা। কিনেছেন আন্ট লুইসা-র ‘বাইবেল পিকচার বুক’ (১৮৮৭), জন্তু-জানোয়ারের ছবিওয়ালা নার্সারি রাইমস, উদ্ভট শিশুতোষ গান দিয়ে ভরা বই ‘ফিজ়িক্যাল এডুকেশন অব চিলড্রেন’, অথবা ‘চিলড্রেন’স পিকচার ফেবলস বুক’ (১৮৮৬)। সংগ্রহে ছিল আর একটি চমৎকার শিশুপাঠ্য বই, আঠারো শতকের ইংরেজ শিক্ষিকা মারিয়া এজওয়ার্থের নীতিগল্পের বই ‘আর্লি লেসনস’(১৮০১)।

কারও পড়ার বিষয়ের ব্যাপ্তি যে কত গভীর ও বিচিত্র হতে পারে, বিদ্যাসাগর তার এক বিরল উদাহরণ। আজীবন ধর্ম সম্পর্কে নিস্পৃহ মানুষটি কখনও পড়ছেন নবম শতকে প্রকাশিত জরথুস্ট্রবাদের বই, আবার কখনও ১৭৭১ সালে জাত ইংরেজ পণ্ডিত, যাজক, ধর্মপ্রচারক সিডনি স্মিথের ধর্ম সম্পর্কিত বই, যেখানে স্মিথ জানাচ্ছেন, “ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্য, মানবজাতিকে নিরন্তর স্মরণ করিয়ে দেওয়া, ধর্ম আসলে মানুষকে মুক্তির শিক্ষা দেয়। মেধা না থাকলেও মানুষের বাস্তব ও আধ্যাত্মিক চাহিদার সংমিশ্রণ সম্ভব, যদি তার নিজের সিদ্ধান্তে দুর্বলতা না থাকে।” বিস্মিত হতে হয়, তাঁর সংগ্রহে থাকা হারগ্রেভ জেনিংস-এর ‘দ্য রোসিক্রুশিয়ান’ বইটি দেখে। রোসিক্রুশিয়ান শিক্ষা বস্তুত গুপ্তবিদ্যা এবং অন্যান্য ধর্মীয় বিশ্বাস ও অনুশীলনের সমন্বয়। ইংরেজ দার্শনিক এবং বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস বেকন ও সমগ্র ইউরোপ জুড়ে অন্যান্য চিন্তকদের কাছে রোসিক্রুশিয়ানিজ়ম আকর্ষণীয় ছিল। আঠারো শতকে এর মহিমা কিছুটা কমে গেলেও উনিশ শতকে ইউরোপ এবং আমেরিকায় সাধারণ জাদুবিদ্যার অনুষঙ্গের অংশ হিসেবে এটি পুনর্জীবিত হয়েছিল। পড়েছেন ইংরেজি অনুবাদে পারস্যের এক ধর্মযাজকের স্বর্গ আর নরকে কাল্পনিক ভ্রমণ কাহিনি নিয়ে বই ‘ দ্য বুক অব আর্ডা ভিরাফ’ (১৮৭২)।

উনিশ শতকের অন্য অনেক শিক্ষিত মানুষের মতো বিদ্যাসাগরেরও বিস্তর আগ্রহ ছিল ফ্রেনোলজি বা মুখমণ্ডল লক্ষণ-বিদ্যায়। সে বিষয়ে বিদেশ থেকে অজস্র বই আনিয়েছেন, ঔৎসুক্য ছিল হস্তরেখাবিদ্যা এবং জ্যোতিষচর্চায়। জীবনের শেষ দিকে ব্যক্তি বিদ্যাসাগর কি আগ্রহী হয়েছিলেন বিবাহিত জীবনে সুখের সন্ধানে? না হলে ১৮৮৬ সালে প্রকাশিত বিবাহ বিষয়ক হ্যান্ডবুক, ‘হাউ টু বি হ্যাপি দো ম্যারেড’ বইটিকে কেন ব্যক্তিগত সংগ্রহে স্থান দেবেন? পড়েছেন ‘এনসাইক্লোপিডিয়া অব ফিমেল বায়োগ্রাফি’, মদ্যপান থেকে বিরত হওয়ার মতো বিষয়, অথবা বিদেশি লেখকের লেখা নারীর দায়িত্ব-কর্তব্য প্রলোভন সুবিধা-অসুবিধা সংক্রান্ত বই। ইংরেজ চিকিৎসক লেখক জোসেফ গ্র্যানভিল-এর ‘দ্য সিক্রেট অব আ ক্লিয়ার হেড’ (১৮৭৯) বইটি পড়ছেন; উদ্দেশ্য: খাদ্যাভ্যাস পরিশ্রম ও ধ্যানের মাধ্যমে কী ভাবে মানসিক স্বচ্ছতা অর্জন করা যায়।

আগ্রহ ছিল নৃতত্ত্বেও। সংগ্রহে রেখেছেন জে সি প্রিখার্ডের ‘রিসার্চেস ইনটু দ্য ফিজ়িক্যাল হিস্ট্রি অব ম্যানকাইন্ড’ (১৮৩৬)। সমান কৌতূহল ছিল সভ্যতার ইতিহাস জানার ক্ষেত্রেও। তার সাক্ষ্য দেয় সংগ্রহে থাকা ‘হিস্ট্রি অব সিভিলাইজ়েশন’ বইটি (১৮৮২) অথবা সভ্যতা বিষয়ক রচনা এবং নিবন্ধ সঙ্কলন ‘সেল্ফ কালচার’ (১৮৮৪)। সংগ্রহ করেছেন উনিশ শতকের ইংরেজ রাজপুরুষ ফিলিপ স্ট্যানহোপ তথা চতুর্থ আর্ল অব চেস্টারফিল্ডের লেখা চিঠি ও প্রবন্ধ সঙ্কলন, ‘দি উইট অ্যান্ড উইজ়ডম অব দি আর্ল অব চেস্টারফিল্ড’ (১৮৭৫)। তিন দশক ধরে চেস্টারফিল্ডের এই সব লেখা মূলত তার অবৈধ সন্তানের উদ্দেশে, যাতে জন্মের কলঙ্ক মুছে ফেলে সে এক সজ্জন মানুষ হিসেবে সমাজে স্বীকৃতি পায়। ইতিহাসপ্রেমী বিদ্যাসাগর সংগ্রহ করেছেন ভারতে বসবাস করা ব্রিটিশ ইতিহাসবেত্তা রবার্ট ওরমে-র লেখা মোগল সাম্রাজ্যের ইতিহাস নিয়ে বই ‘হিস্টোরিক্যাল ফ্র্যাগমেন্টস অব দ্য মোগল এম্পায়ার অব দ্য মোরেটোস’ কিংবা বুন্দেলখণ্ডের ইতিহাস ‘আ হিস্ট্রি অব দ্য বুন্দেলাস’।

সভ্যতা-ইতিহাস-সমাজতত্ত্বের পাশাপাশি আগ্রহ ছিল রাজনীতি, দর্শন এবং আইন বিষয়ক পুস্তকেও। তাই কখনও সংগ্রহ করেছেন ইটালির দার্শনিক, কূটনীতিক ও রাজনীতিবিদ মেকিয়াভেলির ‘দ্য প্রিন্স’ (১৮৮০)। এই লেখা মূলত নতুন রাষ্ট্রনায়কদের উদ্দেশে বার্তা— কী ভাবে ক্ষমতা, নেতৃত্ব আর সৈন্য দিয়ে তাঁরা রাষ্ট্রকে নিরাপত্তা দিতে পারেন, আবার কী ভাবে তাঁরা হারান নিরপেক্ষ অবস্থান। সংগ্রহ করেছেন জর্জ সাইমক্স সঙ্কলিত প্রাচীন গ্রিক কূটনীতিক ডেমোস্থেনিস এবং ইসচিনিস-এর উপদেশাত্মক রচনা, ‘দ্য কালেকশন অব এনশিয়েন্ট গ্রিক ডাইড্যাক্টিক মর‌্যাল অ্যান্ড পলিটিক্যাল’ (১৮৭২) অথবা সক্রেটিস-অনুগামী গ্রিক ঐতিহাসিক, দার্শনিক ও সেনানায়ক জ়েনোফোন-এর লেখা গ্রিসের অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতির ইতিহাস এবং ভ্রমণকথা। প্রাচীন সভ্যতায় আইনের ভূমিকা জানার আগ্রহে সংগ্রহ করেছেন ষষ্ঠ শতকে রোম-সম্রাট জাস্টিনিয়ানের আইন সংক্রান্ত বিষয়ে টমাস কোলেটের লেখা গ্রন্থ ‘দি ইনস্টিটিউটস অব জাস্টিনিয়ানস’ (১৮৮৩)। অনুসন্ধান করেছেন ক্ষুব্ধ মানুষের বিদ্রোহের কারণ নিয়েও, না হলে আঠারো শতকে এইচ এম এস বাউন্টি নামের ব্রিটিশ বাণিজ্যজাহাজটির নাবিকদের বিদ্রোহের ইতিহাস নিয়ে ‘দ্য স্টোরি অব দ্য গুড শিপ বাউন্টি অ্যান্ড হার মিউটিনিয়ারস অ্যান্ড মিউটিনিজ় ইন দ্য হাইল্যান্ড রেজিমেন্টস’ (১৮৮০) নামক বইটি কিনবেন কেন?

ভ্রমণ-সাহিত্যেও বিদ্যাসাগর উৎসাহী ছিলেন। আজীবন বাংলার গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে বেড়ানো মানুষটি মনে মনে ছিলেন বিশ্ব-পর্যটক। তাঁর সংগ্রহে ছিল ১৭৭২ সালে প্রকাশিত ‘আ ভয়েজ টু দি ইস্ট ইন্ডিজ়’, ‘রিফ্লেকশনস অন দ্য ট্রেড ইন ইন্ডিয়া’ অথবা ‘ন্যারেটিভস অব দ্য ভয়েজেস রাউন্ড দি ওয়ার্ল্ড বাই ক্যাপ্টেন জেমস কুক’ (১৮৭৮), ১৭৭৯-তে প্রকাশিত এডওয়ার্ড টেরি-র ‘আ ভয়েজ টু ইস্ট ইন্ডিয়া’ কিংবা স্বদেশের ভ্রমণ-কথা ‘ন্যারেটিভস অব আ জার্নি থ্রু দি আপার প্রভিন্সেস অব ইন্ডিয়া’, ‘ক্যালকাটা টু বোম্বে (১৮২৪-২৫)’। আর একটি চমৎকার বই সংগ্রহে ছিল তাঁর, কলম্বাসের তিনশো বছর আগে, ১১৭০ সালে, আর এক আমেরিকা আবিষ্কারের কাহিনি ‘আমেরিকা ডিসকভার্ড বাই দ্য ওয়েলশ’ (১৮৭৬), ও ‘হিস্ট্রি অব দ্য ডিসকভারি অব আমেরিকা’ (১৮৪৯)।

সারা জীবন সমাজ সংস্কারের জন্য অভিযান করেছেন বিদ্যাসাগর। তাই পড়তে বাকি রাখেননি আঠারো শতকে প্রকাশিত অ্যালেন রেনে লেসেজের লেখা দরিদ্র গিল ব্লাসের বিশ্বভ্রমণের দুরন্ত অভিযানের পর জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কাহিনি অবলম্বনে লেখা জনপ্রিয় উপন্যাস ‘দি অ্যাডভেঞ্চারস অব গিল ব্লাস অব সান্তিলেন’(১৮৮১)।

বিচিত্র বিষয় নিয়ে বই পড়ার আগ্রহ থাকলেও সংস্কৃত পণ্ডিত বিদ্যাসাগর বেশি ঝুঁকেছেন মানুষের শরীর-স্বাস্থ্য বিষয়ক বই সম্পর্কে। হোমিয়োপ্যাথি চর্চা করার তাগিদে শরীর ও বিচিত্র ব্যাধির কারণ আর তার প্রতিকারের জন্য কিনেছেন অজস্র বই। হৃৎপিণ্ড, তার সমস্যা, হৃৎপিণ্ডে মেদ সঞ্চয়জনিত ব্যাধি, অর্শ, বদহজম, পাকস্থলীর ব্যাধি, আমাশা, কোষ্ঠবদ্ধতা, মাথাব্যথা, যক্ষ্মা, কলেরা, বাত, হাঁপানি, মৃগী, ডিপথেরিয়া, টাইফয়েড, বসন্ত, চোখ-কান-নাকের অসুখ, নিউমোনিয়া, হুপিং কাশি, চুল আর ত্বকের সমস্যা, কার্বাঙ্কল, শিরার ব্যাধি, নারী শরীরতত্ত্ব, মেয়েদের ডিম্বাশয় ও জরায়ুর সমস্যা, গর্ভাবস্থা, সুষুম্নাকাণ্ডের সমস্যা, যৌন রোগ— ইত্যাদি সব রকম বিষয়েই বই সংগ্রহ করে গেছেন। অনুসন্ধিৎসু হয়েছেন ডায়াবেটিস ও কিডনির অসুখে দুধের উপকারিতা, ঘুম এবং তাকে আয়ত্ত করার কৌশল, শল্যচিকিৎসা অথবা সোনা দিয়ে রোগ সারানোর মতো অজস্র বিষয়ের বই সম্পর্কে, তাদের রেখেছেন নিজ সংগ্রহে।

তাঁর সংগ্রহ-তালিকায় ছিল দীর্ঘমেয়াদি ব্যাধিতে জল-চিকিৎসা কিংবা স্কারলেট ফিভার, ইয়েলো ফিভারের মতো ব্যাধি ও তাদের চিকিৎসা সংক্রান্ত বই, লন্ডন থেকে প্রকাশিত বিখ্যাত হোমিয়োপ্যাথি চিকিৎসকদের বক্তৃতা-সংগ্রহ। মৃত্যুর দশ বছর আগেও কিনেছেন হিস্টোলজি আর সেল-প্যাথোলজির বই, ফার্মাকোডাইন্যামিক্সের বই। বালিকার রজঃস্বলা হওয়ার বয়স যে সর্বদা দশ বা বারোতে স্থির থাকে না, বিদ্যাসাগরের মতো এই সরল সত্যটি ১৮৯১ সালের ভারতে আর কেউ প্রত্যয়ী হয়ে বলার সাহস দেখাননি।

কৃতজ্ঞতা: বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Vidyasagar

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy