E-Paper

পরভৃৎ

সরমা এক এক দিন চা খাওয়ার সময় ব্যালকনিতে বিস্কুটের টুকরো ছড়িয়ে দেখেছেন। কাক আসে, শালিক আসে, এক জোড়া ঘুঘু দম্পতিও আসে ঘু-ঘু করতে করতে, ও আসে না কখনও।

মৌসুমী মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১৫ মার্চ ২০২৬ ০৮:৩২
ছবি: প্রসেনজিৎ নাথ।

ছবি: প্রসেনজিৎ নাথ।

পাখিটা রোজ এসে বসে থাকে গাছটায়। শুধু বসেই থাকে। মাঝে মাঝে ঘাড় বেঁকিয়ে এ দিক-ও দিক তাকায়। কখনও লাল-লাল চোখ মেলে কী যেন খোঁজে।

ভোরের দিকে ঠান্ডা একটু কমলে সরমা যখন ধোঁয়া-ওঠা এক কাপ চা নিয়ে ব্যালকনিতে গিয়ে বসেন, তখন পাখিটার সারা শরীর ফুলে ঢোল। সাদা-কালো তুলোর বলের মতো দেখতে লাগে যেন। বুক আর পেটের কাছে সাদা রঙের উপর কালো কালো বুটি। আবার ডানার নকশা ঠিক উল্টো। কালো ডানায় সাদা রঙের ফোঁটা দেওয়া। আকারে পায়রার চেয়ে সামান্য বড়। বড়, নাকি সমান? হবে হয়তো। সরমা অতশত বুঝতে পারেন না। শুধু পাখিটাকে দেখতে বেশ লাগে! শান্ত, স্বাধীন, নিঃসঙ্গ। অন্য পাখিদের মতো ডাকাডাকি‌ও নেই কোনও। শীতের কুয়াশামাখা আবছা সকাল, সোনালি রোদের দুপুর কিংবা হঠাৎ ফুরিয়ে যাওয়া বিকেলে ও বসে থাকে পাতা-ঝরা রুখাশুখা বুনো তেঁতুল গাছটার হলদে হয়ে যাওয়া ডালে। অন্য পাখিরা কেউ কেউ কখনও-সখনও পাশে এসে বসে। ভাব জমানো‌র চেষ্টা করে হয়তো, কিন্তু সাড়া পায় না বিশেষ। এই পাখিটা যেন একা-একা বসে থাকতেই পছন্দ করে। কিংবা, আর কাউকে তার পছন্দ নয়।

সরমা এক এক দিন চা খাওয়ার সময় ব্যালকনিতে বিস্কুটের টুকরো ছড়িয়ে দেখেছেন। কাক আসে, শালিক আসে, এক জোড়া ঘুঘু দম্পতিও আসে ঘু-ঘু করতে করতে, ও আসে না কখনও। পুঁতির মতো গোল-গোল রক্তরঙা চোখ মেলে কখনও দেখে, কখনও বা দেখেও না। গায়ের সাদা-কালো পালক ফুলিয়ে বসে থাকে চুপ করে।

বেলা বাড়লে মিনতি আসে। ঘরদোর ঝাঁটপাট দেয়, বিছানা তুলে দিয়ে চাদর পেতে গুছিয়ে পরিষ্কার করে দেয়। সরমা‌র বিছানা, বালিশ, কম্বল নিয়ম করে রোদ্দুরে দেয় রোজ। শীতকাতুরে সরমা ঠান্ডা লেপ-কম্বলে শুতে পারেন না কোনও দিনই। কলকাতার এই আদুরে ঠান্ডায় লেপ আর লাগে কোথায়! এক কম্বলে‌ই শীত পার করে দেন সরমা।

ঘর গুছিয়ে মিনতি রান্নাঘরে ঢোকে। জলখাবার তৈরি করে সরমাকে খেতে দিয়ে নিজের খাবার‌টা নিয়ে এসে বসে পড়ে সরমার পাশেই। চ‌ওড়া ব্যালকনিতে সাদা মার্বেল-বসানো ছোট্ট টি-টেবিল। তাতে একটাই চেয়ার। সেখানে বসে গায়ে রোদ্দুর মেখেই চা-জলখাবার খান সরমা। নীচে মেঝের উপরে চ‌ওড়া গদি পেতে রাখা আছে। জলখাবারের থালা নিয়ে মিনতি বসে সেখানেই।

দীর্ঘ দিন সাহেবি কেতায় অভ‍্যস্ত, শ্রেণিসচেতন সরমা কাজের লোকের সঙ্গে এক টেবিলে বসে খাওয়া‌র কথা চিন্তা‌ও করতে পারেন না। তা বলে গল্প করতে তো বাধা নেই।

নরম রুটি ছিঁড়ে মুখে পুরতে পুরতে সরমা জিজ্ঞেস করেন, “এই পাখিটাকে চিনিস মিনতি? দেখ কেমন অদ্ভুত দেখতে!”

মিনতি ভাল করে না দেখেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে উত্তর দেয়, “আর এক জীবনে মানুষ‌ই চিনে উঠতে পারলাম না গো মা, তায় পাখি!”

উত্তরটা খুবই দার্শনিক হলেও, একঘেয়ে ঘ্যানঘ্যানানির মতো লাগে সরমার। বিরক্ত হয়ে বলেন, “ভাল করে তো তাকিয়ে দেখলিই না পাখিটাকে, বলে দিলি দুম করে! আর কথায় কথায় সব সময় ওই একই প্রসঙ্গ টেনে আনিস কেন!”

বিরক্ত হন, আবার মনে মনে মায়াও বোধ করেন। মিনতির স্বামী ওকে ছেড়ে চলে গেছে অনেক বছর আগে। একটাই মেয়ে, তারও বিয়ে হয়ে গেছে। সরমা নিজে দাঁড়িয়ে থেকে মিনতির মেয়ের বিয়ের ব‍্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। তখন বয়স অল্প ছিল, দাপট‌ও ছিল প্রচুর। সেও আজ অনেক বছর হয়ে গেল।

মিনতির মেয়ে এখন বর, ছেলেমেয়ে নিয়ে মায়ের কাছেই এসে উঠেছে। ওর বরের তেমন রোজগার নেই, তার চেয়েও বড় কথা, রোজগার করার ইচ্ছেও নেই। মেয়েটা নিজেও কয়েক বাড়ি কাজ করে। ওর আর ওর মায়ের রোজগারেই সংসারটা চলে, মোটামুটি ভাল ‌ভাবেই চলে যায়।

ভেবে দেখতে গেলে মেয়ে, জামাই, নাতিনাতনি নিয়ে মিনতির এখন ভরা সংসার। অথচ সব কথায় মিনতি এক বার না এক বার সেই ছেড়ে যাওয়া স্বামী‌র প্রসঙ্গ তুলে আনবেই আনবে। যে ছেড়ে চলে যায়, তার জন্য কিসের এত শোক! আদৌ শোক, নাকি বলতে হয় বলে বলা, একটা দীর্ঘলালিত হা-হুতাশের অভ্যেস— এত দিন পর কি সত্যিই আর কারও জন্য শূন্যতার বোধকাজ করে কারও মনে— বুঝতে পারেন না সরমা।

আসলে সরমা নিজে বিয়ে করেন‌নি, সংসার করেননি বলেই বোধহয় এ-সব বোঝেন‌নি কখনও। বিয়ে করেননি, তাই বলে কি ভালওবাসেননি? বেসেছেন তো! সবটুকু দিয়েই ভালবেসেছেন। কিন্তু সেই ভাল‌বাসায় অন্যের ভাল‌তে বাস করা ছিল ঠিকই, কিন্তু আবেগ ছিল না বোধহয়! যে চাকরি করেছেন সারা জীবন, বেশি-বেশি আবেগপ্রবণ হলে তাতে আর টিকে থাকতে হত না! তিনি অন্তর থেকে উৎসারিত ভালবাসার স্বাভাবিক প্রবাহে কখনও বাধা দেননি, আবার সেই স্রোতে ভেসেও যাননি। কখনও নিজস্বতা বিসর্জন দিয়ে আপসও করেননি। আজীবন নিজের শর্তে বাঁচার একেবারে কপিবুক উদাহরণ তিনি।

দেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই জন্ম সরমা‌র। উনিশশো একান্ন সালে আন্না রাজম যখন দেশের প্রথম মহিলা আইএএস অফিসার হলেন, সরমা‌র তখন মাত্র আট বছর বয়স। আন্না রাজমের খবরটায় বাড়িতে যেন সাড়া পড়ে গিয়েছিল।

সরমা‌রা তখন দিল্লিতে থাকতেন। বাবাও ছিলেন নব‍্যগঠিত ভারত সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মী। বাড়িতে আসা ইংরেজি খবরের কাগজ আর রিডার’স ডাইজেস্ট থেকে বাবা খবরটা পড়ে শুনিয়েছিলেন মা আর তাঁদের দুই বোনকে।

ছোট বোন পরমা তখন বছর পাঁচেকের শিশু। কিছু বোঝার মতো বয়স তার হয়নি। গভীর ভাবে প্রভাবিত হলেন সরমা। জেদ ধরেছিলেন, সিভিল সার্ভিসের প্রবেশিকা পরীক্ষায় বসবেন তিনি। মা-বাবা প্রথমে একটু কিন্তু-কিন্তু করলেও তাঁদের চিরদিনের একরোখা, স্বাধীনতাপ্রিয় প্রথম সন্তান‌টির মতের বিরুদ্ধে রুখে‌ও দাঁড়াননি সেভাবে। ছোটবেলা থেকে মেধাবী, পড়াশোনায় একনিষ্ঠ এই মেয়েটির যা-যা সাহায্য প্রয়োজন হয়েছে, সাধ্যমতো জোগান দিয়ে গেছেন।

খুব ছোট থেকে যদি কেউ তার জীবনের লক্ষ্য স্থির করে নিতে পারে এবং সেই পথে অবিচল থাকে, তা হলে লক্ষ্যে পৌঁছতে বেশি সময় লাগে না। নির্দিষ্ট সময়েই আইএএস হয়েছিলেন সরমা সেন। দীর্ঘ দিন সরকারের বিভিন্ন দফতর সামলেছেন দক্ষ হাতে। ঘোড়ায় চড়তে জানতেন, গাড়ি চালাতে জানতেন, আবার অবসর সময়ে টুকটাক রান্নাও করতেন, শীতকালে কেক বেক করতেন নিজের হাতে। জীবনে যখন যে কাজটাই করেছেন, নিপুণ, নিখুঁত করে করেছেন। যাকে বলে একেবারে পিকচার পারফেক্ট!

আজ আশি পেরিয়ে এসে আর কিছুই করতে ইচ্ছে হয় না। শরীর অবশ্য এখনও যথেষ্ট শক্তপোক্ত। টুকটাক কাজ, শখের রান্না করেন কখনও-সখনও। মা-বাবা তো চলে গেছেন‌ই, বোন পরমাও চলে গেছে আজ বছর দশেক। বোনের কাছাকাছি থাকবেন বলেই রিটায়ারমেন্টের পরে সাদার্ন অ্যাভিনিউয়ে‌র এই বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে এসে ওঠা। ফ্ল্যাট‌টা মণীশ আর পরমার বাড়ির একেবারেই কাছে।

মিনতিকে পরমাই ঠিক করে দিয়েছিল। বারুইপুরের দিক থেকে ট্রেনে, বাসে করে আসে। সারা দিনের সমস্ত কাজ সেরে রাতে বাড়ি ফিরে যায়। পরদিন আবার আসে। সরমা কত দিন বলেছেন, “রাতে তো কেবল ঘুমোতে যাস বাড়িতে, তাও কত দূরে! কী দরকার! আমার কাছে থেকে গেলেও তো পারিস, ঘরগুলো‌ তো সব ফাঁকা‌ই পড়ে রয়েছে!”

মিনতি লাজুক হেসে বলে, “নাতি আর নাতনিটা অপেক্ষা করে থাকে গো মা। গেলেই ব‍্যাগ ধরে টেনে নিয়ে হাতিয়ে হাতিয়ে দেখবে, ওদের জন্য কী এনেছি।”

সরমা বিস্মিত হন। এতে এত খুশি হ‌ওয়ার কী আছে! তাঁর ঘনিষ্ঠ কেউ তাঁর ব্যাগে হাত ঢুকিয়ে কী-কী রয়েছে দেখছে, এমন সম্ভাব‌নার কথা তিনি কষ্টকল্পনা‌তেও মনে আনতে পারেন না! এতে যে রাগ কিংবা বিরক্তি না এসে খুশি হ‌ওয়া যায়, সে-ও তাঁর বোধের অগম্য। তবুও মিনতি বাড়ি ফেরার সময় তিনি কিছু না কিছু ওর নাতিনাতনির নাম করে দিয়ে দেন রোজ।

পার্থ অবশ্য কিছুতেই ওঁকে একা থাকতে দিতে রাজি ছিল না। বার বার বলত, “বিরাশি বছর বয়স হল তোমার মাসিমণি। এই বয়সে একা থাকে নাকি কেউ! হয় আমাদের এখানে এসে থাকো, আর নয় তো রাতের লোক রাখো। আমি সারা দিনের ট্রেন‌ড নার্স ঠিক করে দিচ্ছি একটা, হঠাৎ কোনও অসুবিধে হলে ব‍্যবস্থা করতে পারবে।”

সরমা রাজি হননি। শরীর এখন‌ও যথেষ্ট সুস্থ তাঁর। শুগার, প্রেশার, সব নর্মাল। পার্থ কলকাতার নামকরা কার্ডিয়োলজি‌স্টদের এক জন। কাছাকাছি নার্সিং হোমগুলোয় ওর কথা বলা আছে। যে কোনও দরকারে সরমার নম্বর থেকে একটা এসওএস কল গেলেই হল। লোকাল থানার পুলিশ সপ্তাহে এক বার করে এসে খবর নিয়ে যায়। পার্থ আসে নিয়ম করে প্রতি রবিবার। প্রেশার, শুগার সমস্ত মাপে নিজের হাতে। হাত ধরে ওজন মেশিনে তুলে দাঁড় করিয়ে দিয়ে ওজন নেয়। তার পর ছোট ডায়েরিতে নোট করে নেয় সমস্ত কিছু।

সরমা সারাটা সপ্তাহ অপেক্ষা করে থাকেন এই সময়টার। রবিবার এলেই সকাল থেকে সাজ-সাজ রব। ঘরবাড়ি গুছিয়ে রাখেন, বসার জায়গা পরিপাটি করেন, বিছানায় নতুন চাদর বিছিয়ে নেন মিনতিকে দিয়ে। সারাটা দিন ধরে টুকটুক করে রান্না করেন পার্থর পছন্দসই সব পদ। সমস্ত গুছিয়ে মিনতিকে তাড়াতাড়ি ছুটি দিয়ে অপেক্ষা করেন পার্থর গাড়ি‌র আওয়াজের। মিনতি মনে মনে অবাক হয়। ভাবে, বুড়ি‌র নিজের কেউ নেই বলেই বোধহয় বোনের একমাত্র ছেলে‌টাকে এত বেশি ভালবাসে।

পার্থ এলে সারাটা সপ্তাহের জমা কথা উগরে দিতে থাকেন সরমা। তখন কোথায় ভেসে যায় তাঁর স্বভাবগাম্ভীর্য, তাঁর ব‍্যক্তিত্ব! স্বভাববিরুদ্ধ কী এক প্রগল্ভতায় পেয়ে বসে যে তাঁকে! তিনি পার্থর গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে চান, আঁকড়ে ধরে থাকতে চান পার্থর হাত। হয় না। কেমন যেন লজ্জা করে! নিজের আচরণ নিজের কাছে‌ই যেন কেমন বিসদৃশ ঠেকে।

আসলে সারা জীবন তিনিই ছিলেন সকলের সব আলোচনার কেন্দ্র‌বিন্দু। চাকরি করেছেন যখন, তখনও তাঁকে নিয়ে সকলের কৌতূহলের শেষ ছিল না। মেয়েদের কিটি পার্টি‌তে সকলে তাঁর সঙ্গে হেসে হেসে গল্প করলেও আড়ালে তাঁকে নিয়ে তুমুল সমালোচনার ঝড় ব‌ইত। বেশির ভাগ‌ই অফিসার‌দের স্ত্রী। তারা বিনা যোগ্যতা‌য় কেবল বিবাহসূত্রে সরকারি সমস্ত সুযোগ-সুবিধা ভোগ করত। সরমা জানতেন, আসলে তিনি ছিলেন এদের সকলের ঈর্ষার পাত্রী।

ওদের উপর করুণা হত তাঁর, সহজে মিশতে পারতেন না। মেয়েদের দলে তাই মিশতেন‌ও না বিশেষ, বরং পুরুষ কোলিগদের সঙ্গেই ছিলেন বেশি স্বচ্ছন্দ। দক্ষিণ ভারতীয় যুবক রঙ্গনাথনের সঙ্গে‌ও সেভাবেই আলাপ। প্রাথমিক মুগ্ধতা কাটিয়ে বন্ধু‌ত্ব তৈরি হতে সময় লাগেনি। সম্পর্ক এগিয়েছে দ্রুতগতিতে। প্রেম থেকে শরীর। কিন্তু বিয়ের প্রস্তাবে রাজি হননি সরমা। তামিল ব্রাহ্মণ পরিবারের বৌহয়ে আচারসর্বস্ব জীবনে বাঁধা পড়ে যেতে চাননি।

রঙ্গনাথন আহত হলেও জোর করেনি। ফিরে গিয়েছিল। সে জানত না কিছুই। সরমা ছাড়া জানত কেবল পরমা। পরমাকে বলেছিলেন, কারণ তত দিনে নিজের মধ্যে নতুন প্রাণের আগমনবার্তা টের পেয়ে গেছেন সরমা। সঙ্গে স্পষ্ট করে এও জানিয়ে দিয়েছিলেন, বাচ্চাটাকে নষ্ট করতে চান না তিনি। বিয়ে করতে চাননি, কিন্তু ভ্রূণহত্যার নিষ্ঠুর আচরণে‌ও মন সায় দেয়নি তাঁর। রঙ্গনাথনের সন্তানকে রঙ্গনাথনের অজ্ঞাতেই পৃথিবীতে এনেছিলেন সরমা।

রঙ্গনাথনের সঙ্গে কি অন্যায় করেছিলেন তিনি? তখন তা মনে হয়নি। মনে হয়েছিল, প্রকৃতি তাঁকে, সমস্ত নারীকে এ অধিকার দিয়েছে। অন্যায় করেছিলেন কি বাচ্চাটার সঙ্গে‌ও? কিন্তু এ ছাড়া আর কোনও উপায়ও ছিল না তাঁর! অত বছর আগে সমাজে সিঙ্গল মাদারের কোনও ধারণা‌ই ছিল না। গ্রহণযোগ্যতাও নয়। বোন, প্রিয় বন্ধু পরমাকে তাই জানাতে হয়েছিল সবটাই। পরমা জানত, তাই মণীশ‌ও জানত। দিদিকে ভালবাসত পরমা, সমর্থনও করত সব ব্যাপারে। বিশ্বাস করত, তার দিদি ভুল করার মানুষ নয়। বড় শ্যালিকার প্রতি সম্ভ্রমে খাদ ছিল না মণীশেরও।

তত দিনে রাঁচীতে পোস্টিং হয়ে গেছে সরমার। সেকালে পরিচয়পত্রের তো অত কড়াকড়ি ছিল না, ফলে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন পরমার নাম নিয়েই। সন্তান জন্মেছি‌ল মণীশের পিতৃপরিচয় নিয়ে। হাসপাতাল থেকে ফিরে পরমা আর মণীশ যখন বাচ্চাটাকে নিয়ে চলে এল কলকাতায়, খুব কি ভেঙে পড়েছিলেন সরমা? না তো! বরং নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন, মুক্ত লেগেছিল নিজেকে। তাঁর পাখির মতো ফুরফুরে নির্ভার জীবন আবার হাতছানি দিয়ে ডাকতে শুরু করেছিল তাঁকে।

মুক্ত আকাশ! যেমন ইচ্ছে তেমন করে বাঁচার স্বাধীনতা! একটার পর একটা স্বপ্নপূরণ। তবে নতুন করে সম্পর্কে জড়ানোর মতো ভুল করেননি আর কখনও। কোথাও নোঙর ফেলতে কিংবা বাসা বাঁধতে ইচ্ছে‌ই করেনি। ভাগ্যিস করেনি! পরমাআর মণীশও সন্তান নেয়নি আর। কেন, সে কথা কখনও জানতে চাননি সরমা। তিনি বরাবর এ রকমই। কখনও কারও নিজস্ব পরিসরে ঢোকেননি, নিজের পরিসরে কাউকে ঢুকতেও দেননি।

এখন এই বয়সে পৌঁছে যৌবনের সেই উদ্দামতা স্তিমিত হয়ে গেছে একেবারেই। কোথাও গেলে‌ও সরমা চুপচাপ বসে থাকতেই পছন্দ করেন বেশি। কত কথাই তো বলেছেন সারা‌টা জীবন ধরে! এখন চুপ করে বসে চার পাশ‌টাকে অনুভব করতেই তাঁর ভালও লাগে বেশি। মনে হয়, এই তো, আর তো ক’দিন, সময় তো হয়েই এল!

পার্থ ছেলেমানুষের মতো অভিমান করে, কাছে নিয়ে যেতে চায়। পার্থর বৌ রিমি বলে, “মা, বাবা না-হয় নেই, কিন্তু আমরা তো রয়েছি মাসিমণি, তুমি আমাদের কাছে চলে এসো! আমরা কি কেউ ন‌ই তোমার?”

অজান্তেই সরমার দীর্ঘশ্বাস পড়ে একটা। মনে মনে ঠিক করে রাখেন, এবার পার্থ এলেই পাখিটার কথা জিজ্ঞেস করবেন।

পার্থ আসে রবিবার দুপুরে, নার্সিংহোম থেকে ফেরার পথে। পাখিটা তখনও ডানা মুড়ে জবুথবু হয়ে বসে রয়েছে শুকনো গাছটার ডালে। ওর ফোলানো শরীর ঘিরে থাকা সাদা-কালো টিপটিপে ডানায় দুপুরের মিঠে সোনালি রোদ পিছলে পিছলে যাচ্ছে। পার্থ অনেক ক্ষণ ধরে ভাল করে দেখে পাখিটাকে। তার পর মাথা নাড়ে। নাঃ! চেনে না!

মিনতি খাবার টেবিল সাজায়। পার্থ আর সরমা আজ এক সঙ্গে দুপুরের খাবার খাবেন। হঠাৎ কী মনে হতে পার্থ এগিয়ে যায় ব্যালকনির দিকে। খুব কাছ থেকে পাখিটার কয়েকটা ছবি তুলে নেয় হাতে‌র মোবাইল ফোনে। তার‌ পর সেই ছবি গুগল লেন্সে ফেলে হাসিমুখে এগিয়ে যায় সরমার দিকে। বলে, “মাসিমণি এই নাও তোমার পাখির ডিটেলস। এটা আর কিছুই নয় মাসিমণি, কোকিল! লেডি কোকিল!”

কোকিল! সরমা বিস্মিত হন, বলেন, “কিন্তু সে তো কুচকুচে কালো রঙের হয় রে!”

পার্থ বলে, “না মাসিমণি। ওই যে বললাম, এটা মেয়ে কোকিল! তাই অন্য রকম দেখতে।”

বরাবরের ভাল ছাত্রী সরমার মাথায় পুঁথিপড়া বিদ্যের মতো তথ্যের স্রোত ব‌ইতে থাকে। “ঠিক, ঠিক!” সরমা বিড়বিড় করে‌ বলতে থাকেন, “সায়েন্টিফিক নেম, ইউডিন্যামিস স্কলোপ্যাসিয়াস, ফ্যামিলি কুকুল্যাডি। ভারত এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া‌য় সব চেয়ে বেশি দেখা যায়। আইরিশ ক্রিমসন রেড। মেল এবং ফিমেল স্পিশিস‌কে একদম ভিন্ন দেখতে। কোকিল কখন‌ও বাসা বাঁধে না। স্ত্রী-পাখি ডিম পাড়ার সময় একই ধরনের অন্য জেনাসের পাখির বাসায়, মূলত কর্ভাস জেনাসের পাখি, মানে কাকের বাসায় ডিম পেড়ে আসে…”

পার্থ হাসিমুখে ঘাড় নেড়ে নেড়ে সরমার কথায় সায় দিচ্ছিল। হাসতে হাসতে‌ই বলল, “উফ মাসিমণি! ইউ আর অ্যামেজ়িং! এখনও এত কিছু মনে আছে তোমার! আচ্ছা, একটা অদ্ভুত ব‍্যাপার খেয়াল করেছ…”

সরমা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন পার্থর দিকে। পার্থ পাখিটার দিকে আঙুল নির্দেশ করে বলল, “সব পাখির ছানাই একটা বয়স পর্যন্ত তাদের মায়ের কাছে বড় হয়, কিন্তু এর ছানাগুলো কেউ কিন্তু একে চেনে না! জানেই না তাদের আসল মা কে!”

কথা খুঁজে না পেয়ে ফ্যাকাশে মুখে হাসেন সরমা।

বরাবর ঠিক যেমন চেয়েছিলেন, ঠিক তেমনই একাকী, নিঃসঙ্গ, নোঙরহীন জীবন তিনি যাপন করে এসেছেন। তবু কেমন যেন এক দমকা হাওয়ায় এলোমেলো বোধ করেন দাপুটে প্রাক্তন আইএএস অফিসার সরমা সেন।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Bengali Short Story Short story

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy