কখনও পোড়া হাড়ের উপরে মোমো সেঁকার ছবি ঘুরছে, কখনওআগুন লেগে যাওয়া ঘরের গারদের মতো দরজায় তালা ঝুলিয়ে ভিতরে কিছু মানুষকে ভরে দেওয়ার ছবি ছড়ানো হচ্ছে। কখনও আবারকোনও তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই বলে দেওয়া হচ্ছে, দোষী কে বা কার জন্যবিপর্যয় ঘটেছে! নরেন্দ্রপুরেরঅগ্নিকাণ্ড নিয়ে দিনকয়েক এ ভাবেই নানা রকম মন্তব্য ছড়িয়ে দেওয়ার পরে এখন মনোযোগ ঘুরে গিয়েছে পার্ক স্ট্রিটের একটি রেস্তরাঁর দিকে। সমাজমাধ্যমে দেওয়া একটিভিডিয়োয় দাবি করা হয়েছে, সেখানে এক খাবার বলে অন্য খাবার পরিবেশন করা হয়েছে। সেই নিয়ে দাবি, পাল্টা দাবির ঝড় চলছে। যদিও এর অধিকাংশই ভুয়ো বলে দাবি পুলিশের। এমন ঘটনাউস্কানিমূলক বলেও মনে করছে তারা। ইতিমধ্যেই লালবাজার ভুয়ো তথ্য ছড়ানোর দায়ে নোটিস পাঠানোর ভাবনাচিন্তা শুরু করেছে। মনোরোগ চিকিৎসকদের যদিও দাবি, ‘‘ভুয়ো তথ্যের বিস্ফোরণ ঘটছে। নানা ঘটনায় ভীত সমাজকে এই ভুয়ো তথ্যের ভান্ডার আরও আতঙ্কিত করে তুলছে।’’
তদন্তকারীদের দাবি, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সমাজমাধ্যমে যা ছড়ানো হচ্ছে, তার চেয়ে বাস্তব অনেকটাই আলাদা। নাজিরাবাদের দু’টি গুদামে আগুন লেগে বেশ কয়েক জনের মারা যাওয়ার ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ দেখেছে, ওই ঘটনা নিয়েও সমাজমাধ্যমে বেশ কিছু বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে বেশ কয়েকদিন ধরে।
একই ভাবে এই মুহূর্তে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, পার্ক স্ট্রিটের রেস্তরাঁর সেই কর্মীর নাম, পরিচয়, ঠিকানা। যদিও যে ভিডিয়ো থেকেঘটনার সূত্রপাত, সেটি তুলে নেওয়া হয়েছে প্রেরকের তরফে। ওই কর্মীর বাড়িতে হানা দেওয়ারও ডাকআসছে প্রকাশ্যে। চলছে রেস্তরাঁর মালিক কে এবং তিনি কোন ধর্মের, সেই বিশ্লেষণ। রেস্তরাঁ জ্বালিয়ে দেওয়ার ডাকও দেওয়া হয়েছে সমাজমাধ্যমে। পুলিশ এফআইআর রুজু করে তদন্ত চালানোর পাশাপাশি রেস্তরাঁ কর্মীকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। তাঁর পরিবারের নিরাপত্তার বন্দোবস্তও করা হচ্ছে বলেসূত্রের দাবি।
আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসক-পড়ুয়াকে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনাতেও সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল নানাতথ্য। বলা হয়েছিল, ‘ঘটনাস্থল থেকে ১৫০ গ্রাম বীর্য মিলেছে’। কেউ লিখেছিলেন, ‘তরুণী এতটাই অত্যাচারিত যে, তাঁর পেলভিক বোন আর কলার বোন ভেঙে গিয়েছে’। এর সঙ্গেই দেদার ছড়িয়েছে নির্যাতিতার নাম, ঠিকানা ও ছবি। বাদ যায়নি মৃতদেহ উদ্ধারের সময়ের ছবিও! যদিও এর সবই ভুয়ো বলেপুলিশের দাবি।
জানা যায়, চিকিৎসকেরা নাকি মৃতার যৌনাঙ্গের সম্পূর্ণ ওজন লিখেছেন ১৫০ গ্রাম। ময়না তদন্তের সময়ে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ওজন করেন তদন্তকারীরা। তাতে আলাদাকোনও রোগ ছিল কিনা, বোঝা যায়। আঘাত ধরে ধরে নম্বর দিয়ে লেখা হয়, যাতে আদালতে ব্যাখ্যাচাইলে বলতে সুবিধা হয়। ওই নম্বরকেই কতগুলি হাড় ভেঙেছে, সেই সংক্রান্ত নম্বর ধরে নিয়েও পোস্ট করা হয়েছিল সমাজমাধ্যমে। একই ব্যাপার হয়েছিল কসবার আইন কলেজে গণধর্ষণের অভিযোগ সামনে আসার সময়েও। অভিযুক্তের কীর্তি ফাঁস করার নামে তাঁর সঙ্গীর ব্যক্তিগত ছবিও ছড়িয়ে দেওয়া হয় সমাজমাধ্যমে।
মনোরোগ চিকিৎসক দেবাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন, ‘‘সমাজমাধ্যমে কোনও ছাঁকনি নেই। বয়স্ক থেকে শিশুদের মধ্যে এর কুপ্রভাব পড়ছে বেশি। অনেকে ভাবতে শুরু করেন, তেমন শাস্তি তো হয় না। আমরাও করতে পারি।’’ সমাজতাত্ত্বিক অভিজিৎ মিত্র বলেন, ‘‘এ সবআসলে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা, অন্তরের দৈন্যও বটে। এ ছাড়া আর কিছুইকরার ক্ষমতা নেই। অনেকে আবার ভাবেন, দেখো, আমার কথায় কত জন নাচছে। এর মধ্যে একটা শক্তি অনুভবেরও ব্যাপার আছে। এগুলিকে পাত্তা দিতে দিতে আসলে আমরা উত্তেজনা আর রোমাঞ্চ ছাড়া বাঁচতেই ভুলে যাচ্ছি।’’
আইনজীবী তথা সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞ বিভাস চট্টোপাধ্যায়ের মন্তব্য, ‘‘সব কিছুতেই এখন স্বীকৃতি ও প্রশংসা খোঁজা হচ্ছে।সমাজমাধ্যমে এমন প্রচার বিপদ ডেকে আনতে পারে, কোনও কিছু সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা তৈরি করতে পারে। সমাজমাধ্যমে খুব বেশি বিশ্বাস করেন, এমন মানুষ আবার ভ্রান্ত ধারণার পথে হেঁটে প্রতারিতও হতে পারেন।’’ তা হলে উপায়? কড়া আইন প্রয়োগের ওষুধ ছাড়া রোগ সারার লক্ষণ দেখছেন না কেউই।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)