E-Paper

ক্ষণিকের লাভ?

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ক্ষেত্রে এই সংঘাত একটি অদ্ভুত কৌশলগত আপাতবিরোধ তৈরি করেছে। মস্কো এক দিকে এই হামলাগুলিকে অবৈধ আগ্রাসন বলে সরবে নিন্দা করেছে এবং অন্য দিকে তেহরানের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য ভাগ করে নিয়েছে বলে জানা গেছে।

শেষ আপডেট: ১৯ মার্চ ২০২৬ ০৫:৫৬

যে কোনও সামরিক সংঘাত অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে, যেখানে কোনও তৃতীয় পক্ষ এই বিশৃঙ্খলাকে কাজে লাগায় ব্যক্তিগত, আর্থিক বা কৌশলগত লাভের জন্য। এর ব্যতিক্রম নয় আমেরিকা, ইজ়রায়েল এবং ইরানের সাম্প্রতিক সংঘর্ষও। পশ্চিম এশিয়া জুড়ে যখন যুদ্ধের আবহ এবং কূটনৈতিক উত্তেজনা তুঙ্গে, তখন আর একটি প্রধান শক্তি নীরবে এই অস্থিরতা থেকে সুবিধা লাভ করছে— রাশিয়া। যুদ্ধের জেরে এমনিতেই বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এর উপর আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের আক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় ইরান হরমুজ় প্রণালী কার্যত বন্ধ করে দেওয়ায় বিঘ্নিত হয়েছে জ্বালানি শক্তির সরবরাহ-শৃঙ্খল। স্বাভাবিক ভাবেই ভারত ও চিনের মতো এশীয় ক্রেতারা বাধ্য হয়েছে বিকল্পের সন্ধান করতে, যা এখন সরবরাহ করছে মস্কো। সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, হরমুজ় বন্ধ হওয়ার পর থেকে মস্কো প্রতি দিন প্রায় ১৫ কোটি ডলার অতিরিক্ত তেল রাজস্ব আয় করছে বলে অনুমান। শুধু তা-ই নয়, কিছু দিন আগে ভারতীয় পরিশোধকদের রুশ অপরিশোধিত তেল কেনার জন্য ৩০ দিনের ‘ছাড়’ দেওয়ার পর, এখন অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রেও এই নীতি প্রসারিত করার কথা ঘোষণা করেছে আমেরিকা।

এ দিকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ক্ষেত্রে এই সংঘাত একটি অদ্ভুত কৌশলগত আপাতবিরোধ তৈরি করেছে। মস্কো এক দিকে এই হামলাগুলিকে অবৈধ আগ্রাসন বলে সরবে নিন্দা করেছে এবং অন্য দিকে তেহরানের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য ভাগ করে নিয়েছে বলে জানা গেছে। আসলে, পশ্চিমের যুদ্ধে সরাসরি জড়িত না-হওয়ার বিষয়ে সতর্ক রয়েছে রাশিয়া। পুতিনের হিসাব সোজা— রাশিয়ার অগ্রাধিকার ইউক্রেনের যুদ্ধ, এবং পশ্চিম এশিয়ায় যে কোনও উত্তেজনা তাদের পক্ষে কৌশলগত ভাবে কাম্য। তা ছাড়া, ইউক্রেন যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব ক্রমশ রাশিয়ার অর্থনীতিতে স্পষ্ট হয়ে উঠলেও, তেলের এই আকস্মিক রাজস্ব বৃদ্ধি পুতিনকে যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জোগান দিয়েছে। অন্য দিকে, আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলের ইরান অভিযানে ব্যবহৃত হচ্ছে আমেরিকার অস্ত্রসম্ভারের অনেকখানি, যা অন্যথায় কাজে লাগত ইউক্রেনের প্রতিরক্ষায়। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জ়েলেনস্কি উদ্বিগ্ন হতে পারেন, এই অস্ত্র ঘাটতি আগামী দিনে রাশিয়াকে যুদ্ধে আরও এগিয়ে দিতে পারে।

ফলে, আপাতত মস্কোর পক্ষেই ভারসাম্য ঝুঁকে রয়েছে। বস্তুত, সম্প্রতি ভারতে আমদানি করা রুশ তেলের দাম রেকর্ড ব্যারেল প্রতি ৯৮.৯৩ ডলারে পৌঁছে যায়, যা গত চার বছরে সর্বোচ্চ। তবুও এই পর্বটি সমসাময়িক ভূ-রাজনীতিতে এক পুরনো ধারারই ইঙ্গিতবাহী— প্রান্তিক দ্বন্দ্বগুলি বৃহৎ শক্তিগুলির জন্য যে সুযোগ তৈরি করে সেগুলি খুব কমই সুস্থায়ী কৌশলগত সুবিধায় রূপান্তরিত হয়। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, যদি এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়, তা হলে এটি একটি গভীর বিশ্বব্যাপী মন্দার সূত্রপাত করতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত হাইড্রোকার্বনের চাহিদা হ্রাস করবে। ফলে, শেষ অবধি আহত হওয়ার সম্ভাবনা রাশিয়ার অর্থনীতিরই। আপাতত ক্ষণিকের জন্য লাভবান হলেও, আগামী দিনে এই সুযোগকে রাশিয়া স্থায়ী ভূ-রাজনৈতিক লাভে রূপান্তরিত করতে পারবে কি না, এটাই দেখার।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

US-Israel vs Iran Russia US-Iran Relation Iran-Israel Situation

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy