E-Paper
WBState_Assembly_Elections_Lead0_02-05-26

ক্ষমতার অন্তরাল

রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে সেই সময়ে রোম্যাঁ রোল্যাঁর মধ্যে একটি গভীর অন্তর্দ্বন্দ্ব কাজ করছিল। তিনি জানতেন, এই ভারতীয় কবির অন্তর্জগতে কত বড় শক্তির সঞ্চয়, মানবিক অভিঘাতে তাঁর হৃদয় ও মস্তিষ্ক কেমন সদা-উদ্দীপ্ত।

শেষ আপডেট: ০৩ মে ২০২৬ ০৫:২৭

সব কেমন যেন পাল্টে গেছে। ইতিমধ্যে ফাশিস্টদের প্রভাব আরো বেশি তীব্র হয়ে উঠেছে। আতঙ্কে লোকেরা পেটের কথা পেটেই রাখে, মুখ আর খুলতে চায় না।” ১৯২৬ সালে বাবার সঙ্গী হয়ে ইটালি গিয়ে লিখেছিলেন রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পাল্টে যাওয়ার কথাটা তাঁর মনে হয়েছিল ঠিক এক বছর আগে আর এক বার ইটালি আসার অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে। এই সময়ে ইটালি এমন এক রাজনৈতিক-সামাজিক ‘বিপ্লব’-এর মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল, যাকে অন্য ভাষায় বলা যেতে পারে ফ্যাসিস্ট অভ্যুত্থান, তার পরিপ্রেক্ষিতে এক বছর নিতান্ত কম সময় নয়। এই ধরনের পরিবর্তন স্বল্প সময়ের মধ্যেই অনেকটা এগিয়ে যায়— তার উদ্বেগতাড়িত বর্ণনা আছে তখনকার অনেক ইউরোপীয় লেখক-চিন্তকের রচনাতেই। প্রসঙ্গত, ১৯২৬ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই বিশেষ ইউরোপে সফরটি একটি বিতর্কিত ঘটনা হয়ে আছে রবীন্দ্র-ইতিহাসে। অনেকেই মনে করেছিলেন মুসোলিনির আমন্ত্রণ গ্রহণ করে ইটালি গিয়ে রবীন্দ্রনাথ বড় ভুল করেছিলেন, এবং সেখানে গিয়ে সে দেশের সমাজ-সংস্কৃতির আকর্ষণের চক্রে পড়ে ফ্যাসিবাদের সমূহ বিপদ বুঝতে আরও বড় ভুল করেছিলেন। এই সময়ে তাঁর ফরাসি সুহৃদ রোম্যাঁ রোল্যাঁর সঙ্গে তাঁর পত্রবিনিময় একটি উল্লেখযোগ্য মানস-যাত্রাপর্বের স্বাক্ষর বহন করে। প্রায় এক যুগ আগে প্রথম নোবেলজয়ী এশীয় কবির মঙ্গলকামী বিদেশি বন্ধু কম ছিল না, তাঁরা রবীন্দ্রনাথকে বোঝাতে চেষ্টা করেছিলেন সে দিনের ইটালীয় সরকারের অতি-কর্তৃত্ববাদী নিয়ন্ত্রণের বিপদটা কত ব্যাপক ও গভীর। রোল্যাঁ ছিলেন তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য।

রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে সেই সময়ে রোম্যাঁ রোল্যাঁর মধ্যে একটি গভীর অন্তর্দ্বন্দ্ব কাজ করছিল। তিনি জানতেন, এই ভারতীয় কবির অন্তর্জগতে কত বড় শক্তির সঞ্চয়, মানবিক অভিঘাতে তাঁর হৃদয় ও মস্তিষ্ক কেমন সদা-উদ্দীপ্ত। জানতেন, এক দিকে রবীন্দ্রনাথের সমগ্র সত্তা বিশ্বমঙ্গলকামনায় সিঞ্চিত, অন্য দিকে জাতিরাষ্ট্রের উদগ্র অস্তিত্ব ও দর্পিত সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তিনি ইতিমধ্যেই বলিষ্ঠ প্রতিবাদে দৃপ্ত। ফলে অনেক সমসাময়িক ‘বন্ধু’ যখন রবীন্দ্রনাথকে বুঝতে ভুল করছেন, রোল্যাঁ কিন্তু তা করেননি, বরং সযত্নে তাঁর ভুলগুলি ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। বুঝেছিলেন যে, এ হল দেখার ভুল, কিংবা না-দেখার ভুল। যতখানি সাধারণ দৃষ্টিতে দেখা যায়, তাকে অতিক্রম করে দেখতে পাচ্ছিলেন না রবীন্দ্রনাথ, সেই অক্ষমতার একটি কারণ হয়তো রাষ্ট্রিক কৌশলের বিষয়ে তাঁর ঈষৎ অনভিজ্ঞতা, অন্য কারণ সম্ভবত ইউরোপীয় সমাজ-সংস্কৃতির আড়াল-আবডাল বিষয়ে তাঁর অসতর্কতা। তবে এও ঠিক, অত্যন্ত সচেতন ভাবেই সে দিন ‘ইল দুচে’ মুসোলিনি এই ভারতীয় কবির সামনে মেলে ধরেছিলেন ইটালির রাষ্ট্রিক কাজকর্মের কেবল একটি বাহ্যিক চেহারা— সত্য চেহারাটি লুকিয়ে। ফলে সে দেশের কিছুটা প্রোপাগ্যান্ডা-সুলভ পরিচয়ই রবীন্দ্রনাথ পেয়েছিলেন। এও ভুললে চলবে না যে, ফ্যাসিস্ট জননেতা মুসোলিনির জনপ্রিয়তা তখন গগনচুম্বী, যার আড়ালে অনেক তথ্য ও অনেক সত্য ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। ইউরোপের বেশ কিছু দেশের মানুষের কাছে সেই সময়ে ফ্যাসিবাদী শাসনের এক আশ্চর্য গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হচ্ছিল— পরবর্তী কালে পিছনে ফিরে তাকিয়ে যা এক বিরাট ধাঁধার মতো ঠেকে। উনিশশো বিশ ও ত্রিশের দশকে ইউরোপের এই দেশগুলিতে লক্ষ লক্ষ মানুষের দৃষ্টি আবৃত করেছিল একটি ভারী পর্দা, যার মধ্যে পরতে পরতে মোহ, শঙ্কা আর বিভ্রান্ত উচ্চাশা মিশেছিল। সেই ইতিহাস এখনও স্বল্পালোচিত।

১৯২২ সাল থেকে মুসোলিনির রাজনৈতিক নেতৃত্ব শুরু। তখন থেকেই একটি বিষয় স্পষ্ট ছিল যে সমাজবাদীদের আক্রমণের মুখে রাখা ও উদারবাদীদের সম্পূর্ণ দুর্বল ও অপ্রাসঙ্গিক করে রাখা, এই দ্বৈত কার্যক্রমই তাঁর, তাঁর প্রশাসনিক বৃত্তের ও তাঁর উগ্র সমর্থক ব্ল্যাকশার্ট বাহিনীর লক্ষ্য। এবং চূড়ান্ত লক্ষ্য, অবশ্যই, ‘টোটাল পাওয়ার’ দখল। এর সঙ্গে সামাজিক-সাংস্কৃতিক বৃত্তকে নতুন করে গড়া ছিল আর একটি জরুরি কাজ। রাষ্ট্রের প্রতি প্রশ্নহীন আনুগত্য, নেতার প্রতি অন্ধ সমর্থন, সচেতন ও সক্রিয় ভাবে পৌরুষ-ভিত্তিক রাজনীতি ও সমাজ নির্মাণ— এই ফ্যাসি-তন্ত্রের দাবি। রোম্যাঁ রোল্যাঁ যথার্থ বলেছিলেন সে দিন, এই রাজনৈতিক ক্রিয়াকর্মের একটা প্রবল দুর্বোধ্য আকর্ষণ আছে, যা বিপদের ঘূর্ণিপাকে তলিয়ে দিতে পারে সমগ্র দেশকে, অতি দ্রুত, প্রায় অগোচরে। একশো বছর পেরিয়ে এসে বলা যায়, ইতিহাস সভ্যতার শিক্ষক, যদিও শিক্ষার্থী হিসাবে সভ্যতা বেশি নম্বর পাবে না।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Rabindranath Tagore Benito Mussolini Italy

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy