E-Paper

নৈতিকতার প্রশ্ন

শ্রেণিকক্ষে শেখার পরও যদি বইয়ের পড়া পড়ুয়ার আয়ত্তে না আসে, দুর্বলতা তৈরি হয়, অতিরিক্ত সহায়তার প্রয়োজন হয়, তবে সেই মুশকিল আসান হবে স্কুল চত্বরের মধ্যেই।

শেষ আপডেট: ১৬ জুন ২০২৬ ০৮:৩৫

আবার সরকারি, সরকারপোষিত ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলের শিক্ষকদের গৃহশিক্ষকতা নিষিদ্ধ করার নির্দেশ জারি করেছে শিক্ষা দফতর। নির্দেশিকাটি অবিলম্বে কার্যকর করা জরুরি, কারণ এর সঙ্গে জড়িত পেশাগত নৈতিকতা ও দায়বদ্ধতার প্রশ্ন। যে কোনও চাকরির মতো সরকারি চাকরিতেও স্পষ্ট কিছু শর্ত রয়েছে। সরকার শিক্ষককে তাঁর কিছু নির্দিষ্ট অবশ্যপালনীয় কর্তব্যের বিনিময়ে বেতন দেয়। কর্তব্যসমূহের মধ্যে রয়েছে শ্রেণিকক্ষে পড়ানো, ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষাগত ও সামাজিক অগ্রগতির ভারগ্রহণ এবং সহ-শিক্ষামূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিদ্যালয়ের সামগ্রিক উন্নয়ন। এই কাজই যদি অতিরিক্ত মূল্যের বিনিময়ে বিদ্যালয়ের বাইরে পণ্য রূপে ব্যক্তিগত আয়ের উৎস হয়, তবে স্বার্থসংঘাতের প্রশ্ন ওঠে। এ শুধু নিয়মই নয়, সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানেরও বিষয়।

শ্রেণিকক্ষে শেখার পরও যদি বইয়ের পড়া পড়ুয়ার আয়ত্তে না আসে, দুর্বলতা তৈরি হয়, অতিরিক্ত সহায়তার প্রয়োজন হয়, তবে সেই মুশকিল আসান হবে স্কুল চত্বরের মধ্যেই। অতিরিক্ত ক্লাস করানো, আলাদা মনোযোগ, শিক্ষক-অভিভাবক আলোচনা— এগুলি বিদ্যালয়ের কার্যক্রমেরই অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ, একটি মজবুত শিক্ষাব্যবস্থায় ছাত্রছাত্রীর সকল শিক্ষাগত চাহিদা বিদ্যালয়-অভিমুখী হওয়ারই কথা। কিন্তু সমাজে গৃহশিক্ষকতা সমান্তরাল ব্যবস্থার অস্তিত্ব, এমন একটি ধারণা বা সংস্কৃতি লালন করছে যেখানে অনেক অভিভাবকই মনে করতে পারেন যে বিদ্যালয়ের শিক্ষায় কিছু খামতি থেকে যাচ্ছে বা আরও কিছু বেশি জ্ঞান বা গুণের নাগাল পেতে টিউশনির দ্বারস্থ হতে হবে। এই ধারণা বিদ্যালয়ের প্রতি আস্থা, সম্মানকে ক্ষুণ্ণ করে। পড়ুয়া, অভিভাবক ও সমাজের চাহিদা অন্য কোনও দরজায় গেলে বিদ্যালয়ের উপর নিরবচ্ছিন্ন মানরক্ষার চাপও আর থাকে কি? সমস্যা সমাধানের দায় বর্তায় শিক্ষক, স্কুল কর্তৃপক্ষের উপরই— সেই দায়টা না থাকলে বিদ্যালয়ের শক্তিশালী হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটিই ব্যাহত হয়। স্কুলশিক্ষা দুর্বল, স্থবির হয়।

গৃহশিক্ষকতা বহু যুগের অভ্যাস। কখনও প্রশাসনের চোখ এড়িয়ে, কখনও কর্তৃপক্ষের ঔদাসীন্যের সুযোগে প্রকাশ্যেই এটি চলে। অভিভাবকেরা সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আকাঙ্ক্ষায়, সন্তানের সাফল্যখাতে বিনিয়োগ জ্ঞানে এই খাতে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেন। সকলে না হলেও, কিছু শিক্ষক ব্যক্তিগত গৃহশিক্ষকতা কেন্দ্রে ছাত্র টানতে বিদ্যালয়ের পাঠদান প্রক্রিয়াকে গুরুত্বহীন করেন কি না, সেই তর্কও রয়েছে। এখানেই বড় হয়ে ওঠে সমবণ্টনের প্রশ্ন। শিক্ষাক্ষেত্রে সকলের সমান সুযোগ নিশ্চিত করা কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব। যাঁরা গৃহশিক্ষকের কাছে যেতে পারেন তাঁদের সন্তান যদি সত্যিই অতিরিক্ত সহায়তা ও সুবিধা পায় এবং যাঁরা গৃহশিক্ষকের কাছে সন্তানকে পাঠাতে পারলেন না তাঁদের সন্তান যদি সেই সুযোগ-সুবিধা না পায় তবে তো এই শিক্ষাগত বৈষম্য আরও প্রবল হয়। অর্থাৎ, শিক্ষাব্যবস্থা গৃহশিক্ষকতার প্রতি নির্ভরশীল হয়ে গেলে তা সামাজিক ন্যায়, ভারসাম্য এবং জনস্বার্থের পথের অন্তরায় হয়ে ওঠে। কারণ, তখন শিক্ষাব্যবস্থায় পড়ুয়ার অগ্রগতি তার পরিবারের আর্থিক সামর্থ্যের উপর নির্ভর করে, ব্যর্থ হয় উজ্জ্বল ভবিষ্য-নাগরিক গড়ার রাষ্ট্রের স্বপ্ন এবং শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য— উভয়ই।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Private Tuition Private Tutors West Bengal government Education Department Education system

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy