E-Paper

অপূর্ণ পুষ্টি

গলদটি আসলে শিশুদের নিয়ে সরকারের সদর্থক ভাবনায়। প্রাথমিকের সঙ্গে উচ্চ প্রাথমিকের বরাদ্দের পার্থক্যের জায়গাতেই তা স্পষ্ট। প্রাথমিকে শিক্ষারত শিশু পরিমাণে কম খেলেও তার পুষ্টির দাবিটি একই থাকে।

শেষ আপডেট: ১৫ জুন ২০২৬ ০৫:৫২

পশ্চিমবঙ্গে গত এক মাসে রাজনীতি থেকে অনুদানের অঙ্ক— বদলেছে অনেক কিছুই। শুধু অপরিবর্তিত থেকে যাচ্ছে মিড-ডে মিলে শিশুর পাতের চেহারা। সেই শূন্যতা ভরানোর কোনও সরকারি উদ্যোগ এখনও চোখে পড়ছে না। শিশুর পুষ্টিগত দিকটিকে প্রাধান্য দিতে হলে স্কুলের মিড-ডে মিলে তার পাতে যে খাবারগুলি থাকা আবশ্যক, সেই অনুযায়ী মাথাপিছু বরাদ্দ স্থির করা জরুরি। কিন্তু দেখা যায়, বাজারদর বৃদ্ধি পেলে, জ্বালানির খরচ বাড়লেও মাথাপিছু বরাদ্দ সেই অনুপাতে বাড়ে না। রাজ্যে এই বরাদ্দ শেষ বার বেড়েছিল ২০২৫ সালে, প্রাথমিক ও উচ্চ প্রাথমিকে বরাদ্দ দাঁড়িয়েছিল যথাক্রমে ৬.৭৮ টাকা, এবং ১০.১৭ টাকা। সেই অঙ্কই এখনও অবধি অপরিবর্তিত। অথচ, গত কয়েক মাসে যুদ্ধের জেরে জ্বালানি থেকে আনাজপাতির দর— সবই ঊর্ধ্বমুখী। তার সঙ্গে বরাদ্দের সাযুজ্য না থাকলে শিশুদের পুষ্টির দিকটি কী ভাবে বজায় থাকবে?

গলদটি আসলে শিশুদের নিয়ে সরকারের সদর্থক ভাবনায়। প্রাথমিকের সঙ্গে উচ্চ প্রাথমিকের বরাদ্দের পার্থক্যের জায়গাতেই তা স্পষ্ট। প্রাথমিকে শিক্ষারত শিশু পরিমাণে কম খেলেও তার পুষ্টির দাবিটি একই থাকে। সেখানে এই পরিমাণ বরাদ্দে কতটুকু দেওয়া যায়? মেনুরও নিতান্ত করুণ অবস্থা। সেখানে সপ্তাহে দু’দিন ডিম-ভাত দেওয়ার কথা থাকলে বাস্তবে তা জোটে না। কারণ, বাজারে একটি ডিমের যা দাম, তাতে বরাদ্দে কুলিয়ে ওঠা যায় না। অনেক সময়ই ডিমের ভুজিয়ার তরকারি একটি গোটা ডিমের বিকল্প হয়ে ওঠে। তদুপরি, তেল, মশলার যতটুকু দাম ধরা থাকে, তাতে স্বাদের সঙ্গেও আপস করতে হয়। স্বাদহীন তরকারি, জলসদৃশ ডালের মধ্যে শিশুর খিদেটিও তলিয়ে যায়। অথচ, সরকারের বেঁধে দেওয়া পুষ্টি-তালিকা ধরে শিক্ষার্থীদের ক্যালরি-সমৃদ্ধ খাবার দিতে গেলে মাথাপিছু বরাদ্দ অন্ততপক্ষে কুড়ি থেকে পঁচিশ টাকা হওয়া প্রয়োজন। সেই লক্ষ্য পূরণ দূর অস্ত্। বরং এত কাল পশ্চিমবঙ্গে মিড-ডে মিলের কম বরাদ্দের প্রসঙ্গ উঠলেই কেন্দ্র-রাজ্য পরস্পর দোষারোপের পালা চলত। তামিলনাড়ু, কর্নাটকের মতো রাজ্য ‘কেন্দ্রের বঞ্চনা’র ফাঁকটি নিজ উদ্যোগে অনেকটাই পূরণ করতে পারলেও পশ্চিমবঙ্গ কেন পারে না— প্রশ্নের উত্তরে অখণ্ড নীরবতা বজায় থাকত, অন্য দিকে কেন্দ্র ব্যস্ত থাকত মূল প্রশ্নটি এড়িয়ে মিড-ডে মিলে কম-তেলের রান্না, মূলত সেদ্ধ, গ্রিল, স্টিম বা বেক করা খাবারে শিশুর ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখার মতো নানাবিধ অপ্রাসঙ্গিক পরামর্শ দানে।

প্রাথমিক ও উচ্চ প্রাথমিকের বয়সটি শিশুর বৃদ্ধি ও শারীরিক গঠনের বয়স। এই বয়সে পুষ্টিতে ঘাটতি তার শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধিকে প্রভাবিত করতে পারে। মিড-ডে মিলের ভাবনাটি যে শিশুদের কথা মাথায় রেখে নির্মিত হয়েছিল, তাদের অধিকাংশই দরিদ্র পরিবারের সন্তান, মিড-ডে মিলের খাবারটিই হয়তো তার কাছে দিনের প্রথম রান্না করা ভরপেট খাবার। সেখানে কার্পণ্য প্রকৃতপক্ষে শিশুর সঙ্গে বঞ্চনার শামিল। শিশুর ভোটাধিকার নেই বলেই কি তার পুষ্টি-চিন্তাটি শূন্য থেকে যায়? নির্বাচনের আগের ক’মাস রকমারি খাবারের আয়োজন, নির্বাচন মিটলেই ডাল-ভাতে ফিরে যাওয়া— এই প্রতারণা অক্ষমণীয়। পশ্চিমবঙ্গে ‘ডাবল এঞ্জিন’ সরকার এই বিষয়ে কী উদ্যোগ করে, অতঃপর সে দিকেই তাকিয়ে থাকবে আগামী দিনের ভোটাররা।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

mid-day meal mid-day meal scheme West Bengal government Government Schools

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy