E-Paper
WBState_Assembly_Elections_Lead0_03-05-26

কী শিখবে, কেন শিখবে

কৃত্রিম মেধাকেও আগে থেকে শিখিয়ে রাখা হয় অনেক কিছু— কিন্তু, শুধু একটাই কাজ বা প্রোগ্রামে আটকে না থেকে তাকে শেখানো হয় যে, শিখে রাখা তথ্যকে ব্যবহার করে কী ভাবে শিখতে হবে নতুন নতুন জিনিস।

সোহম ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ১৯ মার্চ ২০২৬ ০৫:৩৭

মানুষের জন্যই কৃত্রিম মেধা, মানুষকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে রাখার জন্য নয়। এ কথাটি মাথায় রেখেই সম্প্রতি দিল্লিতে আয়োজিত কৃত্রিম মেধার শীর্ষ সম্মেলনের নীতিগত উদ্দেশ্য হয়ে উঠল ‘পিপল-প্ল্যানেট-প্রোগ্রেস— অর্থাৎ, মানুষ, তার পরিবেশ ও পৃথিবী, এবং উন্নতি, এই হল কৃত্রিম মেধার মূল চালিকাশক্তি। অন্তত কাগজে-কলমে তেমনটাই দাঁড়াল। আমরা চাই অথবা না-চাই, জানি অথবা না-জানি, কৃত্রিম মেধা ইতিমধ্যেই আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন থেকে সমাজমাধ্যমের নকল ভিডিয়ো, কৃত্রিম মেধার ব্যবহার সর্বত্র।

মেশিন বা কম্পিউটার চলে অ্যালগরিদমে— অর্থাৎ, পর পর কয়েকটি যুক্তির ধাপ পেরিয়ে যন্ত্র আমাদের অভীষ্ট কাজটি করে। যেমন এটিএম-এ টাকা তুলতে গেলে, সে যন্ত্র একের পর এক প্রশ্ন তথা ধাপ পেরিয়ে তবে আমাদের নির্দিষ্ট করে দেওয়া টাকার অঙ্কটি হিসাব করে তার পেট থেকে বার করে দেয়। এই আগে থেকে শেখানো প্রশ্নগুলি দিয়ে তাকে একটি ‘প্রোগ্রাম’ বা ‘কাজের উপায়’ শেখানো হয়েছে। এই যন্ত্র তাকে শেখানো নির্দিষ্ট কাজটুকুই পারে— এটিএম মেশিনের কাছে আবহাওয়ার পূর্বাভাস চাইলে হতাশ হতে হবে।

কৃত্রিম মেধাকেও আগে থেকে শিখিয়ে রাখা হয় অনেক কিছু— কিন্তু, শুধু একটাই কাজ বা প্রোগ্রামে আটকে না থেকে তাকে শেখানো হয় যে, শিখে রাখা তথ্যকে ব্যবহার করে কী ভাবে শিখতে হবে নতুন নতুন জিনিস। কৃত্রিম মেধার একটি মডেল কতটা শিখছে, তা পরীক্ষার জন্য শেখা ব্যাপারটারই একটা মানদণ্ড তৈরি করতে হয়। শুধু শিখলে হবে না, সেই শেখা যেন প্রশ্নের ‘বুদ্ধিসম্মত’ উত্তর হয় তা-ও দেখতে হবে। বুদ্ধির সম্মতি কিসে? সে যত কম ভুল করে, তাতে।

ঠিক এখানেই কৃত্রিম মেধা চরিত্রে একটা অজগরের মতো। সে গুটিয়ে থাকতে পারে, বা লম্বাও হতে পারে— তাকে কী কী শেখানো হল, কোথা থেকে ও কী ভাবে, তার ভিত্তিতে। এই শেখানোর উদ্দেশ্য কী? প্রযুক্তিকে একটি বিশেষ সময়ের মানুষ বা সমাজের বিন্যাসের ব্যতিরেকে দেখা যায় না। মানবিক মেধা ছাড়া কৃত্রিম মেধার ‘কী ভাবে শিখব’ অচল। তাই, কৃত্রিম মেধার জন্য প্রয়োজন তার সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের বৌদ্ধিক শ্রম। আর প্রয়োজন অতি-শক্তিশালী কম্পিউটার (গ্র্যান্ড প্রসেসিং ইউনিট), যা চালাতে আবার লাগবে প্রচুর জল ও বাতাস। এই শ্রমিকের নিয়োগ এবং এই পরিমাণ আর্থিক সঙ্গতির প্রয়োজন দু’টি জিনিস— এক, পুঁজি; এবং দুই, সেই পুঁজি থেকে যে প্রযুক্তি তৈরি হবে, তার উপরে পুঁজির মালিকদের মেধাস্বত্ব। মেধা-শ্রম, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং পেটেন্ট ছাড়া কৃত্রিম মেধার কাজ সামান্যও এগোতে পারত না। কাজেই, কৃত্রিম মেধা কী শিখবে, আর কী শিখবে না, সেই প্রশ্নের উত্তরও এই বাস্তবকে অস্বীকার করে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব।

যে প্রযুক্তি যত বেশি করে কয়েকটি পুঁজির হাতে থাকে, তার ব্যবহার তত বেশি দামি। রেল ইঞ্জিন হোক বা বিদ্যুৎ, কিংবা সামান্য চিরুনি, সব প্রযুক্তিই যদি মুনাফার উদ্দেশ্যে তৈরি হয়, তার চরিত্রে বিজ্ঞান ও পুঁজি দুই-ই মিলেমিশে থাকবে। ধীরে ধীরে পুঁজি ঠিক করে দেয়, মুনাফার বিজ্ঞানটি কী হবে। পুঁজি যদি রাষ্ট্রের হাতেও থাকে, সেখানেও এই সুযোগ বেশ খানিকটা থেকে যায়।

বিশ্বের বহু দেশেই কৃত্রিম মেধার ‘ন্যায়সঙ্গত’ এবং ‘মানব-কেন্দ্রিক’ ব্যবহারের নীতি নির্দেশের চেষ্টা শুরু হয়েছে। মূলত ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলির জন্য তৈরি ‘ন্যায়সঙ্গত’ কৃত্রিম মেধার প্রশ্নে এই কথা স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে যে, বেহিসাবি কৃত্রিম মেধা ব্যবহারের বিবিধ আর্থিক, আইনি, এবং নীতিগত সমস্যা রয়েছে। যদিও এই আইনের ক্ষেত্রে কোন পুঁজির হাতে কৃত্রিম মেধার প্রযুক্তি থাকবে তা সরাসরি বলে দেওয়া হয়নি— তবুও আলোচনার অবকাশটুকু এখনও আছে।

ভারতের মতো দেশে এই নৈতিক ও আইনি আলোচনার পরিসরই এখনও তৈরি হয়নি। কেন্দ্রীয় নীতিতে এবং সাম্প্রতিক বাজেটে শিক্ষায় এবং কৃষি-শিল্পের মতো ক্ষেত্রে কৃত্রিম মেধার ব্যবহারে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। এখানেই একটি আশঙ্কা— বিভিন্ন অনলাইন ই-কমার্স এবং কিউ-কমার্স প্ল্যাটফর্মে এক জন অসংগঠিত শ্রমিককে কাজ খুঁজে পাওয়া, কাজের গতি, এমনকি কাজের প্রকৃতির জন্য নির্ভর করে থাকতে হয় ‘অ্যালগরিদম’-এর উপরেই। কৃত্রিম মেধা তাঁদের জীবনকে কত দূর অবধি নিয়ন্ত্রণ করবে, সে বিষয়ে এই শ্রমিকদের একটি শব্দও বলার পরিসর নেই। সেখানে তাঁদের নামে ‘পার্টনার’ এবং কাজে ‘ঠিকা শ্রমিক’ করেই রেখেছে পুঁজি। যাদের হাতে ক্রয়ক্ষমতা, কৃত্রিম মেধা তাদের কথাই ভাববে, তাদের সুবিধার মাত্রা বাড়াতেই জান লড়িয়ে দেবে। অ্যালগরিদমের চাবুক গিগ-কর্মীদের বাধ্য করবে দশ মিনিটে পণ্য পৌঁছে দিতে ক্রেতার দোরগোড়ায়।

তাই কত দূর অবধি অ্যালগরিদমের এই চাবুককে সহ্য করা যাবে, এটি একটি আইনি প্রশ্ন— শ্রমের আইনের। এবং, বৃহত্তর অর্থে, রাজনীতির। কারণ, দেশের সিংহভাগ শ্রমশক্তির উপরে এই অ্যালগরিদমের দাপট চলতে থাকবে পুঁজির অঙ্গুলি নির্দেশে। সিংহভাগ মানুষের স্বার্থরক্ষা করাই তো রাজনীতির কাজ। তাঁদের স্বার্থের কথা মেশিনের কানে এবং মনে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব কি রাষ্ট্র অস্বীকার করতে পারে?

ফেরা যাক সেই ‘শেখার প্রশ্নে’— মেশিনকে কে শেখাবে, এবং কী শেখাবে? কৃত্রিম মেধাকে ‘এক জন ভারতীয় চাষি’র ছবি দিতে বললে, দশ বারে অন্তত ন’বার সে এক জন পুরুষের ছবিই দেবে। কারণ, কৃত্রিম মেধাকে যাঁরা শেখান, সেই শহুরে মেধা শ্রমিক-এর কাছে মেয়েদের কৃষিকাজের ডকুমেন্টেশন স্বাভাবিক ভাবেই নেই। সেই সামাজিক বাস্তবজ্ঞানের অভাব এবং কৃষিক্ষেত্রে প্রায়-অদৃশ্য নারীশ্রমের চিত্রই হয়ে যায় এআই-এর ‘ট্রেনিং ডেটা’। আবার, বহু ক্ষেত্রেই বিদেশি তথ্য চেপে যায় ভারতীয় বাস্তবের ঘাড়ে। একটা সহজ উদাহরণ— কৃত্রিম মেধাকে দিয়ে ভারতীয় মানুষের ছবি তৈরি করতে চাইলেও তা যথেষ্ট ভারতীয় হয় না, কারণ কৃত্রিম মেধাকে সেই ভারতীয়ত্ব শেখানো হয়নি।

তাই শেখানোর জন্য চাই ভারতীয় আঞ্চলিক, সাংস্কৃতিক এবং বিপুল ভাবে শিক্ষার ডকুমেন্টেশন। তার জন্য চাই নীতি এবং ন্যায়সঙ্গত মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির আইন। ‘কৃত্রিম মেধা বর্জন করুন’ কিংবা ‘কৃত্রিম মেধাই সব জানে’— এই দু’টির মাঝখানে লুকিয়ে আছে একটি মানবিক পথ। ব্যবহারকারীর দেওয়া সার্বিক চিন্তা, এবং পুঁজির বাজার-নির্ধারিত ব্যবহার ছাড়া কৃত্রিম মেধার উপযোগিতা সীমিত। তাই এই প্রযুক্তিকে গ্রহণ-বর্জনের প্রশ্নটি একটি সামাজিক প্রশ্নে এসে দাঁড়ায়।

অবশ্য এর উল্টো দিকে পুঁজি চাইবে কৃত্রিম মেধার প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত আর্থ-সামাজিক চিন্তাকে সম্পূর্ণ ভাবে বিনষ্ট করতে। সেখানেই পুঁজি একনায়ক, এবং তাঁর নির্ধারিত ‘শিক্ষা সম্পূর্ণ’। তাই, প্রযুক্তির সঙ্গে শ্রমের বিরোধাভাসে এই রকম কয়েকটি চিন্তা লুকিয়ে থাকে। এই চিন্তাগুলি আলোচনায় না-এনে আমাদের দেশে ‘ভারত জিপিটি’ বা ‘মহাভারত জিপিটি’ যা-ই তৈরি হোক, তাতে দেশের সিংহভাগ মানুষের কোনও লাভ নেই।

প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Artificial Intelligence AI

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy