E-Paper
WBState_Assembly_Elections_Lead0_02-05-26

রাজনীতির ‘ইয়ে’

আমাদের বাংলা ভাষা একটি অসামান্য ইয়ে ভাষা কারণ সে ভাষার শরীরে নানার্থ-বোধক, নানা উৎস-সঞ্জাত শব্দের ছড়াছড়ি। বাঙালিও একটি অবিশুদ্ধ ইয়ে ভাষাগোষ্ঠী যাঁদের মধ্যে নানা বর্ণ-ধর্ম মিশে আছে।

বিশ্বজিৎ রায়

শেষ আপডেট: ০৩ মে ২০২৬ ০৫:১৫

বা‌ংলা একটা ইয়ে ভাষা। ‘ইয়ে’ এক আশ্চর্য শব্দ। যদি বলি ‘রমেশের সঙ্গে সাবিত্রীর একটু ইয়ে আছে’ তা হলে বুঝতে হবে গোপন, নিষিদ্ধ সম্পর্ক আছে। যদি কেউ বলেন, ‘বাজার থেকে আলু, পটল, বেগুন সবই তো আনলে কত বার ইয়েটা আনতে বললাম তুমি সেটাই ভুলে গেলে!’ এখানে ইয়ে হচ্ছে সেই বার বার আনতে বলে দেওয়ার পরেও ভুলে যাওয়া জিনিস। যাকে বলা হল সে ঠিক বুঝে ফেলবে ইয়েটা কী! বাঙালি ভদ্রলোকদের মধ্যে অনেকেরই বই নিয়ে ‘ইয়ে’ আছে এমন বাক্য শোনা যায়। এখানে ইয়ে-র অর্থ গর্ব। রসিক মাসিমা পাশের বাড়ির মাসিমাকে বলেন, ‘ছেলেমেয়ে-দুটো এত দিন ‘ইয়ে’ করেও একে অন্যকে বিয়ে করল না। কী দিনকাল!’ এখানে ইয়ের তরল অর্থ ‘আশনাই’, অভিজাত অর্থ ‘প্রেম’। আর যখন বলি ‘রাজনীতি একটা ইয়ে জিনিস’, তার অর্থ রাজনীতি নোংরা ও জটিল। ইয়ে বাংলা ভাষার শব্দটি অতি দ্রুত নিজের পরিচয় বদলে ফেলতে পারে, পরিচয় বদলে অন্য-পরিচয়কে আত্মপরিচয় করে তুলতে পারে। সে বিশুদ্ধ নয়, রূপান্তরকামী ও খিচুড়ি-সংস্কৃতির অধিকারী। এই নিয়ে তার কোনও ‘ইয়ে’ (ইনহিবিশন) নেই, বরং ‘ইয়ে’ (আত্মপ্রত্যয়) আছে। কখনও সে বিশেষ্য, কখনও বিশেষণ, কখনও সে সর্বনাম। যে কোনও ভূমিকায় সে সমানে লড়ে যায়। আমাদের বাংলা ভাষা একটি অসামান্য ইয়ে ভাষা, কারণ সে ভাষার শরীরে নানার্থ-বোধক, নানা উৎস-সঞ্জাত শব্দের ছড়াছড়ি। সবচেয়ে বড় কথা বাংলা ছত্রিশ জাতের ভাষা, অঞ্চল সামাজিক শ্রেণি-ভেদে তার নানা রূপ। নানা রূপে বাংলা ভাষা নিজের অভিযোজন ঘটিয়ে বেঁচে আছে। সেই রূপগুলি বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির বহুত্ববোধকতার সূচক। বাঙালিও একটি অবিশুদ্ধ ইয়ে ভাষাগোষ্ঠী যাঁদের মধ্যে নানা বর্ণ-ধর্ম মিশে আছে।

বঙ্গসংস্কৃতির দুই পুরোধা সুকুমার রায় ও পুত্র সত্যজিৎ মনেপ্রাণে এ-কথা বিশ্বাস করতেন। তাঁরা আদ্যন্ত ইয়েপন্থী মানুষ ছিলেন। প্রমাণ চাইছেন?

‘আশ্চর্জন্তু’ নামে একটি গল্প লিখেছিলেন সত্যজিৎ। লেখাটি তাঁর শঙ্কু-কাহিনির অন্তর্গত। আপাতভাবে পড়লে মনে হবে সায়েন্স-ফ্যান্টাসি, কিন্তু ফ্যান্টাসির মধ্যে থাকে গভীরতর রাজনীতি। বাঙালি ভদ্রলোকেরা ‘পার্টি-পলিটিক্স’ শব্দবন্ধ প্রায়ই ব্যবহার করেন। সেখানে ‘পার্টি-পলিটিক্স’ বলতে যা বোঝায়, গভীরতর রাজনীতি বলতে তা বোঝায় না। বড় রাজনীতির অর্থ দলদাসত্ব নয়। সত্যজিৎ দলচারী ছিলেন না কিন্তু তাঁর লেখায় আর ছবিতে বড় রাজনীতি নানা ভাবে প্রকাশ পেয়েছিল। ‘আশ্চর্জন্তু’ গল্পটিও সেই বড় রাজনীতির গল্প। অনেকেই খেয়াল করেন না, গল্পের নাম ‘আশ্চর্য জন্তু’ নয়। ‘আশ্চর্য জন্তু’ ব্যাকরণসিদ্ধ, কিন্তু ‘আশ্চর্জন্তু’ ব্যাকরণসিদ্ধ নয়। সুকুমার রায় সন্দেশ-এর পাতায় সেই কবে লিখেছিলেন ‘ব্যাকরণ মানি না’-র আবোল তাবোল। হাঁস আর সজারু মিলে হাঁসজারু। হাতি আর তিমি মিলে হাতিমি। সেই একই যুক্তিতে সত্যজিৎ নির্মাণ করেছিলেন এই ‘আশ্চর্জন্তু’ শব্দটি। ব্যাকরণ না মানা এই শব্দটিকে সত্যজিৎ রাষ্ট্রতান্ত্রিক প্রকৃতি-বিধ্বংসী পুঁজিতান্ত্রিক রাজনীতির বিরোধিতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।

এই জন্তুটি কেমন? শঙ্কুর ডায়েরি থেকে জানা যাচ্ছে, প্রহ্লাদের এনে দেওয়া জিনিসটা “একটা জানোয়ার। সাইজে বেড়াল ছানার মতো।... মোটকথা এ এক বিচিত্র জীব।” প্রহ্লাদকে এটি দিয়েছিল জগন্নাথ। উশ্রী নদী ডিঙিয়ে ঝলসি গ্রামে তার বাড়ি। জগন্নাথ গাছগাছালির সন্ধানে বনে গিয়ে এটিকে খুঁজে পায়। কী আর করবে? প্রহ্লাদের খামখেয়ালি মনিব শঙ্কুর কাছে পাঠিয়ে দিয়েছে তাকে। শঙ্কু দেখেশুনে বুঝতে পারলেন এই জন্তুটি গোত্র-ছাড়া, পশুজগতের প্রচলিত ব্যাকরণের নিয়ম সে মানে না। এনসাইক্লোপিডিয়া খুঁজেপেতে শঙ্কু এটিকে গোত্রভুক্ত করতে ব্যর্থ। সুকুমার রায় তাঁর ‘খিচুড়ি’ কবিতায় যা শুরু করেছিলেন, সত্যজিৎ তাঁর শঙ্কু-কাহিনিতে সেই ব্যাকরণ না মানাকে আরও জটিল করে তুললেন। কোনও বর্গেই তাকে আটকানো যাচ্ছে না। ‘অর্ডার অব থিংস’ বিপর্যস্ত হচ্ছে। প্রাণিজগতের সংবিধান মেনে তাকে কোনও বর্গে ফেলার উপায় নেই। দিনে দিনে সে বড় হচ্ছিল। প্রতিবেশী অবিনাশবাবু শঙ্কুর কাছে আসা নতুন জন্তুটিকে দেখতে এলেন।

অবিনাশবাবুর না মনে পড়লেও সাধারণ বাঙালি পাঠকের ‘আশ্চর্জন্তু’র সূত্রে সুকুমার রায়ের লেখা ‘কিম্ভূত’ কবিতার কথা মনে পড়তে বাধ্য। সেখানে সেই কবিতায় শেষ অবধি বিদ্‌ঘুটে জানোয়ার কেঁদেকেটে কাঁচুমাচু মুখে বসে। ‘নই ঘোড়া, নই হাতি। নই সাপ বিচ্ছু,/ মৌমাছি প্রজাপতি নই আমি কিচ্ছু।/ মাছ ব্যাং গাছপাতা জলমাটি ঢেউ নই/ নই জুতা নই ছাতা আমি তবে কেউ নই!’ কিম্ভূত-ই যেন সেই আশ্চর্জন্তু! সত্যি তো, কেউ না হলে চলে! একটা বর্গ বা সীমায় ধরাতে পারলে তবে নিশ্চিন্তি। মানুষের জগৎ হলে কী নাম কী ধাম কী পরম্পরা, সব বিশ্লেষণ করে তবে তো নাগরিকত্ব দেওয়া! তা না পেলে মানুষেরও তো কিম্ভূতের মতো দশা হয়, তার চেয়েও খারাপ দশা বলা চলে। নাগরিকত্বহীন!

তবে কিম্ভূতের যা ছিল না, আশ্চর্জন্তুর তা ছিল। আত্মবিশ্বাস, লড়াই করার ক্ষমতা আর অতি দ্রুত নিজেকে বদলে ফেলার অর্থাৎ অভিযোজনের সাংঘাতিক শক্তি। অবিনাশবাবুকে শঙ্কু বললেন, “এটি একটি আনকোরা নতুন শ্রেণীর জানোয়ার। এর নাম ইয়ে।”

সত্যজিৎ কেন এই নতুন শ্রেণির জানোয়ারের নাম ‘ইয়ে’ দিয়েছিলেন? দিয়েছিলেন খুব সঙ্গত কারণেই। বাংলা ভাষায় ইয়ে একটি আশ্চর্য শব্দ। ব্যবহারের গুণে ইয়ে বিভিন্ন পদে রূপান্তরিত হতে পারে। এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় যাচ্ছে বলে পূর্বাবস্থায় যে সে ফিরবে না তাও নয়। ইয়ে নামের জন্তুটিও এই সব পারে। সত্যজিতের গল্পে ইয়েকে নিয়ে শঙ্কু ‘প্রাণিতত্ত্ববিদ’ একহার্টের দেশে গেলেন। একহার্টের দেশ মানে জার্মানি। জার্মানির তো নানা রূপ। এক জার্মানি মানবিক, আর এক জার্মানি নাৎসি-নিয়ন্ত্রিত। শঙ্কু কী ভাবে নব্য-নাৎসিদের নাস্তানাবুদ করেছিল তা নিয়ে সত্যজিতের গল্প আছে। ইয়ের গল্প সে গল্পের আগে লেখা। ইয়েকে নিয়ে তো তিনি জার্মানি গেলেন। সেই জার্মানিতে যে একহার্টের সঙ্গে তাঁর দেখা হল সে আসলে ছেলে একহার্ট, লোভী একহার্ট। বাবা একহার্টের মৃত্যুর পর শঙ্কুর কাছে বাবা একহার্ট সেজে প্রদর্শবস্তু হিসেবে টাকার জন্য ইয়েকে দখল করতে চাওয়া মানুষ। শঙ্কু কিছুতেই তার হাতে ইয়েকে ছাড়তে চান না। একহার্টও ইয়েকে বন্দি করতে তৎপর। শারীরিক আর অস্ত্রশক্তিকে কাজে লাগাতে চায় ছদ্মবিজ্ঞানী। কিন্তু পারল না। কারণ ইয়ে, ইয়ের গোত্রছাড়া শক্তি। তাকে ধরতে মারতে আসছে একহার্টের দলবল। শঙ্কুর চোখের সামনে ‘ক্রমবিবর্তনের অমোঘ নিয়ম লঙ্ঘন করে’ এই স্থলচরের ডানা গজাল। চারপেয়ে হয়েও তখন সে পক্ষী জাতীয়। একহার্টদের লোভের রাষ্ট্রসীমা ডিঙিয়ে উড়ে চলে গেল, সে ইয়ে। বন্দুকের গুলি তাকে স্পর্শ করল না। সে ‘কেউ নয়’ কিন্তু সে তার মতো ‘কেউ’ সে তো কাঁদুনে কিম্ভূত নয় সে তো দাপুটে ইয়ে।

সত্যজিতের ছবি আগন্তুক-এর মনোমোহনকে মনে পড়ে? ভাগ্নির বাড়িতে সেই হঠাৎ আবির্ভূত হওয়া মনোমোহন মিত্রকে ভুলে গেছেন? তিনি বলেছিলেন, পাসপোর্ট কিচ্ছু প্রমাণ করে না। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা আর আরণ্যক অসভ্যতার বিতর্কে তিনি আরণ্যক সভ্যতার পক্ষে। কারণ আধুনিক রাষ্ট্র যে আরণ্যক জীবনকে অসভ্য মনে করে, মনোমোহনের মতে সে অরণ্যচারীরা নিজের মতো করে সভ্য। তাঁদের সেই সভ্যতাকে রাষ্ট্র মাপতে পারে না বলে অসভ্য বলে, সেই জীবনের নিজত্বকে ধ্বংস করতে চায়। এই মনোমোহন রাষ্ট্রব্যবস্থার লৌহদণ্ডে বিশ্বাসী মানুষকে নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছিলেন, তাঁর নাম ‘নিমো’। ‘ল্যাটিন ওয়ার্ড। মানে নো-ওয়ান।’ বাংলায় কী বলব? ‘কেউ না’। সুকুমারের কিম্ভূতের ‘কেউ না’-র মধ্যে যে ভয়-ভয় দশা ছিল, সত্যজিতের আশ্চর্জন্তু ইয়ে সেই ভয় কাটিয়ে ফেলেছিল তার ক্ষমতাবলে। অতি দ্রুত অভিযোজনের ক্ষমতাধারী সে। ঠিক যেমন ইয়ে শব্দটি— ব্যবহারের বহুমাত্রিকতায় ও বিমিশ্রতায় কখন যে কী তার পদ পরিচয়! রাষ্ট্রীয় রাজনীতির একমাত্রিকতাকে, পরিচয়ের বহুমাত্রিকতা দিয়ে প্রশ্ন করা ‘নো ওয়ান’ মনোমোহন আর ‘কেউ না’ কিম্ভূতের লড়াকু উত্তরসূরি ‘ইয়ে’— দু’জনের মধ্যে গভীর মিল। দু’জনেই সভ্যতার পাসপোর্টকে বে-তোয়াক্কা করতে পারে।

সত্যজিতের গল্পে আর ছবিতে যা হয় তা ভিত্তিহীন নয়। সত্যি-সত্যি বাংলা একটা ইয়ে ভাষা, আর বাঙালি একটা ইয়ে জাতি। নানা বাঙালিকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না। এই ইয়ে ভাষা আর ইয়ে জাতির বৈশিষ্ট্য কী ভাবে আমাদের এই দেশ বহন করতে পারে, তারই জন্য তো যুক্তরাষ্ট্রীয় সাংবিধানিক ব্যবস্থা স্বাধীনতা-পরবর্তী পর্বে গড়ে তোলা হয়েছিল। এই দেশের বহুত্ববোধক বিমিশ্রতার জন্য, বিমিশ্র অপভ্রষ্টতার জন্য বিচলিত হওয়ার যে মানেই হয় না, সেই সাহস আমাদের যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি পারুক বা না পারুক, আদর্শগত ভাবে দিতে চেয়েছিল। আমাদের সংবিধান তারই রক্ষাকবচ। তাই একমাত্রিক বিশুদ্ধতার বদলে বরং গর্বের সঙ্গে বলা যাক বাংলা একটা ইয়ে ভাষা, বাঙালি একটি ইয়ে ভাষাকেন্দ্রিক বিশ্বচারী বিবিধ ধর্মবিশিষ্ট জনগোষ্ঠী। আর আমাদের সাংবিধানিক স্বীকৃতিলব্ধ যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো একটি ইয়ে ব্যবস্থা। ইয়ে-র অর্থ নানা রকম। আমাদের ইয়েত্ব নির্বাচনী গণতন্ত্রের দ্বারা স্বীকৃত ও মর্যাদাপ্রাপ্ত হলেই দেশের ও দশের মঙ্গল। তাতেই একহার্টদের পরাজয়, সুকুমার-সত্যজিতের মতো ইয়েপন্থীদের জয়।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Bengali Language Bengali Culture Bengali West Bengal Politics Satyajit Ray

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy