আর কয়েক দিনের মধ্যেই রাজ্যের নবনির্বাচিত সরকার তার প্রথম বাজেটটি পেশ করবে। কোন খাতে কত টাকা বরাদ্দ হল, কোন নতুন প্রকল্প ঘোষণা করা হল— এই সব প্রশ্নই সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। কিন্তু বাজেট নিয়ে এই বিপুল উৎসাহের মধ্যেই একটি মৌলিক প্রশ্ন প্রায় হারিয়ে যায়। সরকার যে প্রতিশ্রুতি দেয়, বাস্তবে তার কতটা পূরণ করে? বাজেটের দিন বরাদ্দ নিয়ে উচ্ছ্বাস দেখা যায়, কিন্তু দু’বছর পরে যখন সেই বাজেটের প্রকৃত আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশিত হয়, তখন তা প্রায় কোনও আলোচনাই তৈরি করে না। অথচ সরকারের আর্থিক কর্মদক্ষতার আসল পরীক্ষা সেখানেই।
সরকারি বাজেট নথিতে সাধারণত চার ধরনের তথ্য থাকে— বাজেট অনুমান (বিই), সংশোধিত অনুমান (আরই), এবং দু’বছর আগের প্রকৃত আয়-ব্যয়ের হিসাব বা অ্যাকচুয়ালস। এর মধ্যে শেষের তথ্যটি থেকে জানা যায়, সরকার যা বলেছিল, বাস্তবে তা কতটা করতে পেরেছে। অর্থশাস্ত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হল ‘ফিসক্যাল মার্কসম্যানশিপ’। সরকার যে আর্থিক লক্ষ্য নির্ধারণ করে, বাস্তবে তার কতটা কাছাকাছি পৌঁছতে পারে, সেটাই ফিসক্যাল মার্কসম্যানশিপ। এক জন দক্ষ তিরন্দাজ যেমন লক্ষ্যভেদ করেন, তেমনই একটি দক্ষ সরকারও রাজস্ব সংগ্রহ, ব্যয় এবং আর্থিক ঘাটতির ক্ষেত্রে নিজের ঘোষিত লক্ষ্যের কাছাকাছি পৌঁছতে পারে। বিপরীতে, বাজেটে এক কথা বলা এবং বাস্তবে অন্য ফল পাওয়া দুর্বল আর্থিক পরিকল্পনা ও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার লক্ষণ। এটি সরকারের আর্থিক শৃঙ্খলার গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
পশ্চিমবঙ্গের ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষের প্রকৃত আয়-ব্যয়ের হিসাব এই দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি এমন একটি সময়ের ছবি তুলে ধরে, যেখানে ঘোষিত অগ্রাধিকার এবং বাস্তব ব্যয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ফারাক দেখা যাচ্ছে। প্রথমেই রাজস্ব ব্যয়ের দিকে তাকানো যাক। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা এবং অন্যান্য জনপরিষেবার জন্য যে রাজস্ব ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছিল, বাস্তবে তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ খরচই হয়নি। সামগ্রিক রাজস্ব ব্যয় বাজেট অনুমানের তুলনায় প্রায় ৭% কম ছিল। আরও গুরুত্বপূর্ণ, উন্নয়নমূলক রাজস্ব ব্যয় প্রায় ১০% কম হয়েছে। অর্থাৎ যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নমূলক কর্মসূচিগুলিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল, তাদের একটি অংশ বাস্তবায়িত হয়নি। সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র সামাজিক পরিষেবা খাতে। শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা, তফসিলি জাতি-জনজাতি কল্যাণ এবং অন্যান্য মানবসম্পদ উন্নয়নমূলক ক্ষেত্রে প্রকৃত ব্যয় বাজেট অনুমানের তুলনায় উল্লেখযোগ্য ভাবে কম। অর্থাৎ, ঘোষিত নীতি ও বাস্তব প্রশাসনিক কর্মসম্পাদনের মধ্যে ব্যবধান রয়েছে। অবশ্য, স্বাস্থ্য খাতে তুলনামূলক ভাবে আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় ছিল। পরিবার কল্যাণ, পুষ্টি এবং জল সরবরাহের মতো কিছু ক্ষেত্র বাজেট অনুমানের কাছাকাছি বা তারও বেশি ব্যয় করেছে।
মূলধনি ব্যয়ের চিত্র আরও তাৎপর্যপূর্ণ। এই ব্যয় ভবিষ্যতের বৃদ্ধির ভিত্তি তৈরি করে। রাস্তা, সেতু, হাসপাতাল, বিদ্যালয়, নগর পরিকাঠামো বা সেচব্যবস্থার মতো দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ এই ব্যয়ের মাধ্যমেই তৈরি হয়। ২০২৩-২৪ সালে পশ্চিমবঙ্গে মূলধনি ব্যয়ের জন্য প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। বাস্তবে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ঘোষিত লক্ষ্যের প্রায় ১৫ শতাংশ অপূর্ণ রয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় ঘাটতি দেখা গেছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিকাঠামো, নগর উন্নয়ন এবং তফসিলি জাতি-জনজাতি কল্যাণ সংক্রান্ত প্রকল্পে। কিছু ক্ষেত্রে প্রকৃত ব্যয় বরাদ্দের অর্ধেকেরও কম। এখানেই আর্থিক শৃঙ্খলার একটি বিশেষ প্রশ্ন সামনে আসে— ঘোষিত অগ্রাধিকার অনুযায়ী অর্থ ব্যয় করার সক্ষমতা। যদি সরকার ধারাবাহিক ভাবে নির্দিষ্ট খাতে বড় বরাদ্দ ঘোষণা করে, কিন্তু তা বাস্তবায়ন করতে না পারে, তবে সমস্যা কেবল অর্থের নয়; সমস্যা প্রশাসনিক সক্ষমতারও।
অন্য দিকে, অর্থনৈতিক পরিষেবা খাতে তুলনামূলক ভাল ফল দেখা যাচ্ছে। কৃষি, গ্রামীণ উন্নয়ন, শক্তি এবং পরিবহণ সংক্রান্ত খাতে ব্যয় বাজেট অনুমানের কাছাকাছি ছিল। বিশেষত পরিবহণ ও শক্তি ক্ষেত্রে ব্যয়ের বাস্তবায়ন তুলনামূলক ভাবে সফল। এটি দেখায় যে প্রশাসনিক সক্ষমতা পুরোপুরি অনুপস্থিত নয়। বরং বিভিন্ন খাতের মধ্যে বাস্তবায়ন ক্ষমতার তারতম্য রয়েছে।
২০২৩-২৪ সালে পশ্চিমবঙ্গের মোট রাজস্ব সংগ্রহ সন্তোষজনক ছিল। কিন্তু নিজস্ব অ-কর রাজস্ব সংগ্রহের ক্ষেত্রে বড় দুর্বলতা ধরা পড়ে। ফি, রয়্যালটি, লভ্যাংশ, ব্যবহারমূল্য এবং অন্যান্য উৎস থেকে যে আয় হওয়ার কথা ছিল, তার প্রায় অর্ধেকই সংগ্রহ করা যায়নি। দেশের অন্যান্য বড় রাজ্যের সঙ্গে তুলনা করলে পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান অনেক পিছনে। এই তুলনা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নিজস্ব অ-কর রাজস্বই একটি রাজ্যের সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনিক দক্ষতার সূচক। কর বাড়িয়ে রাজস্ব সংগ্রহ করা এক জিনিস; বিদ্যমান সম্পদকে দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করে আয় সৃষ্টি করা অন্য জিনিস। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় ক্ষেত্রটির দুর্বলতা স্পষ্ট।
বাজেট নিয়ে জনআলোচনার সংস্কৃতিতে পরিবর্তন জরুরি। ঘোষণা নয়, বাস্তবায়ন; বরাদ্দ নয়, ব্যয়; প্রতিশ্রুতি নয়, ফলাফল— এই প্রশ্নগুলিকেই আলোচনার কেন্দ্রে আনতে হবে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)