E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: রুজিরুটির প্রশ্ন

শিক্ষা যদি সব অবৈধ দোকান আর হকারদের দিতে হয়, তা হলে বড় বড় দোকান, মল, হোটেল, রেস্তরাঁ, দলনির্বিশেষে নেতাদের বাড়ি— এ সবই বা বাদ যাবে কেন?

শেষ আপডেট: ১৭ জুন ২০২৬ ০৬:৫৪

পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকার আসার পরে একটা বিষয় জোরালো হয়ে উঠেছে— অবৈধ ভাবে সরকারি জমি দখল করে থাকা ব্যবসার বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভ। অবশ্য কিছু দিন আগে পর্যন্ত এই ছোটখাটো দোকানগুলো থেকেই খাবার খাওয়া হত কম খরচে, ছোটখাটো জিনিস কেনার জন্য এই দোকানগুলোই ছিল প্রধান ভরসা। আজ তারাই রাতারাতি ‘অবৈধ’ হয়ে গেছে।

রাজ্য জুড়ে এই হকার উচ্ছেদ প্রসঙ্গে অনেক দিক নিয়ে কথা হচ্ছে। যেমন— হকারদের দোকান দেওয়ার কোনও বৈধ কাগজ বা অনুমতি নেই, সরকার বা রেল নিজের জমি ফেরত নিচ্ছে, সে যে কারণেই হোক না কেন। তাতে সমস্যা কোথায়? এই কড়া পদক্ষেপ দরকার ছিল, অবৈধ দোকানদার, হকারদের শিক্ষা না দিলে তাঁদের প্রভাব বাড়তেই থাকবে এবং পরে এঁদের ওঠানো যাবে না, ইত্যাদি।

উত্তরে বলি, হকারদের অনেকের বৈধ কাগজপত্র বা অনুমতিপত্র নেই— এটা সত্যি। কিন্তু তাঁরা কেন সেই দোকান চালাচ্ছেন? অন্য কোনও কাজ তাঁদের নেই বলে, বা থাকলেও সেখানে রোজগার অনেক কম। তাঁদের প্রত্যেকের পরিবার আছে, সন্তান আছে, বয়স্ক বাবা-মা আছেন। একটা পরিবারের খরচ আজকের দিনে মাসে কত হতে পারে, যাঁরা রোজগার করেন, তাঁরা জানেন। এই দোকানদার বা হকারদের স্টেশন চত্বরে বা প্ল্যাটফর্মে দোকান খোলার অনুমতির বদলে সরকার একটা অর্থ নিয়ে ছেড়ে দিলে অসুবিধা কোথায়? এতে পরিবারগুলির রুজিরুটি থেকে গেল, আবার সরকারের ভাঁড়ারে কিছু অর্থও জমা হল। প্রয়োজনে কিছু শর্ত চাপিয়ে দেওয়া যায়— দোকান একটি নির্দিষ্ট আয়তনের হবে, চত্বর নোংরা করা যাবে না, ইত্যাদি। এই পরিবারগুলি আমাদেরই চেনা মানুষ। বিকল্প পথ তাঁদের জন্য তৈরি না করে দিয়ে উচ্ছেদ কি ঠিক? তা ছাড়া, তৃণমূল সরকার যখন সারা রাজ্য জুড়ে হকার বা অবৈধ দোকান উচ্ছেদ শুরু করে, তখন সেই সময়ের প্রধান বিরোধী দলও সরব হয়েছিল। আজ অন্যথা হল কেন?

শিক্ষা যদি সব অবৈধ দোকান আর হকারদের দিতে হয়, তা হলে বড় বড় দোকান, মল, হোটেল, রেস্তরাঁ, দলনির্বিশেষে নেতাদের বাড়ি— এ সবই বা বাদ যাবে কেন? শুধু এই ছোট হকাররাই তো অনুমতি ছাড়া দোকান চালাচ্ছেন না, অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠানও বেশি জমি দখল করে বা অনুমতির বেশি উঁচু বিল্ডিং বানিয়েছে। আসলে, ইতিহাস সাক্ষী, এই সমস্ত ক্ষেত্রে সমাজের গরিবরাই সহজ টার্গেট হন। তাঁদের হয়ে লড়ার কেউ থাকে না। তাঁদের টাকা নেই কোর্টে লড়ার, রাজনৈতিক ক্ষমতাও বিপদের দিনে পাশে থাকে না। কিন্তু বড় ব্যবসায়ীদের দুটোই আছে। তাই তাঁদের বিল্ডিং বা দোকানে সচরাচর বুলডোজ়ার চলে না, পুলিশ রাতে তাঁদের বিল্ডিং ভাঙতে আসে না।

সাধারণ মানুষদের বেশির ভাগই এই সব ছোট দোকান থেকে অপেক্ষাকৃত কম দামে জিনিস কেনে। রেলস্টেশনের ভিতরে একশো টাকার খাবারের বদলে তারা যদি ত্রিশ-চল্লিশ টাকায় খাবার পেয়ে যায়, তবে তারা দ্বিতীয়টাই নেবে। সে কথা ভাবা হল না। অনুমান, এই দোকানগুলি তুলে দেওয়ার পর আসবে বড় বড় কোম্পানির দোকান, যেখানে জিনিসের দাম সবার নাগালের মধ্যে থাকবে না। মানুষ বাধ্য হবে বেশি দামে জিনিস কিনতে। তখন হয়তো ছোট দোকানের গুরুত্ব বোঝা যাবে।

রোহিত সেন, আমোদপুর, বীরভূম

অ-মানবিক

বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে প্রশাসনের উদ্যোগে বেআইনি দখলদারি ও অবৈধ নির্মাণ উচ্ছেদের কাজ চলছে। আইন রক্ষা ও জনস্বার্থে এই পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে এই উচ্ছেদ অভিযানের ফলে বহু ছোট দোকানদার, হকার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জীবিকা হারাচ্ছেন, যাঁদের অধিকাংশই নিম্নবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্য। দীর্ঘ দিন ধরে ওই সব দোকানের আয়েই তাঁদের সংসার চলেছে, সন্তানদের পড়াশোনা হয়েছে এবং পরিবারের নিত্যপ্রয়োজন মিটেছে। এক দিনের মধ্যে দোকান ভেঙে গেলে তাঁদের সামনে জীবিকার সঙ্কট তৈরি হয়। আইন প্রয়োগ অবশ্যই জরুরি, কিন্তু সেই সঙ্গে প্রশ্ন ওঠে— এই মানুষগুলির জন্য কি কোনও বিকল্প ব্যবস্থা ভাবা হয়েছে? পুনর্বাসন, নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক স্থান বরাদ্দ অথবা ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য বিশেষ সহায়তা প্রকল্প কি গ্রহণ করা যায় না? উন্নয়নের পথে শৃঙ্খলা যেমন প্রয়োজন, তেমনই প্রয়োজন মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। প্রশাসনের কাছে আবেদন, উচ্ছেদের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবিকা রক্ষার জন্যও কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থা করা হোক।

সৌম্যদীপ সিংহ, হরিপাল, হুগলি

নিয়মহীন

অবৈধ হকার উচ্ছেদ ও বেআইনি কাঠামো ভাঙা সরকারের সদর্থক প্রয়াস। সরকারকে অবশ্যই এ ব্যাপারে রং, ধর্ম বা এলাকা বিভাজন করলে চলবে না। জনগণের মধ্যে যখন বিশ্বাস আসবে যে সরকার কোনও বিশেষ পক্ষকে সমর্থন করছে না, তখন সর্বস্তরের মানুষ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবে।

রেল হঠাৎ হকার উচ্ছেদ শুরু করেনি। ২০২২ সাল থেকে স্টেশন ম্যানেজারেরা এ ব্যাপারে নিয়মিত চিঠি দিয়ে গেছে প্রতিটি ইউনিয়নকে, লোকাল থানাকে, ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট-এর অফিসে, এবং পুলিশ সুপারকে। রেল কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে কোনও গাফিলতি বরদাস্ত করেননি। এমনকি উপযুক্ত কারণ ছাড়া চিঠি দিতে দেরি করায় কোনও কোনও স্টেশন ম্যানেজার তিরস্কৃতও হয়েছেন। অথচ, সেই ‘রিসিভ’ করা কপিগুলিতে দিন দিন ধুলো পড়েছে।

হকার্স ইউনিয়নগুলিও কোনও সদর্থক পদক্ষেপ করতে পারেনি। না তারা রেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠকে বসেছে, না হকারদের সাবধান করেছে। উল্টে একটা ইউনিয়ন চেষ্টা করেছে কী ভাবে অন্য ইউনিয়নকে শেষ করা যায়। আবার বহু স্টেশনে ছিল নেতাদের মধ্যে গোপন বোঝাপড়া। স্টেশন চত্বরে বসতে হলে ভাড়া, মাথায় ছাউনি দিলে ভাড়া, যে প্ল্যাটফর্মে বেশি ট্রেন দাঁড়ায় তার রেট এক, এসি বগি যেখানে দাঁড়ায় তার সামনে বসলে আর এক রেট। কেউ কেউ আবার জায়গা কিনে ভাড়া বসিয়ে দেয়। ফার্নিশড হলে এক রেট, শুধু জায়গা হলে কম।

অন্য দিকে, এ ব্যাপারে আইনসিদ্ধ স্টলগুলির দিকেও নজর দেওয়া উচিত। সেখানেও প্রথম পক্ষ (যে টেন্ডারে অংশগ্রহণ করে দোকান পেয়েছে) থেকে দ্বিতীয়, তৃতীয় এমনকি চতুর্থ পক্ষের হাতে চলে গেছে স্টল। ফলে সেখানেও বেনিয়ম প্রচুর। চুক্তি অনুযায়ী তাদের ‘গরিবি খানা’র ব্যবস্থা রাখার কথা, অধিকাংশ স্টলে কোনও সময়ই সে সব পাওয়া যায় না। এ ব্যাপারে রেল কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ করা উচিত। কোনও কোনও স্টল থেকে সময়-উত্তীর্ণ খাদ্য বা পানীয়ও বিক্রি হয়।

অসীমকুমার মজুমদার, কলকাতা-৫১

ধ্বংসস্তূপ

স্টেশনে ঢোকার মুখে থমকে গেলাম। চার দিকে ধ্বংসস্তূপ। নিজের দোকানঘরের ভাঙা ইটের উপরে বসে থাকা বয়স্ক মানুষটা আরও কুঁকড়ে গিয়েছেন। পরিচিত দোকানগুলি খুঁজতে গিয়ে দেখি কিচ্ছু নেই। বুকের ভিতরটা কেমন আনচান করে ওঠে, ওঁরা কেমন আছেন? ওঁদের রুটিরুজির কী ব্যবস্থা হবে? ওঁদের ছেলেপুলে দু’বেলা খেতে পাবে তো?

ভাল-মন্দ, ঠিক-বেঠিক, ন্যায়-অন্যায়— সব কিছুর হিসাব মেলানোর আগে এটাই মনে হল, মানুষগুলো কী ভাবে বাঁচবেন? চার দিকে কী ভীষণ অস্থিরতা। এক দিকে বুলডোজ়ার নীতি, অন্য দিকে রাজনীতির রোষ। দীর্ঘ দিন রাজ্যে চরম অরাজকতার সাক্ষী আমরা। শিক্ষা থেকে স্বাস্থ্য, চাকরি-দুর্নীতি, নারী-নির্যাতন। ক্ষোভ জমেছে বিস্তর। কিন্তু তার প্রতিবাদের পথ রক্তাক্ত, হিংসাত্মক, অগণতান্ত্রিক হতে পারে না। আইনের তোয়াক্কা না করেই সবাই সবাইকে শাস্তি দিতে উঠে পড়ে লেগেছে। সোমা মুখোপাধ্যায়ের ‘কিছুই কি নেই বাকি’ (১৩-৬) প্রবন্ধের সঙ্গে সহমত প্রকাশ করে বলা যায়, ‘মানুষ মানুষের জন্য’— এই অনুভূতিই মানুষ হারাতে বসেছে।

কেকা চৌধুরী, হরিপাল, হুগলি

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

hawkers West Bengal government

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy