E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: তুলি ও ক্যামেরা

কুম্ভমেলা আলোকচিত্রীদের অতি প্রিয় বিষয়। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় কুম্ভমেলার অসংখ্য ছবি দেখেছি। কিন্তু রঘু রাইয়ের তোলা একটি ছবি আজও অমরত্বের দাবি রাখে।

শেষ আপডেট: ১৪ জুন ২০২৬ ০৯:৫৪

ঈপ্সিতা হালদারের “অন্তরঙ্গে ধরা ‘মানুষ’” (১৭-৫) শীর্ষক প্রবন্ধটি আমার একদা ফোটোগ্রাফি-চর্চার স্মৃতি মানসপটে জাগিয়ে তুলল। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় ভাল ফলের দৌলতে বাবার কাছ থেকে একটি দামি জাপানি ক্যামেরা আদায় করেছিলাম। ইচ্ছে হয়েছিল রঘু রাইয়ের মতো আলোকচিত্রী হব। তার আগে বারাণসী ও কলকাতা শহরকে নিয়ে রঘু রাইয়ের দু’টি গ্রন্থ সংগ্রহ করে অসংখ্য বার পাতা উল্টে দেখেছি। যত বার দেখেছি, তত বারই মুগ্ধ হয়েছি। পরে এক বন্ধুর সংগ্রহ থেকে তাঁর আরও কাজ দেখার সুযোগ হয়েছিল। কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাতের স্টল থেকেও দু’-তিনটি বই কিনেছিলাম। বার বার দেখে শেখার চেষ্টা করেছি। তাঁর অনুকরণে ছবিও তুলেছি। কিন্তু ছবি ছাপিয়ে হাতে পাওয়ার পর বুঝেছি, দামি ক্যামেরা থাকলেই রঘু রাই হওয়া যায় না। রঘু রাই এক জনই হন। তার জন্য প্রয়োজন আলাদা চোখে দেখা, গভীর মনন এবং ভাল ছবি তোলার প্রতি এক নাছোড়বান্দা একাগ্রতা। এই সব গুণ তাঁর মধ্যে ছিল বলেই ভারতীয় চিত্রসাংবাদিকতার ইতিহাসে তিনি প্রবাদপ্রতিম হয়ে উঠেছেন।

কুম্ভমেলা আলোকচিত্রীদের অতি প্রিয় বিষয়। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় কুম্ভমেলার অসংখ্য ছবি দেখেছি। কিন্তু রঘু রাইয়ের তোলা একটি ছবি আজও অমরত্বের দাবি রাখে। সেখানে এক গ্রাম্য বৃদ্ধ পুণ্যস্নানের উদ্দেশ্যে লাঠি হাতে এগিয়ে চলেছেন। তাঁর ছোট্ট নাতি সেই লাঠি ধরে হাঁটছে, আর পিছনে স্ত্রী তাঁর জামা আঁকড়ে রয়েছেন, যাতে তিনি জনসমুদ্রে হারিয়ে না যান। একটি ছবির মধ্যেই ধরা পড়ে গেছে পারিবারিক নির্ভরতা, বিশ্বাস এবং ভারতীয় জীবনের সহজ সত্য। শুধু বিষয়ভিত্তিক ছবিতেই নয়, বিভিন্ন ব্যক্তিত্বের প্রতিকৃতিতেও তিনি অনন্য। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব জয়প্রকাশ নারায়ণ থেকে ইন্দিরা গান্ধী কিংবা আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব মাদার টেরিজ়া ও দলাই লামার ছবিতে তিনি যেন মানুষের অন্তর্লোককে দৃশ্যমান করে তুলেছেন। তাঁর ক্যামেরায় ধরা পড়েছে অগণিত সাধারণ ভারতবাসীর মুখ। কর্মরত বা বিশ্রামরত মানুষের স্বপ্ন, কল্পনা, আনন্দ ও বেদনা তাঁর ছবিতে নীরবে কথা বলে।

তাঁর ক্যামেরায় ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ছবি যেমন বিশ্বকে শিহরিত করেছে, তেমনই বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের আলোকচিত্র ইতিহাসের মূল্যবান দলিল হয়ে রয়েছে। ঝুঁকি নিয়ে তিনি কার্গিল যুদ্ধের ছবিও তুলেছেন। আবার দেশের নানা শহরের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাও সমান মমতায় ক্যামেরাবন্দি করেছেন। আসলে রঘু রাই শুধু ভারতবাসীর ছবি তোলেননি; তিনি ছবির মাধ্যমে বিশ্বের কাছে ভারতকে পরিচিত করেছেন। ক্যামেরা নামক তুলিতে তিনি এঁকে গিয়েছেন চলমান সময়ের মুখচ্ছবি।

কৌশিক চিনা, মুন্সিরহাট, হাওড়া

মানুষের সঙ্গে

ঈপ্সিতা হালদারের “অন্তরঙ্গে ধরা ‘মানুষ’” শীর্ষক উত্তর-সম্পাদকীয়ের শিরোনামে ‘মানুষ’ শব্দটিকে একক উদ্ধৃতিচিহ্নে বিশেষ ভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আর সেটিই বোধ হয় রঘু রাইয়ের আলোকচর্চার মূল সুর।

সত্যজিৎ রায়, ইন্দিরা গান্ধী, মাদার টেরিজ়া, পণ্ডিত রবিশঙ্কর কিংবা উস্তাদ বিসমিল্লা খানের মতো ব্যক্তিত্ব বিভিন্ন সময়ে তাঁর আলোকচিত্রের প্রধান বিষয় হলেও, সাধারণ মানুষ সব সময়ই তাঁর দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। তাঁর ছবিতে যেমন বিশিষ্ট মানুষের উপস্থিতি রয়েছে, তেমনই রয়েছে রাস্তাঘাট, জনজীবন, শ্রম, আনন্দ, বেদনা এবং সময়ের স্পন্দন। তাঁর শৈলী সম্পর্কে যে বিষয়টি বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য, তা হল পরিপার্শ্বের প্রতি গভীর মনোযোগ। একটি ছবির মধ্যে গল্প বলতে গেলে যে পরিবেশের উপস্থিতি অপরিহার্য, সে কথা তিনি সর্বদাই মনে রাখতেন। ইন্দিরা গান্ধীর একটি বিখ্যাত আলোকচিত্রের কথা মনে পড়ে। সেখানে ইন্দিরা গান্ধীর মুখ দেখা যায় না। পিছন দিক থেকে তোলা ছবিতে সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন এক দল পুরুষ নেতা। প্রধান চরিত্রের মুখ অনুপস্থিত থাকলেও নারী হিসাবে তিনি যে পুরুষপ্রধান রাজনৈতিক পরিসরকে নিয়ন্ত্রণ করছেন, ছবিটি তার চমৎকার প্রকাশ। অর্থাৎ, ছবির পারিপার্শ্বিক চরিত্রগুলিই মূল চরিত্রকে ব্যাখ্যা ও স্পষ্ট করতে সাহায্য করছে। আরও একটি স্মরণীয় আলোকচিত্র, গঙ্গাবক্ষে তোলা পণ্ডিত রবিশঙ্করের প্রতিকৃতি। সেখানে শুধু শিল্পী নন, তাঁর চার পাশের নৌকা, মাঝি, নদী ও জনজীবনও ছবির অংশ হয়ে উঠেছে, যেন প্রত্যেকে মিলে এক দৃশ্য-সংলাপ রচনা করেছে। ফলে ছবিটি কেবল এক প্রতিকৃতি হয়ে থাকেনি; মানুষ, স্থান ও সময়ের এক সম্মিলিত শিল্পে পরিণত হয়েছে।

এই কারণেই রঘু রাইয়ের আলোকচিত্র কেবল কোনও ব্যক্তির মুখচ্ছবি নয়; তা এক-একটি সময়, সমাজ ও পরিবেশের দলিল। তাঁর ক্যামেরায় মানুষকে কখনও একা দেখা যায় না— মানুষকে দেখা যায় তার চার পাশের জগৎ ও বাস্তব ঘটনাচক্রের সঙ্গে যুক্ত অবস্থায়।

গৌতম নারায়ণ দেব, কলকাতা-৭৪

ছবিতে ইতিহাস

“অন্তরঙ্গে ধরা ‘মানুষ’” শীর্ষক প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু সংযোজন। রঘু রাইয়ের চোখে যা ধরা পড়ত, মনে যা সাড়া জাগাত, তাকেই ক্যামেরাবন্দি করতেন। সেখানে যেমন নামজাদা মানুষের ছবি রয়েছে, তেমনই রয়েছে অসংখ্য অজানা ও অপরিচিত মুখ। এই সব ছবিই তাঁর গ্রন্থ ও অ্যালবামের পাতায় অমর হয়েছে।

মানুষের সঙ্গ ছিল তাঁর জীবনের পরম প্রাপ্তি। মানুষই ছিল তাঁর আরাধ্য। সেই মানুষের সন্ধানই তিনি করে গিয়েছেন সারা জীবন। আর শুধু মানুষই বা কেন? প্রকৃতির রূপমাধুর্যও তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল। তাই বার বার তিনি প্রকৃতির কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, যে কোনও দৃশ্যের আলোকচিত্রে মানবিক আবেদন থাকা অত্যন্ত জরুরি। তখন সেই ছবি নিছক নিসর্গচিত্র হয়ে থাকে না; তার মধ্যেও মানুষের উপস্থিতি ও অনুভূতির প্রতিধ্বনি শোনা যায়।

সঙ্গীত ছিল তাঁর কাছে জীবনকে আবিষ্কারের একটি উপায়, বেঁচে থাকার রসদ। কাজের ফাঁকে তাই গান শুনতেন। গভীর শ্রদ্ধা ছিল মাদার টেরিজ়ার প্রতি, আর প্রিয় ব্যক্তিত্বদের অন্যতম ছিলেন সত্যজিৎ রায়। প্রিয় শহর কলকাতার স্মৃতি তিনি আজীবন বয়ে বেড়িয়েছেন। এই শহরের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে কখন যে তিনি মানুষের ভিড়ে মিশে যেতেন, তাদেরই এক জন হয়ে উঠতেন, তা বোঝা যেত না।

রঘু রাই ভারত জুড়ে অসংখ্য ছবি তুলেছেন। সেই সব ছবিতে শুধু সময়ের স্থিরচিত্র ধরা পড়েনি; সেখানে লিপিবদ্ধ হয়েছে ভারতের সমাজ, সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং মানুষের জীবনযাত্রার অমূল্য দৃশ্য-দলিল। তাঁর আলোকচিত্র কেবল শিল্প নয়, ভারতের সচিত্র ইতিহাস।

অবনীন্দ্র মোহন রায়, কলকাতা-৯৬

শহরের অন্তরে

ঈপ্সিতা হালদারের প্রবন্ধটি মন ছুঁয়ে গেল। রঘু রাইয়ের চলে যাওয়া আমাদের শহর কলকাতার জন্যও এক অপূরণীয় ক্ষতি। এই শহরটিকে তিনি আমাদের নতুন ভাবে দেখতে শিখিয়েছিলেন। কলকাতার ভিতরে যে আরও কত কলকাতা লুকিয়ে আছে, তার প্রতিটি স্তর তিনি অসাধারণ সংবেদনশীলতা ও গভীরতায় ফ্রেমবন্দি করেছেন। তিনি শহরকে চিনেছিলেন ভিতর থেকে।

এই শহরের আলো-আঁধারি, তার মানুষ, তাঁদের জীবনসংগ্রাম, সুখ-দুঃখ এবং নীরব গল্পকে তিনি ছবির ভাষায় তুলে ধরেছিলেন। এমন সংবেদনশীলতা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ক্যামেরা হাতে কাজ করতে খুব বেশি মানুষকে দেখা যায় না।

তাঁর ছবিগুলি আধুনিক ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী দৃশ্য-দলিলগুলির মধ্যে অন্যতম হয়ে থাকবে। তাঁর ক্যামেরার চোখ দিয়ে আমাদের অনেকেই শহরটিকে গভীর ভাবে দেখতে ও চিনতে শিখেছি। তাঁর প্রয়াণের পর মনে হয়, সেই দেখার ক্ষমতারও যেন একটি অংশ তাঁর সঙ্গে চলে গেল।

কিন্তু তিনি যে ছবিগুলি আমাদের স্মৃতিতে গেঁথে দিয়ে গিয়েছেন, সেগুলি আজীবন থেকে যাবে। তাঁর তোলা পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ের ছবিগুলি আজও সমান জীবন্ত। সময়ের ব্যবধান সত্ত্বেও সেগুলির আবেদন ম্লান হয়নি। রঘু রাই তাই শুধু এক জন আলোকচিত্রী নন; তিনি ছিলেন সময়, সমাজ ও মানুষের এক অনন্য ভাষ্যকার, যিনি তাঁর ছবির মধ্য দিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে গিয়েছেন অমূল্য উত্তরাধিকার।

প্রদীপকুমার সেনগুপ্ত, ব্যান্ডেল, হুগলি

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Photographer

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy