E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: স্মৃতির সাইকেল

পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের প্রভাব সারা বিশ্বেই পড়েছে। আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি সাশ্রয়ের আহ্বানের প্রেক্ষিতে নবনির্বাচিত বিধায়কের এই উদ্যোগ প্রশংসার দাবি রাখে। সেই সূত্রেই সাইকেলকে ঘিরে কিছু ব্যক্তিগত আবেগ ভাগ করে নিতে ইচ্ছে হল।

শেষ আপডেট: ১৬ জুন ২০২৬ ০৮:৫১

‘অধিবেশন শেষে সাইকেলে চেপে বিধানসভা থেকে বেরোচ্ছেন হলদিয়ার বিজেপি বিধায়ক প্রদীপ বিজলি’ (১৬-৫)— দেবস্মিতা ভট্টাচার্যের তোলা এই আলোকচিত্র মনটাকে প্রফুল্ল করে তুলল।

পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের প্রভাব সারা বিশ্বেই পড়েছে। আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি সাশ্রয়ের আহ্বানের প্রেক্ষিতে নবনির্বাচিত বিধায়কের এই উদ্যোগ প্রশংসার দাবি রাখে। সেই সূত্রেই সাইকেলকে ঘিরে কিছু ব্যক্তিগত আবেগ ভাগ করে নিতে ইচ্ছে হল।

এমন নিত্যপ্রয়োজনীয় বাহনের তুলনা সত্যিই নেই। আমিও প্রত্যেক দিনের শুরু করি আমার ছোট্ট লাল হারকিউলিস ‘ক্যাপ্টেন’ সাইকেলটিকে সঙ্গী করে। ঝিখিরার গ্রামের পথ পেরিয়ে বর্তমানে শহরের রাস্তাতেও সে সমান দক্ষতায় সঙ্গ দিয়ে চলেছে। সকালের রোদ গায়ে মেখে দাশনগর বাজার থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আনার ক্ষেত্রে সাইকেলের কোনও জবাব নেই। এতখানি দূষণমুক্ত, এবং সাশ্রয়ী যানবাহন বোধ হয় আর নেই।

দেশের পেট্রলিয়ামজাত জ্বালানির ব্যবহার কমানো হোক কিংবা বিশ্ব জুড়ে দূষণ নিয়ন্ত্রণ— সর্বত্রই সাইকেলের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে উপলব্ধি করছি আমরা। পেট্রলের দাম যে হারে বাড়ছে, তাতে অদূর ভবিষ্যতে মোটরবাইক বা স্কুটার চালানোও অনেকের কাছেই বিলাসিতার বিষয় হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু সাইকেল শুরু থেকেই সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষের নাগালের মধ্যেই রয়েছে, থাকবেও।

আজ নানা শারীরিক সমস্যার ক্ষেত্রেও চিকিৎসকেরা সাইকেল চালানোর পরামর্শ দেন। অর্থাৎ আধুনিক জীবন যতই এগিয়ে যাক, সাইকেলের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যাওয়ার নয়।

ছোটবেলায় এই সাইকেলেই বাবার সঙ্গে স্কুলে যেতাম। তাই সাইকেল যতই ব্রিটিশদের হাত ধরে এ দেশে এসে থাকুক, আমার মতো মধ্যবিত্ত বাঙালির কাছে এটি এক আবেগ, এক ভালবাসার স্মারক। বাবা আজ আর নেই, কিন্তু তাঁর কেনা ছোট্ট সাইকেলটি দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক পরেও অক্ষত রাখতে পেরেছি— এ আমার কাছে গর্বের বিষয়। সাইকেলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সেই স্মৃতিগুলিও তাই আজও সমান উজ্জ্বল।

স্নেহাশিস সামন্ত, দাশনগর, হাওড়া

দক্ষতার স্বীকৃতি

‘পদ পরিবর্তন’ (১৯-৫) শীর্ষক সম্পাদকীয়ের পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকটি কথা। সম্প্রতি রাজ্যের প্রথম বিজেপি সরকারের মুখ্যসচিব হিসাবে মনোজ আগরওয়াল এবং বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে সুব্রত গুপ্তের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, বিশেষত সময়ের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে। কিন্তু এ কথাও মেনে নেওয়া উচিত যে, এই দুই আধিকারিক তাঁদের উপর অর্পিত বিপুল দায়িত্ব অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পালন করেছেন।

তবে মনে রাখা প্রয়োজন, তাঁরা কোনও রাজনৈতিক দলের হয়ে কাজ করেননি। তাঁরা কাজ করেছেন জাতীয় নির্বাচন কমিশন ও রাজ্য নির্বাচন কমিশনের হয়ে, যাতে রাজ্যের নির্বাচনপর্ব নির্বিঘ্ন, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ ভাবে সম্পন্ন করা যায়। যে রাজ্যের নির্বাচনী ইতিহাসের একটি বড় অংশই হিংসা ও অনিয়মের অভিযোগে কলঙ্কিত, সেখানে শান্তিপূর্ণ ও অবাধ ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করা সহজ কাজ নয়।

একই সঙ্গে এটাও মনে রাখা প্রয়োজন যে প্রায় ৫৫ শতাংশ ভোটার বিজেপির বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন। অর্থাৎ ভোটাররা তাঁদের নিজস্ব রাজনৈতিক পছন্দ ও মতামত অনুযায়ী ভোট দিয়েছেন। মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত, সংশ্লিষ্ট আধিকারিকেরা তাঁদের দায়িত্ব ঠিক ভাবে পালন করেছেন কি না এবং তাঁদের কর্মকাণ্ডের ফলে সাধারণ মানুষ গণতান্ত্রিক ও নাগরিক অধিকার নির্বিঘ্নে প্রয়োগ করতে পেরেছেন কি না। নিশ্চয়ই রাজ্যে তাঁদের মতো কিংবা তাঁদের চেয়েও দক্ষ আরও বহু প্রশাসনিক আধিকারিক রয়েছেন। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই মুহূর্তে মনোজ আগরওয়াল ও সুব্রত গুপ্তের দক্ষতা পরীক্ষিত ও প্রমাণিত। সে ক্ষেত্রে অজানা সম্ভাবনার চেয়ে পরীক্ষিত অভিজ্ঞতার উপর আস্থা রাখাই সরকারের পক্ষে অধিকতর বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত বলেই মনে হয়েছে আমার।

মনে রাখা প্রয়োজন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণই শেষ কথা বলেন। কোনটি ঠিক, কোনটি ভুল— তার চূড়ান্ত বিচারক তাঁরাই। বাইরে থেকে যতই প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা হোক না কেন, ভোটাররা শেষ পর্যন্ত নিজেদের বিবেচনাবোধ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেন। সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল সেই সত্যকেই স্মরণ করিয়ে দিল।

অমিতকুমার চৌধুরী, কলকাতা-৭৫

অতীতেও ছিল

সম্পাদকীয় ‘পদ পরিবর্তন’ প্রসঙ্গে কয়েকটি কথা। প্রশাসনে অবসরের পর গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ পাওয়ার ঘটনা নতুন নয়। বিচারপতি বা আমলারা সাধারণত এই মনোভাব নিয়ে দায়িত্ব পালন করেন না যে, অবসরের পর তাঁরা পুনরায় কোনও উচ্চপদে আসীন হবেন। তবে তাঁরাও মানুষ। ব্যক্তিগত রাজনৈতিক পছন্দ বা মতাদর্শ তাঁদের থাকতে পারে। কখনও কখনও তার প্রতিফলনে তাঁদের সিদ্ধান্ত বা রায়ের ব্যাখ্যা নিয়ে জনপরিসরে আলোচনার জন্ম দেয়।

তবে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল সরকারের আমলে বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন মাত্রা পেয়েছিল। সমালোচকদের অভিযোগ, প্রশাসনিক দক্ষতার পাশাপাশি রাজনৈতিক আস্থার ভিত্তিতেও কয়েক জন উচ্চপদস্থ আমলার মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছিল। আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়, হরিকৃষ্ণ দ্বিবেদীর মতো আমলাদের ক্ষেত্রে অবসরের পরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বহাল রাখা বা কার্যকালের মেয়াদ বৃদ্ধির নজির দেখা গিয়েছে।

অবশ্যই অতীতে কেন্দ্র বা বিভিন্ন রাজ্য সরকার দক্ষ ও অভিজ্ঞ কোনও কোনও আমলার কার্যকালের মেয়াদ বৃদ্ধি করেছে। কিন্তু গত পনেরো বছরে পশ্চিমবঙ্গে যে ভাবে বার বার এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে বিতর্ক ও প্রশ্নও কম ওঠেনি।

তাই বর্তমান প্রশাসন যদি পরীক্ষিত ও অভিজ্ঞ প্রশাসনিক আধিকারিকদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োগ করে, তবে সেই সিদ্ধান্তের মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও একই মানদণ্ড প্রযোজ্য হওয়া উচিত। ব্যক্তিবিশেষ নয়, মূল বিচার হওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট আধিকারিক তাঁর দায়িত্ব কতটা দক্ষতা, নিরপেক্ষতা ও সততার সঙ্গে পালন করেছেন, সেই ভিত্তিতে।

তারক সাহা, হিন্দমোটর, হুগলি

সমঝোতার পথে

প্রণয় শর্মার ‘বিশ্বশক্তি যখন দুর্বল’ (১৪-৫) প্রবন্ধটি তথ্যসমৃদ্ধ, যথাযথ এবং সময়োপযোগী। সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে শাসকের ক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে কিছু কথা যোগ করতে চাই।

শাসক যদি মনে করেন তিনিই বিশ্বের সর্বেসর্বা এবং তাঁর ইচ্ছাতেই বিশ্ব পরিচালিত হবে, তবে তা ইতিহাসের শিক্ষাকে অস্বীকার করার শামিল। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, রাজা যায়, রাজা আসে; কিন্তু কোনও ব্যক্তিই ইতিহাসের ঊর্ধ্বে নন।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ধারণা ছিল, কঠোর সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে ইরানকে দ্রুত নতি স্বীকার করানো সম্ভব হবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের সামরিক অভিযান সত্ত্বেও ইরানকে সহজে কোণঠাসা করা যায়নি। চুক্তি সম্পন্ন হলেও আগামী দিনে সামরিক ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে স্থায়ী সমাধান হবে কি না, প্রশ্ন থাকছেই।

হরমুজ় প্রণালীকে ঘিরে দীর্ঘ অচলাবস্থা বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে গভীর প্রভাব ফেলেছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শক্তিকে নতুন করে সমঝোতার পথ খুঁজতে হয়েছে। চিন এই সমীকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠেছে। চিনও ক্ষতির মুখে পড়েছে। ইরানি তেলের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় তার জ্বালানি আমদানি ও বাণিজ্যে প্রভাব পড়েছে। তবু চিন কৌশলগত অবস্থান বজায় রেখেছে। অন্য দিকে, আমেরিকার শুল্কনীতি এবং অর্থনৈতিক চাপও চিনকে প্রত্যাশিত মাত্রায় দুর্বল করতে পারেনি।

সেই কারণেই যুদ্ধের পাশাপাশি সমঝোতার প্রচেষ্টাও এত গুরুত্ব পেয়েছে বিশ্ব জুড়ে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শেষ পর্যন্ত শুধু সামরিক শক্তিই নয়, কূটনীতি, বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং পারস্পরিক স্বার্থের সমীকরণও স্থায়ী ফলাফল নির্ধারণ করে দেয়।

সূর্যকান্ত মণ্ডল, কলকাতা-৮৪

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Bicycle West Asia Fuel Crisis Cycle

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy