E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: নিরপেক্ষ প্রশাসন

রাজ্যের সরকারি শিক্ষার পরিসর ক্রমশ সঙ্কুচিত হতে হতে এখন খাদের কিনারায়। শিক্ষার দিকে জরুরি ভিত্তিতে এখন নজর দেওয়ার প্রয়োজন, এবং যথাযথ ব্যবস্থা করে সরকারি শিক্ষায় প্রাণসঞ্চার করা প্রথম কর্তব্য বলেই আমার মনে হয়।

শেষ আপডেট: ১৫ জুন ২০২৬ ০৪:২৪

সোমা মুখোপাধ্যায়ের লেখা ‘সংযমের শিক্ষাটা জরুরি’ (১৬-৫) শীর্ষক প্রবন্ধের সঙ্গে সহমত জানিয়ে কিছু কথা। দুর্নীতি, অপশাসন, কাটমানির ১৫ বছর পার করতে গিয়ে রাজ্যের মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন, দেওয়ালে তাঁদের পিঠ ঠেকে গিয়েছিল। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, নিয়োগ ও রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা-সহ মেয়েদের নিরাপত্তাও যথেষ্ট বিপন্ন হয়ে পড়েছিল। এ রকম পরিস্থিতি থেকে যখন পালাবদল ঘটে, তখন সেটা আস্থা, ভালবাসা বা বিশ্বাসের চেয়েও অনেক বেশি ঘটে এই দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসনকে ছুড়ে ফেলে মুক্তির স্বাদ পাওয়ার প্রয়াসে।

রাজ্যের সরকারি শিক্ষার পরিসর ক্রমশ সঙ্কুচিত হতে হতে এখন খাদের কিনারায়। শিক্ষার দিকে জরুরি ভিত্তিতে এখন নজর দেওয়ার প্রয়োজন, এবং যথাযথ ব্যবস্থা করে সরকারি শিক্ষায় প্রাণসঞ্চার করা প্রথম কর্তব্য বলেই আমার মনে হয়। কর্মসংস্কৃতির অভাবে মানুষ দিশাহারা, স্কুল শিক্ষা শেষ করে ছেলেমেয়েরা চলে যাচ্ছে পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে ভিন রাজ্যে, অশেষ নির্যাতন সহ্য করেও। কারণ, এ রাজ্যে কাজের সুযোগ কিছু নেই। প্রাক্-নির্বাচন পর্বে বিজেপি তথ্যপ্রযুক্তি, মাঝারি, ছোট শিল্পে বিনিয়োগ টানার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। যে-হেতু একই দলের সরকার রাজ্য এবং কেন্দ্রে, সে ক্ষেত্রে সমন্বয় রেখে এগিয়ে যাওয়া সুবিধাজনক হবে বলেই মনে হয়।

এ ছাড়া স্বনির্ভর শিল্পে আর্থিক সহায়তা পেলে গ্রামীণ অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনাও আছে। আশার কথা, ইতিমধ্যেই ১০০ দিনের কাজের পরিবর্তে ১২৫ দিনের কাজ শুরু হওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। হিংসার রাজনীতি আর নয়, কারণ বাংলার মানুষ অনেক হিংসা, রক্তক্ষরণ, মৃত্যু দেখেছে। শান্তির বাতাবরণ সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে মানুষ চায় একটি নিরপেক্ষ প্রশাসন, যে বিরোধী কথা শুনবে এবং মর্যাদা দেবে, কারণ বিরোধী কণ্ঠস্বরই হল গণতন্ত্রের একান্ত অপরিহার্য বিষয়। সর্বোপরি, নতুন প্রশাসনের কাছে আশা যে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাতাবরণ এ রাজ্যে দীর্ঘকাল বজায় থেকেছে। সেই সংস্কৃতি আগের মতো করেই চলুক। ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি যেন এ রাজ্যের শান্তি ও উন্নতির অন্তরায় হয়ে না দাঁড়ায়।

দিলীপ কুমার সেনগুপ্ত, বিরাটি, উত্তর ২৪ পরগনা

কেন এত রাগ

সোমা মুখোপাধ্যায় ‘সংযমের শিক্ষাটা জরুরি’ প্রবন্ধে বলেছেন, তৃণমূলের প্রতি কেন এতটা রাগ, সেটা বুঝে এগোনো দরকার। কথাগুলি সত্যি। কোনও দলের প্রতি রাগ দেখানো নয়, রাগ বা বিতৃষ্ণা দলটির সাংগঠনিক ক্ষত ও প্রশাসনিক অক্ষমতার উপর। রাজ্যব্যাপী বিস্তৃত একটি দলের রাশ ধরে রাখা এক-দু’জন শীর্ষ নেতৃত্বের কাজ নয়। ক্ষমতার চিত্ররূপ হওয়া উচিত ছিল পিরামিড আকৃতির, বিভিন্ন স্তরে ক্ষমতা ও নজরদারির বিকেন্দ্রীকরণ প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তা হয়নি। বরং দূর-দূরান্তের নেতা-গোছের কর্মীরা নিজেদের আলাদা আলাদা অলিখিত প্রশাসনিক বৃত্ত তৈরি করে পার্টি ফান্ডের রসদ জুগিয়ে খুশি রেখেছে নেতৃত্বকে। গুণমান মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল না, আনুগত্য দেখানোটাই আস্থা অর্জনে সহায়ক হয়েছে। শৃঙ্খলাহীনতা ও স্থানীয় স্তরের অত্যাচার, শোষণ, লুটতরাজ, সিন্ডিকেটরাজ, কাটমানি নাগরিক সমাজের নিত্যদিনের ভোগান্তি বাড়িয়েছে। এর প্রতিকার থানা-পুলিশ, প্রশাসন কেউ করেনি, ফিরেও তাকায়নি।

সদ্য শেষ হওয়া বিধানসভা নির্বাচনে তাই পুরনো সরকারকে প্রত্যাবর্তনের সুযোগ না দিয়ে সরাসরি পরিবর্তনের পথে হেঁটেছে নাগরিক সমাজ। যে অপশাসনের শিকার এত দিন নাগরিক সমাজ হয়েছে, তার প্রতিকার ও সুসংহত প্রশাসনিক পদক্ষেপের আশ্বাস তারা চায়, যা অমূলক নয়। রাজ্যে বেকারত্বের বহর বেড়ে যাওয়া ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সঙ্কুচিত হওয়ার জন্য ‘ডাবল এঞ্জিন’ সরকার তা নিরসনে অগ্রাধিকার দেবে, এমনই প্রত্যাশা। কাজ করলে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়, সেই সমালোচনা বা ভুল ধরিয়ে দেওয়ার স্বাধীনতা জনগণকে দিতে হবে। তা হলেই ‘নাগরিকবান্ধব’ একটি প্রশাসন মসৃণ ভাবে চলতে পারবে।

সৌম্যেন্দ্রনাথ জানা, কলকাতা-১৫৪

সুদিনের অপেক্ষা

‘সংযমের শিক্ষাটা জরুরি’ প্রবন্ধটি নতুন সরকারের পথ চলার নীতি নির্দেশক হিসেবে যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক। প্রকৃতপক্ষে, দীর্ঘ পনেরো বছর ধরে প্রতিটি স্তরের প্রশাসনিক দুর্নীতি ও অস্বচ্ছতা মানুষকে এক প্রকার বাধ্য করেছে পূর্বতন সরকারের বিরুদ্ধে রায় দিতে। শিক্ষার দুরবস্থা, নিয়োগ-দুর্নীতি, আর জি কর-কাণ্ডের মীমাংসা না হওয়া, স্বাস্থ্যের বেহাল অবস্থা, রাজ্যে বড় শিল্প আনতে ব্যর্থ হওয়া, সরকারি কর্মীদের ন্যায্য ডিএ থেকে বঞ্চিত করা, নেতাদের ঔদ্ধত্য ও গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, নেতৃস্থানীয়দের ক্রমাগত মিথ্যাভাষণ রাজ্যবাসীকে চরম বিরক্ত ও হতাশাগ্রস্ত করে তুলেছিল। তারই বহিঃপ্রকাশ ভোটবাক্সে প্রতিফলিত হয়েছে। প্রবন্ধকার সঠিক ভাবেই বলেছেন যে, রাজ্যবাসীর এই প্রবল প্রত্যাশার সঙ্গে তাল রেখে প্রশাসনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে নতুন সরকারের ভীষণ ভাবে সংযমী হওয়া প্রয়োজন। নিরপেক্ষ প্রশাসন গড়ে তুলতে জনসাধারণ, সংবাদমাধ্যম ও বিরোধীদের গঠনমূলক সমালোচনার স্বীকৃতি দেওয়া অন্যতম কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর প্রাণকেন্দ্র এই রাজ্য। তাই অন্য ধর্মাবলম্বীদের দৃষ্টিভঙ্গিকে উপেক্ষা করা উচিত হবে না। তা ছাড়া, নির্বাচনোত্তর বিক্ষিপ্ত কিছু রাজনৈতিক হিংসার ঘটনা আমরা ইতিমধ্যেই দেখেছি, যা গণতন্ত্রে একেবারেই কাম্য নয়। সবশেষে বলতে হয়, রাজ্যবাসী কিন্তু কখনও সংঘর্ষের রাজনীতি পছন্দ করে না। তাই প্রয়োজন, একটি ধর্মনিরপেক্ষ, সুন্দর, স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন উপহার দেওয়া।

শান্তনু ঘোষ, শিবপুর, হাওড়া

ভরসাস্থল

সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যে পালাবদলের পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান শাসক দলের আগামী দিনের কার্যকলাপ প্রসঙ্গে সোমা মুখোপাধ্যায়ের প্রবন্ধটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। দেখা গেছে, এই নির্বাচনে তৃণমূলের প্রতি সাধারণ মানুষের ক্ষোভ প্রায় পুরোটাই আছড়ে পড়েছে বিজেপির ভোটবাক্সে, যা তাদের সাহায্য করেছে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে। প্রধান কারণ হিসেবে বলা যেতে পারে, বিজেপি ভিন্ন অন্য দলগুলি তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে তাদের বিরোধিতার মাত্রা এমন জায়গায় নিয়ে যেতে পারেনি, যাতে তাদের প্রতি সর্বস্তরের মানুষের বিশ্বাস জন্মায়। বিজেপি সেই দিক থেকে যেমন অনেকটাই এগিয়ে ছিল, তেমনই কেন্দ্রের শাসক দল হওয়ার কারণে এবং প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে বিভিন্ন মাপের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব যে ভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন বাংলা দখলের লক্ষ্যে, তাতে সাধারণ মানুষের কাছে ভরসাস্থল হয়ে দাঁড়িয়েছিল বিজেপি। অনেকেই বলছেন, শুধুমাত্র অনুদান দিয়ে ভোটে জেতা যায় না, তৃণমূলের পরাজয় সেটাই দেখিয়ে দেয়। এই কথার বিরোধিতা করে বলা যেতে পারে, একমাত্র বিজেপিই ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’-সহ প্রকল্পগুলিতে দ্বিগুণ অর্থের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল নির্বাচনী ইস্তাহারে।

নতুন প্রশাসন ও সরকারকে মনে রাখতে হবে, সরকারের সমালোচনার অর্থ সরকার-বিরোধিতা নয়, বরং নিজেদের সংশোধন করে নেওয়ার সুযোগ, যা আগামী দিনে তাদের ‘জনগণের সরকার’ হতে সাহায্য করবে। প্রথমেই প্রশাসনিক ও সরকারি স্তরে উদ্যোগ করে ফিরিয়ে দিতে হবে বিবেচনাধীন যোগ্য ভোটারদের নাম এবং যত দিন না এই বিষয়ের ফয়সালা হচ্ছে, তত দিন যেন কোনও প্রাপকই বঞ্চিত না হন। সাধারণ মানুষের স্বার্থ ও প্রতিটি সম্প্রদায়ের সুরক্ষা এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য-সহ প্রত্যেক পরিবারে স্ব-রোজগারের সুযোগ করে দিতে পারলে, কোনও ভাবেই মানুষের বিরাগভাজন হতে হবে না।

অশোক দাশ, রিষড়া, হুগলি

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

West Bengal government BJP TMC West Bengal Politics West Bengal Development

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy