E-Paper

ফুটবল ও বিশ্ব-রাজনীতির ভাষা

তিন দশকের প্রান্তে আজও একই চিত্র। আমেরিকার মাটিতে ইরান ফুটবল যুদ্ধের জন্য সুসজ্জিত। হয়তো খেলার ছলেই সংঘটিত হবে গভীর তাৎপর্যপূর্ণ কোন কূটনৈতিক সমাবেশ!

পৌলমী ঘোষ

শেষ আপডেট: ১৫ জুন ২০২৬ ০৪:৪৩

যা ইচ্ছে তা-ই করে সীমানা ছাড়িয়ে সুযোগের অভিলাষে একা বা সমষ্টিগত ভাবে এগিয়ে থাকা অনৈতিক। একেই বলে অফসাইড। ‘ফিফা’ প্রতিষ্ঠার প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে থেকেই অফসাইড রুল রয়েছে ফুটবলে। তবে যত অফসাইড হয়েছে মাঠে, তারও বেশি হয়েছে মাঠের বাইরে। অনুপ্রবেশ বরাবরের আন্তর্জাতিক সমস্যা, সেখানেও রয়েছে নিয়মের কড়াকড়ি। অথচ তাবড় রাষ্ট্রনায়করা নিজ সুবিধার্থে ও-সব মানেননি। মুসোলিনি আর্জেন্টিনার অনুপ্রবেশকারীদের খাতির করে ইটালির নাগরিকত্ব দিয়েছিলেন। ফুটবল সাফল্য ছাপিয়ে গভীরতম উদ্দেশ্যটি ছিল সুশাসকের সর্বমুখী উন্নয়নের নজির তৈরি। মাঠের বাইরে শুধু না, টুর্নামেন্টের ফরম্যাটেও বদল করিয়ে ছিলেন ক্ষুদ্র স্বার্থে। ‘জুলে রিমে’ কাপের পাশে অহঙ্কারের স্মারক ‘কোপা-ডেল-দুচে’ জুড়েছিলেন।

উনিশ শতকের প্রথম দিকে আলাদা করে খেলোয়াড় বা পেশাদার ফুটবল দল বলে কিছু ছিল না। কারখানার শ্রমিকরাই নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের হয়ে খেলতেন। কর্মচারীরা মালিকপক্ষের অত্যাচার সহ্য করতেন সপ্তাহান্তে ফুটবল খেলার জন্য। তখন থেকেই ফুটবল ‘স্পোর্টসওয়াশিং’। আয়োজক, কর্তাব্যক্তি, খেলোয়াড় সবার জন্যই। ইটালির খেলোয়াড়রা অ্যান্টওয়র্প অলিম্পিক্সে শ্রমিকের গান ‘দ্য রেড ফ্ল্যাগ’ গেয়েছিলেন। ১৯৩৪-এর বিশ্বকাপে তাঁরাই গান ‘জিয়োভেনেজ্জা’, ফ্যাসিস্ট স্তুতি।

এখন ফুটবল পেশা। কিন্তু আয়োজক বা শাসকের নেশা বদলায়নি একটুও। রাশিয়ার বিশ্বকাপ ছিল ‘রুটির বদলে সার্কাস’! বিনোদনের উল্লাসে শোনা যায়নি দেশবাসীর মৌলিক অধিকারের হাহাকার। প্রকাশ্যে আসে তাদের ‘স্টেট-স্পনসরড’ ডোপিং শিল্পের রমরমা। বিশ্বকাপের আসর সাজাতে রাশিয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের সীমা অগ্রাহ্য করে উত্তর কোরিয়া-সহ বহু দেশের শ্রমিকদের নিংড়ে নেয়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সরব হয়েছিল এর বিরুদ্ধে। আর্থিক দুর্নীতির ছোঁয়া লেগেছিল আয়োজক রাষ্ট্র ও ফিফা-র ক্ষমতাধিকারীদের গায়ে। চোখ-ধাঁধানো উদ্‌যাপন শেষে আত্মতুষ্টি দেশটিকে আরও উদ্ধত করেছিল। বিশ্ব ফুটবলে এখন সে ব্রাত্য।

কাতার বিশ্বকাপেও নিপীড়িত হয়েছেন পরিযায়ী শ্রমিকেরা। একুশ শতকে এসে ‘কাফালা’র শ্রমিক শোষণের নৈতিক বীভৎসতায় পৃথিবী স্তম্ভিত। নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল ওয়ানলাভ ব্যান্ড, রামধনু পতাকা, এমনকি মহিলা দর্শকের পোশাকেও। রক্ষণশীল ফতোয়ায় ফুটবলপ্রেমী বিদেশিরা অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তবে বিশ্ববাসী তৃপ্ত হন আর্জেন্টিনার জয়ে। আবার আয়োজক দেশ হিসাবে আর্জেন্টিনা রচনা করেছে কলঙ্কের ইতিহাস। আর্জেন্টিনার জুন্টা সরকার বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজনের দায়িত্ব নেয়, কিন্তু তারা টুর্নামেন্টকে ব্যবহার করে মিথ্যে জাতীয়তাবাদী আবহ তৈরিতে এবং রাজনৈতিক বিশ্বে পরিচয়পর্ব সম্পন্ন করতে। শুরু হয় ‘ডার্টি ওয়র’। অগণিত বামপন্থী, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হয়। হারিয়ে যান বহু নারী, শিশুও। কনসেনট্রেশন ক্যাম্পগুলিতে নির্বিচারে চলেছিল নির্যাতন। এই ভয়ঙ্কর পরিবেশকে ফুটবলও প্রলেপ দিতে পারেনি। আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ বয়কটের রব ওঠে বিশ্ব জুড়ে।

আসলে সূচনাপর্ব থেকেই ফুটবলের মহোৎসব হয়ে উঠেছিল আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’-এর উপায়। অলিম্পিক্সের মূলমন্ত্র যদি হয় ‘জয় নয়, অংশগ্রহণই মুখ্য’, ফুটবল বিশ্বকাপের মন্ত্র তবে ‘জয় বা অংশগ্রহণ নয়, আয়োজনই মুখ্য’। আয়োজক দেশ বিশ্বকাপকে ‘সফট পাওয়ার’ হিসাবে ব্যবহার করে। উৎসব-পরবর্তী পর্যায়ে সে যেন মানবকল্যাণের পরাকাষ্ঠা। ১৯৬৮ মেক্সিকো অলিম্পিক্সের কিছু দিন আগে সে দেশে ‘তোতেলোলকো’ গণহত্যা হয়। সেই অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রদর্শনেও মেরামত করা সম্ভব হয়নি। তার জন্য মেক্সিকোকে অপেক্ষা করতে হয় পরবর্তী বিশ্বকাপ পর্যন্ত। ভূ-রাজনৈতিক, আর্থ-সাংস্কৃতিক, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ছাপিয়ে বিশ্বকাপ, প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে ছন্দে ফেরার অবলম্বনও হয়েছে। ‘ভ্যালদিভিয়া ভূমিকম্প’-বিধ্বস্ত চিলির নাগরিক-শুশ্রূষায় বিশ্বকাপ ছিল মহৌষধ।

ধর্ম বর্ণ অধিকার এমনকি উপযোগিতার সমতায় ফুটবলের বিকল্প নেই। যদিও বৈষম্যের রাজনীতিতে ফুটবল বিশ্বকাপ অসহায়। প্রগতির, প্রতিস্পর্ধার ফুটবল দূষিত হচ্ছে রাষ্ট্রীয় দম্ভের অভিঘাতে, জাতীয়তাবাদের গিমিকে, প্রক্সি যুদ্ধে, মিথ্যে বয়ানে। সঙ্গে ফিফা-র ইচ্ছাকৃত মৌন বা কুশলী পক্ষপাতিত্বের সরবতা আধুনিক ফুটবলকে এক কূটনৈতিক পরিভাষায় পরিণত করেছে।

তবুও বিশ্বকাপ ফুটবলই পৃথিবীর জনপ্রিয়তম ক্রীড়া-উৎসব। এ বারের বিশ্বকাপ আয়তনে ইতিহাস গড়তে চলেছে: অনেক দেশ, অনেক খেলা। ফরম্যাট বদল। পুরুষের ফুটবলকে উজ্জীবিত করতে খেলার মাঝেই নারীশক্তি মঞ্চ মাতাবে; ‘দাই দাই’ ছন্দে ‘দ্য ঘেটো কিডস’-এর সুযোগ। ফুটবল বিশ্বকাপের শতবর্ষ উদ্‌যাপনের নকশাও তৈরি হচ্ছে, অনুষ্ঠিত হবে পৃথিবীর কোনায় কোনায়। এমন ক্রীড়াসূচি বিলক্ষণ অর্থবহ। আসলে ফুটবল এখন আর স্রেফ খেলা বা সংস্কৃতি নয়, সমঝোতাও!

বিশ্ব জুড়ে এখন অস্থিরতা। গাজ়ায় এখনও অবধি বেঁচে থাকা শিশুরা একটু ফুটবল খেলতে চায়। ফিফা-র তো মস্ত ক্ষমতা, বিস্তর হিতকর প্রকল্প: একটা ‘রিফিউজি টিম’ কি তৈরি করা যেত না? ফুটবল তো চিরকালীন মানবিক— জুলে রিমের কাছে ফুটবল বিশ্বকাপ ছিল প্রসারণশীল সভ্যতার পরিপূর্ণতা। গত প্রায় ১২৫ বছরে ফিফা ক্ষমতায়, উৎকর্ষে, কৌশলে অনেক চৌকস হয়েছে ঠিকই, তবে অলিখিত বিশ্বনিয়ন্তার ভূমিকায় তাকে ক্ষুদ্র রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠতে হবে। নইলে মুশকিল।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

fifa Politics Geopolitics football

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy