এক চিলতে ঘরে তখনও আলো জ্বলছে। হয়তো কয়েক মুহূর্ত আগেও সেই ঘরে বাস করতেন কেউ। কয়েক মিনিটে বুলডোজ়ার ভেঙেচুরে শেষ করে দিল গৃহস্থালি। সেই ছবি সমাজমাধ্যমে দেখে অট্টহাসির ইমোজি— অনেক।
বহু বছরের সংসার থেকে উপড়ে, রাষ্ট্রের পুশ-ব্যাক নীতি অনুযায়ী হোল্ডিং সেন্টারে পাঠানো হচ্ছে কোনও পরিবারকে। সেই ছবি দেখে আমার-আপনার কোনও সহনাগরিক মন্তব্য করলেন, “আজ রাতে শান্তির ঘুম। আজ রাতে স্কচ।”
ভারত তাড়িয়ে দিচ্ছে, বাংলাদেশ ফিরিয়ে নিচ্ছে না। দেশহীন কয়েক জন মানুষ সীমান্তে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের অপেক্ষায়। সমাজমাধ্যমে অসহায় সেই সব মুখের ছবির নীচে মন্তব্য, “তোরা এ বার মর।”
এক মহিলার পোশাক ছিঁড়ে তাঁকে মাটিতে ফেলে এলোপাথাড়ি চড়-থাপ্পড় মারা হচ্ছে। চলছে অশ্রাব্য গালিগালাজ। ‘দুর্নীতি’র সঙ্গে যোগ থাকার শাস্তি! সামনে থিকথিকে ভিড়। প্রায় প্রত্যেকের হাতে মোবাইল ফোন। চলছে ভিডিয়ো রেকর্ডিং। কেউ কেউ আবার আক্ষেপও করছেন, “জুতো খুলে মারছে না কেন?” কিন্তু ভিড় থেকে একটাও মুখ বলে উঠছে না যে, ‘দুর্নীতি’র হাজার অভিযোগ থাকলেও কাউকে এ ভাবে মারধর করা সম্পূর্ণ বেআইনি। বরং বাড়ি, অফিস, ক্লাব, বাস-ট্রেন, চায়ের দোকানের জটলায় সেই ভিডিয়ো দেখে উল্লাসে ফেটে পড়ছেন অনেকে। এক ভিডিয়ো থেকে অন্য ভিডিয়ো। শুধু অন্তর্বাস পরে থাকা অবস্থায় কোমরে দড়ি বেঁধে, গলায় জুতোর মালা ঝুলিয়ে হাঁটানো হচ্ছে কাউকে। পুলিশ সেখানে দর্শক। আর বাকি জনতা ভিডিয়োগ্রাফার।
দেশ জুড়ে তো বটেই, এই বিকৃতি ক্রমশ ঢুকে পড়েছে আমাদের ঘরেও। ‘সোনার বাংলা’র ছবি এখন অনেক ক্ষেত্রে এটাই। টিভি, ফেসবুক, ওয়টস্যাপ খুললেই অন্যের প্রতি বিষোদ্গার, ডিম, গোবর, জুতোর মালা, সাদা থান, কুৎসিত গালিগালাজ, ব্যঙ্গ-শ্লেষ। অন্যকে নস্যাৎ করে দেওয়া, অন্যকে অপদস্থ করার সামান্য সুযোগও হাতছাড়া করছেন না বহু মানুষ।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ, হতাশা, প্রতিবাদ? সবটাই কি তাই? রাজনীতি জনতার একটা বড় অংশকে ক্রমাগত ওস্কাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেই প্ররোচনায় তাঁরা পা দিচ্ছেন, কারণ স্বেচ্ছায় পা দিতে চাইছেন। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেওয়া যায় যে, চার পাশে যা চলছে তার একটা অংশ জনরোষ, তা হলেও বাকিটা? রাজনীতির ছোঁয়াচ ছাড়াই অন্যের অনিষ্ট দেখে এই স্বতঃস্ফূর্ত উল্লাস? এর পিছনে কাজ করছে কোন মানসিকতা? অন্যের ক্ষতি, অন্যের বিপর্যয় কবে থেকে আমাদের জীবনে এমন বিপুল আমোদের আমদানি করল? শুধু নিজের গণ্ডিটুকু সুরক্ষিত রেখে বাকিদের ভোগান্তি কবে এতটা সুখ দিতে শুরু করল? যে ভাল আছে, তার জীবনে বিপর্যয় আসুক, আর যে খারাপ আছে, সে আরও খানিকটা বেশি খারাপ থাকুক— বহু মানুষের দৈনন্দিন চাহিদা যেন এখন এটাই। গাজ়ায় নিহত শিশুদের ছবি দেখেও মানুষ হাসির ইমোজি দিয়েছে, এমনও দেখেছি আমরা।
অন্যের দুঃখ, বিপর্যয় বা পতনে উল্লসিত হওয়ার এই প্রবণতাকে বলা হয় ‘শাডেনফ্রয়েডে’। পৃথিবীর ইতিহাস ও সাহিত্যে এর অজস্র উদাহরণ রয়েছে। প্রাচীন রোমে কলোসিয়ামে গ্ল্যাডিয়েটরদের প্রাণঘাতী লড়াই দেখতে জড়ো হতেন হাজার হাজার মানুষ। মানুষের যন্ত্রণাই সেখানে বিনোদনের উপকরণ। ফরাসি বিপ্লবের সময়েও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দেখতে ভিড় করত জনতা। শত্রুপক্ষের কারও মৃত্যু সেখানে উৎসবের সমান। মধ্যযুগীয় ইউরোপে অপরাধীদের প্রকাশ্যে বেত মারা, বিভিন্ন শাস্তি দেওয়া, এমনকি ফাঁসিও জনসমক্ষে প্রদর্শিত হত।
সেই রোগ এখন এখানেও সংক্রামক। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অসুস্থতা, গ্রেফতার, নির্বাচনী পরাজয়, ব্যক্তিগত বিপর্যয়— সবই নির্মম উল্লাসের খোরাক। সমাজমাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ব্যক্তিগত দুর্দশা ঘিরে উল্লাসের উদাহরণ ক্রমশ বাড়ছে। গণপ্রহারে মৃত্যুর ঘটনাও এ রাজ্যে লাফিয়ে বাড়ছে। সেই আক্রোশ থেকে বাদ যাচ্ছে না শিশুরাও। ‘উল্টো করে ঝুলিয়ে মারা’র রাজনৈতিক হুমকিকে নিজেদের জীবনে প্রয়োগ করতে মরিয়া একটি অংশ। এখানে শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধনী-দরিদ্র, সুবিধাভোগী-সুবিধাবঞ্চিত— বোধ হয় কোনও বিভাজনই নেই।
আগেও যে এই প্রবণতা ছিল না, তা নয়। কিন্তু এমন গণহারে ছিল না। এমন সমাদৃতও ছিল না। আব্রু ছিল অনেকটাই। এখন তাও নেই। এক ডাক্তার বন্ধু বলছিলেন, এই প্রবণতা মানুষের আদিম হিংস্রতা, হীনম্মন্যতা এবং অন্যের চেয়ে নিজেকে সফল দেখার বিকৃত মানসিকতা থেকে তৈরি হয়। মানুষ যখন নিজের জীবন নিয়ে তৃপ্ত থাকে না, তখন অন্যের বিপর্যয় কামনা করে এবং অন্যের কষ্টে আনন্দ পায়। চার পাশে কেউ সফল হলে অবচেতনে অনেকে নিজেদের ব্যর্থ ভাবতে শুরু করেন। ফলে সেই ব্যক্তি বেকায়দায় পড়লে মন শান্ত হয়। আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞানের গবেষণাও বলছে, প্রতিপক্ষের দুর্গতি দেখলে মস্তিষ্কের ভেন্ট্রাল স্ট্রায়াটাম নামের অংশটি সক্রিয় হয়ে ওঠে। অর্থাৎ এই বিকৃতির একটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও রয়েছে।
কিন্তু সেই উদ্দীপনা এখন হঠাৎ এত বেড়ে গেল কেন? কেন অন্যের যন্ত্রণায় অট্টহাসির ইমোজি এমন গণ-হিস্টিরিয়ার চেহারা নিল?
গত বেশ কিছু বছরে পরিবর্তনের জোয়ার এসেছে রাজ্যে। এমনই সেই পরিবর্তন যে, তা দেখে দেখে আমরা অনেকেই ক্লান্ত। এখনও প্রতি মুহূর্তে একের পর এক পরিবর্তন দেখেই চলেছি। চার পাশের দুর্নীতি হজম করতে করতে, অশিক্ষা ও অসভ্যতা মেনে নিতে নিতে আমাদের নিজস্ব বোধবুদ্ধি, ভাবনাচিন্তার ক্ষমতাতেই যেন জং ধরে গিয়েছে। দু’হাতে সঙ্কীর্ণতার পাঁক মেখে চলেছি অবিরত। মাঝে-মাঝে প্রশ্ন জাগে, এই ধারাবাহিক দুঃসময়ের অধ্যায়ের কি কোনও শেষ নেই? না কি এটাই ‘নিউ নর্মাল’?
রাজনীতি ও ধর্মের মেরুকরণ এখন এমন বিপজ্জনক জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে বিপন্ন মানুষকে মানুষ হিসেবে না দেখে সে কোন পক্ষের, সেটাই আগে ভাবা হচ্ছে। সমাজমাধ্যম দৈনন্দিন জীবনে এমন আগ্রাসী চেহারা নিয়েছে, যেখানে ক্ষোভ, বিদ্রুপ এবং ট্রোলিং-ই ‘ইন থিং’; বাকি সব সেকেলে। চাকরি, শিক্ষা, আর্থিক নিরাপত্তা— সব ক্ষেত্রেই প্রবল চাপ। অন্যের কষ্ট অনুভব করার মানসিক স্থিতিটা হারিয়ে যাচ্ছে। প্রতিযোগিতা এতটাই কঠিন হয়ে উঠেছে যে, চার পাশে কয়েক জন মানুষ কষ্টে থাকলে মনে হচ্ছে, তা হলে হয়তো আমার ভাল থাকার সুযোগটা বাড়বে।
প্রশ্ন এটাও যে, মানুষের খারাপ থাকার ঘটনা এত বেশি যে কোথাও কি একটা ‘কম্প্যাশন ফ্যাটিগ’ বা সহানুভূতির ক্লান্তি তৈরি হচ্ছে? এই অসংবেদনশীলতার পিছনেও কি তার ভূমিকা রয়েছে?
আমাদের রাজ্যে শিক্ষার হাল খারাপ হয়েছে কয়েক দশক ধরেই। চাকরির অবস্থা তলানিতে। দুর্নীতি কার্যত সরকারি সিলমোহর পেয়েছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে আশা, ভরসা, আস্থা তিল তিল করে ক্ষয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এত কিছু হারানোর মধ্যেও তো অনেক কিছু বেঁচে ছিল। মানবিক বোধ ছিল, সহানুভূতি ছিল, অন্যের পাশে দাঁড়ানোর মমত্ববোধ ছিল।
শুধু ছিলই বা কেন বলছি? বন্যা, দুর্ঘটনা কিংবা সামাজিক বিপর্যয়ের সময় এখনও বহু মানুষ এগিয়ে আসেন। বহু মানুষ নিঃশব্দে অন্যের পাশে দাঁড়ান, রক্তদান করেন, পথশিশুদের পড়ানোর দায়িত্ব নেন, বিপর্যয়ে ত্রাণ সংগ্রহ করেন, অসুস্থ প্রতিবেশীর পাশে এসে দাঁড়ান, পথের পশুকে আগলে রাখেন। কিন্তু তাঁরা কি ক্রমশ সংখ্যালঘু হয়ে পড়ছেন?
কোভিড আমাদের সহমর্মিতাকে মারতে পারেনি। রাজনীতির নোংরামি কি তাতে সক্ষম হল?
আমাদের সব কিছু আস্তে আস্তে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। যেটুকু অবশিষ্ট, সেটুকুও কি এমন নিস্পৃহতায় হারিয়ে যেতে দেব? ‘আমাদের গেছে যে দিন একেবারেই কি গেছে, কিছুই কি নেই বাকি?’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)