১৯৯২ সালে থোড় বড়ি খাড়া বেরোল। যেমন ভাষা, তেমন রসবোধ। মধ্যবিত্ত বাঙালির গৃহস্থালি আর অন্দরের কথকতা! আপাতকৌতুকের আড়ালে জমে আছে কত যুগের বঞ্চনা-বেদনা-অপচয়ের পাহাড়। বাঙালির ভিতরবাড়ির এই কথকঠাকরুন কল্যাণী দত্তের বয়স তখন পঁয়ষট্টি। বইটির প্রাক্কথনে আছে, ‘“তাঁবা তুলসী” নিয়ে কবুল করছি যে এরকম একঘেঁয়ে ঘরোয়া কথা কেউ শুনতে চাইবেন এমন কথা কখনো ভাবিনি’। কিন্তু ওই ঘরোয়া কথকতার সূত্রেই কল্যাণী দত্তকে চিনলেন পাঠক। তাঁর প্রথম বই বেরিয়েছিল ১৯৪৭-এ, ছোটদের সচিত্র কৃত্তিবাস সংকলন, জয়নুল আবেদিনের অলঙ্করণে, দাম এক টাকা, প্রকাশক গ্রন্থজগৎ, তার পর তিনটি কবিতার বই, তিন বেণী (১৩৭১), শ্রাবস্তী (১৩৮৪) এবং ঋজুবালুকা (১৩৮৬); প্রথমটিতে প্রকাশক হিসেবে নাম ছিল কল্যাণীর দিদি দুর্গা দত্তর, শেষেরটির প্রকাশক কবি স্বয়ং, মাঝেরটির প্রকাশক ৪৯৪বি কেয়াতলা রোডের অন্নপূর্ণা বসু। অন্য দু’টি বইয়ের ঠিকানা— ৪১সি এস পি মুখার্জি রোড, অর্থাৎ কল্যাণী দত্তের বাড়ি।
শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি রোডে নিজেদের বাড়িতে আসার আগে কলকাতায় একাধিক ভাড়াবাড়িতে থেকেছে পরিবারটি। ১৯২৭-এর ১২ মে বাবা-মায়ের অষ্টম এবং কনিষ্ঠ সন্তান কল্যাণীর জন্ম। তখন হুগলি জেলার দেবানন্দপুর গ্রামের দত্তমুন্সি জমিদার বংশের ছোটতরফের পঞ্চমপুরুষ দাশরথি দত্ত ভাড়া থাকতেন ১৩৭/৬ বেলেঘাটা মেন রোডে। ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট দাশরথি ছিলেন সংসারজ্ঞান-বিবর্জিত। ডেপুটিগিরির বাইরে তাঁর সময় কাটত চেম্বারস্ ডিকশনারি আর নেসফিল্ড-এর গ্রামার পড়ে। মেজোমেয়ে মুরলার বিয়ে দিয়েছিলেন ডাক্তারিতে রেকর্ড নম্বর পাওয়া ছেলের সঙ্গে। ছেলের মা-বাবা নেই, থাকার নিজস্ব জায়গা নেই, ছেলেটি যে প্রবল সন্দেহবাতিকগ্রস্ত, ছাত্রজীবনেই একাধিক বার অপ্রকৃতিস্থ হয়েছেন, এ-সব কোনও খবরই নেননি। বিয়ের কিছু দিন পরে স্বামী নিরুদ্দেশ হন, মুরলার জন্য পড়ে থাকে ‘আধাবিধবা’র জীবন। টাকার সংস্থান ছাড়া সংসার চালানোর আর সব দায়িত্ব যে মা অতুলকুমারীর, তা ছোট থেকেই দেখেছেন কল্যাণী। তদুপরি মামলা, গঙ্গাস্নান, ফুটবল ম্যাচ, যে-কারণেই আত্মীয়স্বজন কলকাতায় আসতেন, তাঁরা ১৩৭/৬-এ উঠতেন, থাকতেন, এখানে থাকার কত অসুবিধা, কল্যাণীর মায়ের রান্না কত খারাপ, এই সব আলোচনা করতেন। দাদা-দিদিরা প্রত্যেকেই নিজেদের পড়া, কাজ, সমবয়সি বন্ধু ইত্যাদিতে ব্যস্ত।
অত ভিড়ের মধ্যেও দাদা-দিদিদের থেকে অনেক ছোট কল্যাণী একা। নিরেস চেহারার জন্য জ্ঞান হওয়ার আগে থেকেই নাকানি-চোবানি! অমন কুচ্ছিত মেয়ের ডাকনাম আবার শোভা! ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে ইতিহাসে সাম্মানিক-সহ স্নাতক কল্যাণী কাশীতে ছোটমামার বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে সেখানকার টোলশিক্ষার প্রতি আকৃষ্ট হলেন, ব্যুৎপন্ন হলেন বৈদিক সংস্কৃতে; ১৯৫০-এ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃতে স্নাতকোত্তর, সেই বছরেই কর্মজীবন শুরু। পর পর তিনটি কলেজে সংস্কৃত বিভাগে পড়িয়েছেন তিনি ১৯৯২ পর্যন্ত।
তেরো থেকে কুড়ি বছর বয়সে লেখা কবিতার সঙ্কলন তিন বেণী-র প্রথমেই ‘অর্গলা স্তোত্র’— ‘অনেক দিয়েছ প্রেম লজ্জাহীন উন্মাদের মতো/ কদাকার অভিশাপ দাম্ভিক মূঢ়ের পদাঘাত/ হে জগৎস্বামী।/ দাও গণিকার চোখ দাও মোরে কবির লেখনী/ এককাব্যরাজ্যপাশে খণ্ড ছিন্ন বিক্ষিপ্ত জগৎ/ বেঁধে দিব আমি’। ঋজুবালুকা-য় জানকীকে সম্ভাষণে কল্যাণী প্রবল দুঃসাহসী: ‘তোমার শাস্ত্রের দোহাই মানা নারীত্বকে/ তোমার উচ্চারিত সরল বাসনাকে/ যে একান্ত সত্য মর্যাদা দিয়েছিল/ সে ওই দাম্ভিক অধার্মিক রাবণ’ (‘উত্তরসীতাচরিত’)। মহাকাব্য বা স্তোত্র থেকে যখন কবিতারা আসে আঠারো-উনিশ-বিশ শতকের সংসারে-সমাজে, পাঠক দেখেন, নারীর ঘরে-বাইরে ছড়ানো শৃঙ্খলের শিল্পসম্মত বিন্যাস! থোড় বড়ি খাড়া-র এক দশকেরও বেশি আগে বেরিয়েছিল যে ঋজুবালুকা, তার ‘আনন্দ সন্দেশ’ কবিতার শুরুতেই দেখি, ‘তারপর আবার সেই থোড় বড়ি খাড়া/ শয়ন উত্থান পাশমোড়া।/ যাই বলো তবু ভদ্রস্থ আছে’। এমন ভদ্রস্থ যে আদৌ মানবিক নয়, কবিতার বয়ান তা খোলাখুলি বলে না। অথচ সে-বয়ান নির্লিপ্ত নয় মোটে। সদাই যেন আকাঙ্ক্ষা তার, পরোক্ষ ওই অব্যক্ত প্রতিরোধ থেকে পাঠক খুঁজে নেবেন প্রত্যক্ষ প্রতিবাদের গড়ন আর চলন! কিন্তু কথকঠাকরুন তাঁর ঘরোয়া কথার চতুর্থ গদ্যের বই ছিটমহল-এর (১৯৯৭) ভূমিকায় লিখে গেছেন, “কবিতা লিখতে ভালোবাসতুম— সে তো যুগ যুগ আগে! আমি যুগ যুগ জীও বললেই তো সে-সব কবিতা বেঁচে থাকবে না!” এই বেঁচে না-থাকা কবিতাদের দেখে কি মনে হয়, বাঙালির ঘর-গেরস্তালির, শৃঙ্খল-বন্ধনের কথকঠাকরুন হওয়ার বাসনা নিয়ে আদৌ তাঁর দোয়াতকলমের লালন-পালন শুরু করেননি কল্যাণী দত্ত? মৌলিক চিন্তাগুলোকে প্রথম প্রথম তিনি ভরে দিতে চাইতেন তাঁর কবিতার অন্তরে?
কিন্তু পাঠকের কাছে তিনি ছড়ানো শৃঙ্খলের মোকাবিলায় দীর্ণ কবি নন, শৃঙ্খলের জবরদস্ত সঙ্কলক। শিশুর মতো সরল, ফুলের মতো সুন্দর লক্ষ্মী যত বারই শ্বশুরবাড়ি যায়, মায়ের বাধ্য তার ডাক্তার স্বামী মায়ের সামনে বৌকে ঘরে নেয় না। কিন্তু লাথি-ঝাঁটা খেয়ে যত বারই সে বাপের ঘরে ফেরে, কেমন করে যেন তার গর্ভে এসে যায় আর একটা সন্তান! মানসিক ভারসাম্য হারাতে হারাতে লক্ষ্মী খাড়া দাঁড়িয়ে হাসে, সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘ঝর্ণা’ কবিতাটা বলতে বলতে দু’হাত তুলে চেঁচিয়ে ওঠে, ‘আমি চন্দনবর্ণা’ (‘পুষ্পাঞ্জলি’, ছিটমহল)। পরজন্মে বৈধব্য রুখতে সাবিত্রীকে শাঁখা পরাবে বলে সাবিত্রী পাহাড়ের পথে রওনা হয়েছিল বালবিধবা ইন্দুমতী। কিন্তু পাহাড়ে ওঠার আগেই হয়ে পড়ল ঋতুমতী, অশুদ্ধ। তার আনা পুজোর উপচার নিয়ে তার সঙ্গিনীরা চলে গেল উদ্দিষ্ট পথে। কেঁদে বলল ইন্দুমতী, ‘… ঠাকুর… সেজেগুজে দাঁড়িয়ে থাকো শুধু, কাঠিটি নাড়তে পার না। আমার খিদে তেষ্টা আর এই রক্তভাঙা রোগ— এই তোমায় দিলুম’ (‘বৈধব্য-কাহিনী ১’, পিঞ্জরে বসিয়া [১৯৯৬])। ইন্দুমতীর এই সরবতা কল্যাণী দত্তের অতি-আলোচিত ‘বৈধব্য-কাহিনী’ দু’টির অন্য মাত্রা চেনায়। কিন্তু ‘আমি চন্দনবর্ণা’-র উন্মাদ হাহাকার কিংবা ঠাকুরকে খিদে-তেষ্টা আর রক্ত-ভাঙা রোগ উৎসর্গ করার অঙ্গীকার যেন পুরোপুরিই সধবা লক্ষ্মীর কিংবা বিধবা ইন্দুমতীর বাচন। ওই বাচন যিনি পাঠকের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন, তিনি নিজস্ব কোনও মৌলিক স্বর আখ্যানে যোজনা করার ঘোর বিরোধী। তেমন যোজনা তো সাবেককালের কবিতা-যুগের খেয়াল, কবে চুকেবুকে গেছে। কথকঠাকরুন যেন বলেন, এখন তো বাপু যেটুকু শুনি, যেমনটি যে দেখায়, তেমন-তেমনই লিখি। ব্যাসদেবের যেমন গণেশ ছিলেন! তা আমার ব্যাসদেবীরা যে সব তৃণ! আর আমি? তৃণাদপি তৃণ!
কল্যাণী দত্ত তাঁর বিশিষ্ট গদ্যের বইগুলিতে কেবলই সাজিয়ে গেলেন অন্যের গবেষণার উপকরণ। যেন আখ্যানের কিংবা তথ্যের সূত্র ধরে কোনও সামাজিক জিজ্ঞাসার অন্বেষণ বা সে-জিজ্ঞাসার একাধিক সম্ভাব্য উত্তরের উন্মোচন তাঁর কাজ নয়। থোড় বড়ি খাড়া-র ‘মেয়েমহল’-এ কিংবা ছিটমহল-এর ‘সে যুগের দাসীদিদিরা’-য় পাঠক দেখেন, অক্ষরজ্ঞানহীনের বর্ণমালায় বা নিরক্ষরের প্রজ্ঞায় আকীর্ণ উচ্চারণ; অথচ শিক্ষিতের দুনিয়ায় সে-উচ্চারণের চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে কথকঠাকরুন নীরব! সামাজিক ইতিহাসের উপাদান সন্ধানে যে-মৌখিক পরম্পরার গুরুত্ব ক্রমবর্ধমান (তাই তো থোড় বড়ি খাড়া, পিঞ্জরে বসিয়া, ছিটমহল নিয়ে এত মাতামাতি), সেই পরম্পরার অবিচ্ছেদ্য ওই দাস-দাসীদের কথকতা! এই সত্যি তো কল্যাণী দত্তের অজানা নয়!
লক্ষ্মীঠাকরুনকে ফতুর করে মা-সরস্বতীর সাধনা করেছেন তিনি তাঁর সাবালক জীবনে। কালোকুচ্ছিত শুনতে শুনতে বেড়ে ওঠা মেয়েটি কলেজে পৌঁছে অপালাকে ভালবেসেছিল, লিখেছিল ‘সোমলতা’ নাটক (খাড়া বড়ি থোড়)। সে-নাটকে ইন্দ্র অপালাকে বলেন, “জগতের আনন্দের উৎস শুধু নাভির নীচে নয়… তুমি ব্রহ্মবাদিনী হও”। এ-নির্মাণ তো কেবল বাল্যস্মৃতিতে নির্ভর নয়! এক দিকে প্রবল পরাক্রান্ত পাঠকসত্তা, অন্য দিকে সংস্কৃত সাহিত্য মন্থন করা ‘পঞ্চশিখের গান’ (তিন বেণী), ‘অশথপাতা কুঞ্জলতা’-র (ঋজুবালুকা) স্মৃতিমেদুর বিষাদ, এমন সব কবিতার হারিয়ে যাওয়া, শেষ জীবনে কুটোনো-বাটনা, সকড়ি-শুদ্ধি, একাদশী-অম্বুবাচীর বাখানায় পাঠকের হইচই, দীর্ঘ বিয়াল্লিশ বছরের শিক্ষকতার রুজি— সব মিলেই তো অবিবাহিতা কল্যাণী দত্তের ছিয়াত্তর বছরের জীবন! কেমন ছিল ওই সাবালক জীবনে অন্দর-বাহিরের ঘাত-প্রতিঘাত? যে-বয়ানের সুষমা যত বেশি, সেই বয়ানের অন্তর্লীন শৃঙ্খলাকে ওলটপালট করে সংলগ্ন জীবনের শৃঙ্খলকে চিনে নেওয়া কি ততই দুরূহ? যিনি লিখেছিলেন, ‘সব চিঠি জবাব খোঁজে না/ কথাগুলো ফুঁসে ফুঁসে/ পাড়ে এসে ভেঙে ভেঙে যায়/ অভিধান দেয় নয়া সামাল’ (‘বিধিলিপি’, ঋজুবালুকা), জীবনের শেষ দশ বছরে তিনি হলেন বাঙালি ঘর-গেরস্তালির বিখ্যাত কথকঠাকরুন! এ-ঘটনা কি নিজেই এক শৃঙ্খল নয়? কল্যাণী দত্তের শতবর্ষের সূচনায় এমন জিজ্ঞাসার স্বীকৃতি জরুরি।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)