আমাদের জীবনের অনেকটা অংশ জুড়ে ছিল কলেজ ফেস্ট। বিভিন্ন কলেজের ফেস্ট-এ কেউ গান গাইতাম, কেউ ডিবেট-এ যোগ দিতাম, কেউ ব্যান্ড নিয়ে গাইত। তেমনই একটি কলেজ ফেস্ট থেকে প্রীতমের সঙ্গে আমার আলাপ। প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ত প্রীতম, আর আমি স্কটিশ চার্চ কলেজ। কলেজ ফেস্টের বাইরেও আমাদের বন্ধুত্বের উৎস ছিল একটি গান।
তখন আমি প্রথম বর্ষের ছাত্র। ‘সাউন্ড অফ সাইলেন্স’-এর সুরে ‘মৌনমুখরতা’ নামে একটি গান লিখেছিলাম। সেই সময়ে প্রীতমেরও একটি ব্যান্ড ছিল— ‘জতুগৃহের পাখি’। আমার লেখা গানটি ওরা নানা জায়গায় গাইত। তাই আমাদের বন্ধুত্বের গোড়ায় এই গানটির বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। মনে আছে, কলেজের অনুষ্ঠানগুলো শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও আমরা একসঙ্গে বেশ কিছুটা সময় কাটাতাম। একসঙ্গে গানবাজনা করতাম। প্রীতমকে দেখে বুঝতে পারতাম, ও গান নিয়েই থাকতে চায়। ওর গান বাঁধার ক্ষমতা তো ছিলই, ভাল গাইতও। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হল, খুব মনখোলা মানুষ ছিল ও।
‘চন্দ্রবিন্দু’র একেবারে গোড়ার দিকের একটা কথা বলতেই হয়। তখনও আমি বা চন্দ্রিল ব্যান্ডে যোগ দিইনি। ‘চন্দ্রবিন্দু’র একটি অনুষ্ঠান দেখতে গিয়েছিলাম। তখন কিন্তু প্রীতম এই ব্যান্ডের সদস্য ছিল। তখন জানতাম না, আমি একদিন এই ব্যান্ডের সদস্য হয়ে উঠব। প্রীতমও জানত না, ও বম্বে (অধুনা মুম্বই) চলে যাবে।
‘আমাদের একসঙ্গে একটি বাংলা ছবিতে কাজ করার কথাও হয়েছিল।’ ছবি: সংগৃহীত।
‘চন্দ্রবিন্দু’র প্রথম অ্যালবাম তৈরি হওয়ার পরে বম্বে গিয়েছিলাম। প্রীতমের কাছে একটি ‘পেজার’ ছিল। পেজার-এর মাধ্যমেই ওকে খবর দিয়েছিলাম, ‘আমি বম্বে এসেছি।’ তখন বম্বেতে গিয়ে নিজের জায়গা তৈরির লড়াই করছে প্রীতম। অনেকের সঙ্গে একটি পিজি-তে থাকত। সেখানে গিয়েই আমিও উঠেছিলাম। প্রীতম এবং ওর ‘রুমমেট’-দেরও আমাদের অ্যালবামের গানগুলি শুনিয়েছিলাম। ও তখন ইসকন-এর একটি কাজ করছিল। তাই প্রীতম তখন ফোন করে প্রথমেই বলত ‘হরে কৃষ্ণ’।
আরও পড়ুন:
আমাদের একসঙ্গে একটি বাংলা ছবিতে কাজ করার কথাও হয়েছিল। আমার উত্তর কলকাতার বাড়িতে আমি, প্রীতম ও চন্দ্রিল গানগুলো বেঁধেছিলাম। তার মধ্যে একটি গান ছিল— ‘আমরা ক’জন কিসের নিমন্ত্রণে চলেছি’। ওই বাংলা ছবিটি শেষ পর্যন্ত হয়নি। তবে এই গানের সুরটি পরে ‘ধুম’ ছবিতে ‘দিলবরা’ নামে একটি গানে ব্যবহার করেছিল প্রীতম। সেই গান খুবই জনপ্রিয় হয়।
জাতীয় পুরস্কার পেয়ে প্রথম ফোনটা ওর থেকেই পেয়েছিলাম। তাই এমন বন্ধুত্ব নিয়ে গর্বিত হতেই হয়। বন্ধুত্বের মতোই ওর গুণেরও প্রশংসাও করতে হয়। ‘জব উই মেট’, ‘লভ আজ কাল’, ‘বরফি’র গান খুব পছন্দের। সবচেয়ে পছন্দের ‘গ্যাংস্টার’— কেকে ও প্রীতমের যুগলবন্দির তুলনাই হয় না।
ক্রমশ প্রীতমের উত্থান দেখি। গর্ব হয় যে, ও আমার সেই কলেজবেলার বন্ধু। সেই বন্ধুত্ব আজও অমলিন আছে। গত বছরই বম্বে গিয়েছিলাম। আমাদের হোটেলে চলে আসে ও। গোটা একটা রাত আড্ডা, গানবাজনায় কেটেছিল। সেই রাতেই পরিকল্পনা করলাম, আমরা একসঙ্গে একটা অ্যালবাম করব, যার নাম হবে— ‘রি-ইউনিয়ন’। আমাদের দেখা হলে আজও কলেজের জীবনটাই যেন চোখের সামনে উঠে আসে। ছোটবেলার বন্ধুত্ব। স্বার্থের বাইরে এই সম্পর্কটা। তাই বন্ধুত্বটা এক রকমই রয়ে গিয়েছে। জন্মদিনে ওকে অনেক শুভেচ্ছা। তবে ওর কাছে আবদার, জন্মদিনের পার্টিটা কিন্তু দিতে হবে!