Advertisement
E-Paper

বাঙালির সিনেমাযাপনের অনন্য অভিজ্ঞানটি নিশ্চিহ্নপ্রায়! প্রশ্ন উঠছে, একপর্দার হলের সুদিন ফিরিয়ে বাংলা ছবির হাল কি ফেরানো সম্ভব

বাঙালির সিনেমা সংস্কৃতি নিয়ে কথা উঠলেই যে কোনও আলোচনার পরিসরেই অনিবার্য ভাবে এসে পড়ে একপর্দার প্রেক্ষাগৃহ বা সিঙ্গল স্ক্রিন নিয়ে স্মৃতিচারণ। কেউ ফিরে যান সত্তর-আশির দশকে, কেউ বা তারও কিছুটা পরে।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৪ জুন ২০২৬ ০৮:৫৭
একপর্দার হল কি বাংলা ছবিকে বাঁচাবে

একপর্দার হল কি বাংলা ছবিকে বাঁচাবে গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

‘সিনেমা প্যারাদিশো’, একটি স্মৃতিসরণির জন্ম

আলফ্রেডো মারা গিয়েছে। আলফ্রেডো! বান্ধবীর কাছে খবরটা শুনেই এক মেঘ স্মৃতি যেন বিষাদের মতো ঘনিয়ে এল পরিচালকের মনে। সেই দস্যি শৈশবে ফিরে গেলেন তিনি। ছোট্ট শহরের এক সিনেমাহলের মধ্যবয়স্ক প্রোজেকশনিস্ট আলফ্রেডোর হাত ধরেই রুপোলি মায়ার ম্যাজিকে মেতেছিল সে। সুযোগ পেলেই সে সিনেমাহলের সামনে ঘুরঘুর করত, উঁকি দিত প্রোজেকশন রুমে। তখনই পরিচয় আলফ্রেডোর সঙ্গে। সে-ই তাকে সুযোগ করে দেয় সিনেমা দেখার, প্রোজেকশন রুমে একটা স্টুলের উপর দাঁড়িয়ে দেওয়ালের ফুটোয় চোখ রেখে সে যেন স্বর্গরাজ্যে পা রেখেছিল। এ ভাবেই তার সিনেমাপ্রেম শুরু। আলফ্রেডোর শেষযাত্রায় তাই পরিচালক ছুটলেন ছোটবেলার শহরে। গিয়ে শুনলেন, যে সিনেমাহল তাঁকে মায়াবীজগতে ভাসতে শিখিয়েছিল একদিন, সেই ‘সিনেমা প্যারাদিশো’ও আজ নেই! ভেঙে দিয়ে পার্কিং লট হয়ে গিয়েছে। ‘সিনেমা প্যারাদিশো’, তাঁর অসমবয়সী বন্ধু আলফ্রেডো, সেই মায়াপর্দায় ছিটকে পড়া আলোছবি এক ঝটকায় তাঁর স্মৃতির সরণিতে ঢুকে পড়ল।

ছবির নামও ‘সিনেমা প্যারাদিশো’। ১৯৮৮ সালে তৈরি। কান থেকে অস্কার হয়ে বাফটা— সর্বত্রই সম্মানিত হয়েছিল ইতালীয় ছবিটি।

সিনেমাওয়ালা, একটি যাপনের অন্ত-ঘোষণা

আধা-শহরের এক বন্ধ হয়ে যাওয়া সিনেমাহল ঘিরে বাবা ও ছেলের দ্বন্দ্ব, শেষে একপর্দার মৃত্যুর গল্প। হলের মালিক বাবা (পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়) চান কোনও চাপের কাছে নতিস্বীকার না করে সসম্মানে হলটাকে চালাতে। তবু বাজারের নিয়মে হল বন্ধ হয়ে যায়। অন্য দিকে, ছেলে (পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়) চায় নতুন ব্যবসা, যা রাতারাতি পয়সা আনে। ‘মৃত’ হল নিয়ে বাবার আবেগের কোনও মূল্য নেই তার কাছে। এমনকি, বাবার মাছের ব্যবসাতেও তার মন নেই। ভিডিয়ো ছবির ব্যবসার ফাটকা লাভই তার লক্ষ্য। ছবির একটা জায়গায় ছেলে তাঁর বাবাকে বলে, ‘‘আমি তোমাকে হলটাকে বাঁচাবার বুদ্ধি দিয়েছিলাম, তুমি নাওনি।’’ বোঝাই যাচ্ছে, সে হলটাকে বাঁচাতে বাবাকে সম্ভবত ‘কম্প্রোমাইজ়িং’ কোনও প্রস্তাব দিয়েছিল, যা বাবার পছন্দ হয়নি। পরাণ একরকম মরা আগলানোর মতো করে বন্ধ হলের যত্নআত্তি করেন। তাতেই তাঁর তৃপ্তি, অন্তত স্মৃতিটুকু যতদিন আগলে রাখা যায়! একদিন তাঁর এই স্মৃতিযাপনের বিশ্বস্ত সঙ্গী হতাশায় আত্মহত্যা করে হলের প্রোজেকশন রুমে। এর পরে নিজের হাতে প্রিয় সিনেমাহলকে পুড়িয়ে সেই আগুনেই নিজেকে শেষ করেন পরাণ।

ছবির নাম ‘সিনেমাওয়ালা’। ২০১৬ সালে তৈরি এই ছবিটিকে একপর্দা বা সিঙ্গল স্ক্রিন প্রেক্ষাগৃহের স্মৃতিতে কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি তর্পণ বলা যেতে পারে।

একপর্দার প্রেক্ষাগৃহ বা সিঙ্গল স্ক্রিন বিরলতম এক ‘সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞান’-এ পরিণত হয়েছে।

একপর্দার প্রেক্ষাগৃহ বা সিঙ্গল স্ক্রিন বিরলতম এক ‘সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞান’-এ পরিণত হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

একপর্দার প্রেক্ষাগৃহ বা সিঙ্গল স্ক্রিন। আজ বাংলা তথা গোটা দেশেই বিরলতম এক ‘সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞান’-এ পরিণত হয়েছে। কয়েক দশক ধরেই নীরবে ঘটে চলছে একপর্দার অন্তর্জলি যাত্রা। এর পিছনে আর্থ-সামাজিক, বাজার অর্থনীতির অনিবার্য কারণই কি শুধু দায়ী? এটা গবেষণাসাপেক্ষ বিষয়। তবে একপর্দা নিয়ে বাঙালির আবেগ বা নিছক স্মৃতিমেদুরতার নরম আস্তরণটিকে সরিয়ে রেখেও বলা যায়, একলা পর্দার হল বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে, সেই বাড়িটা নয়, বরং সেটা ঘিরে সেই অঞ্চলের মানুষের নির্দিষ্ট একটা যাপন সংস্কতিকে অতি অবহেলায় ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই করে দেওয়া। হয়তো সব স্মৃতিকে আমরা হৃদয়ে জায়গা দিতে পারি না। তাই কোনও কোনও স্মৃতির ঠাঁই হয় আমাদের মাথারই কোনও এক ডিটেনশন সেন্টারে! এটা মানা কঠিন হলেও বাস্তব। পুরনো সিনেমা, পুরনো হলগুলো নিয়ে আজকের বাঙালির কি সত্যিই কোনও আবেগের জায়গা আছে? মাল্টিপ্লেক্স, ওটিটি-র মতো বিলাসী বিনোদনযাপনের এই স্রোতে অনন্ত সন্তরণের মধ্যেও প্রশ্ন জাগে। একপর্দা কি তবে জাদুঘরে শোভা পাবে? একপর্দার হল কি ফিরিয়ে আনা যায় নতুন রূপে? তাতে কি বাংলা ছবি তার দর্শক-দাক্ষিণ্যের গৌরব ফিরে পাবে?

একসময় ছবি দেখতে মানুষের ভিড়।

একসময় ছবি দেখতে মানুষের ভিড়। ছবি: সংগৃহীত

আশির দশকেই কি একপর্দার পতনের শুরু?

উপরের আলোচিত দুটি ছবির একটি, ‘সিনেমা প্যারাদিশো’ ১৯৮৮ সালে নির্মিত। তবে কী কারণে ইতালির ওই ছোট্ট জনপদের হলটি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল তা স্পষ্ট নয়। ধরে নেওয়া যেতেই পারে, আর্থিক নানা কারণে হলটি লাভজনক না হওয়ায় বন্ধ করে দিয়ে সেখানে পার্কিং লট করা হয়েছিল। তবে, মনে রাখতে হবে, ওই আশির দশকের শুরু থেকেই ঘরে ঘরে ভিডিয়ো ছবির উত্থান। এক ঝটকায় সিনেমা হল থেকে ছবির পর্দা মানুষের ঘরে। সেই প্রথম! তবে এ দেশে, এই বাংলায় ঘরে ঘরে অতটা শুরু না হলেও পাড়ায় পাড়ায় তাঁবু খাটিয়ে বা কোনও বাড়ির বড় চাতালে বাণিজ্যিক ভাবে ভিডিয়োয় সিনেমা দেখানো চালু হয়ে গিয়েছে। মনে আছে, তখন ত্রাহি ত্রাহি রব পড়েছিল সিনেমা হলের মালিকদের মধ্যে। প্রশাসনেরও টনক নড়ে। সরকারকে বিনোদন কর দিয়ে শো আর কে দেখায়? মাঝেমধ্যেই পুলিশি হামলা হত নীল ছবি দেখানো বা কর না দিয়ে শো করার অভিযোগে। তবে এর পর ধীরে ধীরে সুস্থপথে মেশিনপত্র কিনে, প্রশাসনকে সুপথে-বিপথে মানিয়ে অনেকেই এই ব্যবসায় ভিড়েছেন। মফসসলের অনেক জায়গাতেই সিনেমা হলের ভিড়কে টেক্কা দিত বিভিন্ন ভিডিয়ো হল। এর প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত ‘সিনেমাওয়ালা’ ছবিতে সিনেমার ভাষায় অত্যন্ত মরমি ভঙ্গিতে দেখিয়ে দিয়েছেন পরিচালক কৌশিক। ছবিটি ২০১৬ সালে তৈরি হলেও এর কাহিনিকাল আন্দাজ করা যেতে পারে আশির দশকেরই কোনও একটা সময়। কার্যত এক থেকে দেড় দশক ধরে ডিভিডি-র এই ব্যবসা রমরমিয়ে চলেছে। সিনেমাহলের সঙ্কট নিয়ে লেখা বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ বলছে, আশির দশকে ভিডিয়ো ছবির রমরমাই একপর্দার অস্তিত্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রথম প্রশ্ন তুলে দিয়েছিল।

তবে ইতিমধ্যেই উদার অর্থনীতির একটা ঢেউ এসে পড়ে দেশে। যার জেরে বিদেশি বৈদ্যুতিন প্রযুক্তি সবার সাধ্যের নাগালে এসে পড়ে। সামাজিক পরিসর থেকে সিনেমা দেখার জায়গাটা এ বার চলে এল একান্ত ব্যক্তিগত পরিসরে, নিজের ঘরে। পার্সোনাল কম্পিউটার, ডিভিডি-সিডি, ব্লু-রে’র কল্যাণে।

প্যারাডাইস সিনেমা হল।

প্যারাডাইস সিনেমা হল। ছবি: সংগৃহীত

হিসাবের খাতা বনাম বাস্তব পরিস্থিতি

একসময় সাতশোরও কিছু বেশি একপর্দার হল ছিল গোটা রাজ্যে। এই মুহূর্তে সেই সংখ্যাটা এসে দাঁড়িয়েছে আড়াইশোরও নীচে। যদিও সর্বভারতীয় সংস্থা ফিল্ম ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়া-র ২০২১ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, যেখানে সারা দেশে ১০, ১৬৭টি একপর্দার হল ছিল, সেখানে পশ্চিমবঙ্গে ছিল ৩৩০টি হল। পাঁচ বছর আগেকার সেই হিসাবের পরে বহু হল বন্ধ হয়েছে। এ রাজ্যে দেখা গিয়েছে, কলকাতায় তবু কোনও হল বন্ধ হলে খবর হয়। কিন্তু মফসসলে জেলা শহরে কোনও হল বন্ধ হলে তার খবর মেলে না বড়সড় সংবাদমাধ্যমে। ফলে বন্ধ হলের সংখ্যা ৩৩০ বা ২৫০ না হয়ে সেটা ১০০-র অনেক নীচেও হতে পারে। একাধিক সংবাদ রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে, আশি থেকে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত একপর্দার হল বন্ধের এত হিড়িক দেখা যায়নি। তবে তার পর থেকেই এই তিন দশকে প্রায় প্রতি মাসে কলকাতা হোক বা জেলা শহর, একের পর এক হলের ঝাঁপ বন্ধ হয়েছে। কেন, সেটাই এ বার দেখা যাক।

বড়পর্দায় যে ছবি দেখতে ভিড় করত দর্শক।

বড়পর্দায় যে ছবি দেখতে ভিড় করত দর্শক। ছবি: সংগৃহীত

বিভিন্ন বেসরকারি রিপোর্ট এবং ছোট শহরের হলমালিকদের বক্তব্য থেকে এর পিছনে অনেকগুলো কারণ উঠে আসছে।

১. সিনেমাহলের প্রাত্যহিক খরচ বেড়েছে বছরের পর বছর।

২. সেই তুলনায় টিকিটের দাম বাড়ানো যায়নি বলে মালিকপক্ষের অভিযোগ।

৩. উন্নত প্রযুক্তির সঙ্গে পাল্লা দিতে না পারা।

৪. বাংলা হিট ছবির অভাব। যেটা নিয়ে মুম্বই বা দক্ষিণে এতটা সমস্যা হয়নি। বাংলায় বিনিয়োগের অভাবে কম ছবি তৈরি হয়। ফলে হিন্দি ছবির সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো হিট ছবি তেমন তৈরি হয় না। এ দিকে আঞ্চলিক ভাবে দর্শকও সীমাবদ্ধ। সেখানে বলিউডে বা দক্ষিণী ছবিতে বিনিয়োগ যেমন বিশাল, তেমনই দর্শকের চিন্তাও কম সেখানে।

৫. বেশি লাভের আশায় রিয়্যাল এস্টেট বা শপিং মলের ব্যবসায় ঝুঁকেছেন বেশির ভাগ হলমালিক।

৬. মাল্টিপ্লেক্স ও ওটিটি প্ল্যাটফর্ম।

এমনই একটা পরিস্থিতিতে কেউ কেউ দাবি করছেন, একপর্দার হলগুলোর হৃতগৌরব ফেরানো গেলে বাংলা ছবির উন্নতি হবে, দুর্দশা কাটবে ইন্ডাস্ট্রির। অভিনেতা শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় বাংলা ছবির এক জন প্রতিষ্ঠিত অভিনেতা। তিনি মনে করেন, একপর্দার প্রেক্ষাগৃহ ফেরানো গেলে বাংলা ছবির হালও ফিরবে। অভিনেতার স্পষ্ট বক্তব্য, “সিঙ্গল স্ক্রিনগুলি ফিরিয়ে আনা খুব জরুরি। শৈশবে একটি ছবিই চলত ম্যাটিনি, ইভনিং ও নাইট শো-য়। আজকাল মাল্টিপ্লেক্সে বাংলা ছবি চলে সকাল ৯টা থেকে। বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ করে ওই ছবি দেখতে মানুষ কেন যাবে? ‘টেলিফিল্ম’ দেখতে দর্শক খরচ করে মাল্টিপ্লেক্সে যাবে না!” তবে কী ভাবে কোন উপায়ে একপর্দার হলগুলোর সুদিন ফিরবে, তার সূত্র দেননি তিনি। অন্য দিকে, প্রবীণ অভিনেতা এবং বহু হিট ছবির নায়ক চিরঞ্জিৎ চক্রবর্তী মনে করেন, বাংলা ছবিকে বাঁচিয়ে রেখেছে মূলত গ্রামবাংলার দর্শকেরাই। তাই মাল্টিপ্লেক্স দিয়ে বাংলা ছবি বাঁচবে না। তিনি বললেন, “বাংলা ছবি নিয়ে দর্শকের উৎসাহ চলে গিয়েছে, এ কথা আমি অন্তত একেবারেই মানতে রাজি নই। যখন নন্দনে, রাধায় খুব কম টাকায় ছবি দেখানো হয়েছে, তখন বেশির ভাগ শো হাউসফুল হয়েছে। তার মানে টাকা একটা বড় বিষয়। টিকিটের দাম ২৫০-৩০০ টাকায় উঠে গেলে দর্শকের সমস্যা হচ্ছে।” আশি-নব্বইয়ের দশকের অভিনেতার ছবি একসময় সিঙ্গল স্ক্রিনে রমরমিয়ে চলেছে। অতীতের কথা মনে করে আক্ষেপের সুরেই তিনি বললেন, “আমার সময়ে ৭৫০টি সিঙ্গল স্ক্রিনের হল ছিল। এখন সেই সংখ্যা হয়তো ৪০-এ এসে পৌঁছেছে।”

এখানেই এ বার প্রশ্ন উঠছে, মাল্টিপ্লেক্সের আবির্ভাবে কি দর্শকসংখ্যা বেড়েছে, বা আরও খোলসা করে বললে মাল্টিপ্লেক্সে কি বাংলা ছবির দর্শক বেড়েছে? হিসাব বলছে, এ রাজ্যে এখন মাল্টিপ্লেক্স মেরেকেটে ৪০ থেকে ৪৫টা। তাও বেশিরভাগই কলকাতায় এবং অল্প কিছু জেলার সদর শহরে। এই সব মাল্টিপ্লেক্স মিলে মোট স্ক্রিনের সংখ্যা ১৩০ থেকে ১৪০। মাল্টিপ্লেক্সের উত্থান মোটামুটি এই শতকের শুরু থেকে। অথচ, এই আড়াই দশকে বন্ধ হয়েছে অন্তত ৪০০ একপর্দার হল। অর্থাৎ মাল্টিপ্লেক্সের পর্দা যোগ করেও সার্বিক ভাবে এই সময়ে এ রাজ্যে কিছু না হলেও ২৬০টি পর্দা কমেছে। স্বাভাবিক অঙ্কেই দর্শকও কমেছে। এমনকি, একপর্দার তুলনায় মাল্টিপ্লেক্সে পর্দাপিছু বেশি শোয়ের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও। বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, এই সব মাল্টিপ্লেক্সের দর্শক শুধু বাঙালি নয়, একটা বড় অংশ অবাঙালি। সেই বাঙালি-অবাঙালি মেশানো দর্শক ভিড় করেন হিন্দি ছবির পর্দার সামনেই। এই পরিস্থিতিতে চিরঞ্জিতের বক্তব্য, বাঙালিদের মধ্যে একটা ‘মল’ বা মাল্টিপ্লেক্স-ভীতি আছে। তাঁর কথায়, “মিনার, বিজলী, ছবিঘরের মতো হল মানুষ বোঝে। মল-ভীতি বাংলা ছবির বিরাট সংখ্যক দর্শককে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। বাংলা ছবির সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন হচ্ছে অনেকের। ছোট ছোট হল তৈরি করতে হবে। ১০০ টাকার ভিতরে টিকিটের দাম রাখতে হবে। তা হলেই আবার মানুষ প্রেক্ষাগৃহে ফিরবেন।”

জ্যোতি সিনেমা হল।

জ্যোতি সিনেমা হল। ছবি: সংগৃহীত

কিন্তু ১০০ টাকার টিকিট হলেই কি একপর্দার হলে বাঙালি দর্শক ফিরবেন? বিতর্কিত বিষয়। কিন্তু খোদ কলকাতায় বাংলা ছবির হয়ে দাবি তুলতে গিয়ে একপর্দার কী অবস্থা হয়েছিল, সেটা অনেকেই জানেন। হিন্দি ছবির দাপটে এ রাজ্যে, বিশেষ করে কলকাতার মাল্টিপ্লেক্সে. এমনকি একপর্দার হলেও দিনের পর দিন বাংলা ছবি কম শো পাচ্ছে। তাতে ক্ষতি হচ্ছে বাংলা ছবির। এমনই অভিযোগকে কেন্দ্র করে হইচই বেধেছিল গত বছর। এর সমাধানে বাংলার প্রযোজক-অভিনেতাদের একাংশের অনুরোধে রাজ্য সরকার হস্তক্ষেপও করেছিল। সরকারের নির্দেশ ছিল, যত বড় বাজেটের হিন্দি ছবিই আসুক না কেন, বাংলা ছবিকে আগে হল দিতে হবে। প্রাইম টাইম শো-ও দিতে হবে। এর ফলে বাংলায় কার্যত কোণঠাসা হয়ে পড়ে বলিউড। এ দিকে, উৎসবের সময় ছাড়া অন্য সময় যখন বাংলা ছবি নেই, তখন হিন্দি ছবি চালাবেন, সেই উপায়ও ছিল না সিঙ্গল স্ক্রিনের হলমালিকদের। কারণ, হিন্দি ছবির পরিবেশকেরাও আর হলমালিকদের পাশে ছিলেন না। বাধ্য হয়ে তাই হল বন্ধ রাখেন শহরের হলমালিকদের একাংশ।

এর সমাধান কী? এ ব্যাপারে বাংলা ছবির পরিবেশক তথা হল মালিক শতদীপ সাহার বক্তব্য, বাণিজ্যের দিক মাথায় রেখেই একপর্দার প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। তাঁর কথায়, “মাল্টিপ্লেক্স হোক বা, সিঙ্গল স্ক্রিন— ছবি দেখানোর জন্য প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। টু-স্ক্রিন হল তৈরি হলেও ক্ষতি নেই। এটাই আমাদের লক্ষ্য।” শহর তথা রাজ্যের বেশ কিছু জায়গায় প্রেক্ষাগৃহের অভাব রয়েছে। অথচ সেখানে দর্শকের অভাব নেই। সেই সব এলাকায় নতুন প্রেক্ষাগৃহ তৈরির প্রয়োজন বলেও মনে করেন শতদীপ। মিত্রা, দর্পণা, ছবিঘর, রূপবাণী, প্যারাডাইস, এলিট, জ্যোতি, রক্সি, রিগ্যাল, ইন্দিরা, পূর্ণ-র মতো বেশ কিছু সিঙ্গল স্ক্রিন আর নেই। সেগুলি নতুন করে খোলার কথাও বলেছেন তিনি। সেইসঙ্গে শতদীপ এ-ও বলেন, “এলাকাভিত্তিক প্রেক্ষাগৃহ তৈরি করতে হবে। যেখানে মাল্টিপ্লেক্স প্রয়োজন, সেখানে সেটাই করতে হবে।”

রূপবাণী সিনেমা হল।

রূপবাণী সিনেমা হল। ছবি: সংগৃহীত

প্রায় একই বক্তব্য অভিনেত্রী শ্রাবন্তী চট্টোপাধ্যায়েরও। ‘মাল্টিপ্লেক্স বনাম সিঙ্গল স্ক্রিন’ নয়। দুই ধরনের প্রেক্ষাগৃহকেই সচল রাখার পক্ষে তিনি। তাঁর বক্তব্য, “দুটোই প্রয়োজন। কিছু সিঙ্গল স্ক্রিনের হাল ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন। গ্রামাঞ্চলে সেই ভাবে এখনও মাল্টিপ্লেক্স নেই। তাই সেখানকার সিঙ্গল স্ক্রিন হলগুলির পরিকাঠামোয় উন্নতি দরকার। মাল্টিপ্লেক্সের কিছু সুবিধা যাতে সেখানেও মেলে। যত বেশি হল বাড়বে, আমাদের ছবিও বেশি সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছোবে।”

অন্য ভাবনা পরিচালকের

কিন্তু শুধুই বাণিজ্য নিয়ে ভাবনার বিরোধিতা করেছেন পরিচালক ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী। তাঁর মতে, বাণিজ্যিকীকরণের জন্যেই বাংলা ছবির এই পরিণতি। তিনি বলেন, “ছবিকে টিভি, ফ্রিজ বা ওয়াশিং মেশিনের মতো করে দেখলে এবং বিক্রি করার চেষ্টা করলে এই পরিণতিই হবে। এর জন্যই আজ মাল্টিপ্লেক্সের রমরমা। কোনও চিত্রনির্মাতা মাল্টিপ্লেক্স চাননি। নিজে থেকেই মাল্টিপ্লেক্স চলে এসেছে। বলা ভাল, মাল্টিপ্লেক্সে ছবি দেখা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে মানুষের উপর।”

সমাধানে সরকার কী ভাবছে

বাংলা ছবির উন্নয়নে কি শুধুই প্রযোজক-পরিবেশক ও হলমালিকদেরই দায়? এ প্রসঙ্গ তুলতেই বিধায়ক তথা অভিনেতা রুদ্রনীল ঘোষ জানান, টলিপাড়ার হাল ফেরাতে এবং সিঙ্গল স্ক্রিনগুলির অবস্থা পুনরুদ্ধার করতে রাজ্য সরকার ভাবতে শুরু করেছে। তাঁর কথায়, “আগের সরকারের আমলে রীতিমতো বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল চলচ্চিত্রজগৎ। সিঙ্গল স্ক্রিন হলগুলি অবশ্যই প্রয়োজন। গ্রামাঞ্চলেও যাতে প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা বৃদ্ধিতে মানুষ উদ্যোগী হন, সেই চেষ্টা চালাতে হবে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও প্রযোজকদের লভ্যাংশ, উভয় দিক মাথায়ে রেখেই টিকিটের দাম ধার্য করা উচিত।” প্রায় একই বক্তব্য বিজেপি নেতা তথা পরিচালক শঙ্কুদেব পণ্ডারও। গ্রামের মানুষকে ছবি দেখানোর সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে বলে মনে করেন তিনি। তাই এক পর্দার প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা বৃদ্ধিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি।

এই মুহূর্তে বাংলা চলচ্চিত্রের হাল কিসে ফিরবে, তা সত্যিই তর্কসাপেক্ষ। কোনও একটি সমাধান সূত্র এখনই সামনে নেই। তবে বলা বাহুল্য, প্রত্যেক মানুষের ক্রয়ক্ষমতার কথা মাথায় রেখে ছবি দেখার সুযোগ বাড়লে, সমাধানের দিকে কয়েক ধাপ অন্তত এগোনো যাবে।

Single Screen Tollywood Multiplex
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy