এই রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের পরে বদলের আবহে সম্প্রতি ডিমের ভূমিকা বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পরাক্রমশালী শাসক দলের পরাজয়ের পর ‘ডিমচর্চা’ প্রায় সর্বত্র। ক্ষমতা হারানো মাঠ কাঁপানো বড় নেতা থেকে সদ্য রাজনীতিতে আসা কচি নেতা— অনেককেই পড়তে হচ্ছে তীব্র জনবিক্ষোভের মুখে। আর সেই ক্ষোভ প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে দুনিয়া জুড়ে স্বীকৃত সুষম খাদ্য ডিম। পচা হোক বা তাজা, ডিম ছুড়ে নেতাদের হেনস্থা করার এই হিড়িক এখন বাংলার রাজনীতির নতুন ট্রেন্ড। এ নিয়ে সমাজমাধ্যমে যেমন মিমের বন্যা বইছে, তেমনই গুরুতর প্রশ্নও উঠছে রাজ্যের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নিয়ে।
ইতিহাসের পাতা ও বিজ্ঞানের রসায়নে চোখ রাখলে দেখা যাবে, এই একটিমাত্র ডিমের সামাজিক বিবর্তন এবং বহুমাত্রিক ভূমিকা রীতিমতো চমকপ্রদ ও বৈপরীত্যে ভরা। প্রতিবাদী ‘এগিং’-এর ইতিহাস বহু পুরনো। রাজনীতিতে আসার অনেক আগে ডিম ছোড়ার চল শুরু হয়েছিল বিনোদন জগৎ এবং অপরাধের শাস্তির ক্ষেত্রে। ষোড়শ শতকের ইংল্যান্ডে মঞ্চে কোনও অভিনেতার অভিনয় দর্শকদের পছন্দ না হলে তাঁর দিকে পচা ডিম ছোড়া হত। অনেক সময় টোম্যাটোও থাকত সেই তালিকায়। খারাপ অভিনয়ের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার এটাই ছিল জনপ্রিয় উপায়।
ইতিহাস বলছে, মধ্যযুগে অপরাধীদের ‘পিলোরি’ বা কাঠের ফ্রেমে হাত-মাথা আটকে জনসমক্ষে দাঁড় করিয়ে রাখা হত। সাধারণ মানুষ তখন তাঁদের অপমান করতে পচা ডিম ছুড়ে মারত। অর্থাৎ ডিম বহু দিন ধরেই সামাজিক লজ্জা ও জনসমক্ষে অপদস্থ করার প্রতীক।
রাজনীতিতেও ডিম ছোড়ার এক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। গত শতাব্দীর গোড়ার দিকে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী বিলি হিউজেসকে লক্ষ্য করে এক যুবক ডিম ছুড়েছিলেন। ডিমটি গিয়ে লাগে প্রধানমন্ত্রীর টুপিতে। স্থানীয় পুলিশকে ওই যুবককে গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়েও সাড়া পাননি প্রধানমন্ত্রী। পরে নিজের নিরাপত্তা জোরদার করতে তিনি যে পদক্ষেপ করেন, তা থেকেই গড়ে ওঠে আজকের অস্ট্রেলিয়ান ফেডারাল পুলিশের পূর্বসূরি কাঠামো। এক অর্থে, একটি ডিমের ঘটনাও প্রশাসনিক ইতিহাসে প্রভাব ফেলেছিল।
বিশ্ব রাজনীতির আরও বহু পরিচিত মুখকে ডিমের মোকাবিলা করতে হয়েছে। রিচার্ড নিক্সন, হেলমুট কোল, রাজা তৃতীয় চার্লস, মার্গারেট থ্যাচার, জন মেজর, আর্নল্ড শোয়ার্ৎজ়েনেগার— তালিকাটি দীর্ঘ। ভারতেও পি চিদম্বরম, লালকৃষ্ণ আডবাণী, নবীন পট্টনায়ক, অরবিন্দ কেজরীওয়ালের মতো নেতারা বিভিন্ন সময়ে ডিম-হামলার মুখে পড়েছেন।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, রাজনৈতিক প্রতিবাদের ক্ষেত্রে ডিম জনপ্রিয় হওয়ার পিছনে তিনটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, এটি সহজলভ্য ও সস্তা। ডিম জোগাড় করতে কোনও জটিল প্রস্তুতির প্রয়োজন হয় না। দ্বিতীয়ত, ডিম ছুড়লে সাধারণত প্রাণঘাতী ক্ষতির আশঙ্কা থাকে না। যা হয়, তা মূলত প্রতীকী অপমান। রক্তপাতের ঝুঁকি কম থাকায় বড় ধরনের ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ থেকেও অনেক সময় রেহাই মেলে। কিন্তু জনসমক্ষে এক জন ক্ষমতাশালী ব্যক্তির ভাবমূর্তি মুহূর্তে আঘাতপ্রাপ্ত হয়। তৃতীয় এবং সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল ভিজুয়াল ইমপ্যাক্ট। ডিম ফেটে যাওয়ার দৃশ্য অত্যন্ত নাটকীয়। এই সমাজমাধ্যম-নির্ভর যুগে সেই ছবি বা ভিডিয়ো মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবাদ যতটা না ঘটনাস্থলে ঘটে, তার চেয়ে অনেক বেশি ঘটে মোবাইলের পর্দায়।
সবচেয়ে বড় বৈপরীত্যটি অবশ্য অন্যত্র। যে ডিমকে অপমানের প্রতীক হিসেবে ছুড়ে দেওয়া হচ্ছে, সেটিই আবার আমাদের অন্যতম পুষ্টিকর খাদ্য। দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় ডিমের মতো পুষ্টিকর, তুলনামূলক সস্তা এবং সহজলভ্য খাবার খুব কমই আছে। উচ্চমানের প্রোটিন ও নানা প্রয়োজনীয় পুষ্টিগুণের জন্য পুষ্টিবিজ্ঞানীরা একে প্রায়শই ‘সুপারফুড’ বলে থাকেন। সেই ডিমই আজ রাজনৈতিক অস্ত্র।
ডিমের এই দ্বিমুখী ভূমিকা এক গভীর সামাজিক সত্যকে সামনে আনে। যে উপাদানটি অপুষ্টির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের হাতিয়ার হতে পারত, সেটিই আজ রাজনীতির মঞ্চে অপমানের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। রাস্তার কংক্রিটে, কিংবা কোনও নেতার শার্ট বা কুর্তায় গিয়ে ভাঙছে ডিম। কিন্তু তাতে কি কোনও সমস্যার সমাধান হচ্ছে?
ডিম ছুড়ে কোনও নেতার দুর্নীতি ঢাকা যায় না। আবার ডিম ছুড়ে কোনও সরকারকেও রাতারাতি ফেলে দেওয়া যায় না। এতে সাময়িক উত্তেজনা তৈরি হতে পারে, ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটতে পারে, কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনের বাস্তব সমস্যাগুলির সমাধান হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
গণতন্ত্রে প্রতিবাদের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার এখনও ব্যালট বাক্স। জনগণের অধিকার রয়েছে নেতাদের কাজের বিচার করার, কিন্তু সেই বিচার শেষ পর্যন্ত হওয়া উচিত উপযুক্ত গণতান্ত্রিক মঞ্চেই। ডিম ছোড়ার এই প্রবণতা নিয়ে তাই আরও ভাবনাচিন্তার প্রয়োজন রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলি যদি এটিকে প্রশ্রয় দেয়, তা হলে আগামী দিনে বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কৃতি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)