E-Paper

বেআইনি, তাই ‘অবৈধ’?

যে শহুরে মধ্যবিত্ত নিজেরাই নজিরবিহীন মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব এবং প্রতিকূল বাজার পরিস্থিতির চাপে জর্জরিত— তাদের কাছে অন্যের সমস্যার প্রতি সহানুভূতি ও সংবেদনশীলতার প্রত্যাশা করাকে এক প্রকার মূঢ়তাই বলা চলে।

অগ্নিদীপ্ত তরফদার

শেষ আপডেট: ১৭ জুন ২০২৬ ০৬:৪১
শাসন: যাদবপুরে হকার উচ্ছেদের প্রতিবাদে পথে নামা প্রতিবাদীদের উপর পুলিশের লাঠিচার্জের বিরুদ্ধে হাবড়ায় সিপিএম কর্মীদের মিছিল।

শাসন: যাদবপুরে হকার উচ্ছেদের প্রতিবাদে পথে নামা প্রতিবাদীদের উপর পুলিশের লাঠিচার্জের বিরুদ্ধে হাবড়ায় সিপিএম কর্মীদের মিছিল। ছবি: সুজিত দুয়ারী।

নবগঠিত পশ্চিমবঙ্গ সরকার যখন শহর জুড়ে হকারদের দোকানপাট ভাঙার নির্দেশ দিচ্ছে এবং তা নিয়ে নাগরিক পরিসরে তুমুল বিতর্ক চলছে, তখন এই বিতর্ক মেটানোর জন্য একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় সূত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। সেই সূত্রের কেন্দ্রে রয়েছে এই সব দোকানের আইনগত বৈধতার প্রশ্ন। হকার বা পথবিক্রেতারা সরকারি জমি— অতএব জনসাধারণের সম্পত্তি— দখল করে বসেছেন, ফলে তাঁরা অবৈধ দখলদার; এই ধারণাটি খুব বেশি বিতর্ক ছাড়াই সাধারণ মানুষের মনে প্রায় অবিসংবাদী সত্য হিসাবে জায়গা করে নিয়েছে। জীবিকা থেকে মানুষকে বঞ্চিত করার জন্য কেবলমাত্র ‘বৈধতা’ আদৌ জরুরি এবং যথেষ্ট শর্ত কি না, সেই প্রশ্নটি কার্যত অনুপস্থিত। তার পরিবর্তে বিতর্কটি ধীরে ধীরে এক সরল ‘বাইনারি’তে পরিণত হয়েছে— এক পক্ষ সমস্ত ‘অবৈধ হকার দোকান’ বুলডোজ়ার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার দাবি তুলছেন; অপর পক্ষ মানবিকতার দোহাই দিয়ে উচ্ছেদ হওয়া মানুষদের পুনর্বাসনের কথা বলছেন, যদিও এই পক্ষও একই নিঃশ্বাসে এই হকারদের ‘অবৈধ’ হিসাবে স্বীকার করে নিচ্ছেন। উচ্ছেদের বিষয়ে অবস্থান ভিন্ন হলেও হকারদের অবৈধতা নিয়ে উভয় পক্ষ একমত।

হকারদের অবস্থার প্রতি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের যে আবেদন এই দ্বিতীয় পক্ষ করে চলেছেন, কৌশল হিসাবে তা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হতে বাধ্য। যে শহুরে মধ্যবিত্ত নিজেরাই নজিরবিহীন মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব এবং প্রতিকূল বাজার পরিস্থিতির চাপে জর্জরিত— তাদের কাছে অন্যের সমস্যার প্রতি সহানুভূতি ও সংবেদনশীলতার প্রত্যাশা করাকে এক প্রকার মূঢ়তাই বলা চলে। মধ্যবিত্ত নিজেকে আইনের শাসনের প্রবল সমর্থক হিসাবে তুলে ধরতে ভালবাসে। তারা নিজেদের সভ্য ও আইন মেনে চলা নাগরিক বলে ভাবতে গর্ববোধ করে। মধ্যবিত্ত জীবনের এ এক অনিবার্য সত্য। আর্থ-সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসে তাদের অবস্থান এত উঁচুতে নয় যে, আইন তার নাগাল পাবে না— সাঙাততন্ত্রের অংশীদার ধনকুবের কর্পোরেট গোষ্ঠী যেমন কেম্যান দ্বীপপুঞ্জে সংস্থা খুলে এ দেশের বিচারব্যবস্থাকে এড়াতে পারে, মধ্যবিত্তের পক্ষে তা সম্ভব নয়। আবার, তাদের অবস্থান এত নীচেও নয় যে, নিয়মভঙ্গের ফলাফলকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করতে পারবে— রাস্তার গুন্ডারা যা পারে, মধ্যবিত্ত তা পারে না। এ দিকে, মধ্যবিত্তের হারানোর মতো যথেষ্ট কিছু আছে। ফলে আইন— যা তাদের ক্ষেত্রে আত্মরক্ষার অস্ত্র বা ঢাল, কোনওটাই হয়ে উঠতে পারেনি— সেটিকেই তারা এক অনিবার্য নিয়ন্ত্রণ হিসাবে মেনে নিয়েছে। আর সেই নিয়ন্ত্রণ তারা নিজেদের উপরের ও নীচের উভয় স্তরের মানুষের উপরই কার্যকর হোক, দেখতে চায়। তবে সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসের উপরের স্তরে থাকা মানুষদের জবাবদিহির মুখে দাঁড় করানোর ক্ষমতা তাদের সীমিত। ফলে তারা অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করে নিজেদের নীচে থাকা মানুষের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগকে সমর্থন করতে।

‘বৈধ’ এবং ‘অবৈধ’-র এই মোহই বুলডোজ়ারের আকর্ষণ ব্যাখ্যা করে। ইদানীং ‘দৃঢ় প্রশাসন’-এর প্রতীক হিসাবে বুলডোজ়ারকে দেখা হচ্ছে। ফলে ‘অবৈধ’দের নির্মূল করার নামে রাষ্ট্র যখন কর্তৃত্ববাদী পদ্ধতি গ্রহণ করে, তখন মধ্যবিত্ত তার নীরব সহযোগীতে পরিণত হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশ’ নিয়ে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক প্রচারও একই প্রবণতার আর একটি উদাহরণ। ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ বা ‘অবৈধ হকার’-কে শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করা এমন এক রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করতে সাহায্য করে, যা জনসাধারণের অসন্তোষকে চালিত করে কোনও চিহ্নিত ‘অপর’-এর বিরুদ্ধে— বৈষম্য, বেকারত্ব এবং দৈনন্দিন জীবনের নানা সঙ্কট থেকে মানুষের দৃষ্টি সরিয়ে যদি সেই দায় প্রান্তিক মানুষের উপর চাপানো যায়, তবে এক ঢিলে দুই পাখি মারা যায়।

জনপ্রিয় ধারণার বিপরীতে, আইন বা বৈধতার প্রশ্ন মোটেই সাদা-কালোয় বিভক্ত নয়। জনপরিসরে সেই বিতর্ক সচেতন ভাবে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ এবং পরস্পর-সম্পর্কিত প্রশ্ন এড়িয়ে যায়। প্রথমত, গণতন্ত্রে সরকার যেমন পরিবর্তনশীল, আইনও তেমন পরিবর্তনযোগ্য। প্রকৃত অর্থে আইন হল প্রাতিষ্ঠানিক নীতির লিখিত রূপ। প্রতিষ্ঠানগুলির গঠন পরিবর্তিত হলে নীতিও বদলাতে পারে। অর্থাৎ, আজ যে আচরণ বৈধ বলে গণ্য হচ্ছে, কাল সেটিই অপরাধ হিসাবে বিবেচিত হতে পারে; আবার আজ যা অপরাধ, তা কাল বৈধতা পেতে পারে। সমকামিতার অপরাধমুক্তি থেকে শুরু করে ইনসাইডার ট্রেডিংকে অপরাধ হিসাবে গণ্য করা পর্যন্ত এমন নানা উদাহরণ রয়েছে। আইনের যে কোনও মনোযোগী ছাত্রই বলবে, এর থেকেও অনেক বড় পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব অপেক্ষাকৃত ছোট আইনি সংশোধনের মাধ্যমে। যেমন, নির্বাচনী বন্ড বা পিএম কেয়ারস তহবিলকে তথ্যের অধিকার আইনের আওতার বাইরে রাখার জন্য যে আইনি পরিবর্তনগুলি করা হয়েছিল।

ঠিক তেমনই, কলকাতার শহরতলির বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এক সময় যাঁদের ‘অবৈধ দখলদার’ বলা হত, তাঁদের অনেকেই পরবর্তী কালে সেই জমির আইনি স্বীকৃতি পেয়েছেন। জমির তথাকথিত ‘প্রকৃত মালিক’-এর হাত থেকে নিয়ন্ত্রণ সরে গিয়ে সেই সব উদ্বাস্তু কলোনি ধীরে ধীরে অভিজাত পাড়ায় পরিণত হয়েছে। এই পরিবর্তন সম্ভব হয়েছিল রাষ্ট্রের সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী হস্তক্ষেপের ফলে। যে দখলদাররা এক সময় অবৈধ ছিলেন, তাঁরা পরবর্তী কালে বিভিন্ন আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে সেই জমির উপর বৈধ অধিকার পেয়েছেন। আরবান ল্যান্ড সিলিং আইন কিংবা এক ধরনের প্রাক্-সমাজতান্ত্রিক পুনর্বণ্টনমূলক রাষ্ট্রনীতির ফলে অন্যের সম্পত্তির উপরে তাঁদের অধিকারের স্বীকৃতি মিলেছিল। দক্ষিণ শহরতলির যোধপুর পার্ক, যাদবপুর থেকে যদু কলোনি, বিজয়গড় থেকে বাঁশদ্রোণী; আবার উত্তর-পূর্ব কলকাতার বিস্তীর্ণ দমদম এলাকা— আইনের চোখে যে জমি তাঁদের নিজেদের নয়, এমন জমি রক্ষার জন্য সংগ্রাম করেছিলেন অতীত প্রজন্মের মানুষ। আজ তাঁদের উত্তরসূরিরা তার সুফল ভোগ করছেন; এবং উচ্ছ্বসিত ভঙ্গিতে বুলডোজ়ারের আগ্রাসনকে সমর্থন করছেন।

যারা নিজেদের ইতিহাস ভুলে যায়, তারা সেই ইতিহাসই পুনরাবৃত্তি করতে বাধ্য হয়। দেশভাগের পরে পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা উদ্বাস্তু পরিবারগুলির সন্তান-সন্ততিরা, যারা আজ শহরের নানা প্রান্তে গড়ে ওঠা কলোনিগুলিতে বেড়ে উঠেছে, তারা যেন বিস্মৃত না হয় যে, এই দেশের নাগরিক হিসাবে তাদের অবস্থান জন্মসূত্রে নয়, বরং সংবিধানপ্রদত্ত স্বীকৃতির ফল। দেশভাগ ছিল মানব ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম বিপর্যয়। কিন্তু সেই বিপর্যয়ের মধ্যেও ভারতীয় নাগরিকত্বের দাবি প্রতিষ্ঠার ভিত্তিতে ছিল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত— তাঁদের নাগরিক হিসাবে এবং সমান মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া। অর্থাৎ, বাদ দেওয়ার পরিবর্তে অন্তর্ভুক্ত করার একটি নৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

বৈধতার যুক্তির দ্বিতীয় সমস্যাটি কিছুটা বেশি বিমূর্ত, কারণ এটি প্রায়শই আইনগত বিষয়কে নৈতিকতার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে। সর্ব ক্ষেত্রে আইনকে নৈতিকতার ভিত্তি হিসাবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়— যা কিছু আইনি হিসাবে স্বীকৃত, তাই যে নৈতিক, এমনটা নাও হতে পারে। ইতিহাসে এই ধরনের ভুলের উদাহরণ অজস্র। তাত্ত্বিক ভাবে আইনকে সামাজিক ঐকমত্যের প্রতিফলন হিসাবে দেখা হয়। কিন্তু বাস্তবে আইন মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণের ন্যূনতম মানদণ্ড হিসাবেও কতটা কার্যকর, তা নিয়েও প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে। যে সমাজে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা এমন আইন পাশ করেন, যেখানে প্রাপ্তবয়স্ক দুই ব্যক্তি অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করতে পারেন না; যেখানে বৈবাহিক ধর্ষণ এখনও অপরাধ হিসাবে স্বীকৃত নয়; অথচ রাজনৈতিক ভিন্নমতের চেয়ে গোরক্ষা-সংক্রান্ত হিংসাকে বেশি সুরক্ষা দেওয়া হয়— সেখানে এই প্রশ্ন উঠবেই। আইন মানা, এবং আইনকে প্রশ্নাতীত বলে মেনে নেওয়া— এই দু’টি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। প্রথমটি আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধা থেকে আসে; দ্বিতীয়টি গণতন্ত্রের মৌলিক নীতিগুলি সম্পর্কে ভুল ধারণা থেকে জন্ম নেয়।

যে দেশের স্বাধীনতা গড়ে উঠেছিল অসহযোগ আন্দোলনের ভিতের উপরে, সেই দেশের ক্ষেত্রে এর চেয়ে বড় পরিহাস আর কী হতে পারে?

আইনবিদ্যা বিভাগ, ও পি জিন্দল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

hawkers Middle Class

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy