E-Paper

ডিজিটাল যুগে সত্যের মূল্য

২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচন প্রায় ১.৩৫ লক্ষ কোটি টাকা ব্যয়ে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল নির্বাচনে পরিণত হয়, যার মধ্যে ২০০০ কোটি টাকার বেশি সরাসরি রাজনৈতিক প্রচারে খরচ হয়েছে।

দীপ্র ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ০২ মে ২০২৬ ০৭:৩৭

ভারতের গণতন্ত্র বহু ঝড়-ঝাপটা পেরিয়ে আজও বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ নির্বাচনী প্রক্রিয়া। ভারতে ৯৬.৮৮ কোটি যোগ্য ভোটার (পশ্চিমবঙ্গে ৭.০৪ কোটি) নিয়ে এই গণতান্ত্রিক পদ্ধতি— আজ এক নতুন, অদৃশ্য, জটিল সঙ্কটের মুখে দাঁড়িয়ে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সমাজমাধ্যম এবং রাজনৈতিক প্রচারের মেলবন্ধন এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যেখানে সত্য আর মিথ্যা আজ মিলেমিশে একাকার। ডিপফেক ভিডিয়ো, ক্লোন করা কণ্ঠস্বর এবং লক্ষ্যভিত্তিক বার্তা শুধু তথ্য বিকৃত করছে না, বরং বাস্তবতাকেই পুনর্গঠন করছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে— ভোটার যা দেখছেন বা শুনছেন, তা আদৌ কতটা সত্য?

২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচন প্রায় ১.৩৫ লক্ষ কোটি টাকা ব্যয়ে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল নির্বাচনে পরিণত হয়, যার মধ্যে ২০০০ কোটি টাকার বেশি সরাসরি রাজনৈতিক প্রচারে খরচ হয়েছে। এই বিপুল অর্থের একটি বড় অংশ ডিজিটাল ও এআই-চালিত প্রচারে ব্যবহৃত হয়েছে, যেখানে বাস্তবসম্মত অথচ সম্পূর্ণ মনগড়া কনটেন্ট তৈরি করা হয়েছে— বিকৃত বক্তৃতা থেকে শুরু করে ভুয়ো সমর্থন পর্যন্ত। একই সঙ্গে ভারতে প্রায় ১০০ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এবং ওয়টস্যাপের মতো প্ল্যাটফর্মের বিপুল ব্যবহার এই কনটেন্টের বিস্তারকে বহু গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, অতীতে নির্বাচনে ওয়টস্যাপে শেয়ার করা রাজনৈতিক ছবির প্রায় ১৩% ছিল ভুল তথ্য। এই দ্রুতগতির তথ্যপ্রবাহে মিথ্যা প্রায়শই যাচাই ব্যবস্থার আগেই লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ডিপফেক কনটেন্টের পরিমাণ এখন বহু গুণ বেড়েছে, যা এই সঙ্কটের তীব্রতাকে স্পষ্ট করে।

বিশ্বের নানা নির্বাচনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর ডিপফেক ও ভুয়ো তথ্যের ব্যবহার সরাসরি ভোটারদের আচরণ ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করেছে। ২০২৩ সালে স্লোভাকিয়ার নির্বাচনের মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে একটি ভুয়ো অডিয়োতে বিরোধী নেতাকে ভোট কারচুপির পরিকল্পনা করতে শোনা যায়। আমেরিকায় ২০২৪ সালের নিউ হ্যাম্পশায়ার প্রাইমারিতে প্রায় ২০,০০০ ভোটারের কাছে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের কণ্ঠে ভুয়ো ফোনকল পাঠিয়ে ভোট না দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। দক্ষিণ আফ্রিকা, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপিনস— দুনিয়া জুড়ে নির্বাচনে অনৈতিক ভাবে ব্যবহৃত হয়েছে এআই।

ভারতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন মুহূর্তের মধ্যে আঞ্চলিক ভাষায় অনুবাদ, স্থানীয় উচ্চারণে ভয়েস ক্লোনিং এবং নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য কাস্টমাইজ়ড আখ্যান তৈরি করতে পারে। ফলে একটি ভুয়ো ভিডিয়ো, যেখানে কোনও জনপ্রিয় নেতা বিতর্কিত মন্তব্য করছেন বলে দেখানো হচ্ছে, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। ইংরেজি কনটেন্ট যেখানে যাচাইয়ের সুযোগ পায়, আঞ্চলিক কনটেন্ট ক্লোজ়ড নেটওয়ার্কে প্রাথমিক ভাবে শনাক্তই হয় না। গবেষণা বলছে, একই ভুয়ো বার্তা সামান্য পরিবর্তন নিয়ে একাধিক ভাষায় ছড়িয়ে পড়ে, ফলে সমান্তরাল তথ্যবাস্তুতন্ত্র তৈরি হয় যা একে অপরকে শক্তিশালী করে। বার্তাটি যত স্থানীয়, তা তত বেশি বিশ্বাসযোগ্য— এবং তত বেশি বিপজ্জনক।

এই পুরো প্রক্রিয়ায় ওয়টস্যাপ একটি শক্তিশালী প্রচারযন্ত্রে পরিণত হয়েছে। এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশনের কারণে এখানে নজরদারি প্রায় অসম্ভব, অথচ কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন এই প্ল্যাটফর্মে তথ্য আদানপ্রদান করেন। ‘ফরওয়ার্ড’ সংস্কৃতি তথ্যের উৎস যাচাই না করেই দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে সাহায্য করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মাইক্রো-টার্গেটিং— কৃত্রিম মেধা ব্যবহার করে ভোটারদের ধর্ম, জাতি, অর্থনৈতিক অবস্থা ও পছন্দ বিশ্লেষণ করে আলাদা আলাদা বার্তা পাঠানো। ফলে একই রাজনৈতিক দল ভিন্ন গোষ্ঠীর কাছে ভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিতে পারে। এটি আর গণপ্রচার নয়, বরং সূক্ষ্ম, ব্যক্তিনির্ভর প্রভাব বিস্তারের কৌশল।

ডিপফেকের কার্যকারিতা মানুষের মনস্তত্ত্বের সঙ্গেও গভীর ভাবে যুক্ত। মানুষ স্বভাবতই যা দেখে বা শোনে, তা বিশ্বাস করতে চায়— বাস্তবসম্মত ভিডিয়ো ‘প্রত্যক্ষ বাস্তবতা’র অনুভূতি তৈরি করে। কনফার্মেশন বায়াস মানুষকে সেই তথ্যই বিশ্বাস করতে প্ররোচিত করে যা তার পূর্বধারণার সঙ্গে মেলে। আবেগনির্ভর কনটেন্ট— রাগ, ভয়, গর্ব— দ্রুত ছড়ায়। ওয়টস্যাপ গ্রুপে একই বার্তা বার বার আসায় ঐকমত্যের বিভ্রম তৈরি হয়, যেখানে মানুষ মনে করে এটাই সংখ্যাগরিষ্ঠ মত। অতিরিক্ত তথ্যের চাপে মানুষ হিউরিস্টিকসের উপরে নির্ভর করে, ফলে দ্রুত, ভুল তথ্যের প্রতি ঝুঁকে পড়ে।

এই প্রেক্ষাপটে প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ, কঠোর আইন, প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহি এবং ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ— তারা কি এই প্রযুক্তি ব্যবহার থেকে বিরত থাকবে, না কি প্রতিযোগিতার চাপে এক ‘আর্মস রেস’-এ জড়িয়ে পড়বে? শেষে, এই সঙ্কট একটি মৌলিক প্রশ্ন তোলে— ডিজিটাল যুগে সত্যের মূল্য কত? কৃত্রিম মেধা ইতিমধ্যেই নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছে। এখন চ্যালেঞ্জ হল, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, আইন এবং নাগরিকরা কত দ্রুত মানিয়ে নিয়ে সত্যের অখণ্ডতা রক্ষা করতে পারে। তা না হলে, ডিপফেকের এই অনৈতিক ভোটযুদ্ধ গণতন্ত্রের ভিত্তিকেই দুর্বল করে দিতে পারে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Social Media Virtual World Voters

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy