E-Paper

দেশের মর্যাদা রক্ষার চেষ্টা কই

ট্রাম্প বার বার দাবি করেছেন, তিনি চাইলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘রাজনৈতিক জীবন ধ্বংস’ করে দিতে পারেন। এই ধরনের মন্তব্য ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিসরে সরাসরি হস্তক্ষেপের শামিল। সমান ভাবে নিন্দনীয় ট্রাম্পের এই বর্ণবাদী ও গভীর অবমাননাকর বক্তব্য, যেখানে তিনি ভারতকে বলছেন ‘হেলহোল’।

জি. দেবরাজন

শেষ আপডেট: ০১ মে ২০২৬ ০৭:৪৫

ভারত বিষয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কিছু মন্তব্য এবং অবস্থান গ্রহণ— ইতিমধ্যেই কূটনৈতিক শালীনতার সীমা অতিক্রম করেছে। ভারতের সার্বভৌমত্বকে চাপ সৃষ্টি করে খাটো করার এক উদ্বেগজনক ইঙ্গিত মিলছে এ সবের মধ্যে। আরও চিন্তার বিষয়— নরেন্দ্র মোদী সরকারের প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত সীমিত। স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠছে, আন্তর্জাতিক পরিসরে দেশের মর্যাদা রক্ষায় সরকার কি অনিচ্ছুক?

ট্রাম্প বার বার দাবি করেছেন, তিনি চাইলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘রাজনৈতিক জীবন ধ্বংস’ করে দিতে পারেন। এই ধরনের মন্তব্য ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিসরে সরাসরি হস্তক্ষেপের শামিল। সমান ভাবে নিন্দনীয় ট্রাম্পের এই বর্ণবাদী ও গভীর অবমাননাকর বক্তব্য, যেখানে তিনি ভারতকে বলছেন ‘হেলহোল’। এই ভাষা শুধু কুরুচিকর নয়, এর মধ্যে লুকিয়ে আছে পক্ষপাত, অজ্ঞতা এবং ঔদ্ধত্য। ১৪০ কোটিরও বেশি মানুষের দেশকে এমন ভাষায় বর্ণনা করা মানে ভারতের প্রতিটি নাগরিককে অপমান করা। নিছক সৌজন্যমূলক কূটনৈতিক বার্তায় নয়, স্পষ্ট ও কঠোর ভাষাতেই এর জবাব দেওয়া উচিত।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও ভারতীয় রফতানির উপর একতরফা শুল্ক আরোপ ও তা বাড়িয়ে চলার প্রবণতা একই রকম দাদাগিরির পরিচয় দেয়। দায়িত্বশীল রাষ্ট্রগুলি বাণিজ্য-বিবাদ মেটায় আলোচনা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে। কিন্তু এখানে সহযোগিতার বদলে চাপ প্রয়োগই মুখ্য হয়ে উঠেছে। কৌশলগত অংশীদারি এই ভাবে তৈরি হয় না; এ ভাবে নির্ভরশীলতা চাপিয়ে দেওয়া হয়।

এই উদ্বেগজনক ধারায় আরও একটি স্তর যোগ করেছে এইচ-১বি ভিসা-নিয়ন্ত্রণ এবং প্রস্তাবিত বিপুল ফি-বৃদ্ধি। আমেরিকার প্রযুক্তি ও স্বাস্থ্য পরিষেবা-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ভারতীয় পেশাজীবীরা দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। সেখানে হঠাৎই অস্বাভাবিক মাত্রার ব্যয় চাপানোর মধ্যে অর্থনৈতিক বর্জনের কৌশল রয়েছে। অবশ্য শেষে এতে শুধু ভারতীয় কর্মীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না, যে সব শিল্প তাদের দক্ষতার উপর নির্ভরশীল, সেগুলিও আঘাত পাবে।

ভারতের সার্বভৌমত্বের প্রতি অসম্মানের সবচেয়ে প্রকট উদাহরণ সম্ভবত জ্বালানি নীতি নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থান। ভারত যেন রাশিয়ার তেল না কেনে— এমন বক্তব্যের পর আবার ৩০ দিনের জন্য শর্তসাপেক্ষ ‘অনুমতি’ দেওয়া হয়েছে। ঘটনাটি অত্যন্ত অপমানজনক। ভারত কোনও অধস্তন রাষ্ট্র নয়, যার জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ওয়াশিংটনের ছাড়পত্র প্রয়োজন। এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে একমাত্র ভারতের নিজস্ব স্বার্থ বিচার করেই।

ভূরাজনৈতিক দিক থেকেও এর তাৎপর্য গুরুতর। ঐতিহাসিক ভাবে পশ্চিম এশিয়ার সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক— পারস্পরিক সম্মান ও অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে। জোর করে দ্বিমুখী শিবিরে ঠেলে দিলে সেই ভারসাম্য নষ্ট হয়, এবং ভূরাজনৈতিক পরিবেশও অস্থির হয়ে পড়ে।

আরও উদ্বেগজনক ট্রাম্পের সেই দাবি যে, তাঁর চাপেই ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান থামিয়েছে এবং যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। এতে এক বিপজ্জনক ধারণা তৈরি হয় যে ভারতের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত বাইরের প্রভাবের অধীন। ভারতের স্পষ্ট জানানো উচিত— তার সামরিক ও নিরাপত্তা নীতি নির্ধারিত হয় কেবল জাতীয় স্বার্থের নিজস্ব মূল্যায়নে।

আরএসএস নেতা এবং বিদেশ বিষয়ে মোদী সরকারের উপদেষ্টা রাম মাধবের মন্তব্য— যেখানে শুল্ক বা তেল আমদানি নিয়ে ভারত চাপের কাছে নতি স্বীকার করছে বলে ইঙ্গিত মিললে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়। কূটনীতি অবশ্যই আলোচনা ও সমঝোতার বিষয়। কিন্তু তা কখনও আত্মসমর্পণে নেমে যেতে পারে না।

ভারতের ইতিহাস কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির সম্পূর্ণ বিপরীত কথা বলে। প্রায় দু’শো বছরের ঔপনিবেশিক শোষণ সহ্য করার পর অসীম ত্যাগের বিনিময়ে এই দেশ স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করেছে। আজ যদি দেখা যায় বাইরের শক্তি প্রকাশ্যে শর্ত চাপাচ্ছে, পরোক্ষ হুমকি দিচ্ছে, তা হলে তো তা সেই কঠিন সংগ্রামে অর্জিত স্বাধীনতার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।

ভারত সরকারের উচিত স্পষ্ট ও দৃঢ় অবস্থান নেওয়া। ভারতকে ‘হেলহোল’ বলে অপমান করা হলে তার কড়া প্রতিবাদ হওয়া চাই। দেশের নেতৃত্বকে হুমকি দেওয়া হলে তাকে প্রত্যাখ্যান করা চাই। অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত যে ভারতের নিজস্ব অধিকার, তা স্পষ্ট ভাষায় জানানো জরুরি।

একই সঙ্গে ভারতের নিজের অর্থনৈতিক সক্ষমতাও বাড়াতে হবে— যাতে বাইরের চাপের কাছে দুর্বলতা কমে। প্রকৃত সার্বভৌমত্ব শুধু ঘোষণা করে পাওয়া যায় না; স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাতেই তা প্রমাণিত হয়। ভারত এক গর্বিত সার্বভৌম প্রজাতন্ত্র, যে দেশের ইতিহাস অতিসমৃদ্ধ এবং বিশ্ব-ভবিষ্যৎ নির্মাণে যার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকার কথা। সেই মর্যাদা কিন্তু আপসযোগ্য নয়।

সাধারণ সম্পাদক, অল ইন্ডিয়া ফরওয়ার্ড ব্লক-এর কেন্দ্রীয় কমিটি

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Donald Trump India-US Relationship USA

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy