E-Paper

শাস্তি শুধু যাত্রীদেরই প্রাপ্য?

বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে অকস্মাৎ বদলে গিয়েছে সেই বিমানবন্দরের চেহারাও। কোথাও হাজার হাজার আটকে পড়া যাত্রী নিয়ে কর্মীরা হিমশিম খাচ্ছেন, কোথাও আবার ধু ধু মরুভূমির মতো বিমানবন্দরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বিভ্রান্ত কর্মীরা। আন্তর্জাতিক উড়ান প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

নবকুমার বসু

শেষ আপডেট: ১৯ মার্চ ২০২৬ ০৫:৪৩

পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ শুরু হওয়ায় প্রবল দুর্ভোগের মুখোমুখি হাজার হাজার ভারতীয় বিমানযাত্রী। অজস্র বিমান বাতিল হয়েছে, এবং হচ্ছে— ফলে এই মুহূর্তে দেশে, বিদেশে অথবা মাঝপথে আটকে পড়েছেন যাত্রীরা। কবে তাঁরা ঘরে ফিরতে পারবেন, কী ভাবে, সবই অনিশ্চিত।

দেশ-বিদেশে যাতায়াত এখন আর নেহাত বেড়াতে যাওয়ার সীমাবদ্ধ নয়— এই বিশ্বায়িত দুনিয়ায় সামাজিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, বিবিধ কারণে বিদেশে যাতায়াতের প্রয়োজন পড়ে। স্বাভাবিক ভাবেই এক দিকে যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে বিমানযাত্রীর সংখ্যা, একই ভাবে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বিমান সংস্থার সংখ্যাও। সারা বছর ধরে দেশ-বিদেশের বিমানে যে কী বিপুল সংখ্যায় যাত্রী যাতায়াত করেন, তার আন্দাজ পাওয়া যায় বিমানবন্দরগুলির কর্মব‍্যস্ততায় এবং আধুনিক হয়ে ওঠার প্রচেষ্টায়।

বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে অকস্মাৎ বদলে গিয়েছে সেই বিমানবন্দরের চেহারাও। কোথাও হাজার হাজার আটকে পড়া যাত্রী নিয়ে কর্মীরা হিমশিম খাচ্ছেন, কোথাও আবার ধু ধু মরুভূমির মতো বিমানবন্দরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বিভ্রান্ত কর্মীরা। আন্তর্জাতিক উড়ান প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। বহু যাত্রী নির্দিষ্ট বিমানে উঠতে পারেননি, অথবা ট্রানজ়িটে অর্থাৎ মাঝপথে আটকে পড়েছেন। দিশাহীন বিভ্রান্ত বিপন্ন ক্লান্ত অবস্থা তাঁদের। কোথায় যাবেন, কোথায় থাকবেন, হোটেলে না কি বিমানবন্দরের লাউঞ্জে, বিমান কর্তৃপক্ষ তাঁদের থাকা-খাওয়ার কী ব‍্যবস্থা করবেন, কত দিন আটকে থাকতে হবে এ ভাবেই— কোনও প্রশ্নেরই স্পষ্ট উত্তর নেই। আর সেই ডামাডোল পরিস্থিতির মধ্যেই পৃথিবীর বিভিন্ন দিক থেকে শত শত যাত্রী বহন করে নেমে আসছে আরও অনেক আন্তর্জাতিক উড়ান। তার পর আর উড়তে পারছে না।

একেবারে ভৌগোলিক অবস্থানের জন্যই পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোর বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে পৃথিবীর নানান দেশের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার ক্ষেত্রে। বিশেষ করে এশিয়া মহাদেশের পশ্চিম এবং দক্ষিণ-পশ্চিমের দেশগুলো থেকে ইউরোপ ও আমেরিকায় যাতায়াত, যোগাযোগ রক্ষা করার ক্ষেত্রে পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোর উড়ান সংস্থাগুলি বহু কাল ধরেই যাত্রী পরিষেবা দিয়ে আসছে। সেগুলি জনপ্রিয়ও বটে।

এ দিকে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মাধ্যমেই অধিকাংশ পূর্ব ভারতের রাজ্যের সঙ্গে পশ্চিম দুনিয়ার যোগাযোগ রক্ষিত হয়। এয়ার ইন্ডিয়া ছাড়া সেই অসংখ‍্য যাত্রীর উড়ান আয়োজন সম্ভব হয় মূলত পশ্চিম এশিয়ার কয়েকটি দেশের আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থার জন্য— যার মধ্যে এমিরেটস, কাতার ও এতিহাদ এয়ারওয়েজ় অন‍্যতম। এক সময় বাংলাদেশ বিমান চলাচল করলেও, ক্রমশ তার জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েছে। ইউরোপের বিভিন্ন এয়ারলাইনস যখন সম্ভবত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে কলকাতা থেকে সরাসরি বিমান পরিষেবা গুটিয়ে নিল, এমনকি ইউরোপের সঙ্গে যোগাযোগের জন‍্য এয়ার ইন্ডিয়াও বন্ধ হয়ে গেল, তখন পশ্চিম এশিয়ার এই তিনটি মূল বিমান সংস্থার উপরে নির্ভর করা ছাড়া আমাদের আর উপায় কী!

কিন্তু বর্তমান যুদ্ধের পরিস্থিতিতে প্রত‍্যক্ষ এবং পরোক্ষ দু’রকম ভাবেই রীতিমতো প্রভাবিত হয়েছে এই বিমান সংস্থাগুলি। যাত্রী-নিরাপত্তার জন‍্যই তারা বাধ্য হয়েছে উড়ান বাতিল করতে। বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার ক্ষেত্রে তাদের সংযোগ রাখতেই হয় স্বদেশের রাজধানীর সঙ্গে। সুতরাং দোহা, দুবাই অথবা আবু ধাবি থেকে তাদের বিমান উড়বে, নতুবা সেখানে অবতরণ করবে। আর বিপদও সেখানে। কাছাকাছির মধ্যে ইরানের দিকে তাক করা অথবা সেখান থেকে ছুটে আসা ক্ষেপণাস্ত্র পড়তেই পারে তাদের দেশে। বিশেষ করে ইরান হুমকি দিয়েছে— যেখানে আমেরিকান ঘাঁটি আছে, সেখানে মিসাইল ছুড়তে দ্বিধা করবে না। সুতরাং উড়ান বাতিল করা ছাড়া ওই সব দেশেরই বা উপায় কী? ফলে অসহায় অবস্থায় পড়েছেন হাজার হাজার যাত্রী। তাঁরা ঘরে ফেরার জন্য উদ্‌গ্রীব। চাকরি চিকিৎসা পরীক্ষা বিবাহ, ছেলেমেয়েদের স্কুল— অগুনতি কাজ ও দায়— ফিরতে না পারলে চলবে না।

আর ঠিক সেই সময়েই যাত্রী ঠকানো ব‍্যবসায় নেমে পড়েছে বেশ কিছু বিমান সংস্থা। তারা পশ্চিম এশিয়ার ঝুঁকিপূর্ণ আকাশপথ এড়িয়ে ইউরোপ-আমেরিকায় চলাচল করতে পারে বলে জানাচ্ছে। মরিয়া যাত্রীরা সেই সুযোগ নিতে চাইবেন তো বটেই। কিন্তু সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করছে এই সব সংস্থা। তারা কোথাও দ্বিগুণ, তিন গুণ এমনকি দশ গুণ পর্যন্ত ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে। নিরুপায় কিছু যাত্রী বাধ‍্য হয়েই বাড়তি ভাড়া দিয়ে, এমনকি ধারদেনা করে সে সব উড়ান ধরছেন। আর বাকিরা? অনিশ্চিত প্রতীক্ষায় উৎকণ্ঠায় দিন গুনছেন যুদ্ধ থামার। তাঁদের কাছে বিকল্প আর কিছু নেই। আটকে পড়ে আছেন ঘরবাড়ি ছেড়ে নানান জায়গায়।

সরকার বা প্রশাসন এ সব ব্যাপারে জড়াবে, কিংবা বিপন্ন প্রবাসীদের পাশে থাকবে— আমাদের দেশে এতখানি আশা করতে সাহস হয় না। কিন্তু দুর্নীতিগ্রস্ত যে সব উড়ান সংস্থা এই বিপদের সময় অসহায় যাত্রীদের কাছ থেকে ইচ্ছেমতো টাকা রোজগার করছে, তাদের নিয়ন্ত্রণের কোনও ব্যবস্থাও কি কারও হাতে নেই? শাস্তি শুধু যাত্রীদেরই প্রাপ্য?

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Flight Services Service Disrupted West Asia US-Israel vs Iran

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy