E-Paper

দগ্ধ গুদাম থেকে যদি পালিয়ে গিয়ে থাকেন স্বামী, এখনও আশায় স্ত্রী

বছর চারেক আগে ভালবেসে বিয়ে করেছিলেন পঙ্কজ ও মৌসুমী। গড়িয়ার বালিয়ায় ঘর ভাড়া নিয়ে থাকতেন স্বামী-স্ত্রী। বিয়ের পরেই নাজিরাবাদের ওয়াও মোমোর গুদামে কাজে ঢোকেন পঙ্কজ।

সমীরণ দাস 

শেষ আপডেট: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:৩৫
পঙ্কজ হালদারের স্ত্রী মৌসুমী হালদার।

পঙ্কজ হালদারের স্ত্রী মৌসুমী হালদার। ছবি: শশাঙ্ক মণ্ডল।

“আর হয়তো পাঁচ মিনিট, তার পরেই সব শেষ, মেয়েটাকে দেখে রেখো...।” স্বামী পঙ্কজ হালদারের শেষ কথাগুলি কানে বাজে মৌসুমীর।

যুক্তি বলে, পঙ্কজ আর নেই। সেই রাতেই জ্বলে খাক হয়ে গিয়েছে তাঁর দেহ। তবু মন মানে না মৌসুমীর। যদি কোনও ভাবে শেষ মুহূর্তে অগ্নিকুণ্ড থেকে বেরোতে পেরে থাকেন, যদি জখম অবস্থায় কেউ উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে দিয়ে থাকেন— এ সব ভাবনাই ভিড় করে বছর চব্বিশের তরুণীর মনে। সেই আশায় গত কয়েক দিন আশপাশের সব হাসপাতালে ঘুরেছেন মৌসুমী।

বছর চারেক আগে ভালবেসে বিয়ে করেছিলেন পঙ্কজ ও মৌসুমী। গড়িয়ার বালিয়ায় ঘর ভাড়া নিয়ে থাকতেন স্বামী-স্ত্রী। বিয়ের পরেই নাজিরাবাদের ওয়াও মোমোর গুদামে কাজে ঢোকেন পঙ্কজ। দিব্যি চলছিল সংসার। বছরখানেকের মধ্যেই জন্ম নেয় তাঁদের কন্যাসন্তান। সেই মেয়ের বয়স এখন তিন। মৌসুমী বলেন, “দরজার দিকে হাত তুলে বার বার বাবা কখন আসবে, জিজ্ঞেস করছে মেয়ে। উত্তর দিতে পারিনি।”

মোমোর গুদামে মালপত্র তোলা-নামানোর কাজ করতেন পঙ্কজ। আগে দিনেই ডিউটি ছিল। মাসকয়েক হল রাতের ডিউটি শুরু হয়েছিল। সেই রাতে দশটা নাগাদ খেয়েদেয়ে বাড়ি থেকে বেরোন তিনি। গুদামে পৌঁছে স্ত্রীকে ফোন করে মেয়েকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়তে বলেছিলেন। তার পরে রাত তিনটেয় আসে সেই ফোন।

মৌসুমী বলেন, “তখন ঘুমিয়ে পড়েছি। তিনটে নাগাদ হঠাৎ ফোন করে বলল— কারখানায় আগুন লেগেছে, আমাকে বাঁচাও। আমি সঙ্গে সঙ্গে অ্যাপ-ক্যাবে রওনা দিই। কিছু ক্ষণের মধ্যেই আবার ফোন পাই। বলল, আর পাঁচ মিনিটের মধ্যেই সব শেষ হয়ে যাবে। তার পর থেকেই ফোন বন্ধ। ওখানে গিয়ে দেখি, চার দিকে আগুন। আগুনের মধ্যে ওর বাইকটাও পুড়তে দেখি। কিন্তু ওর কোনও খোঁজ পাইনি। সে দিন বেরোনোর আগে মেয়েটা বার বার বাবাকে যেতে বারণ করছিল। এক বার যদি মেয়েটার কথা শুনত!”

পঙ্কজ-মৌসুমীর প্রতিবেশী সুশোভন মণ্ডল বললেন, “বুঝতে পারছি, পঙ্কজ আর ফিরবে না। তবু আশা নিয়ে মেয়েটা এ দিক-ও দিক ঘুরছে। পুলিশ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ডিএনএ ম্যাচ করে দেহটা পরিবারের হাতে তুলে দিক।”

ওয়াও মোমোর তরফে পাশে থাকার আশ্বাস মিলেছে। সরকারের তরফেও ক্ষতিপূরণ ও সিভিক ভলান্টিয়ারের চাকরির কথা বলা হয়েছে। শনিবারই নরেন্দ্রপুর থানায় এসে সিভিক ভলান্টিয়ারের চাকরির জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেন মৌসুমী। সুশোভন বলেন, “আশ্বাস মিলেছে। বাস্তবে কিছুই পায়নি। অন্তত সিভিকের চাকরিটা যদি তাড়াতাড়ি হয়, ওই টাকায় সংসারটা চলে যাবে।”

মৌসুমী জানান, মেয়ের কথা ভেবে তাঁর চাকরি করা ছাড়া আর উপায় নেই। তিনি বলেন, “অনেক আশা নিয়ে মেয়েকে ভাল স্কুলে ভর্তি করিয়েছিল ওর বাবা। বলেছিল, যে করেই হোক পড়াশোনাটা ভাল ভাবে করাবে। মেয়েটার জন্যই এখন আমাকে কিছু একটা করতেই হবে। লড়াইটা একাই লড়তে হবে এ বার।”

গত সোমবার ভোরে নাজিরাবাদের দুই গুদামে বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ডের পরে এখনও পর্যন্ত দফায় দফায় ২৭ জনের দেহাংশ মিলেছে। পুলিশ জানিয়ে দিয়েছে, দুই গুদাম মিলিয়ে সে দিন ২৭ জন শ্রমিকই ছিলেন। শীঘ্রই উদ্ধার হওয়া দেহাংশের ডিএনএ-র সঙ্গে পরিজনদের রক্তের নমুনা মিলিয়ে পরিবারের হাতে দেহাংশ তুলে দেওয়া হবে। শনিবারও দিনভর ক্রেন, গ্যাস কাটার দিয়ে দু’টি গুদামের দগ্ধ জিনিস সাফ করা হয়।

অন্য দিকে, গ্রেফতার হওয়া ডেকরেটর সংস্থার মালিক ও মোমো সংস্থার দুই আধিকারিককে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। কী ভাবে এত বড় ঘটনা ঘটল, কোথায় গাফিলতি ছিল— দেখা হচ্ছে। দমকল ও বিদ্যুৎ দফতরের তদন্ত রিপোর্টের অপেক্ষায় রয়েছেন তদন্তকারীরা। দুই দফতরকেই আলাদা চিঠি দিয়েছে নরেন্দ্রপুর থানা। অগ্নিকাণ্ড থেকে বেঁচে ফিরেছেন কয়েক জন শ্রমিক। আগুন লাগার সম্ভাব্য কারণ জানতে তাঁদের সঙ্গেও কথা বলবে পুলিশ। তবে বারুইপুর পুলিশ জেলার এক কর্তা জানিয়েছেন, বেঁচে ফেরা শ্রমিকেরা অনেকেই জখম। এখনও আতঙ্ক কাটাতে পারেননি। কয়েক দিন পরে তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Sonarpur

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy