E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: অবিবেচক সিদ্ধান্ত

যে কোনও দেশেই সামাজিক, রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বিদ্বেষের কারণে সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন নিন্দনীয়।

শেষ আপডেট: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:৫২

দোদুল্যমান ভূ-রাজনীতির পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের অবস্থান ক্রমশ অস্বস্তিকর হয়ে উঠছে। আমেরিকার শুল্ক-রক্তচক্ষু ও ভিসা-বিদ্বেষ, চিনের আগ্রাসী মনোভাব, প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্কের ক্রমাবনতি— ভারতের কূটনৈতিক স্থিরতাই আজ টালমাটাল। এই পরিস্থিতিতে আইপিএল-এ বাংলাদেশি ক্রিকেটার মুস্তাফিজ়ুর রহমানকে (ছবি) নিলামে কেনার পরেও বাদ দেওয়া, দু’দেশের ইতিমধ্যে শিথিল হয়ে পড়া সম্পর্ককে তিক্ততর করে ক্রিকেটবিশ্বেও অনভিপ্রেত আলোড়ন সৃষ্টি করল।

বাংলাদেশ আজ ভারত-বিরোধী স্বরে চড়া, যা দু’দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অদূরদর্শিতারই প্রতিফলন। গত এক দশকে সম্পর্কের যে অবনতি ঘটেছে, তার নেপথ্যে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা দু’দেশের সংবাদমাধ্যম ও সমাজমাধ্যমের। শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর এই সম্পর্কের অবনতি বিদ্যুৎগতিতে ত্বরান্বিত হয়েছে। যে কোনও দেশেই সামাজিক, রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বিদ্বেষের কারণে সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন নিন্দনীয়। দু’দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের স্বার্থে আইপিএল থেকে বাংলাদেশি ক্রিকেটার মুস্তাফিজ়ুর রহমানকে নিলামে কিনে বাদ দেওয়ার মতো পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকাই শ্রেয় ছিল। পরবর্তী ঘটনা-পরম্পরায় গোটা ক্রিকেট বিশ্বেই অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের মুখে তীব্র নিন্দা শোনা যাচ্ছে, যা সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে জনমানসে ভারতের বিরূপ ছবি গড়ে তুলছে। অবিবেচক মন্তব্য করার আগে সাধারণ মানুষেরও দু’দেশের বর্তমান পরিস্থিতি এবং নিজ নিজ সরকারের কূটনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে সচেতন হওয়া উচিত। মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ভারতের জন্য কৌশলগত ভাবে কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

আব্বাসউদ্দিন আহমেদ, মুর্শিদাবাদ

অন্যায্য

কোনও অসৎ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দ্বারা সংঘটিত অপরাধের জন্য সেই একই গোত্র, জাতি, ধর্ম বা দেশের সম্পূর্ণ নিরপরাধ সদস্যকে ‘খলনায়ক’ বানিয়ে একঘরে করা যায় না। সুতরাং সম্পূর্ণ নির্দোষ মুস্তাফিজ়ুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়া ন্যায্য হতে পারে না। অন্যথায়, একই যুক্তিতে বিশ্বের সমস্ত ইসলাম-অনুগামী দেশে সমস্ত ভারতীয়কে— বিশেষত হিন্দুদের— সব ক্ষেত্র থেকে ব্রাত্য করে দেওয়াও তা হলে যুক্তিসঙ্গত বলে মানতে হবে, কারণ ধর্মের নামে এ দেশেও অগণিত সম্পূর্ণ নিরপরাধ মানুষকে নৃশংস ভাবে হত্যা করা হয়েছে।

একই ভাবে, বিশ্বের খ্রিস্টান-অধ্যুষিত দেশগুলোর কি উচিত সেখানকার প্রতিটি ক্ষেত্রের দরজা ভারতীয়দের সামনে সজোরে বন্ধ করে দেওয়া— কারণ ওড়িশায় এক সময় এক মিশনারিকে সন্তান-সহ আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছিল, এবং সম্প্রতি মণিপুরে দুই খ্রিস্টান নারীর নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে?

বাংলাদেশে নিরপরাধ হিন্দুদের হত্যার তীব্র নিন্দা অবশ্যই করা উচিত। কিন্তু তা হওয়া দরকার অহিংস ও বিবেচনাপ্রসূত ভাবে। কোনও যুক্তি, নীতি, সভ্যতা বা মানবিকতার নিরিখেই ‘সমস্ত বাংলাদেশি মুসলিম’-কে ‘সাম্প্রদায়িক’ বা ‘হিন্দু-বিরোধী’ হিসাবে দাগিয়ে দেওয়া যায় না। বরং ভারতীয় হিন্দুদেরই সর্বাগ্রে আত্মবিশ্লেষণ করা প্রয়োজন— তাঁরা নিজেদের দেশের সহনাগরিকদের সঙ্গে বাঙালি, মুসলিম, খ্রিস্টান বা দলিত হওয়ার তথাকথিত ‘অপরাধ’-এ ঠিক কেমন আচরণ করেছেন এবং করে চলেছেন।

বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়কের নাম লিটন দাস। তা হলে প্রশ্ন ওঠে— বাংলাদেশ কি সত্যিই সম্পূর্ণ ভাবে ‘হিন্দু-বিদ্বেষী সাম্প্রদায়িক’ রাষ্ট্র?

কাজল চট্টোপাধ্যায়, কলকাতা-১১৪

উদ্বেগচিত্র

‘বাড়ছে স্কুলছুট, কমছে স্কুল’ (১৭-১) শীর্ষক তরুণকান্তি নস্করের প্রবন্ধটি দেশের বনিয়াদি শিক্ষার যে সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরেছে, তা গভীর উদ্বেগের। সারা দেশে স্কুলছুট বাড়ার ফলে যেমন স্কুলের সংখ্যা কমছে, তেমনই স্কুলের সংখ্যা কমার ফলেও আবার পড়ুয়ার সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে— এ যেন এক ভয়াবহ চক্র। ‘শিক্ষার অধিকার আইন’-এর এই ক্ষেত্রে কার্যত কোনও প্রবেশাধিকার বা কার্যকর প্রয়োগ চোখে পড়ছে না। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে এই সমস্যা দিন দিন আরও গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে।

গ্রামাঞ্চলের দূরবর্তী স্কুলগুলিতে মেয়েদের পড়াশোনা করার বাস্তব সমস্যাগুলিকে কোনও ভাবেই লঘু করে দেখা যায় না। ‘নারীর ক্ষমতায়ন’, ‘বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও’— এই স্লোগানগুলি ক্রমশ স্লোগানেই সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মেয়েদের মর্যাদা নিয়ে নিরাপদে বেঁচে থাকা যেমন মুশকিল, তেমনই পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াও ক্রমশ দুরূহ হয়ে উঠছে।

রাজ্যে জাতীয় শিক্ষানীতি মোতাবেক ‘ক্লোজ়ার অ্যান্ড মার্জার’ (বন্ধ করে সম্পৃক্তকরণ) নীতির কবলে প্রায় ৮,২০৭টি স্কুল বন্ধ করে দেওয়ার কথা শোনা যাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সারা রাজ্যে শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর চরম অভাব। গ্রামবাংলার শিক্ষাব্যবস্থা কার্যত মুখ থুবড়ে পড়ছে।

এর পর শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর অপ্রতুলতার যুক্তি দেখিয়ে যদি কর্নাটক সরকারের পথ অনুসরণ করে এ রাজ্যেও ‘ম্যাগনেট স্কুল’ চালু করা হয়, তবে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা সহজেই অনুমেয়। ‘ম্যাগনেট স্কুল’ বলতে কয়েকটি স্কুলকে একত্র করে একটি কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ে রূপান্তর করা, যা এই সঙ্কটকে আরও বহু গুণ বাড়িয়ে দেবে। ভাবতে বিস্ময় জাগে, যে রাজ্য এক সময় শিক্ষার মানদণ্ডে দেশের বহু রাজ্যের কাছে শিক্ষণীয় ছিল, তার আজ এই বেহাল দশা!

গৌরীশঙ্কর দাস, খড়্গপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর

সবই কর্মফল

সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষ ক্রমশ নিজেকে প্রকৃতির ঊর্ধ্বে ভাবতে শুরু করেছে। শিল্প স্থাপনের নামে বন কাটা হয়েছে, নগর সম্প্রসারণের জন্য নদী ভরাট হয়েছে, খনিজ আহরণ ও আবাসনের লোভে পাহাড় কেটে ফেলা হয়েছে। এই অবিবেচক কর্মকাণ্ডের ফলেই আজ মানবসভ্যতা এক গভীর পরিবেশ সঙ্কটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। প্রকৃতি এত দিন নীরব থাকলেও আজ তার প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট— এই প্রতিক্রিয়াই প্রতীকী অর্থে পরিচিত হচ্ছে ‘সবুজের প্রতিশোধ’ নামে।

বিশ্ব উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন এক নির্মম বাস্তব। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে মেরু অঞ্চলের বরফ দ্রুত গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে চলেছে। উপকূলবর্তী দেশ ও অঞ্চলগুলি নিয়মিত ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও প্লাবনের শিকার হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ এলাকায় অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘ খরা ও হঠাৎ বন্যা কৃষি ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে তুলছে। খাদ্য উৎপাদন কমছে, বাড়ছে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা।

প্রকৃতির এই রুদ্র রূপ আসলে মানুষেরই কর্মফলের প্রতিফলন। বনধ্বংস এই সঙ্কটের অন্যতম প্রধান কারণ। বন শুধু গাছের সমষ্টি নয়— এটি বৃষ্টির নিয়ন্ত্রক, মাটির রক্ষাকবচ এবং জীববৈচিত্রের আধার। অথচ নির্বিচারে বন উজাড়ের ফলে বহু প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতি আজ বিলুপ্তির পথে। বনভূমি কমে যাওয়ায় কার্বন ডাইঅক্সাইড শোষণের ক্ষমতাও হ্রাস পাচ্ছে, যার ফলে উষ্ণায়ন আরও ত্বরান্বিত হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানুষের জীবনে, জলসঙ্কট তীব্রতর হচ্ছে, কৃষিজমি অনুর্বর হয়ে পড়ছে এবং গ্রামীণ অর্থনীতি ভেঙে পড়ছে।

নদী ও জলাশয়গুলির অবস্থাও আজ গভীর উদ্বেগের বিষয়। এক সময় যে নদী সভ্যতার জন্ম দিয়েছিল, আজ সেই নদীই মানুষের জন্য দুর্যোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে প্রকৃতির সতর্কবার্তা।

পাহাড়ি এলাকায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। নির্বিচারে পাহাড় কাটা ও অপরিকল্পিত নির্মাণের ফলে পাহাড়ের স্বাভাবিক ভারসাম্য সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। বর্ষা এলেই ভূমিধস এসে কেড়ে নিচ্ছে মানুষের প্রাণ ও সম্পদ। একই সঙ্গে পাহাড়ি বন ধ্বংস হওয়ায় জলধারণ ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে সমতলের নানা এলাকাতেও— বন্যা ও খরার প্রবণতা সেখানে বেড়েই চলেছে। প্রকৃতি যেন একের পর এক আঘাত হেনে বুঝিয়ে দিচ্ছে, তার সঙ্গে যুদ্ধ করে জয়ী হওয়া মানুষের পক্ষে একেবারেই অসম্ভব।

অক্ষয় বর্মণ, আসানসোল, পশ্চিম বর্ধমান

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Mustafizur Rahman IPL BCCI

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy