E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: অদৃশ্য লৌহশৃঙ্খল

ক্ষমতার ভিত্তি ছিল সার্বভৌমত্বের ধারণা। সার্বভৌমের অধিকার ছিল প্রজাদের মৃত্যুর উপর, অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ডের ভয়ই ছিল সার্বভৌম ক্ষমতার ভিত্তি। আধুনিক যুগে ক্ষমতার যৌক্তিক ন্যায্যতা প্রমাণ করা জরুরি।

শেষ আপডেট: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:১৫

‘আত্ম-আবিষ্কারের নাট্য’ (৩-১) প্রবন্ধে শতবর্ষ পরেও সমাজবাস্তবতায় রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবীর প্রাসঙ্গিকতা আলোচনা করে অভীক মজুমদার পাঠককে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করেছেন। রক্তকরবী গবাক্ষ থেকে নজর রেখে মানুষকে দমন-পীড়ন করে ‘নিয়মনিষ্ঠ, আইনস্বীকৃত’ করে তোলা ক্ষমতার এক ‘ক্লাসিক’ ধারণার উদাহরণ। সেই সময়ে ক্ষমতার ভিত্তি ছিল সার্বভৌমত্বের ধারণা। সার্বভৌমের অধিকার ছিল প্রজাদের মৃত্যুর উপর, অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ডের ভয়ই ছিল সার্বভৌম ক্ষমতার ভিত্তি। আধুনিক যুগে ক্ষমতার যৌক্তিক ন্যায্যতা প্রমাণ করা জরুরি। ফলে প্রয়োজন এমন এক ক্ষমতার, যা জীবনের সুরক্ষার উপর জোর দেয়, মৃত্যুভয়ের উপর নয়। রাজা আর পর্দার আড়ালে থাকেন না; তিনি এখন মঞ্চে আসীন জনসেবক। তা হলে কি ক্ষমতার অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ বন্ধ হয়ে গিয়েছে? আধুনিক রাষ্ট্র প্রয়োগ করে ক্ষমতার এমন এক প্রযুক্তি, যার নির্ভরতা লোকাচার, অভ্যাস, স্বাস্থ্য, প্রজনন, পরিবার এবং সুখস্বাচ্ছন্দ্যের উপর। জনমোহিনী রাজনীতিতে রাষ্ট্র তার প্রজাদের ক্ষমতার লৌহশৃঙ্খল পরিয়ে দেয় নানান প্রকল্পের মোহিনী মায়ায়, যেগুলি আপাত সমস্যার সমাধান করে মূল সমস্যাগুলিকে সকলের অলক্ষ্যে রেখে দেয়। ফলে ‘আত্ম-আবিষ্কার’এর পরিবর্তে মানুষ আত্মহারা হয়ে ওঠে।

জেরেমি বেন্থাম প্রণীত ‘প্যানঅপটিকন’ আক্ষরিক অর্থেই ছিল একটি কারাগার ভবনের নকশা। এ-হেন ভবনে বন্দিরা সর্বদা অদৃশ্য নজরদারির আওতায় থাকতে থাকতে মানসিক ভাবে অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণের অধীন হয়ে পড়ে। ফুকো ডিসিপ্লিন অ্যান্ড পানিশ গ্রন্থে জৈব-ক্ষমতা প্রয়োগে জৈব-রাজনীতির কথাই বলেন। জৈব-রাজনীতির সাফল্য এই যে, জৈব-ক্ষমতার আপাত ইতিবাচক ভূমিকায় দমন-পীড়ন ছাড়াই পোষমানা প্রজাগোষ্ঠী স্ব-নিয়ন্ত্রক হয়ে ক্ষমতার বশে থাকে। ক্ষমতার যৌক্তিক ন্যায্যতা প্রমাণের কোনও দায়ই শাসকের থাকে না।

২০১১-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় কার্যকলাপে রক্তকরবী-র প্রাসঙ্গিকতা বিষয়ে একাধিক প্রশ্ন থেকেই যায়। ২০১৪-পরবর্তী ভারতীয় রাজনীতিতে মন্দির-মসজিদের প্রাসঙ্গিকতা বৃদ্ধি কি জৈব-ক্ষমতা ব্যবহারের নিদর্শন? ধর্ম যদি হয় লোকাচার, তা হলে ফুকো-র তত্ত্ব অনুসারে লোকাচার জৈব-ক্ষমতা প্রয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার, কারণ এই হাতিয়ার ব্যবহার করলে ক্ষমতার যৌক্তিক ন্যায্যতা প্রমাণের প্রয়োজনই হয় না। ধর্ম ও ধর্মীয় অনুশাসনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়ে দাঁড়ায় অধর্ম। শ্রম আইনের সাম্প্রতিক পরিবর্তনের খসড়ায় কি রক্তকরবীর শ্রমিক-দমনকারী ‘সর্দার’-এর কোনও ভূমিকা আছে? অবশ্য এই প্রশ্নগুলি অবান্তর, কারণ, এই কালের মহাভারতের শাসকদের সঙ্গে রক্তকরবীর রাজার সাদৃশ্য খুঁজে দেখার প্রচেষ্টা ‘স্বর্গারোহণ’ পর্বে সমাহিত।

অনিরুদ্ধ রাহা, কলকাতা-১০

আজও প্রাসঙ্গিক

‘আত্ম-আবিষ্কারের নাট্য’ শীর্ষক অভীক মজুমদার লিখিত প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের কথায়, “কর্ষণজীবী এবং আকর্ষণজীবী এই দুই জাতের সভ্যতার মধ্যে একটা বিষম দ্বন্দ্ব আছে, এ সম্বন্ধে বন্ধুমহলে আমি প্রায়ই আলাপ করে থাকি। কৃষিকাজ থেকে হরণকাজ মানুষকে যখন টেনে নিয়ে যায় তখনই কলিযুগ কৃষিপল্লীকে কেবলই উজাড় করে দিতে থাকে। শোষণজীবী সভ্যতার ক্ষুধাতৃষ্ণা দ্বেষহিংসা বিলাসবিভ্রম সুশিক্ষিত রাক্ষসেরই মতো।” এখন প্রশ্ন, বর্তমান সময়ের শোষণজীবী সভ্যতায় ক্ষমতাধারীর দলও কি সেই বিলাসবিভ্রম সুশিক্ষিত রাক্ষসের মতোই আচরণ করে না?

রবীন্দ্রনাথের বক্তব্যেই কালোত্তীর্ণ হয়ে ওঠা রক্তকরবীর বিষয়বস্তুটি পরিষ্কার। তিনি লিখছেন, “...রক্তকরবীর সমস্ত পালাটি ‘নন্দিনী’ বলে একটি মানবীর ছবি। চারিদিকের পীড়নের ভিতর দিয়ে তার আত্মপ্রকাশ। ...মাটি খুঁড়ে যে পাতালে খনিজ ধন খোঁজা হয় নন্দিনী সেখানকার নয়; মাটির উপরিতলে যেখানে প্রাণের, যেখানে রূপের মৃত্যু, যেখানে প্রেমের লীলা, নন্দিনী সেই সহজ সুখের সেই সহজ সৌন্দর্যের।”

সহজ সুখের, সহজ সৌন্দর্যের নন্দিনীরা প্রাণের মাধুর্যকে ফিরিয়ে আনার প্রয়াসে ক্ষমতার স্বরকে প্রশ্ন করে। রাষ্ট্রের যান্ত্রিকতা সত্যিই আজ মানুষকে একটি সংখ্যায় পর্যবসিত করেছে। ‘ডিজিটাল ভারত’ যন্ত্রের মাধ্যমে দেশের নাগরিকদের নিয়ন্ত্রণে এনে নিয়মের নিগড়ে আবদ্ধ করেছে। দেশের খনিজ সম্পদ ও জঙ্গলের অধিকার রাষ্ট্র তুলে দিয়েছে শিল্পপতিদের হাতে। রাষ্ট্রশক্তির ক্ষমতার স্বর কখনও রবীন্দ্রনাথকে বঙ্কিমচন্দ্রের সঙ্গে যুযুধান প্রতিপক্ষ করে তোলে। ক্ষমতার দম্ভে মত্ত যক্ষপুরীতে আমরাও কি এক-এক জন ফাগুলাল, পালোয়ান, বিশু হয়ে উঠছি না? সর্দার-মোড়ল-মেজো সর্দারদের দল যারা নিত্যদিন শোষণের জালে মানুষকে আবদ্ধ করে রাখে!

সত্যিই, এই পৃথিবী আমাদের চেনা। শতেক বছর পরেও রক্তকরবীর ব্যঞ্জনায় শিল্পবিপ্লবোত্তর যুগে ধনতন্ত্রের বিজ্ঞানভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক প্রবল প্রতিবাদের কথন ধ্বনিত হয়।

সঞ্জয় রায়, দানেশ শেখ লেন, হাওড়া

ফিরে আসুক

বর্ষশেষে সুদীপ্ত ভৌমিকের তোলা ছবি— ‘চর্চা: বেহালায় ব্রতচারী উপশীলন শিবিরে শিক্ষার্থীরা’ (৩১-১২)— দেখামাত্রই স্কুলজীবনের এক অমলিন সুখস্মৃতি মনকে নাড়া দিল। ‘ব্রতচারী’ শব্দটি শুনলেই মনে পড়ে গুরুসদয় দত্তের নাম। যে সকল মনীষী বাংলা ও বাঙালির ঘরোয়া সংস্কৃতিকে পরিপুষ্ট করেছেন, গুরুসদয় দত্ত তাঁদেরই এক জন। ব্রিটিশ-শাসিত অবিভক্ত বাংলায় মহিলা, চাষি, মজুর, ছাত্র ও তরুণ-সহ গ্রামীণ মানুষের দুর্দশা মোচনের লক্ষ্যে বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে তিনি গড়ে তুলেছিলেন স্বপ্নের ‘ব্রতচারী আন্দোলন’।

তাঁর নির্দেশিত ব্রতগানগুলি ছিল ছাত্রছাত্রীদের কণ্ঠহার। পথে-ঘাটে চলতে ফিরতে আনন্দে সেগুলি আওড়ানো হত— “চল্ কোদাল চালাই/ ভুলে মানের বালাই।” সত্তরের দশকের মধ্যভাগে ব্রতচারী বিষয়টি পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের ‘শারীরশিক্ষা’ পাঠক্রমের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় গ্রাম ছাড়িয়ে শহরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলিতেও ব্রতচারীর জোয়ার এসেছিল। সে সময় আমাদের বিদ্যালয়ে শারীরশিক্ষা বিষয়ের প্রশিক্ষণ দিতেন শ্রদ্ধেয় সুফলচন্দ্র চন্দ্র মহাশয়। তিনিই প্রথম আমাদের কিশোর মনে ব্রতচারীর বীজ বপন করেছিলেন। নানা আঙ্গিকে মনোমুগ্ধকর ব্রতগানের তালে তালে ছাত্রছাত্রীদের নাচ দেখতে বিদ্যালয় চত্বরে বড়দেরও ভিড় জমত।

বিদ্যালয়ের বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী ও রকমারি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের অনুষঙ্গ হিসাবেও ব্রতগানের পাশাপাশি প্রাধান্য পেত অসমের কৃষক সম্প্রদায়ের বিখ্যাত ‘বিহু নৃত্য’। মাদলের তালে তালে দেহ-মনে নেমে আসত এক অদ্ভুত মাদকতা। দুঃখের বিষয়, মধ্যশিক্ষা পর্ষদ শারীরশিক্ষা বিষয়ের উপর গুরুত্ব কমাতে কমাতে এক সময় পাঠ্যক্রম থেকে তা একেবারেই প্রত্যাহার করে নেয়। যদিও নতুন সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর কাগজে-কলমে ব্রতচারী শিক্ষায় কিছুটা উৎসাহ দেখিয়েছে, অদ্যাবধি তার কোনও বাস্তব রূপ চোখে পড়েনি। প্রয়োজন ঋষিকল্প এই মানুষটির জীবনাদর্শের উপর ব্যাপক আলোকপাত করে বিষয়টিকে পুনরায় স্কুলপাঠ্যের অন্তর্ভুক্ত করা।

ভানুপ্রসাদ ভৌমিক, ডানকুনি, হুগলি

অপ্রতুল

অনুলিখিত বয়ানে কুমকুম চক্রবর্তীর ‘আমার ভুবন’ (রবিবাসরীয়, ৪-১) শীর্ষক প্রবন্ধটি জীবনসংগ্রামে ব্রতী হতে প্রভূত সহায়তা করবে। তবে কুমকুম চক্রবর্তী তাঁর জীবনে প্রতিষ্ঠালাভের নিমিত্তে পারিপার্শ্বিক মানুষজনের— বিশেষত ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে যে সহায়তা পেয়েছিলেন, তা বিরলতম।

লুই ব্রেলের ঐতিহাসিক উক্তি, অন্ধত্ব এক জন মানুষকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে সাধারণ জীবনযাপন থেকে বঞ্চিত করতে পারে না; ব্রেল পদ্ধতির মাধ্যমে সে তার সহনাগরিকদের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক ও যোগাযোগ বজায় রাখতে পারে— আজও প্রাসঙ্গিক। তবে এখনও ব্রেল পদ্ধতিতে শিক্ষাদানকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অত্যন্ত অপ্রতুল। রামকৃষ্ণ মিশনের তত্ত্বাবধানে এবং কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার উদ্যোগে দৃষ্টি-প্রতিবন্ধীদের জন্য কয়েকটি মাত্র বিদ্যালয় রয়েছে। সরকারি উদ্যোগ ছাড়া এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি প্রায় অসম্ভব।

সুবীর ভদ্র, কলকাতা-১৫১

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Rabindranath Tagore drama

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy