E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: তাঁরই তো সম্মানে…

জন স্নেথের শেষ ইচ্ছা ছিল, তাঁর সমাধি থেকে যেন চিরকাল দিঘার সমুদ্র দেখা যায়। নারায়ণবাবু বিষয়টি এবং তিন তলা বাড়ি নির্মাণের অসুবিধার কথা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন। সঙ্গে সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী নির্দেশ দেন, পর্যটন আবাসের বাড়িগুলি যেন তিন তলার বদলে দোতলা করে তৈরি করা হয়।

শেষ আপডেট: ১৯ মার্চ ২০২৬ ০৫:২৬

তৃণা ঘোষাল ভট্টাচার্যের লেখা ‘দিঘা ও তার প্রেমিক সাহেব’ (রবিবাসরীয়, ১৫-২) দিঘার প্রকৃত ইতিহাস মানুষের সামনে তুলে ধরেছেন, যা সম্ভবত অধিকাংশ বাঙালির কাছেই অজানা ছিল। তবে এর সঙ্গে আরও কিছু তথ্য সংযোজন করতে চাই। প্রবন্ধে উল্লিখিত হয়েছে যে স্বাধীনতার পরে মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায় দিঘার উন্নয়নের জন্য উদ্যোগী হন। তিনি এ কাজের প্রধান কান্ডারি হিসাবে দায়িত্ব দেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক এবং শিবপুর বি ই কলেজ থেকে সিভিল এঞ্জিনিয়ারিংয়ে উত্তীর্ণ সরকারি ইঞ্জিনিয়ার নারায়ণ সান্যালকে। একটি লেখায় পড়েছি, দিঘার সৈকতে প্রথম সরকারি পর্যটন আবাসের কমপ্লেক্স নির্মাণের দায়িত্ব পড়েছিল তাঁর উপর। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথমে ওই বাড়িগুলি তিন তলা হবে ধরে প্রোজেক্ট রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছিল।

বর্তমান দিঘার প্রতিষ্ঠাতা জন স্নেথের সমাধি ছিল ঠিক এর পিছনেই। সাইটে গিয়ে নারায়ণবাবু দেখেন, পর্যটন আবাসের বাড়িগুলি যদি তিন তলা হয়, তা হলে জন স্নেথের সমাধি থেকে দিঘার সমুদ্র আর দৃশ্যমান থাকবে না। সৈকতাবাসের বাড়িগুলির উপরতলা সেই দৃশ্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। অথচ জন স্নেথের শেষ ইচ্ছা ছিল, তাঁর সমাধি থেকে যেন চিরকাল দিঘার সমুদ্র দেখা যায়। নারায়ণবাবু বিষয়টি এবং তিন তলা বাড়ি নির্মাণের অসুবিধার কথা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন। সঙ্গে সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী নির্দেশ দেন, পর্যটন আবাসের বাড়িগুলি যেন তিন তলার বদলে দোতলা করে তৈরি করা হয়। সেই নির্দেশ মেনেই শেষ পর্যন্ত বাড়িগুলি দোতলা করেই নির্মিত হয়।

ভাস্কর ঘোষ, কলকাতা-১০৭

স্মৃতিপটে ভাসে

‘দিঘা ও তার প্রেমিক সাহেব’ প্রবন্ধে তৃণা ঘোষাল ভট্টাচার্য স্নেথ সাহেবের কথা অনেকটাই বলেছেন। আমার এবং শ্রদ্ধেয় সুরথ মাইতির স্মৃতিপট থেকে আরও কিছু তথ্য সংযোজন করছি। ১৯৭৪-৭৫ সাল পর্যন্ত জন্মভূমি দিঘা-সন্নিহিত খাদালগোবরা থেকে স্কুলশিক্ষা শেষ করে পাকাপাকি কলকাতায় আসার আগে পর্যন্ত স্নেথ সাহেবের বাংলোই ছিল আমাদের আড্ডার জায়গা। পাশে অধুনা সরকারি টুরিস্ট লজ, তার এ পাশে উঁচু টিলার উপর অঘোরকামিনী স্বাস্থ্যকেন্দ্র, লাগোয়া মাঠটির নাম হল নেহরু ময়দান। প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু সৈকত শহরের ওই জায়গাতেই কন্যা ইন্দিরা গান্ধীকে নিয়ে হেলিকপ্টার থেকে নেমেছিলেন। সেই থেকেই মাঠটির নাম হয়ে যায় নেহরু ময়দান (অধুনা নেহরু মার্কেট)।

ইংল্যান্ডের মিডলসবরোর অধিবাসী জন ফ্রাঙ্ক স্নেথ (জন্ম ১৮৮২) ব্রিটিশ শাসনকালে অধুনা ডালহৌসি এলাকায় ‘হ্যামিলটন জুয়েলারি’ খোলেন। সেই সূত্রে তখনকার দিনের বহু সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর আলাপ হয়। মেদিনীপুর জেলার কাঁথি শহর হয়ে বালিসাই অঞ্চলের বারো ভুঁইয়াদের সঙ্গেও তাঁর পরিচয় গড়ে ওঠে। গরমের সময় নিজের দেশ ইংল্যান্ডের ব্রাইটনে গিয়ে ‘সামার’ কাটানোর ইচ্ছা প্রকাশ করলে বারো ভুঁইয়াদের এক জন তাঁকে মেদিনীপুর জেলার দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের কূলে বিস্তীর্ণ বালুকাবেলা, ঝাউবীথি, কেয়াঝাড় ও জঙ্গলঘেরা বীরকুল পরগনার শান্ত, নিরিবিলি পরিবেশের খোঁজ দেন। সে সময় এলাকায় যাতায়াতের পথ ছিল হাওড়া থেকে ট্রেনে বেলদা, সেখান থেকে ঘোড়ার গাড়িতে কাঁথি ডাকবাংলো হয়ে পিছাবনি। সেখান থেকে বারো ভুঁইয়াদের হাতির পিঠে চড়ে স্নেথ সাহেব পৌঁছে যান সেই মনোরম স্থানে।

বীরকুল পরগনার বীরকুল গ্রাম আজ সমুদ্রগর্ভে বিলীন; বঙ্গোপসাগর অনেকটাই এগিয়ে এসেছে। পূর্বতন বীরকুল গ্রামে ওয়ারেন হেস্টিংসের একটি বাড়ি ছিল, যার আর অস্তিত্ব নেই। জলোচ্ছ্বাস ও ঝড়ঝাপটা সামলে অষ্টাদশ শতকের ইতিহাসবাহী এই পর্যটনকেন্দ্রটি ক্রমাগত পাড়ভাঙা বঙ্গোপসাগরের গ্রাসে পড়ে, পরে দিঘা গ্রামে নতুন করে স্থায়িত্ব পায়। ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে সাড়ে এগারো একর জমি লিজ় নিয়ে চার দিকে ঢাল রেখে মাঝের টিলার উপর তিনি নিজের একটি সুন্দর বাসস্থান তৈরি করেন, যা ছিল ব্রিটিশ স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন। বর্তমানে গ্রামটির নাম গোবিন্দবসন। ১৯৩৯-এ বাড়িটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়, নাম হয় ‘রান্সউইক হাউস’। কলকাতার হ্যামিলটন জুয়েলারি কোম্পানির শোরুমের প্রবেশপথের দু’টি সাদা মার্বেলের হাতি— যা ছিল কোম্পানির প্রতীক— সেগুলি তুলে এনে দিঘার বাংলোর সামনের বারান্দায় ওঠার সিঁড়িতে বসানো হয়। সেগুলি এখনও রয়েছে।

স্নেথ সাহেব দুই আসনবিশিষ্ট উড়োজাহাজ নিজেই চালিয়ে দিঘায় আসতেন, উড়োজাহাজ নামত শক্ত সৈকতের উপর। তাঁর সখ্য গড়ে উঠেছিল নাড়াজোলের রাজার সঙ্গে। আবার স্নেথের মৃত্যুর পর স্নেথের ভাইপো ও যোগ্য উত্তরসূরি ফ্ল্যানিগানও উড়োজাহাজে চড়ে দিঘায় আসতেন। ১৯৬০-এর দশকের শেষ থেকে সত্তরের দশকের শুরুর দিকে তাঁকে প্রায়ই দেখা যেত হুডখোলা লাল জিপগাড়িতে, পাশে গোল্ডেন ল্যাব্রাডর কুকুরটিকে বসিয়ে, সকালে সমুদ্রতীর ধরে আমাদের সামনে দিয়ে দিঘা থেকে ওড়িশার দিকে বা অধুনা নিউ দিঘা পর্যন্ত ড্রাইভ করতেন— বিশেষ করে শনি ও রবিবার।

বাংলোয় যখন কানাঘুষো শোনা যাচ্ছিল যে শ্রমিক ধর্মঘটের জেরে ‘হ্যামিলটন জুয়েলারি’ বন্ধ হওয়ার মুখে, এবং ফ্ল্যানিগান সাহেব দেশে ফিরে যাবেন, তখন তাঁর সঙ্গী কুকুরটি যেন সেই বিচ্ছেদের আভাস পেয়েছিল। চোখ দিয়ে তার অনবরত জল পড়ত। মনিবের বিরহে ডেনি প্রায় অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ১৯৭৪-এর ২৯ ডিসেম্বর নিউ ইয়র্কের ওয়াটারটাউনে ফ্ল্যানিগান মারা যান। পর দিন বিকেলে বাংলোয় স্নেথের শেষ জীবনের এবং ফ্ল্যানিগানেরও সহচর সুরথ মাইতি বলছিলেন, “সাহেবের তো টিকিট পাঠানোর কথা ছিল, আমায় দেখতে চেয়েছেন। এখনও এল না টিকিট। সাহেবেরও নিশ্চয় মন খারাপ ও দেশে গিয়ে।” সুরথের আর এক সহকর্মী রামচন্দ্র দে উঠে গিয়ে একটি টেলিগ্রাম এনে দেন। তাতে সাহেবের প্রয়াণসংবাদ ছিল। প্রেরক ফ্ল্যানিগানের ছোট বোন জেনেট মারিয়ন লিলি। দুঃখের আবহে সেই সান্ধ্য আড্ডা শেষ হল।

স্নেথ সাহেবের একটি মূর্তি অন্তত রান্সউইক হাউসের সামনে, অথবা আধুনিক দিঘার রূপকার বিধানচন্দ্র রায়ের আবক্ষ মূর্তির কাছে স্থাপন করা উচিত।

সৌম্যেন্দ্র নাথ জানা, কলকাতা-১৫৪

প্রথম মুখ্যমন্ত্রী

‘দিঘা ও তার প্রেমিক সাহেব’ প্রবন্ধে লেখা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী ডা. বিধানচন্দ্র রায়। তথ্যটি ঠিক নয়। স্বাধীন ভারতে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ। ডা. বিধানচন্দ্র রায় ছিলেন দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী।

মনোজিৎ দাস, কলকাতা-১১

শব্দদৈত্যের গ্রাস

মধুমিতা দত্তের লেখা ‘বাসে-ট্রেনে শব্দ-সন্ত্রাস’ শীর্ষক প্রবন্ধ (১১-২) প্রসঙ্গে জানাই, দীর্ঘ রেলযাত্রায় প্রতি পদে এই যন্ত্রণা উপলব্ধি করেছি। শিশু সন্তানের হাতে মুঠোফোন তুলে দিয়ে মা-বাবাকে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে যেতে দেখেছি। চার পাশের দ্রুত ধাবমান সবুজ ধানের খেত, জলাশয়, কাশফুল, গবাদি পশুর বিচরণ— কোনও কিছুই আজ ওই শহুরে শিশুদের আকর্ষণ করতে পারে না। শিশুরা যে ‘রিল’ ক্রমাগত দেখে চলেছে, সেই বিষয়গুলিও কি আদৌ শিশুমনের উপযুক্ত?

“আপনি সবচেয়ে আনন্দ পান কিসে?”— জনৈক ইংরেজ প্রশ্নকর্তার জিজ্ঞাসায় এক বাঙালি অবলীলায় উত্তর দিয়েছিলেন, “বাই ডিস্টার্বিং এনি ওয়ান।” শব্দসন্ত্রাসের মাধ্যমে অন্যকে বিরক্ত করার সেই ‘ট্র্যাডিশন’ যেন এখনও সমান তালে চলছে, শীতলা পুজোর লাউডস্পিকার থেকে কালীপুজোর শব্দবাজি, ভাসানের ডিজে থেকে মোবাইলের শব্দরাজি।

সরিৎশেখর দাস, কলকাতা-১২২

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

digha History Tourist Spot

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy