E-Paper
WBState_Assembly_Elections_Lead0_02-05-26

সম্পাদক সমীপেষু: নবজীবনের মুক্তিদূত

বেগম রোকেয়া ছিলেন সুচিন্তক, একই সঙ্গে নবজীবনের মুক্তিদূত। সমাজতাত্ত্বিক আধুনিক এক বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তিনি বলেন, আমাদের ভবিষ্যৎ বংশরক্ষার জন্য দুইটি বিষয় দরকারি হয়ে পড়েছে দেখছি।

শেষ আপডেট: ০৩ মে ২০২৬ ০৫:০৬

ঈশিতা ভাদুড়ীর ‘এক সেরা নারীবাদী বাঙালিনি’ (১৪-৩) শীর্ষক প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। সমাজসেবা ও নারীশিক্ষা বিস্তারে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক। তিনি ছিলেন মুসলিম নারীমুক্তি আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ। আবার বাংলা সাহিত্যে নারীবাদী চিন্তার ইতিহাসেও এক স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। স্ত্রীজাতির মুক্তির দাবিতে প্রায় একক সংগ্রামের সৈনিক রোকেয়ার অবলম্বন ছিল ওই কাগজ আর কালি। তাঁর সাহিত্যচর্চা মূলত সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার; মানবকল্যাণের ভাবনায়ই তিনি বেশি স্বচ্ছন্দ ছিলেন।

বেগম রোকেয়া ছিলেন সুচিন্তক, একই সঙ্গে নবজীবনের মুক্তিদূত। সমাজতাত্ত্বিক আধুনিক এক বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তিনি বলেন, আমাদের ভবিষ্যৎ বংশরক্ষার জন্য দুইটি বিষয় দরকারি হয়ে পড়েছে দেখছি। প্রথম স্ত্রীশিক্ষার বহুল প্রচার, দ্বিতীয় বাল্যবিবাহ রহিত করা। অর্থাৎ মেয়েদের বেশি করে পড়া লেখা শিখতে হবে, যাতে তারা নিজের শরীরের যত্ন করতে শেখে, আর অল্প বয়সের ছেলেমেয়ের বিয়ে বন্ধ হবে।

সে যুগে তাঁর এই চিন্তার গভীরতা ও অনুভূতির সূক্ষ্মতায় বিস্মিত হতে হয়। প্রবল প্রত্যয় ও গভীর মননশীলতার সঙ্গে বেগম রোকেয়া তাঁর বিভিন্ন রচনায় নারী-উন্নয়নের কথা বলেছেন। সাহিত্যের নানা ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, যুক্তিবাদী মনন, প্রকাশভঙ্গির ঋজুতা ও শব্দের শাণিত প্রয়োগে তিনি অনন্যতার স্বাক্ষর রেখেছেন। লেখিকা হিসাবে তিনি নারীমুক্তিকামী রূপে চিহ্নিত হলেও দেশীয় স্বাধীনতা, স্বদেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদ সম্পর্কেও ছিলেন সমান সচেতন। তাঁর লক্ষ্য ছিল বিশ্বমানবতার পথে শামিল হওয়া।

বেগম রোকেয়া মনে করতেন, নারীর সুসমঞ্জস বিকাশ ও নারী-পুরুষের মিলিত সহাবস্থানেই সম্ভব সমাজের প্রকৃত কল্যাণ। আর এখানেই তিনি যুগোত্তীর্ণ আলোকবর্তিকা হিসাবে আজও আমাদের প্রণম্য।

সুদেব মাল, তিসা, হুগলি

সমানুভূতির বীজ

‘লটারি’ (২২-৩) শীর্ষক সম্পাদকীয়টি পড়ে এই পত্রের অবতারণা। আমরা জানি, আজকের শিশু ভবিষ্যতের নাগরিক। আর এই ভবিষ্যতের নাগরিকদের যুদ্ধবিরোধী মনোভাব-সহ নানা বিষয়ে সচেতন করে সুনাগরিক রূপে গড়ে তুলতে বড়দের কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে, এমনই মূল্যবান পরামর্শ উঠে এসেছে সম্পাদকীয়তে।

খুবই দুশ্চিন্তার বিষয়, আজ বহু শিশু দূষিত বারুদের গন্ধের মধ্যে জন্ম নিচ্ছে। জন্মের পর থেকেই তারা দেখছে ক্ষেপণাস্ত্রের লেলিহান শিখা। ফলে যুদ্ধের প্রাণহানি, সম্পত্তিহানি এবং পরিবেশ দূষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি গল্পের মাধ্যমে ছোট ছেলেমেয়েদের সামনে তুলে ধরা অভিভাবকদের এক গুরুদায়িত্ব, এমন পরামর্শ দিয়েছে কলকাতার বেশ কিছু স্কুল। এই পরামর্শ অবশ্যই সাধুবাদযোগ্য। যুদ্ধের নির্মমতা, নিষ্ঠুরতা, ভয়াবহতা ও বীভৎসতার ছোট ছোট গল্প শিশুদের মনে ধীরে ধীরে যুদ্ধের প্রতি ঘৃণা ও অনীহার বোধ জাগিয়ে তুলতে সক্ষম হয়। ইতিমধ্যেই এই প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে এবং তা সর্বত্র শুরু হওয়াই উচিত।

তবে আমাদের মতো বড়দের আরও অনেক দায়িত্ব পালন করতে হবে। ‘ছেলে-মেয়ে সমান সমান’— এই মনোভাব সম্বলিত গল্পও ছোটদের শোনানো অত্যন্ত প্রয়োজন। কারণ আজও আমাদের সমাজের কিছু দেওয়ালে কান পাতলে শোনা যায়, পুত্রসন্তান জন্মালে শঙ্খধ্বনি, আর কন্যাসন্তান জন্মালে ক্রন্দনধ্বনি। অথচ শারীরিক পার্থক্য ছাড়া ছেলে-মেয়ের মধ্যে অন্য কোনও মৌলিক পার্থক্য নেই; ক্ষমতা বা দক্ষতাও লিঙ্গনির্ভর নয়। মানুষ যে ধর্মেরই হোক, যে বর্ণেরই হোক, ধনী বা দরিদ্র— সবার হোক একটাই পরিচয়, তারা মানুষ।

শৈশবের শুরু থেকেই প্রয়োজন মূল্যবোধের পাঠ। এই মূল্যবোধ আমাদের চিন্তা, অনুভূতি ও ইচ্ছা— এই তিনটি মানসিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। ভারতীয় দর্শন মতে, চিন্তার আদর্শ হল সততা, অনুভূতির আদর্শ হল সৌন্দর্য, আর ইচ্ছা, যা কাজের মাধ্যমে রূপায়িত হয়, তার আদর্শ হল শিব বা মঙ্গল। এই তিনটিই হল পরম মূল্যবোধ। সন্তানকে এই মূল্যবোধের পাঠ দিয়ে ভবিষ্যতের সুনাগরিক রূপে গড়ে তুলতে হলে সর্বাগ্রে অভিভাবক হিসাবে আমাদেরও এই মূল্যবোধ আত্মস্থ করতে হবে। ব্যক্তি-স্বার্থের সাধনা অনেক সময় সমষ্টিগত স্বার্থের সাধনার পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। সেই অন্তরায়ের প্রাচীর অতিক্রম করতে প্রয়োজন সমানুভূতির জাগরণ। আমাদের মধ্যে সেই সমানুভূতির জাগরণ ঘটলে তবেই আমরা সন্তানের মধ্যেও সমানুভূতির বীজ বপন করতে পারব।

সত্যকিঙ্কর প্রতিহার, যমুনা, বাঁকুড়া

দেশের অবস্থান

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক কৌশিক বসুর লেখা ‘আশা-আশঙ্কার দোলাচল’ (৫-৪) প্রবন্ধটি গভীর অন্তর্দৃষ্টি এবং প্রাসঙ্গিক বিশ্লেষণে সমৃদ্ধ। পেশাগত সূত্রে তাঁর অভিজ্ঞতা ও বিশ্বমানের দৃষ্টিভঙ্গি প্রবন্ধটিকে এক অনন্য বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করেছে, যা পাঠককে আকৃষ্ট করে।

বর্তমান বিশ্ব-পরিস্থিতি এক গভীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত বহন করছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব তেল, গ্যাস ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যে এবং ডলারের তুলনায় ভারতীয় টাকার মানে প্রতিফলিত হয়েছে। ভারতের বিদেশনীতি এক সময় বিশ্বমঞ্চে স্বাধীনতা ও নেতৃত্বের মর্যাদা বহন করত; বর্তমান পরিস্থিতি সেই অবস্থানকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলি ইঙ্গিত দেয় যে কূটনৈতিক ভারসাম্য ও স্বাতন্ত্র্য যথাযথ ভাবে রক্ষা করা যায়নি। গবেষণা ও উন্নয়ন, উচ্চশিক্ষা ও পরিসংখ্যান ক্ষেত্রেও পুনর্বিবেচনা অত্যন্ত জরুরি।

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও এই আলোচনায় সমান প্রাসঙ্গিক। কলকাতার বহুত্ববাদী ঐতিহ্য— যেখানে বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের সহাবস্থান এক বৃহত্তর সমাজচেতনার জন্ম দিয়েছে, ভারতের গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার মর্যাদাকে বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠিত করেছিল, তার মর্যাদা রক্ষা করা জরুরি। অতীতের এই গৌরবময় ইতিহাসকে অস্বীকার না করে, তার ইতিবাচক দিকগুলি আত্মস্থ করেই ভবিষ্যতের রূপরেখা নির্মাণ করা প্রয়োজন।

অলোক কুমার মুখোপাধ্যায়, সোদপুর, উত্তর ২৪ পরগনা

হাসির দিন

বাংলা সমাজ, সংস্কৃতি, রীতিনীতি ও প্রথা এক দিকে যেমন বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য বজায় রেখে চলেছে, তেমনই ব্রিটিশ আমলে বিদেশি কিছু প্রথাও এই সংস্কৃতির মধ্যে প্রবেশ করেছে। সেই সব প্রথার কিছু আজও আংশিক ভাবে পালিত হয়ে চলেছে। ইংরেজি বর্ষপঞ্জির চতুর্থ মাসের প্রথম দিন, যা ‘এপ্রিল ফুল’ হিসেবে পরিচিত, সেই রীতিও বাংলার শহর ও গ্রামে প্রভাব ফেলেছে। বাস্তবে এই দিনটিতে আমরা মানুষকে ঠকিয়ে মজা পাই।

পূর্বে এই রীতি কিছুটা ভিন্ন ভাবে পালন করা হত। যেমন কোনও বাচ্চা ছেলেকে দিয়ে পরিচিত কাউকে ডাকা হয়েছে বলে ভুল বোঝানো, অথবা কারও পিঠে পোকা বসেছে বলে তাকে বিভ্রান্ত করা— এই ধরনের সরল ঠাট্টায় আনন্দ খোঁজা হত। মোবাইল ও ইন্টারনেট আসার পর ঠকানোর ধরন আজ অনেকটাই বদলে গিয়েছে।

এপ্রিল ফুলের উৎস নিয়ে একাধিক মত রয়েছে। ইতিহাসবিদদের একাংশের মতে, ১৫৬৪ সালে ফ্রান্সে নতুন ক্যালেন্ডার চালুর ঘটনাকে ঘিরেই এই প্রথার সূচনা, এই ব্যাখ্যাই সবচেয়ে বেশি প্রচলিত। ওই সময়ের আগে ফ্রান্সের অনেক অঞ্চলে মার্চের শেষ থেকে এপ্রিলের শুরু পর্যন্ত নববর্ষ পালনের রীতি ছিল। পরে ১ জানুয়ারি বছর শুরুর নিয়ম চালু হলে অনেকে পুরনো অভ্যাস বজায় রাখেন। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, নতুন নিয়ম মানা লোকেরা তাঁদের নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করত, এমনকি পিঠে কাগজের মাছ লাগিয়ে দিত। সেখান থেকেই ‘এপ্রিল ফিশ’ বা এপ্রিল ফুলের ধারণার সূত্রপাত বলে মনে করা হয়।

বাঙালিরা এই ‘এপ্রিল ফুল’ দিনটিকে ভুলে যায়নি। সামান্য তামাশা, মজা ও হাসির মধ্য দিয়েই দিনটি এখনও গুরুত্ব সহকারে পালন করা হয়। পরিশেষে একটাই কথা— এই অত্যাধুনিক যুগে মানুষ যেন হাসতে ভুলে যাচ্ছে। তাই বছরের এই বিশেষ দিনটি একটু মজা করে কাটানো ভাল, যদিও সেই আনন্দ ক্ষণিকের।

নরসিংহ দাস, মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Rokeya Sakhawat Hossain India-Bangladesh Women Empowerment Social Activist Social worker

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy