E-Paper

এ বার পশ্চিমবঙ্গে

রাজীব গান্ধী তিনটির কোনও কাজই করেননি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর জমানায় প্রথম দু’টি কাজ সেরে ফেলেছেন। অযোধ্যায় রামমন্দির তৈরি হয়েছে। কাশ্মীরের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা তুলে দিয়ে সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ রদ হয়েছে। বাকি শুধু অভিন্ন দেওয়ানি বিধি।

প্রেমাংশু চৌধুরী

শেষ আপডেট: ০২ জুলাই ২০২৬ ০৬:৩১

যদি ক্ষমতায় ফেরত আসতে হয়, তা হলে তোমাকে তিনটি কাজ করতে হবে। এক, অযোধ্যায় রামমন্দির তৈরি করাতে হবে। দুই, ৩৭০ অনুচ্ছেদ রদ করতে হবে। তিন, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করতে হবে। এখন থেকেই তার প্রস্তুতি নাও।” শুনলে মনে হবে, নরেন্দ্র মোদীকে সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত এই উপদেশ দিয়েছিলেন!

ভুল। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন রাজীব গান্ধীকে এই উপদেশ দিয়েছিলেন তাঁর প্রধান মন্ত্রণাদাতা, নেহরু-গান্ধী পরিবারেরই সদস্য অরুণ নেহরু। অরুণ নেহরুর মত ছিল, রাজীব যদি শুধু মুসলিমদের মন জয়ের চেষ্টা করেন, তা হলে দেশের হিন্দুদের সমর্থন সরে যাবে। রাজীব যদি অযোধ্যায় রামমন্দির তৈরি, ৩৭০ রদ, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালুর কাজ করেন, তা হলে বিজেপির পালের হাওয়া পুরোপুরি কেড়ে নেওয়া যাবে।

রাজীব গান্ধী তিনটির কোনও কাজই করেননি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর জমানায় প্রথম দু’টি কাজ সেরে ফেলেছেন। অযোধ্যায় রামমন্দির তৈরি হয়েছে। কাশ্মীরের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা তুলে দিয়ে সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ রদ হয়েছে। বাকি শুধু অভিন্ন দেওয়ানি বিধি। উত্তরাখণ্ড, গুজরাত, অসমের মতো বিজেপি শাসিত রাজ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ইউসিসি চালু হয়েছে। বিজেপি শাসিত মধ্যপ্রদেশ, ছত্তীসগঢ়েও ইউসিসি-র কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে। এ বার শুভেন্দু অধিকারীর সরকার পশ্চিমবঙ্গেও তা চালু করার পদক্ষেপ করেছে।

অভিন্ন দেওয়ানি বিধি হল, দেশের সব ধর্ম, জাত, সম্প্রদায়, অঞ্চলের মানুষের জন্য বিয়ে, দত্তক, উত্তরাধিকার, বিবাহবিচ্ছেদ সংক্রান্ত বিষয়ে একটিই (অভিন্ন) আইন। এর সুবিধা হল, গোটা আইনি ব্যবস্থার সরলীকরণ। হিন্দু, মুসলিম, পার্সি, খ্রিস্টান, সকলের জন্য ব্যক্তিগত বা পারিবারিক আইন একই রকম হয়ে গেলে আইনি প্রক্রিয়াটা সহজ হয়ে যাবে। আইনি অপরাধের ক্ষেত্রে যেমন জাত-ধর্ম নির্বিশেষে সকলের জন্য একই আইন। চুক্তি, সম্পত্তির হস্তান্তর, বেচাকেনা, অংশীদারির মতো ক্ষেত্রেও সকলের জন্য একই আইন। বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ, দত্তক, উত্তরাধিকারের মতো ক্ষেত্রে বিভিন্ন রকম আইন থাকার ফলে তার মধ্যে যে ফাঁকফোকর রয়েছে, তা আর থাকবে না। অনেক ধর্মের ব্যক্তিগত আইনে মহিলাদের প্রতি বৈষম্য, দমনমূলক নীতি রয়েছে। উত্তরাধিকার, সম্পত্তির ভাগ বা বিবাহবিচ্ছেদের পরে খোরপোশের মতো ক্ষেত্রে সব ধর্মের মহিলারা সমান সুবিধা পাবেন। অনেক ব্যক্তিগত আইনেই বিভিন্ন সেকেলে, পশ্চাদ্‌গামী ধারা রয়েছে। অভিন্ন দেওয়ানি বিধি তৈরি হলে তারও সংস্কার হবে।

বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবারের অসমাপ্ত কর্মসূচির তালিকায় একদম প্রথমে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি রয়েছে। নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ বার বার ‘এক দেশ, এক আইন’-এর কথা বলেছেন। প্রশ্ন ওঠে, তা হলে জাতীয় স্তর থেকে মোদী সরকার গোটা দেশে ইউসিসি চালু করার চেষ্টা করছে না কেন? কারণ জোট রাজনীতির বাধ্যবাধকতা। জনসঙ্ঘের পথে হেঁটে বিজেপি আশির দশক থেকেই ইউসিসি-র পক্ষে সওয়াল করেছে। ১৯৯৬ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির ইস্তাহারেও বড় করে ইউসিসি-র কথা ছিল। কিন্তু ১৯৯৮ ও ১৯৯৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির ইস্তাহারে তার কোনও উল্লেখ মেলে না। সে সময় এনডিএ-র শরিকদের অনেকেই ইউসিসি-র পক্ষে ছিলেন না। অটলবিহারী বাজপেয়ী, লালকৃষ্ণ আডবাণীরা তাই কৌশলগত ভাবে সে সময় ইউসিসি হিমঘরে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।

নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে বিজেপি ২০১৪-য় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পরে ইউসিসি-র সলতে পাকানো শুরু হয়। কিন্তু প্রথম মোদী সরকারের সময়ই ২০১৮ সালে ২১তম আইন কমিশন তাতে জল ঢেলে দিয়ে বলে, ইউসিসি বাস্তবযোগ্য নয়। এতৎসত্ত্বেও ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনের মাস ছয়েক আগে ২২তম আইন কমিশন বিজ্ঞপ্তি জারি করে ইউসিসি নিয়ে জনগণের মতামত জানতে চেয়েছিল। তবে ওই পর্যন্তই। কোনও রিপোর্ট জমা না করেই সেই আইন কমিশনের মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল। ২০২৪-এর লোকসভা ভোটের পরে কেন্দ্রীয় সরকারে নতুন করে শরিকদের উপরে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে বিজেপি। তেলুগু দেশম, জেডি(ইউ)— দুই প্রধান শরিকেরই মত হল, যথেষ্ট আলোচনা করেই ইউসিসি নিয়ে এগোনো উচিত। ঐকমত্য হলে তবেই ইউসিসি চালু করা উচিত। কোনও ভাবেই চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়।

রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা মেনে নিয়ে মোদী-শাহ এখন কৌশল বদলে বিজেপি শাসিত রাজ্যে একে একে ইউসিসি চালু করার পন্থা নিয়েছেন।

মুশকিল হল, গোটা দেশে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু না করে এক-এক রাজ্যে এক-এক রকম দেওয়ানি বিধি চালু হলে আইনি জটিলতা আরও বাড়তে পারে। ধরা যাক, কারও বিয়ে হল পশ্চিমবঙ্গে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি মেনে। পরবর্তী কালে সেই দম্পতি কাজের সূত্রে গুজরাত চলে গেলেন। সেখানে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদের মামলা হল। তা হলে কোন রাজ্যের দেওয়ানি বিধি মেনে বিবাহবিচ্ছেদ হবে— পশ্চিমবঙ্গ না কি গুজরাত?

অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে এই সমস্যা নতুন নয়। অভিন্ন দেওয়ানি বিধি সংবিধানে স্থান পেয়েছে সংবিধানের ‘ডায়রেক্টিভ প্রিন্সিপলস অব স্টেট পলিসি’ বা ‘রাষ্ট্রের কর্মপদ্ধতির নির্দেশন নীতিসমূহ’-র অধীনে ৪৪তম অনুচ্ছেদে। তাতে শুধু বলা হয়েছে, রাষ্ট্র ভারতের সর্বত্র অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করার চেষ্টা করবে। মুশকিল হল, এ দেশে শুধু যে হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টানদের পারিবারিক আইন, ধর্মীয় রীতিনীতি আলাদা, এমন নয়। হিন্দুদের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যেও বিভিন্ন রকম ব্যক্তিগত আইন, পারিবারিক প্রথা রয়েছে। মুসলিমদের মধ্যেও আলাদা বিধি মানা হয়। যেমন কাশ্মীরে মুসলিমদের পারিবারিক প্রথা মুসলিম শরিয়তি আইনের থেকে অনেকটাই আলাদা। নাগাল্যান্ড, মেঘালয়, মিজ়োরামের জনজাতিভুক্ত মানুষের পারিবারিক রীতিনীতিকে সংবিধানে রক্ষাকবচ দেওয়া হয়েছে। এখানেই ইউসিসি-র সঙ্গে সংবিধানের মৌলিক অধিকার জড়িত। সংবিধানে সব ধর্ম ও সম্প্রদায়কে নিজস্ব ধর্মীয় বিষয় পরিচালনা করার অধিকার দেওয়া হয়েছে। নিজস্ব সংস্কৃতি, প্রথা রক্ষা করারও অধিকার রয়েছে। ফলে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করতে গিয়ে ধর্মাচরণের মৌলিক অধিকারে হস্তক্ষেপ হবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থেকে গিয়েছে।

সংবিধান তৈরির সময় মৌলিক অধিকারের মধ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধিকে রাখা হবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক হয়েছিল। শেষে সর্দার বল্লভভাই পটেলের নেতৃত্বে মৌলিক অধিকার-সংক্রান্ত উপ-কমিটি ভোটাভুটি করে সিদ্ধান্ত নেয়, অভিন্ন দেওয়ানি বিধিকে মৌলিক অধিকারের বাইরে রাখা হবে। ধর্মাচরণের অধিকারের থেকে তখনই ইউসিসি-কে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।

এখন আবার বিজেপিকে সব রাজ্যেই জনজাতিভুক্ত মানুষকে ইউসিসি-র আওতার বাইরে রাখতে হচ্ছে। আদিবাসী ভোটব্যাঙ্ক মাথায় রেখে তাঁদের সামাজিক প্রথায় হস্তক্ষেপ করার ঝুঁকি বিজেপি নিতে নারাজ। যদিও মুসলিমদের ব্যক্তিগত আইনে হস্তক্ষেপ করতে বিজেপি নেতৃত্বের সমস্যা নেই। পশ্চিমবঙ্গ, অসমে ভোটের আগে ইউসিসি-র পক্ষে সওয়াল করে অমিত শাহ বলেছিলেন, অনুপ্রবেশকারীদের চার বার বিয়ে করা তাঁরা বন্ধ করতে চাইছেন। অর্থাৎ ইউসিসি-র পক্ষে বিজেপির রাজনৈতিক ভাষ্য বিজেপি তৈরি রেখেছে।

ঠিক এই কারণেই শুধুমাত্র রাজনৈতিক বিরোধিতার জন্য দেশের বা পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলগুলি যদি ইউসিসি-র বিরোধিতা করে, তা হলে ভুল করবে। কারণ তা হলে বিজেপির পক্ষে সংখ্যালঘু তোষণের অভিযোগ তোলা সহজ হয়ে যাবে। বিজেপি বলবে, তৃণমূল, বাম বা কংগ্রেস আসলে ইউসিসি-র বিরোধিতা করে মুসলিমতোষণ করতে চাইছে। পশ্চিমবঙ্গের বিজেপির পক্ষে হিন্দু ভোট আরও এককাট্টা হবে।

চার দশক আগে অরুণ নেহরু ঠিক এই আশঙ্কাই করেছিলেন। মুসলিম ব্যক্তিগত আইনে তালাক-এর পরে মহিলাদের জন্য খোরপোশের কোনও ব্যবস্থা নেই। তা সত্ত্বেও সুপ্রিম কোর্ট ১৯৮৫ সালে শাহ বানোর মামলায় মুসলিম মহিলাদের খোরপোশের পক্ষে রায় দিয়েছিল। রাজীব গান্ধী মুসলিম সংগঠনগুলির চাপে নতুন আইন এনে সেই রায় খারিজ করে দিয়েছিলেন। অরুণ নেহরুর পরামর্শ ছিল, কট্টরপন্থী মুসলিমদের কাছে মাথা নত করলে হিন্দু ভোটব্যাঙ্ক বিমুখ হবে। তাই তিনি ওই তিন পরামর্শ দিয়েছিলেন রাজীবকে।

কংগ্রেস সেই উপদেশ শোনেনি। বিজেপি তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করছে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Uniform Civil Code UCC West Bengal government Central Government BJP

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy