E-Paper

পিতৃত্ব আর নীরব দূরত্ব

বাঙালির পারিবারিক কাঠামো এবং সম্পর্কের রসায়ন বরাবরই সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের এক অন্যতম প্রধান উপজীব্য। এর মধ্যে বাবা এবং ছেলের সম্পর্কটি রহস্যে ঢাকা। যেখানে স্নেহ আছে, কিন্তু প্রকাশ নেই; সম্মান আছে, কিন্তু সাবলীলতা নেই।

সৌভিক মণ্ডল

শেষ আপডেট: ০১ জুলাই ২০২৬ ০৬:০৮

জুন মাসের তৃতীয় রবিবার ধার্য হয়েছে ‘ফাদার্স ডে’। ইদানীং সমাজমাধ্যম এই দিনটিতে নানা ছবি আর শুভেচ্ছাবার্তায় ভরে উঠলেও, ‘মাদার্স ডে’-র স্বতঃস্ফূর্ত উত্তাপ তেমন পাওয়া যায় না। মায়েদের নিয়ে সন্তানদের আবেগঘন পোস্টের ঢল, বিজ্ঞাপনী দুনিয়ায় প্রবল উন্মাদনার সিকিভাগও দেখা যায় না বাবার দিনটিতে। এটা আমাদের সংস্কৃতিরই প্রতিফলন। পরিবারের অন্দরে বাবার সঙ্গে ছেলের যে চিরাচরিত মানসিক দূরত্ব, সেটাই ছায়া ফেলে উৎসবের আবহে।

বাঙালির পারিবারিক কাঠামো এবং সম্পর্কের রসায়ন বরাবরই সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের এক অন্যতম প্রধান উপজীব্য। এর মধ্যে বাবা এবং ছেলের সম্পর্কটি রহস্যে ঢাকা। যেখানে স্নেহ আছে, কিন্তু প্রকাশ নেই; সম্মান আছে, কিন্তু সাবলীলতা নেই। পরিচালক পৃথা চক্রবর্তীর সাম্প্রতিক চলচ্চিত্র ফেরা-তে (ছবিতে একটি দৃশ্য) বাবা-ছেলের সম্পর্ক কেবল একটি পারিবারিক গল্পের গণ্ডিতে আটকে নেই, হয়ে উঠেছে সমাজের পুরুষালি মনস্তত্ত্বের এক সমাজতাত্ত্বিক দলিল। সঞ্জয় মিশ্র (বাবা, পান্নালাল) এবং ঋত্বিক চক্রবর্তীর (ছেলে, পলাশ) অনবদ্য অভিনয়ে সমৃদ্ধ এই ছবিতে উঠে এসেছে একটি ফেলে-আসা বাড়ি, একটি ছেড়ে যেতে-চাওয়া শহর এবং সেগুলির মাঝখানে আটকে থাকা এক বাবা-ছেলের সম্পর্কের অভিমান ও দূরত্বের গল্প। কথায় প্রকাশ না-পাওয়া ভালবাসা, জেনারেশন গ্যাপ, একাকিত্বের মতো বিষয়গুলো ফুটে উঠেছে।

বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারে ‘বাবা’ নামক প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘ কাল ধরে একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে গড়া। পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোয় এক জন বাবাকে হতে হয় পরিবারের ‘কর্তা’। তাঁর প্রধান দায়িত্ব হল পরিবারের অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা, শৃঙ্খলা বজায় রাখা। সমাজ ছোটবেলা থেকেই পুরুষদের শেখায় যে আবেগ প্রকাশ করা দুর্বলতার লক্ষণ। ফলে বাবা তাঁর সন্তানের প্রতি ভালবাসা সহজে প্রকাশ করতে পারেন না। অন্য দিকে, ছেলেও বাবাকে ভয় করে, শ্রদ্ধা করে, এবং নিরাপদ দূরত্বে রেখে দেয়। মা যেখানে বাবা-ছেলের মাঝে এক যোগাযোগের মাধ্যম বা ‘বাফার’ হিসেবে কাজ করেন। বাবা ও ছেলের কথোপকথন আটকে থাকে পড়াশোনা, কেরিয়ার বা বাজারের ফর্দে। অদৃশ্য দেওয়ালের দু’পাশেই জমতে থাকে না-বলা কথা।

বাবার ভালবাসা লুকিয়ে থাকে রবিবার সকালে বাজারের সেরা মাছটা কিনে আনায়, ছেলের জ্বরের রাতে চুপিসারে মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়ায়, ছেলের স্বপ্নপূরণ করতে গিয়ে নিজের পুরনো চশমার ফ্রেমটা বছরের পর বছর না বদলানোর মধ্যে। শব্দ সেখানে বাহুল্য। ছেলে যখন বড় হচ্ছে, তখন সে এই নীরব ভাষা বুঝতে পারে না। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই ভুল-বোঝাবুঝি দূরত্বের জন্ম দেয়।

উচ্চশিক্ষা বা জীবিকার তাগিদে ছেলেরা যখন অন্য শহরে বা দেশে পাড়ি দেয়, তখন মনের দূরত্বও হয়ে ওঠে অলঙ্ঘনীয়। পরিবারের কর্তা ধীরে ধীরে পরিণত হন একাকী বৃদ্ধে, সংসারে ‘অপ্রাসঙ্গিক’। বাবার ক্ষমতা খর্ব হয়, কিন্তু পুরনো অভ্যাসবশত সেই গাম্ভীর্যের খোলসটি খসে পড়ে না। তৈরি হয় শূন্যতা, একে অপরকে বুঝতে না পারার আক্ষেপ।

ফেরা-র একটি দৃশ্যে বাবা আর ছেলে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। সামনে দিয়ে একটি মৃতদেহবাহী যান চলে যায়। পরিচালক এখানে একটু থামেন, ক্যামেরা নড়ে না, সংলাপ নেই, শুধু ক্ষণিক নীরবতা। মৃত্যু দু’জনকেই মনে করিয়ে দেয় যে সময় ফুরিয়ে আসছে। দৃশ্যটি কোনও সংলাপের চেয়ে অনেক বেশি কথা বলে— কারণ নীরবতাই এখানে সবচেয়ে সৎ ভাষা।

আর একটি দৃশ্যে ট্যাক্সিতে ক্লান্ত বাবা ঘুমের ঘোরে ছেলের কাঁধে মাথা এলিয়ে দেন। অন্য যে কোনও সম্পর্কে এমন মুহূর্ত সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। কিন্তু বাবা-ছেলের মধ্যে এই দূরত্বের জগতে এটি হয়ে দাঁড়ায় ব্যতিক্রমী, প্রায় অলৌকিক। হয়তো এই প্রথম ছেলে অনুভব করে যে বাবাও ভার নামাতে চান, বাবাও কারও কাঁধ খোঁজেন।

পলাশ যখন বাবার কাছে ফিরে আসে, তখন সে নিজেও পরিণত পুরুষ, ব্যক্তি। এই ফেরাটা তাই সমানে-সমানে মুখোমুখি হওয়ার। এই পর্যায়ে ‘পুরুষালি’ খোলসটা খসতে শুরু করে দুই তরফেই। বাবা বোঝেন আজীবনের কঠোরতার আড়ালে তিনি একা। ছেলে বুঝতে পারে, তার বাবার অতীতের দীর্ঘ নীরবতা অবহেলা বা উদাসীনতা ছিল না, ছিল সমাজ-নির্ধারিত পুরুষালি খোলসের বাধ্যবাধকতা।

মনে পড়ে বাংলা ছবির আর এক বাবার কথা, গুপী গাইনের বাবা। গুপীর সারল্য গোটা গ্রামের রসিকতার বিষয়। বাবা ছেলেকে বাস্তবের কথা বোঝাতে চান। কিন্তু সেই বোঝানোটা যে ভাষার মোড়কে প্রকাশ পায় তা রুক্ষতার, ধমকের, যা গুপীকে আরও একরোখা করে তোলে। বাবা চান ছেলের ভাল, কিন্তু সেই চাওয়ার ভাষাটুকু হারিয়ে যায় কর্তৃত্বের অভ্যাসের নীচে। এবং তার পর সেই দৃশ্য— গুপীকে গাধায় চাপিয়ে গ্রাম থেকে বার করে দেওয়া হচ্ছে। চার পাশে মানুষের হইচই, সেই ভিড়ে বাবা দাঁড়িয়ে। মুখে কোনও কথা নেই, শুধু চোখ মুছছেন গামছায়। সত্যজিৎ রায় সেই একটি মুহূর্তে একটি গোটা সম্পর্ককে ধরে রেখেছেন।

গুপী আর ফেরে না সেই গ্রামে, সেই বাবার কাছে। পলাশ অন্তত ফেরে। হয়তো এটুকুই পার্থক্য। একটু দেরিতে হলেও ফেরার রাস্তাটা খোলা রাখা।

সমাজতত্ত্ব বিভাগ, প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Relationship Society Father's Day

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy