শিল্পী বসে ক্যানভাসের সামনে। মাঝে মাঝে তুলির আঁচড় দিচ্ছেন, মাথা নাড়ছেন। ভাবছেন, ফের এক পোঁচ রং লাগাচ্ছেন। কখনও চোখেমুখে তৃপ্তি, পরমুহূর্তে দ্বন্দ্ব। যেন সংলাপ বিনিময় চলছে। এ ভাবে দিনের পর দিন সংলাপের পর কখনও ক্যানভাস, মাটি, পাথর, কাঠে নান্দনিক প্রাণসঞ্চার হয়। সৃষ্টি স্রষ্টাকে জানান দেয়, সে সম্পূর্ণ। দু’জনের এই সম্পর্কই অদ্যাবধি শিল্পসৃষ্টির মূল চালিকাশক্তি।
ধরা যাক আর একটি অবস্থান: শিল্পী ক্যানভাসের সামনে, সঙ্গে নানা আধুনিক গ্যাজেট। কম্পিউটারে ‘কম্যান্ড’ দিচ্ছেন ইচ্ছেমতো, ফুটে উঠছে বাহারি দৃশ্যকলা; অ্যালগরিদমের অধীন যান্ত্রিক শৈল্পিক অভিব্যক্তি, এআই-প্রয়োগে যে শিল্পতথ্য আগে থেকেই যন্ত্রের স্মৃতিকুঠুরিতে ভরা। ইচ্ছেমতো কম্যান্ড দিলেই মিলবে হাতে-গরম শিল্পকলা, পছন্দমতো বেছে নিলেই হল। তার পর সেই শিল্পতথ্যের উদ্যাপন শুরু ক্যানভাসে, কাগজে, অন্য কোনও মাধ্যমে। তৈরি হয়ে যাবে স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে সংলাপবর্জিত, চেতনাহীন অথচ আকর্ষণীয় এক শিল্প-উপকরণ। যার স্থায়িত্ব হয়তো কয়েক মুহূর্ত, কারণ ততক্ষণে অন্য কেউ আরও বুদ্ধিদীপ্ত কম্যান্ড দিয়ে পেয়ে গেছেন আরও আকর্ষণীয় শিল্পতথ্য।
শিল্পকলা কি অচিরেই কম্যান্ডসর্বস্ব হবে? না কি তাতে শিল্পীর ব্যক্তিত্ব, আনন্দ, আবেগ, বিষণ্ণতা, অপূর্ণতা মিশে থাকবে, যা আসলে স্রষ্টা ও সৃষ্টির একান্ত ব্যক্তিগত সংলাপ? সময়ই বলবে। ‘বুদ্ধি’ শব্দটি ছোটবেলা থেকেই গুরুজনেরা প্রয়োগ করতে শিখিয়েছেন। আর আবেগ, যা শিল্পীর প্রাণশক্তি, তাঁরা তা নিয়ন্ত্রণের নিদান দিতেন বুদ্ধির প্রয়োগে। শৃঙ্খলাপরায়ণ হয়ে উঠতে এটুকু নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। কিন্তু এক জন শিল্পীর আবেগ যদি সর্বদা ‘বুদ্ধি’ দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হয়, সেও যদি হয় ‘কৃত্রিম’ বুদ্ধিমত্তা, তবে সেই শিল্পকর্ম তার অভিপ্রেত সমৃদ্ধি থেকে বঞ্চিত হয়ে ক্রমেই পূর্বের অনুকৃতি হতে শুরু করে।
দার্শনিক, সাংস্কৃতিক সমালোচক ওয়াল্টার বেঞ্জামিন ১৯৩৬-এ তাঁর ‘দ্য ওয়ার্ক অব আর্ট ইন দি এজ অব মেকানিক্যাল রিপ্রোডাকশন’ প্রবন্ধে এই বিভাজনের সম্ভাবনা তুলে ধরেছিলেন। ১৯৫০-এর দশকে এআই-এর ক্ষেত্রটি প্রতিষ্ঠিত হয়, ধীরে ধীরে শিল্পীরা এর সাহায্যে শিল্পকর্ম তৈরি করা শুরু করেন। প্রথম উল্লেখযোগ্য এআই আর্ট সিস্টেমগুলোর একটি হল ‘অ্যারন’, ষাটের দশকের শেষ দিকে স্যান ডিয়েগোর ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে তৈরি করেন হ্যারল্ড কোহেন। এটি একটি কম্পিউটার প্রোগ্রাম, স্বয়ংক্রিয় ভাবে দৃশ্যকলা তৈরির জন্য নির্মিত। শুরুর দিকে টেক্সট-টু-ইমেজ মডেল ব্যবহারের মাধ্যমে করা কাজকে অ্যালগরিদমিক আর্ট, কম্পিউটার আর্ট, ডিজিটাল আর্ট বা নিউ মিডিয়া আর্ট বলা হত। কোহেন এই প্রোগ্রামটি নিয়ে প্রতিনিয়ত নিরীক্ষা করেছেন, তাঁর এআই আর্ট ভেনিস বিয়েনাল, লন্ডনের টেট গ্যালারি-সহ বহু জায়গায় প্রদর্শিত।
২০২০ থেকে বিশ্ব জুড়ে এআই-উত্থানের সময় ডিপ ড্রিম, মিডজার্নি, ডাল-ই ও স্টেবল ডিফিউশন-এর মতো টেক্সট-টু-ইমেজ মডেল খুব জনপ্রিয় হয়, অল্প পরিশ্রমে দ্রুত আকর্ষণীয় দৃশ্যকলা নির্মাণের সুযোগ করে দেয় এরা। শিল্পের সঙ্গে তথাকথিত সম্পর্কহীন, দক্ষ কম্পিউটার অপারেটরও এই কাজ করতে সক্ষম, ছবি আঁকা বা ডিজিটাল ইলাস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা না থাকলেও সমস্যা নেই। যাঁরা হয়তো নিজেদের শিল্পী বলে দাবি করেন না কিন্তু একটা সৃষ্টিশীল মন আছে, নানা অ্যাপ্লিকেশন এনে এআই তাঁদের দৃশ্যশিল্পকর্ম তৈরির কাজ সহজ করে তুলেছে।
গোল বাধে এই জায়গায়: অঙ্কনদক্ষতা না কি প্রযুক্তিদক্ষতা, শিল্পসৃষ্টিতে কোনটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ? কেউ বলবেন, শিল্পী না হয়েও যদি কেউ শিল্পসৃষ্টিতে নিয়োজিত হতে পারেন, সে তো ভাল কথা। তাতে শেষে সমাজের মানসিক স্বাস্থ্যেরই উন্নতি হয়। তা ছাড়া যেখানে পণ্যের বিজ্ঞাপনের জন্য নানা শর্ত ও সময়সীমা মেনে ‘ভিস্যুয়াল কনটেন্ট’ তৈরির প্রশ্ন, সেখানে এআই-প্রয়োগে বিজ্ঞাপনের বাজার নিয়ন্ত্রিত হবে, এটাই স্বাভাবিক। স্রষ্টা-সৃষ্টির সম্পর্কের রসায়ন সেখানে মূল্যহীন।
কিন্তু এর বাইরেও শিল্পজগতে এআই-এর যে প্রভাব পড়ছে তা সুখকর নয়। শিল্পীরা নিজেদের অজানতেই তার অংশ হয়ে উঠছেন। শিল্প-দর্শনের পণ্ডিতরা বলছেন, এআই ধীরে ধীরে শৈল্পিক অভিব্যক্তি যান্ত্রিক করে, তাকে অ্যালগরিদমিক যুক্তির অধীন করে সৃষ্টিশীলতার চেতনা নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করে। যদি আন্তর্জাল থেকে চয়ন করা হাজারও শিল্পকর্মের উপর ভিত্তি করে এআই দিয়ে কোনও শিল্পকর্ম সৃষ্টি করা হয়, তার প্রকৃত স্রষ্টা কে? এআই-শিল্পকর্ম প্রায়ই বিদ্যমান শিল্পতথ্য থেকে উপাদান নেয়, যার মধ্যে অধিকাংশ শিল্পকর্ম প্রকৃত শিল্পীদের দ্বারা নির্মিত, দীর্ঘ সময় ও শ্রমের ফল। কপিরাইট আইন এআই প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি, ফলে এআই-সৃষ্ট ছবির প্রকৃত মালিকানা নিয়ে একটি আইনি ধূসর এলাকা তৈরি হয়েছে। ২০২৩-এর অগস্টে আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয়, মানুষের সৃষ্টিকর্মের মানদণ্ড পূরণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় এআই-শিল্পকর্ম কপিরাইটের অযোগ্য।
শিল্পক্ষেত্রে এআই-এর প্রয়োগ ক্রমশ শৈল্পিক স্বত্বের ধারণা বদলে দিচ্ছে। এআই-ই যদি বেশির ভাগ কাজ করে, তবে শিল্পীর ভূমিকা কোথায় শুরু, কোথায় শেষ?
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)