E-Paper

গায়ের জোরে চুক্তি

মোদী সরকারকে চমকে দিয়ে গত অগস্টে ট্রাম্প-প্রশাসন ভারতের পণ্যের উপরে আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করে দেয়। এর পর রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি করার শাস্তি হিসাবে ভারতের পণ্য আমদানির উপরে আরও ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপানো হয়।

প্রসেনজিৎ বসু

শেষ আপডেট: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৫:৩৯

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ঘাটতি ভারতের অর্থনীতির পুরনো সমস্যা। ভারত থেকে প্রতি বছর মোট যে মূল্যের পণ্য রফতানি হয়, তার তুলনায় মোট আমদানি অনেক বেশি হওয়াই ডলারের নিরিখে টাকার ক্রমাগত অবমূল্যায়নের মূল কারণ। কেন্দ্রের মোদী সরকার অনেক দিন ধরেই ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ জাতীয় উদ্যোগের মাধ্যমে ভারতের আমদানির তুলনায় রফতানি বৃদ্ধির প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তাতে বিশেষ সাফল্য অর্জন করা যায়নি। গত আর্থিক বছরের (২০২৪-২৫) শেষে ভারতের সামগ্রিক বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ২৮৩ বিলিয়ন ডলার, তৎকালীন বিনিময় মূল্যে প্রায় ২৪ লক্ষ কোটি টাকা। মোট বাণিজ্য ঘাটতির এক-তৃতীয়াংশ ছিল চিনের সঙ্গে এবং অর্ধেকের বেশি রাশিয়া, সৌদি আরব, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, ইন্দোনেশিয়া ইত্যাদি তেল রফতানিকারী দেশগুলির সঙ্গে।

এর বিপরীতে, গত আর্থিক বছরে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ছিল প্রায় ৪১ বিলিয়ন ডলার বা ৩.৫ লক্ষ কোটি টাকা। আমেরিকা বিগত কয়েক বছরে ভারতে উৎপাদিত বৈদ্যুতিন যন্ত্রপাতি, মূল্যবান রত্ন ও ধাতু, ওষুধপত্র, জামাকাপড় ইত্যাদি পণ্য রফতানির সবচেয়ে বড় বাজার হয়ে উঠেছে। গত বছর ভারতের মোট পণ্য রফতানির প্রায় ২০ শতাংশ ছিল আমেরিকার বাজারে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভারতের বিরুদ্ধে শুল্ক যুদ্ধ শুরু করার এটাই ছিল প্রেক্ষাপট।

মোদী সরকারকে চমকে দিয়ে গত অগস্টে ট্রাম্প-প্রশাসন ভারতের পণ্যের উপরে আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করে দেয়। এর পর রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি করার শাস্তি হিসাবে ভারতের পণ্য আমদানির উপরে আরও ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপানো হয়। একতরফা ভাবে এই পদক্ষেপগুলো করার পর আমেরিকান প্রশাসন ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির দরকষাকষি শুরু করে।

৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ তারিখে হোয়াইট হাউস থেকে প্রথমে প্রকাশিত একটি যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে ভারত ও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য সংক্রান্ত অন্তর্বর্তী চুক্তির একটি কাঠামো সামনে আনা হয়। এই অন্তর্বর্তিকালীন বাণিজ্য চুক্তিতে শর্তসাপেক্ষে ভারতের পণ্যের উপরে বর্ধিত আমেরিকান শুল্ক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশ করা হয়েছে।

কোন শর্তের বিনিময়ে এই বর্ধিত শুল্ক কমানো হয়েছে? অন্তর্বর্তী বাণিজ্যচুক্তি অনুযায়ী, প্রথমত ভারত সরকার আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত সকল প্রকার শিল্পপণ্য এবং বেশ কিছু কৃষিপণ্যের উপরে আমদানি শুল্ক কমিয়ে শূন্য বা তার কাছাকাছি নিয়ে আসতে সম্মত হয়েছে। অর্থাৎ, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় শিল্প এবং কৃষিপণ্যের উপরে আমদানি শুল্ক— গত বছর পর্যন্ত যা ছিল গড়ে ৩ শতাংশ এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রায় শূন্য থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে— এখন বেড়ে হবে ১৮ শতাংশ, আর ভারতে নানাবিধ আমেরিকান পণ্যের উপরে শুল্ক কমিয়ে শূন্যের কাছাকাছি হারে নিয়ে যাওয়া হবে। যৌথ বিবৃতিতে আমেরিকায় উৎপাদিত জোয়ার এবং ভুট্টা-জাত পশুখাদ্য, বিভিন্ন রকম বাদাম, তাজা এবং প্রক্রিয়াজাত ফল, সয়াবিন তেল, মদ ইত্যাদি কৃষিপণ্যের উপরে ভারতের আমদানি শুল্ক কমানোর কথা উল্লিখিত আছে।

পাশাপাশি, ভারতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সংক্রান্ত পণ্য, চিকিৎসা সরঞ্জাম, খাদ্য ও কৃষিপণ্যের মতো ক্ষেত্রে আমেরিকান রফতানির উপরে শুল্ক-বহির্ভূত বাধা প্রত্যাহার এবং নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে আমেরিকার থেকে ৫০০ বিলিয়ন ডলার (৪,৫০০,০০০ কোটি টাকার বেশি) মূল্যের জ্বালানি পণ্য, উড়োজাহাজ ও তার যন্ত্রাংশ, মূল্যবান ধাতু, প্রযুক্তি পণ্য এবং কয়লা কেনার ভারতের অভিপ্রায় চুক্তিতে লিপিবদ্ধ হয়েছে। ২০২৫ সালে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতের আমদানি ছিল ৪২ বিলিয়ন ডলার, বাণিজ্যচুক্তি অনুযায়ী সেই আমদানি আগামী পাঁচ বছরে ১২ গুণের বেশি বেড়ে যাবে।

আমেরিকায় ভারতীয় পণ্যের রফতানি কতটা বাড়বে, বাণিজ্যচুক্তিতে সেই সংখ্যার কিন্তু কোনও উল্লেখ নেই। কেবল ভারতে উৎপাদিত বস্ত্র ও জামাকাপড়, চামড়া ও জুতো, প্লাস্টিক ও রবার, জৈব রসায়নিক পণ্য, গৃহসজ্জা সামগ্রী, হস্তশিল্প পণ্য, যন্ত্রপাতি, ওষুধপত্র, হিরে ও মণিরত্ন, গাড়ি ও উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশের মতো বিভিন্ন পণ্যের উপরে বর্ধিত আমদানি শুল্কের হার কমানোর কথা বলা হয়েছে। এই সমস্ত ক্ষেত্রের ভারতীয় রফতানিকারী সংস্থাগুলির কিছুটা হয়তো লাভ হবে, কিন্তু ভারতের বাজারে আমেরিকান রফতানি বৃদ্ধির হার তার তুলনায় অনেক বেশি হওয়ার সম্ভাবনা।

আসলে এই বাণিজ্য চুক্তির মূল ভিত্তি হল দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যকে ‘ভারসাম্যপূর্ণ’ করে তোলা— অর্থাৎ, দুই দেশের মধ্যে কারও বাণিজ্য ঘাটতি বা উদ্বৃত্ত, কোনওটাই থাকবে না। সে ক্ষেত্রে আগামী পাঁচ বছরে ভারতে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের রফতানি সে দেশে ভারতীয় রফতানির তুলনায় বাড়বে, এবং ভারতের বর্তমান বাণিজ্য উদ্বৃত্ত কমে যাবে। এর ফলে ভারতের বাজারে আমেরিকান পণ্য আমদানির যদি ঢল নামে, ভারতীয় কৃষক এবং ছোট-মাঝারি শিল্প প্রতিযোগিতায় বাজার হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

ভারত-আমেরিকা যৌথ বিবৃতির পাশাপাশি ৬ ফেব্রুয়ারি আমেরিকার প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে আর একটি পৃথক আদেশনামা জারি করে বলা হয়েছে যে, ভারত রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি বন্ধ করার শর্তেই ভারতীয় রফতানির উপরে আরোপিত অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করা হচ্ছে। এই আদেশনামায় স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে যে, ভারত সরকার রাশিয়া থেকে তেল আমদানি বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, এবং আমেরিকার থেকে থেকে জ্বালানি পণ্য কেনার কথাও জানিয়েছে। আরও বলা হয়েছে, আমেরিকান বাণিজ্য ও অর্থ দফতরের সেক্রেটারিরা ভারতীয় তেল আমদানির উপরে ক্রমাগত নজর রাখবেন। ভারত যদি ভবিষ্যতে আবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে রাশিয়া থেকে তেল আমদানি চালু করে, তবে অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক পুনরায় আরোপ করা হবে।

ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া থেকে ভারতের অপরিশোধিত তেল আমদানি ২০২২-২৩ আর্থিক বছরে ৫০.৮৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন থেকে বেড়ে ২০২৩-২৪ সালে ৮৩.০২ মিলিয়ন মেট্রিক টন এবং ২০২৪-২৫ সালে ৮৭.৫৪ মিলিয়ন মেট্রিক টন হয়েছিল। ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৫-এর মার্চের মধ্যে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেলের ব্যারেল প্রতি দাম ৭৯ ডলার থেকে ৬৬ ডলারে নেমে আসে। রাশিয়া ভারতকে তেলের দামে ছাড় দিয়েছে বলেই ভারতে রাশিয়া থেকে তেল আমদানি বেড়েছে। ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানিতে রাশিয়া থেকে আমদানি হওয়া তেলের ভাগ ২০১৯-২০ সালে অতি সামান্য ছিল, যা ২০২৩-২৪ সালে বেড়ে ৩৬ শতাংশেরও বেশি হয়েছে। যদিও ২০২৫-২৬ আর্থিক বছরে রাশিয়া থেকে তেল আমদানি ইতিমধ্যেই কমতে শুরু করেছে এবং বছরের শেষে তা ২০ শতাংশের নীচে নেমে যেতে পারে।

ট্রাম্প প্রশাসন ভারতকে রাশিয়ার পরিবর্তে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র বা ভেনেজ়ুয়েলা থেকে তেল আমদানি করতে বলছে, কিন্তু তেলের দামে ছাড় দেওয়ার কোনও ইঙ্গিত দিচ্ছে না। রাশিয়ার তুলনায় আমেরিকার থেকে বেশি দামে তেল কিনলে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। এতে ডলারের নিরিখে টাকা আরও দুর্বল হবে। পেট্রল-ডিজ়েল’সহ জ্বালানির দামও বাড়তে পারে, যার ফলে ভারতে সার্বিক মূল্যবৃদ্ধি আবার মাথাচাড়া দেবে। অর্থাৎ আমেরিকার ব্যবসায়িক লাভ, ভারতীয় জনগণের ক্ষতি।

ভারত-আমেরিকা অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তির সঙ্গে রাশিয়া থেকে তেল আমদানি সংক্রান্ত আমেরিকান প্রেসিডেন্টের আদেশনামাকে এক সঙ্গে দেখলে এটাই স্পষ্ট হয় যে, ভারতের কৌশলগত স্বাধিকার খর্ব করে ট্রাম্প প্রশাসন একটি অন্যায্য দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ভারতের উপরে চাপিয়ে দিতে চাইছে। আত্মনির্ভরতার উল্টো পথে হেঁটে মোদী সরকার এই অসম বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করলে আমেরিকার উপরে ভারতের নির্ভরশীলতা অনেক মাত্রায় বেড়ে যাবে, যা ভারতের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকে আরও অনিশ্চিত করে তুলবে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

India-US Trade Deal India-US Relationship US Tariff War Donald Trump

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy