E-Paper

একমেরু ঔদ্ধত্যের প্রত্যাবর্তন

বোর্ডের তহবিল এবং সদস্যপদের কাঠামো বুঝিয়ে দেয়, এর শ্রেণিগত ও ক্ষমতাগত চরিত্রটি কেমন। এখানে আছে একটি ‘পে-টু-প্লে’ ব্যবস্থা, যা শত কোটি ডলারের অনুদানে স্থায়ী সদস্যপদ নিশ্চিত করে।

জি দেবরাজন

শেষ আপডেট: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৫:৫৪

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একের পর এক পদক্ষেপ এখন বিশ্বরাজনীতিতে উদ্বেগ তৈরি করছে। সম্প্রতি তাঁর ‘বোর্ড অব পিস’ (বিওপি)-এর ঘোষণা আবারও দুনিয়াময় আশঙ্কার তরঙ্গ তুলল। যুদ্ধ-পরবর্তী গাজ়া পরিচালনা এবং বিশ্বব্যাপী সংঘাত নিরসনের লক্ষ্যে না কি এই ব্যবস্থা! অথচ বুঝতে অসুবিধা নেই, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির পর থেকে গড়ে তোলা বহুপাক্ষিকতার যে নীতি, তার উপর একটি সরাসরি আঘাত এই পদক্ষেপ। ঠান্ডা যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার একটা ইঙ্গিত মিলছিল— তা এখন ট্রাম্পের আমেরিকার আধিপত্যের সামনে বিনষ্টপ্রায়। বিওপি গঠনকেও আমেরিকার হৃত-আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি সুস্পষ্ট প্রচেষ্টা হিসেবেই দেখা যেতে পারে।

বোর্ড গঠনের সময় এবং প্রেক্ষাপটটিও তাৎপর্যপূর্ণ। লক্ষণীয়, এই বোর্ড প্যালেস্টাইনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের বিষয়টিকে ইচ্ছাকৃত ভাবে বাদ দিয়েছে। ইজ়রায়েলের দখলদারি, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের মতো প্রশ্নের মধ্যে না-ঢুকে প্যালেস্টাইন সমস্যাকে ‘প্রশাসন’ এবং ‘স্থিতিশীলতা’র একটি বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

আরও উদ্বেগজনক হল, এর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘আজীবন চেয়ারম্যান’ হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। সদস্য নিয়োগ, কার্যসূচি নির্ধারণের ব্যাপক ক্ষমতা থাকছে তাঁরই হাতে। ট্রাম্প ছাড়াও সংস্থায় থাকছেন মার্কো রুবিয়ো, জ্যারেড কুশনার, টোনি ব্লেয়ারের মতো ব্যক্তিত্ব, যাঁরা প্রত্যেকেই সামরিক নীতিতে বিশ্বাসী, শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তাই একে কূটনীতির ছদ্মবেশে কেন্দ্রীভূত একনায়কত্ব ভাবলে ভুল হবে কি?

বোর্ডের তহবিল এবং সদস্যপদের কাঠামো বুঝিয়ে দেয়, এর শ্রেণিগত ও ক্ষমতাগত চরিত্রটি কেমন। এখানে আছে একটি ‘পে-টু-প্লে’ ব্যবস্থা, যা শত কোটি ডলারের অনুদানে স্থায়ী সদস্যপদ নিশ্চিত করে। এই ধরনের মডেল নিশ্চিত ভাবেই আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এবং এশিয়ার বহু দেশকে বাদ দিয়ে পুঁজিবাদী ধনী রাষ্ট্র এবং আমেরিকাকে আরও ক্ষমতাবান করতে চলেছে।

রাষ্ট্রপুঞ্জের প্রতিদ্বন্দ্বী, কিংবা সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে নিজেকে তুলে ধরার মাধ্যমে বিওপি একটি নিয়ম-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ধারণাকেই চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। বহু ত্রুটি, ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা সত্ত্বেও রাষ্ট্রপুঞ্জই এত দিন একমাত্র বৈশ্বিক মঞ্চ হিসেবে টিকে আছে, যেখানে ছোট রাষ্ট্রগুলির কণ্ঠস্বর শোনা যায়। বলা যায়, এই সমাধান কোনও ‘সংস্কার’ নয়, বরং আগের ব্যবস্থাকে আমূল পরিত্যাগ করে নতুন ব্যবস্থার সূচনা।

আরও গভীর আদর্শগত স্তরে, বিওপি আসলে একমেরু বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দিকে এগোনোর ইঙ্গিত নিয়ে আসছে। ১৯৯১ সালে সোভিয়েট ইউনিয়নের পতনের ফলে লাগামহীন মার্কিন আধিপত্যের একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু ধ্বংসাত্মক পর্বের সূচনা হয়, যার বৈশিষ্ট্য ছিল ইরাক, যুগোস্লাভিয়া, আফগানিস্তান এবং লিবিয়ায় যুদ্ধ। গত দুই দশকে ক্ষমতার বিকল্প কেন্দ্রগুলির ক্রম-উত্থান এই একাধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাতে শুরু করেছিল। বিওপি সেই ঐতিহাসিক ধারাটিকে উল্টে দিতে চায়।

এই নতুন ব্যবস্থা কার্যকর করার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক জোরাজুরি একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। দেশগুলোকে বোর্ডে যোগ দিতে বাধ্য করার জন্য শুল্ক আরোপের হুমকি এবং আর্থিক চাপ সাম্রাজ্যবাদী কৌশলেরই অংশ। এমন ‘ব্ল্যাকমেল’-এর মাধ্যমে চাপিয়ে দেওয়া শান্তি আসলে আধিপত্য বিস্তার ছাড়া আর কিছুই নয়। অন্য দিকে, বিওপি-র বিষয়ে ইউরোপীয়দের সংশয় দেখিয়ে দেয়, আমেরিকার এত দিনের বন্ধুদের মধ্যেও অস্বস্তি ক্রমবর্ধমান। অনেকেরই দাবি, এক জন একক নেতার খেয়ালের উপর নির্ভর করে কোনও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা চলতে পারে না।

ভারতের জন্য এই নতুন ব্যবস্থার গুরুত্ব খুব বেশি। প্রথমেই বলা দরকার, প্যালেস্টাইনের অধিকারকে উপেক্ষা করে, রাষ্ট্রপুঞ্জকে পাশ কাটিয়ে যেতে চায়— এমন কোনও সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়া ভারতের নিজস্ব ঔপনিবেশিকতা-বিরোধী ঐতিহ্যের পরিপন্থী। প্যালেস্টাইনের প্রতি ভারতের দীর্ঘ দিনের সমর্থন এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের প্রতি অঙ্গীকার রয়েছে। তাই, বলা যেতে পারে যে, এই বোর্ডের সঙ্গে যুক্ত হলে ভারতের বৈশ্বিক মর্যাদা বাড়বে না। বরং এটি একটি নব্য-সাম্রাজ্যবাদী প্রকল্পের সঙ্গে ভারতকে জুড়ে নেবে, এবং ক্রমে হয়তো বিশ্বমঞ্চে ভারতকে একটি অধীন, গুরুত্বহীন চরিত্রে পরিণত করবে।

বিওপি নিয়ে এই উদ্বেগ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়েই একটি সংগ্রাম। ট্রাম্প-শাসিত এই বিশ্ব কি প্রকৃত বহুপাক্ষিকতা, সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা এবং নিপীড়িত জনগণের অধিকারের দিকে এগিয়ে যাবে? না কি একক শক্তি শাসিত একটি শ্রেণিবদ্ধ ব্যবস্থার দিকে পিছিয়ে যাবে, যা জবরদস্তির মাধ্যমে ‘শান্তি’ প্রতিষ্ঠা করতে চায়? শান্তির ভিত্তি হওয়া উচিত ন্যায়বিচার এবং জাতিসমূহের সম্মিলিত ইচ্ছা। লাগামহীন আমেরিকান আধিপত্যের অন্ধকারতম দিনগুলির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, এমন কোনও বিশ্বব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত করার প্রচেষ্টা দৃঢ় ও দ্ব্যর্থহীন বিরোধিতা অত্যন্ত জরুরি।

সাধারণ সম্পাদক, সারা ভারত ফরওয়ার্ড ব্লক

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Donald Trump USA

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy