ভারতে দরিদ্রের সংখ্যা কত, তা নিয়ে সরকারি হিসাবের সঙ্গে অর্থনীতিবিদদের একাংশের হিসাবে বিপুল ফারাক আছে। স্বভাবতই সরকারি মতে দরিদ্রের সংখ্যা কম। সরকারের হিসাবকেই যদি শিরোধার্য করা যায়? নীতি আয়োগের মাল্টিডাইমেনশনাল পভার্টি ইন্ডেক্স বা বহুমাত্রিক দারিদ্র সূচক অনুসারে, দেশে গরিব মানুষের সংখ্যা ১৬.৩৫ কোটির বেশি। ২০২৫-এ প্রকাশিত বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে ভারতের অবস্থান ১২৩টি দেশের মধ্যে ১০২ নম্বরে। হতদরিদ্র পরিবারের সদস্যদের দু’বেলা দু’মুঠো ভাতের জোগাড় হয় না; মায়েরা ভুগছেন বিপজ্জনক স্তরের অপুষ্টিতে, ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্মে সন্তানদের মধ্যে সঞ্চারিত হচ্ছে চরম অপুষ্টি। ২০২৫ সালের মানব উন্নয়ন সূচকে ভারত ১৯৩টি দেশের মধ্যে ১৩০তম স্থানে।
নির্মলা সীতারামনের নবম বাজেটে অবশ্য এ সমস্ত বাজে কথার উল্লেখ নেই। গত বছরের তুলনায় তাঁর বাজেট-বক্তৃতায় এ বার তিনটি পাতা বেড়েছে। আর, বাজেটের বহর বেড়েছে তিন লক্ষ কোটি টাকার মতো, যা ভারতের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন (জিডিপি)-এর এক শতাংশও নয়। নির্মলার বাজেটে কেন গরিব মানুষরা থাকেন না, সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে দেখা যাবে, আসলে সমস্যাটা রয়েছে দেখার চোখে। একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। বিজেপি-সরকার গোড়া থেকেই পরিকাঠামোর উন্নয়নে অর্থ বরাদ্দ করতে আগ্রহী। পরিকাঠামোর উন্নতি যে গুরুত্বপূর্ণ, এবং সে কাজে সরকারকে অগ্রণী ভূমিকা নিতেই হয়, সে বিষয়ে কোনও সংশয় নেই। এ বার বাজেটে মূলধনি বিনিয়োগের বহর ১২.২ লক্ষ কোটি টাকা— গত বছরের তুলনায় এক লক্ষ কোটি টাকার সামান্য বেশি।
পরিকাঠামোয় বিনিয়োগ মানে ময়দানবের কর্মযজ্ঞ। বড় বড় শহরকে জোড়া হচ্ছে ছয় থেকে দশ লেনের মহাসড়কের মাধ্যমে। সংখ্যা বাড়ছে বিমানবন্দর আর সামুদ্রিক বন্দরের। শহরগুলিকে মুড়ে ফেলা হচ্ছে উড়ালপুলে। নিত্যনতুন করিডর তৈরির কথা শোনা যাচ্ছে। এ বারের বাজেটেও রয়েছে তেমন সংস্থান। তা হলে কী ভাবে বলা যায় যে, বাজেট মোটেই উন্নয়নমুখী নয়? সমস্যা হল, নতুন ঝাঁ চকচকে রাস্তা তো বিলক্ষণ দেখতে পাচ্ছি— কিন্তু সেই রাস্তার ফুটপাত জুড়ে যাঁরা জীবন কাটান, তাঁদেরও যে দেখছি। নির্মলা সীতারামন প্রতি বছর পাঁচ হাজার কোটি করে আগামী পাঁচ বছরে পঁচিশ হাজার কোটি টাকার ব্যবস্থা করেছেন বিশেষ গোত্রের (টিয়ার ২ ও ৩) কিছু শহর এবং মন্দির নগরীর উন্নয়নে। অথচ তিনি দেখতেই পাননি যে, ওই সব শহরাঞ্চলেই নিরন্ন, নিরাশ্রয় ফুটপাতবাসী মানুষ কী প্রবল কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন।
এমন উদাহরণ এই বাজেটে কার্যত না-খুঁজলেই মিলবে— এবং, শুধু এ বারের বাজেটে নয়, নির্মলার পেশ করা তাঁর আগের আটটি সংস্করণেও। ধরা যাক স্বাস্থ্য ক্ষেত্রকে। বিস্তর সরকারি ঢক্কানিনাদের পরও স্বাস্থ্য খাতে মোট ব্যয়ের প্রায় ৫০ শতাংশ জনগণ পকেট থেকেই বহন করেন। এ ক্ষেত্রে বাজেটে জোর দেওয়া উচিত ছিল প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র, জেলাওয়ারি একটি করে সাধারণ হাসপাতাল, উপযুক্ত সংখ্যায় ডাক্তার, সাহায্যকারী কর্মী ও নার্সের উপরে। কিন্তু অর্থমন্ত্রী জোর দিলেন ভারতের সুপ্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের উপর। বাজেটে তাই সংস্থান রয়েছে নতুন তিনটি ‘অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব আয়ুর্বেদ’-এর।
প্রশ্ন জাগে, সেই যে ‘সবকা সাথ সবকা বিকাশ’ মন্ত্র, যা প্রতি নিঃশ্বাসে আওড়ে যান ‘ভক্ত’ থেকে ‘ভগবান’ প্রত্যেকেই— সেই মন্ত্রের অন্তর্নিহিত ‘সব’ কারা? প্রশ্নটি সহজ, আর উত্তরও তো জানা। তাঁরা বাজারে বর্জিত। তাই বাজেটে ব্রাত্য। অর্থশাস্ত্রে এঁদের বলা হয় ‘মার্কেট এক্সক্লুডেড’। আসলে নব্য উদার অর্থব্যবস্থায় বাজেট তো বাজারের ইশারাতেই চলবে। এতে খামোকা নির্মলা সীতারামনকে দোষ দেওয়া কেন? তিনি তো ‘রিফর্ম এক্সপ্রেস’-এর চালক। কিন্তু ওই ট্রেনের গার্ডমশাই যে অসীম শক্তিশালী বাজার।
বাজার এমনিতে খুব খারাপ কোনও ব্যবস্থা নয়। পূর্ণ প্রতিযোগিতা যদি থাকে, তা হলে সব স্তরে উৎপাদনের দক্ষতা বাড়বে, সম্পদের অপচয় হবে না। এবং, তত্ত্বগত ভাবে দেখলে তেমন সমাজে বৈষম্য খুব মারাত্মক চেহারা নেবে না। পশ্চিমের ধনাঢ্য দেশগুলির জিনি সূচকে (সমাজে আর্থিক বৈষম্য পরিমাপের একক) নজর রাখলেই এই সত্যটি বেরিয়ে আসবে। কিন্তু ভারতের বাজার, অর্থনীতি ও সমাজ যে নিয়ন্ত্রণ করে সাঙাততন্ত্র! আর সেই কারণেই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে আর্থিক বৈষম্য। ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে টমাস পিকেটি, নোবেলজয়ী অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অন্যরা তাঁদের গবেষণালব্ধ ফলাফল দেখে জানিয়েছিলেন যে, ২০২৩ সালে ভারতে আয় ও সম্পদের বৈষম্য ভয়াবহ জায়গায় পৌঁছে গেছে। জনসংখ্যার এক শতাংশের সিন্দুকে ঢুকে গেছে জাতীয় সম্পদের ৪০.১%, এবং মোট উপার্জনের ২২.৬%।
সেই অসহনীয় অসাম্যের কোনও উল্লেখ কেন্দ্রের বাজেটে নেই। যে সমস্যার অস্তিত্ব স্বীকারে সরকারের অস্বস্তি হয়, সেই সমস্যার সমাধান তো দূর অস্ত্। অমৃতকালের হিসাব থেকে কারা বাদ পড়ছেন, সে বিষয়ে নির্মলা সীতারামনের বাজেট কোনও সংশয় রাখেনি।
অর্থনীতি বিভাগ, কাছাড় কলেজ, শিলচর
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)