E-Paper

ডাক্তার আসার পরেও

বিধেয় নিয়ে সংশয় ও সন্দেহ জাগছে, আদৌ এই প্রক্রিয়া পশ্চিমবঙ্গে এ বছর বিধানসভা নির্বাচনের আগে সম্পূর্ণ হবে তো!

তূর্য বাইন

শেষ আপডেট: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:০৮
অপেক্ষমাণ: এসআইএর-এর শুনানির ভিড়, রানাঘাট, জানুয়ারি ২০২৬। সুদেব দাস

অপেক্ষমাণ: এসআইএর-এর শুনানির ভিড়, রানাঘাট, জানুয়ারি ২০২৬। সুদেব দাস

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘মরীচিকা’ কবিতায় লিখেছিলেন, “যাহা চাই তাহা ভুল করে চাই,/ যাহা পাই তাহা চাই না।” পশ্চিমবঙ্গে যাঁরা অবাধ, সুষ্ঠু এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের প্রাক্‌-শর্ত হিসেবে ত্রুটিমুক্ত ভোটার তালিকা চেয়েছিলেন এবং সেই লক্ষ্যে নির্বাচক তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন তথা এসআইআর-এর প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানিয়েছিলেন, এই প্রক্রিয়া যত এগোচ্ছে ততই যেন তাঁদের স্বপ্নভঙ্গ হচ্ছে। মনে এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য এবং বিধেয় নিয়ে সংশয় ও সন্দেহ জাগছে, আদৌ এই প্রক্রিয়া পশ্চিমবঙ্গে এ বছর বিধানসভা নির্বাচনের আগে সম্পূর্ণ হবে তো!

শুরু থেকেই জাতীয় নির্বাচন কমিশনের কাজের ধারা, রূপায়ণের পদ্ধতি ও পরিকাঠামোজনিত ত্রুটিবিচ্যুতি নিয়ে যে এক অসন্তোষের সূচনা হয়েছিল, পরবর্তী কালে উদ্ভূত ধারাবাহিক প্রতিকূল পরিস্থিতির নিরিখে তা তীব্র থেকে তীব্রতর আকার ধারণ করেছে। দায়টা যে মূলত নির্বাচন কমিশনের, জনমানসে এই বিশ্বাসও ক্রমশ দৃঢ় হচ্ছে। কোনও জটিল রোগের সঠিক চিকিৎসার আগে যেমন নির্দিষ্ট কিছু প্যাথোলজিক্যাল পরীক্ষানিরীক্ষার প্রয়োজন হয়, তেমনই এই রাজ্যের নির্বাচক তালিকা সংশোধনের আগে এখানকার জনবিন্যাস এবং ধর্মীয় তথা সামাজিক স্তরভেদ সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকাটা বাঞ্ছনীয় ছিল। অথচ কোনও রকম ক্ষেত্রসমীক্ষা ছাড়াই নির্বাচকের বৈধতা নিরূপণের ক্ষেত্রে আবশ্যক নথির যে তালিকা স্থির করা হয়েছিল, সেটির মধ্যেই হয়তো নাগরিক অসন্তোষের বীজ উপ্ত ছিল। বৈধ নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও শিক্ষা এবং সচেতনতার অভাবে কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ-সহ অনতিক্রম্য নানা দুর্ঘটনার কারণে এই রাজ্যের এক বৃহত্তর অংশের মানুষই যে সেগুলো অর্জন বা সংরক্ষণ করতে অসমর্থ, মানবিক দৃষ্টিতে তা অগ্রিম অনুধাবন করা সম্ভব হলে হয়তো সাধারণ মানুষকে আজ এতটা হয়রানির মধ্যে পড়তে হত না।

এর উপরে কমিশনের সিদ্ধান্তহীনতা, বিশেষত নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে ‘আধার’ এবং বয়সের প্রমাণপত্র হিসেবে মাধ্যমিক পরীক্ষার অ্যাডমিট কার্ডের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে একাধিক বার অবস্থান বদল (অবশ্যই আদালতের নির্দেশে) হওয়ার জেরে এক দিকে যেমন মানুষের মনে নানা বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে, তেমনই মানুষের হয়রানিও চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়েই চলেছে। এতদ্ব্যতীত তথ্যগত অসঙ্গতি বা ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি’-র নামে যান্ত্রিক ভাবে চিহ্নিত এক বিরাট সংখ্যক নির্বাচকের বৈধতাকে যে ভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে তাঁদের হাতে শুনানির নোটিস ধরানো হয়েছে, তার অধিকাংশই যে প্রকৃতপক্ষে একেবারেই ‘লজিক্যাল’ তথা যুক্তিগ্রাহ্য নয়, একটু তলিয়ে দেখলেই ব্যাপারটা স্পষ্ট বোঝা যায়।

পশ্চিমবঙ্গে এক দিকে যেমন বহুধাবিভক্ত ভিন্ন ভিন্ন জনগোষ্ঠীর বাস, তেমনই জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে মানুষের নাম এবং পদবির বৈচিত্র, একই পদবির ভিন্ন রূপ এবং উভয় ক্ষেত্রেই বানানের ভিন্নতা অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা। উদাহরণ হিসেবে ব্যানার্জি/বন্দ্যোপাধ্যায়, ঠাকুর/টেগোর, আইচ-আশ, মুহাম্মদ/মোহাম্মদ/মহম্মদ-এর মতো বহুরূপধারী অগণিত পদবি ও নামবাচক শব্দেরও উল্লেখ করা যেতে পারে, যেগুলির বানান এবং উচ্চারণ পৃথক হলেও আদতে সেগুলি অভিন্ন কুল-পরিচায়ক। সুতরাং বাবা-মায়ের নথিতে লেখা নাম এবং পদবির সঙ্গে সন্তানের নথিতে লেখা নাম বা পদবির বানানের ভিন্নতা এখানে মোটেই অস্বাভাবিক নয়। নির্বাচন কমিশন কেন এই সহজ সত্যটি অনুধাবন করতে অসমর্থ হল এবং একটা বিপুল সংখ্যক মানুষকে অহেতুক শুনানি-যন্ত্রণার মধ্যে নিক্ষেপ করল, তা রীতিমতো রহস্যময়।

আসলে গলদটা হয়তো এই এসআইআর-এর লক্ষ্য অস্পষ্টতার মধ্যেই নিহিত রয়েছে। যে কোনও নিরপেক্ষ এবং দায়িত্বশীল নাগরিক নিশ্চয়ই প্রত্যাশা করেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচক তালিকা সংশোধনের সময় এক জন বৈধ নাগরিকও যাতে নিজের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব রকমের সাবধানতা অবলম্বন করা হবে। কিন্তু এসআইআর-এর এই লক্ষ্য পূরণের বিষয়ে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের তরফে জনসচেতনতা প্রসারে অনীহা, এবং সেই সুযোগে রোহিঙ্গা-সহ মুসলমান অনুপ্রবেশকারী বিতাড়ন নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রধান রাজনৈতিক বিরোধী দল বিজেপির নেতা ও সমর্থককুলের ক্রমাগত তর্জন ও হুমকি, সেই সঙ্গে ভোটার তালিকা থেকে কত নাম বাদ যেতে পারে, তার একটা মনগড়া বিরাট সংখ্যা আগাম হাওয়ায় ভাসিয়ে দেওয়ার ফলে পুরো এসআইআর প্রক্রিয়াটি সম্পর্কেই এক ধরনের নেতিবাচক ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে সংখ্যালঘু নাগরিকেরা শুরু থেকেই বিভ্রান্ত, আতঙ্কিত।

এ রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের তরফে দাবি করা হয়েছিল, এসআইআর প্রক্রিয়া আসলে পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যালঘুদের প্রতি প্রতিহিংসামূলক পদক্ষেপের নামান্তর। তথ্যগত অসঙ্গতির অজুহাতে যে নাগরিকেরা শুনানিতে হাজির হওয়ার নোটিস পেয়েছেন, তাঁদের মধ্যে তুলনামূলক ভাবে মুসলমান সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষের সংখ্যা বেশি হওয়ায়, রাজ্যের শাসক দলের সেই অভিযোগই যে প্রকারান্তরে মান্যতা পেয়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

কিন্তু এর চেয়েও বড় অভিযোগ, শুনানির নোটিস যাঁরা পেয়েছেন, তাঁদের মধ্যে বেশির ভাগই বৈধ ভোটার ও নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও নাম-পদবি গরমিলের মতো আপাত-তুচ্ছ কারণে রাষ্ট্রের সন্দেহের তালিকাভুক্ত হয়েছেন। শোনা যাচ্ছে, প্রযুক্তিনির্ভর তথ্য যাচাইয়ের ফলেই এই বিভ্রাট, না হলে বিএলও-দের মাধ্যমে বুথ স্তরেই বহু তথ্যগত অসঙ্গতির নিষ্পত্তি করা সম্ভব হত।

সুতরাং এসআইআর নিয়ে এই রাজ্যের মানুষের মনে যে শঙ্কা ও ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়েছে, তা একেবারেই অমূলক নয়। অপ্রিয় হলেও সত্যি, এই অবস্থায় রাজ্যের শাসক দলের নেতা-কর্মীরাই তথ্যগত অসঙ্গতির জেরে তালিকাভুক্ত আতঙ্কগ্রস্ত মানুষের পাশে দৃশ্যমান ভাবে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছেন। আপাদমস্তক রাজনৈতিক প্রণোদনায় হলেও এই দলীয় সহমর্মিতাকে অবশ্যই বাহবা জানাতে হয়। কিন্তু একই সঙ্গে একটি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগকে পদে পদে বাধা দেওয়া, এবং জনসাধারণের ক্ষোভকে নানা রকম উস্কানিমূলক প্ররোচনা দিয়ে রোষে রূপান্তরিত করাটাও কখনও দায়িত্বশীলতার পরিচয় হতে পারে না। বিশেষ করে বিরোধিতার নামে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে একের পর এক বিডিও অফিসে তাণ্ডব করা, সরকারি আধিকারিকদের গায়ে হাত তোলা, লক্ষ লক্ষ টাকার সরকারি সম্পত্তি ভেঙেচুরে তছনছ করা এবং সরকারি কাজে বাগড়া দেওয়া সন্দেহাতীত ভাবে দণ্ডনীয় অপরাধ।

এই পরিস্থিতিতে প্রশাসনিক ক্লীবতার জেরে এবং দলীয় প্রশ্রয়ে সংঘটিত অপরাধগুলিকে ‘জনরোষের স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ’ বলে যদি অপরাধীরা পার পেয়ে যায়, অথবা আদালতের নির্দেশ সত্ত্বেও অপরাধের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযুক্ত জনপ্রতিনিধি অথবা কর্তব্যে গাফিলতির দায়ে অভিযুক্ত আধিকারিকদের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করা না যায়, তাতে কেবল জাতীয় নির্বাচন কমিশনের দক্ষতা ও ক্ষমতাই প্রশ্নচিহ্নের সামনে দাঁড়ায় না, প্রতিষ্ঠানটির নখদন্তহীন অসহায় ভাবমূর্তিটাও প্রকট হয়ে ওঠে।

এ থেকেই জন্ম নেয় একাধিক আশঙ্কা। সমস্ত প্রতিকূলতা ও বিরোধিতা অতিক্রম করে শেষ পর্যন্ত এই রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের আগে এসআইআর প্রক্রিয়া যথাযথ ভাবে সম্পন্ন হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় তো সৃষ্টি হয়ই— তার চেয়েও বড় হয়ে দেখা দেয় এক ভয়ঙ্কর ত্রাস। নির্বাচক তালিকা সংশোধন করতেই যদি চোখের সামনে জাতীয় নির্বাচন কমিশন এতটা নাস্তানাবুদ হয়, তা হলে হিংসাসঙ্কুল এ রাজ্যের আগামী বিধানসভা নির্বাচন তারা কতটা নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে পারবে, ভাবতে গেলেও হাড় হিম হয়ে আসে। ছোটবেলায় ইংরেজি ব্যাকরণের পাতায় ডাক্তার আসার আগে বা পরে রোগীমৃত্যুর কথা লেখা থাকত, নির্বাচন কমিশন এসআইআর-এর দায়িত্ব নেওয়ার পরেও পশ্চিমবঙ্গে নাগরিকতন্ত্র সুস্থ, জীবিত থাকছে কি!

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

SIR

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy