E-Paper

উচ্চশিক্ষায় কেন এই অনাগ্রহ

অভিজ্ঞতা বলছে, উচ্চশিক্ষার ডিগ্রি অর্জনে বাঙালির আগ্রহ শেষের পথে। সরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিপুল সংখ্যক আসন শূন্য। অথচ কয়েক বছর আগেও প্রায় গায়ের জোরে আসন বৃদ্ধিই ছিল রেওয়াজ।

আকাশ বিশ্বাস

শেষ আপডেট: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ ০৬:৩৫

উত্তরবঙ্গের একটি কলেজের অধ্যক্ষ সমাজমাধ্যমে জানিয়েছেন, এ রাজ্যে নতুন শিক্ষা নীতি ২০২০ চালু হওয়ার বছর, অর্থাৎ ২০২৩-এ তাঁর কলেজে প্রথম সিমেস্টারে পরীক্ষা দিতে নথিভুক্ত হয় ৩৬৪২ জন ছাত্রছাত্রী। ভর্তি হয়েছিল তারও বেশি। এক বছর পর, তৃতীয় সিমেস্টারে সংখ্যাটা দাঁড়ায় ২০৩৬; পঞ্চম সিমেস্টারে ১৪৬৯। ফেল করায় বা ব্যাক পাওয়ায় সংখ্যা কমেছে, এমন নয়। যত খুশি ফেল করেও পঞ্চম সিমেস্টার পর্যন্ত পরীক্ষা দিয়ে যাওয়ায় বাধা নেই কোনও।

অভিজ্ঞতা বলছে, উচ্চশিক্ষার ডিগ্রি অর্জনে বাঙালির আগ্রহ শেষের পথে। সরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিপুল সংখ্যক আসন শূন্য। অথচ কয়েক বছর আগেও প্রায় গায়ের জোরে আসন বৃদ্ধিই ছিল রেওয়াজ। কলেজগুলো আতান্তরে; ছাত্রশূন্যতার অজুহাতে বিভাগ লোপ, শিক্ষক স্থানান্তর ও পর্যায়ক্রমে কলেজের ‘ক্লাস্টার’ তৈরি বা সংযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির ভবিতব্যও স্পষ্ট।

তার আগে পর্যন্তই বা চলে কী ভাবে! এখন প্রথম সিমেস্টার বা ষাণ্মাসিকে ভর্তির টাকাও জমা হয় কেন্দ্রীয় পোর্টালে। সে-টাকা বিলম্বে হাতে আসে কলেজগুলির। স্বাভাবিক ভাবেই উপায়, প্রতিষ্ঠান পরিচালনা খাতে ফি বৃদ্ধি। ব্যয়ও নিত্য বর্ধমান। কোথাও অল্প, কোথাও ব্যাপক পরিকাঠামো তৈরি প্রয়োজন। বিভাগ চালু রাখার প্রয়োজনে ‘রিসোর্স পার্সন’, ‘ভিজ়িটিং ফ্যাকাল্টি’ নামে কলেজ বাধ্য হচ্ছে শিক্ষক নিয়োগে; নামমাত্র হলেও ‘সাম্মানিক’ প্রদানে। শৌচালয় পরিষ্কার রাখার কর্মী জোগাড়ও এখন চিন্তার। অ-শিক্ষক কর্মী-সঙ্কট চরমে। ছাত্র ভর্তি না হলে, ভর্তি হয়েও শেষ পর্যন্ত না থাকলে রেস্ত জোগাড় হবে কী করে?

যারা কলেজে ভর্তি হচ্ছে, তাদের একটা বড় অংশের স্কুলে যাওয়ার অভ্যাসই চলে গেছে অষ্টম বা নবম শ্রেণি থেকে— অভিভাবকদের অনুমতিক্রমেই। টিউশন পড়ার দায়ে, আর বাড়ি বসে পড়লে মাধ্যমিকের ভাল প্রস্তুতি সম্ভব— এই বিশ্বাসে। বহু অভিভাবক মাধ্যমিকের পর এমন স্কুল খুঁজে বেড়াচ্ছেন যেখানে হাজিরার বাধ্যবাধকতা নেই, নইলে সন্তান ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হবে কী করে! ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হতে পারেনি কিন্তু স্কুলে না-যাওয়ার অভ্যাস রপ্ত করছে, এমন বিরাট এক অংশ পড়তে আসছে কলেজে। বিভিন্ন কারণে মিলছে রাজ্য সরকারি বৃত্তি, যার সঙ্গে লেখাপড়ার সংযোগ ক্ষীণ। প্রয়োজন মিটলেই কলেজমুখো হওয়া থেকে চিরবিরত হচ্ছে একটা অংশ।

বাকিদের একটা অংশ পড়ার পাশাপাশি যুক্ত হচ্ছে পেটের সংগ্রামে। অসংগঠিত শ্রম-বাজারে যত দেরিতে ঢোকা যায়, পিছিয়ে পড়তে হয় ততই। কিছু না করে শুধু স্নাতক স্তরে পড়া এদের কাছে বিলাসিতা। অনেকে চলে যাচ্ছে কর্মমুখী শিক্ষায়। কিন্তু স্নাতক, স্নাতকোত্তর, বি এড, নেট সেট গেট, পি এইচডি করেও স্কুল-কলেজে কবে ও কী ভাবে শিক্ষকতার চাকরি অর্জন সম্ভব, কেউ জানে না।

বাড়ছে শিক্ষার নানা খরচও। নতুন শিক্ষানীতিতে পঞ্চম সিমেস্টারে ইন্টার্নশিপ, ভোকেশনাল পড়তে হচ্ছে তৃতীয়, পঞ্চম ও ষষ্ঠে। বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই এই ব্যয় নির্বাহ হচ্ছে ছাত্রদের থেকে অতিরিক্ত অর্থ সংগ্রহের মাধ্যমে। সিবিসিএস পদ্ধতি থেকেই পাঠক্রম মস্ত গোলকধাঁধায় পরিণত হয়েছিল, নয়া শিক্ষানীতিতে পরিস্থিতি আরও ঘোরালো। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিণত হচ্ছে নথিভুক্তিকরণ ও পরীক্ষাগ্রহণ কেন্দ্রে, শিক্ষকেরা পরীক্ষা-সহায়ক কর্মীতে। রক্ষা করা যাচ্ছে না সিমেস্টার শুরু-শেষের সময়সূচি। ক্লাসের সময় বাস্তবে বড়জোর মাস তিন। অথচ প্রতি সিমেস্টারে ৭টি পেপার, সঙ্গে ইন্টার্নশিপ। মেজর, মাইনর, এইসি, এসইসি, ভাষা শিক্ষা, ভ্যালু-অ্যাডেড কোর্স, পরিবেশ, সংবিধান— প্রস্তুতি নিয়ে পড়াতে ও পড়তে যাওয়া দূরস্থান, কখন কোন ক্লাস মনে রাখাই মুশকিল। কোনও সিমেস্টারে মেজর-এর থেকে অন্য বিষয়ই মুখ্য। উপযুক্ত পরিকাঠামোর অভাবে ক্ষেত্রবিশেষে ভরসা অনলাইন, ভিডিয়ো শিক্ষা।

আর উপস্থিতির কড়াকড়ি? অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে পড়ুয়াদের উপস্থিতির জন্য ধার্য ৫ নম্বর। অথচ একটি ক্লাসে উপস্থিত না থাকলেও শূন্য দেওয়ার জায়গা নেই, দিতে হবে কমপক্ষে ২। অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা যা খুশি দিলে, ক্ষেত্রবিশেষে না দিলেও ১০ বা ১৫-র মধ্যে ৮০, ৯০% পেয়ে যাওয়াটা প্রায় মান্য রীতি। অনেক ক্ষেত্রে মূল পরীক্ষারও দু’-একটি পত্রের খাতা দেখা ও নম্বর তোলার কাজ হচ্ছে পরীক্ষার্থীর হোম সেন্টারে। অন্য দিকে, মূল প্রশ্নপত্রের সামান্য অংশ বর্ণনাধর্মী প্রশ্নোত্তর, সংক্ষিপ্ত, অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্নের দৌলতে উতরে যাওয়া সহজ।

ঝাঁ-চকচকে ইংরেজি মাধ্যম স্কুল থেকে এসে ভর্তি হওয়া ছাত্রছাত্রীদের মনে সরকারি পরিকাঠামো তৈরি করছে এক বিরূপ প্রতিক্রিয়া। কেন্দ্রীয় সরকারি অর্থানুকূল্য বহু দিন অন্তর্হিত, অন্তত রাজ্য সরকারের অধীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির ক্ষেত্রে। ফলে, পরিকাঠামোর উন্নতিও প্রায়-অসম্ভব ইউজিসি-সেমিনার, মেজর-মাইনর রিসার্চ প্রোজেক্ট ইত্যাদিও লুপ্ত, মেধাচর্চার শর্তে যারা গড়ত ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কসেতু। বন্ধুত্বও কলেজে উপস্থিতির মুখাপেক্ষী নয় এখন: পড়ুয়াদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত আসার উৎসাহ হারিয়ে ফেলার সেও হয়তো এক কারণ। একটা অংশ নিয়মিত আসত ছাত্র-রাজনীতির আকর্ষণে, তার প্রাতিষ্ঠানিক অস্তিত্বও দীর্ঘ দিন বিলুপ্ত। সব মিলিয়ে, সরকারি-আধা সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি কাছে টানতে পারছে না পড়ুয়াদের। সরকারও কি এমনটাই চায়?

বাংলা বিভাগ, শ্রীগোপাল ব্যানার্জি কলেজ

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Higher education Education system West Bengal government

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy