সালটা ১৮০৬। স্থান মেদিনীপুরের হিজলি সল্ট এজেন্টের কাছারি। কাছারির কর্ণধার ম্যাসনকে ঘেরাও করে বিক্ষোভ জানাচ্ছেন শ’তিনেক মৃতপ্রায় লবণ শ্রমিক। দাবি না মানলে আগের এজেন্টের মতো সরে যেতে হবে ম্যাসনকেও। এজেন্ট তাঁর আগের লবণ-কর্তার হাল জানতেন। তাই নীরবেই বিক্ষোভ সহ্য করেন তিনি। ১৯৩০ সালের ৬ এপ্রিল ভারত জুড়ে লবণ সত্যাগ্রহ হয়। তার ১২৫ বছর আগে বাংলার কিছু হতদরিদ্র, নিরক্ষর শ্রমিক দাবি আদায়ের লক্ষে বিদ্রোহ করেছিলেন। 

কেন বিদ্রোহ? লবণ তখন ছিল ব্রিটিশদের লাভের ব্যবসার অন্যতম পথ। লবণ বাংলার অন্যতম প্রাচীন শিল্প। বাংলায় উৎপাদিত লবণের অর্ধেকেরও বেশি পাওয়া যেত তমলুক, হিজলি অঞ্চল থেকে। লবণ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল জ্বালানির জোগান দিত তমলুক, মহিষাদলের জালপাই বা অরণ্যভূমি। লবণ উৎপাদন কেন্দ্রকে খালাড়ি বলা হত। শ্রমিকেরা হলেন মলঙ্গি। এঁদের দু’টো ভাগ, আজুড়া ও ঠিকা। উৎপাদনের মরসুমে পুরো সাত মাস মলঙ্গিদের থাকতে হত খালাড়িতে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে। প্রাচীন কাল থেকেই উপকূল সংলগ্ন অঞ্চলের দরিদ্র মলঙ্গিরা স্বাধীন ভাবে লবণ তৈরি করতেন। 

অবস্থা খারাপ হতে থাকে ১৭৬৫ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া দেওয়ানি পেয়ে লবণ ব্যবসার একচেটিয়া অধিকার পাওয়ার পরে। নতুন ব্যবস্থায় লবণ তৈরি ও বিপণনে বেআইনি কারবার বৃদ্ধি পেলে মলঙ্গিদের দুরবস্থা বাড়ে। আবার কোম্পানির রাজস্বও কমে যায়। রাজস্ব বাড়াতে কোম্পানি এক একটি অঞ্চলকে কয়েকটি এজেন্সিতে ভাগ করে। এজেন্সির দায়িত্ব পান একজন সল্ট এজেন্ট। গঠিত হয় ‘সল্ট ডিপার্টমেন্ট’। আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মলঙ্গিদের উপরে অত্যাচার বাড়ে। হিজলির সল্ট এজেন্ট টমাস কালভার্ট, হিউয়েট, চার্লস চ্যাপম্যান, ফার্কুহার্সন ছিল প্রচণ্ড অত্যাচারী। এরা মাসিক বেতন ছাড়াও বছরে কয়েক লক্ষ টাকা কমিশন পেত। আরও বেশি কমিশনের জন্য বেশি টাকা দাদন দিয়ে উৎপাদন বাড়াতে মলঙ্গিদের উপরে চাপ বাড়ানো হত। কখনও বেঁধে পাঠিয়ে দেওয়া হত সুন্দরবনের খালাড়িতে। পালিয়ে গেলেও দরে নিয়ে আসা হত।

এমন অসহনীয় অবস্থায় শ্রমিকদের বিদ্রোহ করাই স্বাভাবিক। ফলে ১৭৮৬-১৮০৬ সাল পর্যন্ত চারবার বিদ্রোহ করেন শ্রমিকরা। দাবি ছিল, আজুড়া প্রথার দাসত্ব থেকে মুক্তি, ঠিকা মলঙ্গিদের হারে লবণের দাম, লবণের দাম বাড়ানো এবং ওজন-সহ কারচুপি বন্ধ করা। প্রথমে মলঙ্গিরা শিক্ষিত কোনও স্থানীয় ব্যক্তিকে দিয়ে আবেদন লিখিয়ে স্থানীয় এজেন্ট এবং কলকাতার কর্তাদের কাছে পাঠাতেন। তাতে কাজ হত না। মলঙ্গিদের একজোট করতে শুরু করেন বলাই কুণ্ডু, পরমানন্দ সরকার বা প্রেমানন্দ সরকারের মতো কয়েকজন। তাঁরা লবণ ব্যবসার হাল জানতেন। তাঁরা বুঝতে পারেন সংঘবদ্ধ করতে না পারলে দাবি আদায় করা যাবে না।

বলাই কুণ্ডুর নেতৃত্বে আন্দোলন শুরু হয় ১৭৯৫ সালের অক্টোবরে। তার আগেও বিদ্রোহ হয়েছে। আন্দোলনের প্রভাব দেখে কর্তৃপক্ষ সমস্যা নিয়ে খোঁজখবর করতে থাকে। ইড়িঞ্চি পরগনা, জলামুঠা পরগনার তদন্তে উঠে আসে মলঙ্গিদের দুঃসহ জীবন। তার আগে ১৭৯০ সালে কম্পট্রোলার গ্রিন্ডাল ইড়িঞ্চি পরগনা পরিদর্শনে এসে প্রতিশ্রুতি দেয়, ঠিকা মলঙ্গিদের আজুড়ি মলঙ্গিদের মতোই দাম দেওয়া হবে। সরকার ঘোষণা করেছিল, তুলে দেওয়া হবে আজুড়িয়া প্রথা। কিন্তু জমিদারদের আপত্তিতে দু’টোই স্থগিত হয়ে যায়। ১৯৮৩ সালে হল চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। ১৭৯৪ সালে আবার এল আজুড়াদের মুক্তির বিষয়টি। সরকার জমিদারদের হাত থেকে নিমকমহাল খাসে নিয়ে নিলে মলঙ্গিদের দুর্দশা আরও বাড়ে। এখন থেকে এজেন্টরাই হলেন সর্বেসর্বা। দারোগা, কেরানি, কয়াল প্রমুখের অত্যাচারে অতিষ্ঠ শ্রমিকেরা বলাই কুণ্ডুর শুরু করে তৃতীয় বারের সংগ্রাম। এক লিখিত আবেদনে এজেন্টকে জানিয়ে দেওয়া হয়, জুলুম বন্ধ না হলে তাঁরা ধর্মঘট করবেন। এজেন্ট চ্যাপম্যান নির্দেশ দিল মলঙ্গিদের আটকে রাখতে।

৪-৫ দিন আটক, অত্যাচারেও মলঙ্গিদের দমানো যায়নি। ঘটনার বিবরণ জানিয়ে বলাই কুণ্ডু আবেদন পাঠান সল্ট বোর্ড, কলকাতায়। বোর্ড চ্যাপমানের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে সে প্রথমে বিষয়টি অস্বীকার করে। পরে জানায়, বলাই কুণ্ডু লবণ উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত নন। কয়েকজন আত্মীয়কে কেরানি হিসেবে কাজে ঢোকাতে না পেরে কিছু অলস মলঙ্গিকে নিয়ে সমস্যা তৈরি করছেন। বিভেদ ঘটাতে ষড়যন্ত্র শুরু করে চ্যাপম্যান। বলাই কুণ্ডুর বিরুদ্ধে সাজানো অভিযোগ এনে দরখাস্ত পাঠায় বোর্ডের কাছে। বলাই আন্দোলন থেকে সরে যান। 

এর কিছুদিন পরে মলঙ্গিদের সংগঠিত করেন পরমানন্দ সরকার। সহযোগী তাঁর ভাই পাওল কুটিবা। সেই সময়ে হিজলির সল্ট এজেন্ট ফার্কুহার্সন। তার কাছে প্রতিকার জানাতে গিয়ে বাড়ল নির্যাতন, কয়েদ। পরমানন্দ কৌশল বদলালেন। দুর্গম হিজলি থেকে বেশ কিছু মলঙ্গি কলকাতায় এসে বোর্ডের কাছে দাবি জানাতে থাকেন। প্রাথমিক সাফল্যও মেলে। চিফ সেক্রেটারি মলঙ্গিদের পক্ষে বেশ কয়েকটি নির্দেশ দেন। এর মধ্যে একটা ঘটনা ঘটে। কলকাতায় আসার পথে ভুবন মাইতি নামে এক মলঙ্গির মৃত্যু হয়। সম্ভবত ভুবনই ভারতের শ্রমিক বিদ্রোহের প্রথম শহিদ। তবে চিফ সেক্রেটারির আদেশ স্থানীয় কর্মীদের জন্য কার্যকর হয়নি। ফলে আবার পরমানন্দের নেতৃত্বে প্রায় ৩০০ মলঙ্গি ফার্কুহার্সনের কাছারি ঘিরে বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন আদেশ কার্যকরের জন্য। না হলে তাঁরা কাজ করবেন না। আবার শুরু হয় নির্যাতন। মলঙ্গিরা প্রথমে বোর্ডকে, পরে মেদিনীপুরের ম্যাজিস্ট্রেটকে বিষয়টি জানান। দুই কর্তৃপক্ষই জবাব চান এজেন্টের কাছে। প্রথমে অস্বীকার, তারপর ফার্কুহার্সন জানায়, বিষয়টি মিটিয়ে ফেলা হয়েছে আগেই। পরমানন্দের অনুগামীর সংখ্যা সামান্যই। তাঁরা বিদ্রোহ করলেও কোম্পানির ক্ষতি হবে না। 

৩০-০১-১৮০৪ তারিখে ম্যাজিস্ট্রেটকে এজেন্ট জানায়, পরমানন্দ এবং তাঁর ভাই লবণ উৎপাদনে যুক্ত নন। অথচ তাঁদের প্ররোচনাতেই বিদ্রোহ হচ্ছে। তাঁকে গ্রেফতার করলেই বিদ্রোহীরা কাজে যোগ দেবেন। এবারও সাজানো রিপোর্টের কৌশল। কিন্তু বোর্ড অব ট্রেড ফার্কুহার্সনকে সরিয়ে দেয়। ১৮০৬ সালে তমলুকের এজেন্ট ম্যাসন এজেন্ট হন। ম্যাসন ৬ মে বোর্ডের প্রেসিডেন্টের কাছে পরমানন্দ ও মলঙ্গিদের সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করে রিপোর্ট পাঠান। কিন্তু মলঙ্গিদের দুর্দশা দূর করার কোনও ব্যবস্থা নেননি। হতদরিদ্র মলঙ্গিদের নিয়ে হিজলি, কলকাতা, মেদিনীপুর ছোটাছুটি করে অসমসাহসী পরমানন্দের সংগ্রাম চলতেই থাকে। পরমানন্দদের বিদ্রোহ হিজলি বিভাগেই সীমাবদ্ধ ছিল। কারণ তমলুক এজেন্সির মলঙ্গিরা অনেকটাই স্বস্তি পেয়েছিলেন আঠারো শতকের শেষ দিকে। 

তবুও বলাই কুণ্ডু, পরমানন্দদের লড়াইকে সম্মান জানাতে হয়। অনেকে মনে করেন, হিজলির লবণ বিদ্রোহই দেশের প্রথম শ্রমিক বিদ্রোহ। ১৮৬২-৬৩ সালে লবণ ব্যবসা থেকে সরে আসে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি।

লেখক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক