কর্নাটকের প্রখ্যাত নাট্যপরিচালক এস রঘুনন্দন এ বারের সঙ্গীত নাটক অকাদেমির পুরস্কার-প্রাপক, কিন্তু তিনি তাহা গ্রহণ না করিয়া ফিরাইয়া দিয়াছেন। গৌরবময় জাতীয় পুরস্কার ফিরাইয়া দিবার সময় একটি জরুরি কথা তিনি বলিয়াছেন— ইহা প্রতিবাদ নহে, এই সিদ্ধান্ত তিনি লইয়াছেন তীব্র হতাশা ও অসহায়তার কারণে। দেশ জুড়িয়া ব্যাপ্ত অসহিষ্ণুতার পরিবেশ দেখিয়াই তাঁহার এই সিদ্ধান্ত। ধর্মের নাম করিয়া বিদ্বেষ ছড়ানো হইতেছে, এমনকি খাদ্যের ভিত্তিতে হানাহানি, গণপ্রহার সংঘটিত হইতেছে— এ সব তাঁহাকে এতই ব্যথিত করিয়াছে যে পুরস্কার গ্রহণের ইচ্ছা তাঁহার নাই। প্রসঙ্গত, ইতিপূর্বেও শিল্পী-সাহিত্যিকরা জাতীয় পুরস্কার ফিরাইয়া দিয়াছেন, কিন্তু তাঁহাদের সহিত রঘুনন্দনের বক্তব্যের তফাত এইখানেই যে প্রতিবাদের বদলে অসহায়তার উপর জোর দিয়াছেন তিনি। আরও একটি দুর্ভাগ্যের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছেন: বুদ্ধিজীবী ও সমাজকর্মীরা যে ভাবে নিহত হইতেছেন, কারাগারে নিক্ষিপ্ত হইতেছেন, সে বিষয়ে। অসহায়তার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁহার এই শেষ বক্তব্যটি বিশেষ মনোযোগ দাবি করে। 

বিজেপির শাসনে ভারতীয় রাষ্ট্রের দমন-প্রবণতা এখন অত্যন্ত প্রবল। কেন নূতন করিয়া নিরাপত্তা আইনগুলিকে কঠোরতর করা হইতেছে, প্রশ্ন উঠিবে। বর্তমান আইন দিয়া কি যথেষ্ট নিরাপত্তাদান সম্ভব হইতেছে না? কাশ্মীরকে বাদ রাখিলে, গোটা দেশে কি নিরাপত্তা এতটাই বিঘ্নিত যে নূতন আইন লাগিবে? সংসদে একটি বিল পাশ হইয়াছে, আর একটি পেশ হইয়াছে। পাশ হওয়া জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা (সংশোধনী) বিল ও প্রস্তাবিত ইউএপিএ (সংশোধনী) বিলের অভিমুখ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও জোরদার করিবার দিকে। দেশের নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা প্রশ্নাতীত। কিন্তু, পরিস্থিতি কি এমনই ভয়াবহ যে কোনও সংগঠনের সহিত সংযোগহীন ব্যক্তিকেও ‘সন্ত্রাসবাদী’ হিসাবে চিহ্নিত করিবার অধিকার দাবি করিতে পারে রাষ্ট্র? কাশ্মীরে সশস্ত্র বাহিনীকে বিশেষ ক্ষমতাদায়ী আফস্পা অনন্ত কাল ধরিয়া চলিয়াছে। তাহার ফল কতখানি ইতিবাচক হইয়াছে, আপাতত সেই আলোচনা বকেয়া থাকুক। কিন্তু অবশিষ্ট ভারতে এত তীব্র দমনমূলক আইনের প্রয়োজন কী কারণে, নাগরিক প্রশ্ন তুলিতে পারেন। এবং প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর না মিলিলে ভাবিতে পারেন যে, রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ববাদ মাত্রা ছাড়াইতেছে। 

সাম্প্রতিক জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা (সংশোধনী) বিল বা এই গোত্রের আইনের রাজনৈতিক অপব্যবহার হইবার সম্ভাবনা থাকে বিপুল। বস্তুত গত কয়েক বৎসরে, সিবিআই হইতে ইডি, অথবা আয়কর বিভাগ, কার্যত প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই যে ভাবে বিরোধী কণ্ঠস্বর দমন করিতে ব্যবহৃত হইয়াছে, তাহাতে ভয় হইতে পারে, এনআইএ-র বর্ধিত অধিকারসীমাও একই ভাবে ব্যবহৃত হইবে না। বর্তমানে এ দেশে শাসকের বিরোধিতার সহিত রাষ্ট্রের বিরোধিতার মধ্যে ফারাক ক্রমে মিলাইয়া যাইতেছে। সুতরাং আইনকে আরও দমনমূলক করিয়া তোলার বিপদ কোথায়, বুঝিতে সমস্যা নাই। এই কঠোরতর আইনের হাতে বলি হইতে পারে নাগরিকের মতপ্রকাশের অধিকার অর্থাৎ গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা। ভুলিলে চলিবে না, প্রতিস্পর্ধী কণ্ঠস্বর কিন্তু নাগরিক স্বাধীনতারই একটি প্রকার। রাষ্ট্র যদি অন্যায় করে, তাহা হইলে নাগরিক সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করিতেই পারেন, সেই বিবেচনা নাগরিকদের উপরেই ছাড়িতে হইবে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় সাঁড়াশি আরও চাপিয়া বসিলে বিবেচনার অবকাশগুলিও ক্রমে কমিয়া আসিবে। ইহা কোনও ভাবেই সমর্থনীয় নহে। সুতরাং, কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বিল পাশ করাইলেই চলিবে না, বর্তমান আইনের কঠোরতর সংশোধন লাগিবে কেন, তাহা ব্যাখ্যা করিবার দায় কেন্দ্রীয় সরকারের উপরই বর্তায়।

এবার শুধু খবর পড়া নয়, খবর দেখাও।সাবস্ক্রাইব করুনআমাদেরYouTube Channel - এ।