অরাজক ছাড়া আর কী বলা যেতে পারে এই পরিস্থিতিতে? নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রোগী মৃত্যুর জেরে হামলা হল জুনিয়র চিকিৎসকদের উপরে। দুই জুনিয়র চিকিৎসক গুরুতর জখম হলেন, একজনকে বড়সড় অস্ত্রপচারের মধ্যে দিয়ে যেতে হল। তার পর থেকেই ক্ষোভে উত্তাল চিকিৎসকরা। নীলরতন সরকার হাসপাতালে তো বটেই, অন্যান্য মেডিক্যাল কলেজেও জুনিয়র চিকিৎসকরা কর্মবিরতিতে চলে গেলেন মঙ্গলবার। ক্রমে সিনিয়ররাও আন্দোলনের পাশে দাঁড়ালেন। চিকিৎসকদের নিরাপত্তার দাবিতে আজ অর্থাৎ বুধবার গোটা রাজ্যে সব সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কর্মবিরতিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন চিকিৎসকরা। জরুরি পরিষেবা বিভাগ হয়তো চালু রাখার চেষ্টা হবে। কিন্তু দিনভর রাজ্যের সব সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে সাধারণ চিকিৎসা পরিষেবা বন্ধ থাকলে পরিস্থিতি কতটা সঙ্কটজনক হয়ে উঠতে পারে, তা কল্পনা করলেই আতঙ্কিত হতে হচ্ছে।

কেন তৈরি হল এইরকম পরিস্থিতি? হাসপাতালে হামলা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসন উপযুক্ত পদক্ষেপ করল না কেন? যে কোনও মৃত্যুই বেদনাদায়ক এবং দুঃখজনক। কিন্তু রোগীর মৃত্যু হওয়ায় চিকিৎসকদের উপরে ভয়াবহ আক্রমণ নেমে আসবে, এ কেমন কথা! হামলাকারীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপই বা প্রশাসন করবে না কেন?

রাজ্য জুড়ে চিকিৎসকরা একযোগে কর্মবিরতিতে গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। কিন্তু হাসপাতালে হাসপাতালে চিকিৎসকদের নিরাপত্তার অভাব যে যথেষ্টই, সে কথা অস্বীকার করা যাবে কীভাবে! হাসপাতালে রোগীর মৃত্যু হলে চিকিৎসকদের উপর হামলার ঘটনা বারবার সামনে আসছে। মৃতের পরিজনদের হাতে জুনিয়র ডাক্তারদের আক্রান্ত হওয়ার দৃশ্য প্রায়শই আমাদের বিচলিত করে তুলছে কিন্তু এর কোনও সুরাহা খুঁজে বার করতে পারছে না প্রশাসন। সুরাহা খোঁজায় প্রশাসনের যে খুব একটা আগ্রহ রয়েছে, তাও মনে হচ্ছে না।

সম্পাদক অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা আপনার ইনবক্সে পেতে চান? সাবস্ক্রাইব করতে ক্লিক করুন

সোমবার যে ভাবে আক্রান্ত হয়েছেন হবু ডাক্তাররা, তা নিয়ে রাজ্যের স্বাস্থ্য দফতর বা রাজ্য প্রশাসন আদৌ কি খুব একটা বিচলিত ছিল? বিচলিত যদি হত, তাহলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ কি হতো না? মঙ্গলবার জুনিয়র চিকিৎসকরা হাসপাতাল অচল করে দেওয়ার পরে সরকারের টনক সামান্য নড়ল। চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, নির্মল মাজিরা পরিস্থিতি সামাল দিতে ময়দানে নামলেন। আলোচনার মাধ্যমে সমাধান সূত্রে পৌঁছনোর চেষ্টা হচ্ছে বলে শোনা গেল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনও ফলপ্রসূ আলোচনার খবর পাওয়া গেল না। চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যদের ঘিরেই বরং শুরু হয়ে গেল বিক্ষোভ। রাজ্যের স্বাস্থ্যক্ষেত্র কি আদৌ সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে আর? অরাজকতার ছবিটা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে না কি? এই অরাজক পরিস্থিতির জন্য রাজ্য প্রশাসন ছাড়া আর কাউকে দায়ী করা কি সম্ভব?

আরও পড়ুন: করোটি তুবড়ে ঢুকে গিয়েছে ভিতরে, আপাতত বিপন্মুক্ত এনআরএসের জুনিয়র ডাক্তার পরিবহ

নিয়ন্ত্রনহীনতার লক্ষণ কিন্তু শুধু কোনও একটি ক্ষেত্রে নয়। রাজ্য জুড়ে অবাধ রাজনৈতিক হিংসা এবং একের পর এক প্রাণহানি প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে। শিক্ষাঙ্গনগুলিতেও নৈরাজ্যের আভাস মিলতে শুরু করেছে। সরকারি কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের আঁচ এবং তার বহিঃপ্রকাশ ক্রমবর্ধমান। এবার স্বাস্থ্য বিভাগেও বিদ্রোহের ভঙ্গি যেন। এইসব লক্ষণ কিন্তু মুষ্টি শিথিল হওয়ার। কী ভাবে এর মোকাবিলা করা যাবে, কী ভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে, যে সব সমস্যার প্রেক্ষিতে এই সঙ্কটের উদ্ভব, সে সব সমস্যার নিরসন কী ভাবে ঘটানো যাবে— রাজ্য প্রশাসনকেই তা ভাবতে হবে। সময়ও কিন্তু অঢেল নেই। প্রকৃত প্রশাসকের ভূমিকা নিয়ে উপযুক্ত এবং কাঙ্খিত পদক্ষেপগুলো এখনই করা শুরু না হলে সঙ্কট গভীরতর হওয়ার আশঙ্কা থাকছে।