Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৭ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

প্রবন্ধ

আমাদের কিংকর্তব্যবিমূঢ় বামেরা

পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থীরা এখনও ন যযৌ ন তস্থৌ। কেবল থেকে থেকে বলছেন ‘মিশটেক মিশটেক’। করার কিন্তু অনেক কিছুই ছিল, আছে। বলছেন ইউনিভার্সিটি অব ক্য

২১ জুলাই ২০১৫ ০০:৪৬
খুঁজি খুঁজি... (বাঁ দিক থেকে) বিমান বসু, সূর্যকান্ত মিশ্র, সীতারাম ইয়েচুরি। আলিমুদ্দিন স্ট্রিট, জুন ২০১৫। ছবি: সুদীপ্ত বন্দ্যোপাধ্যায়।

খুঁজি খুঁজি... (বাঁ দিক থেকে) বিমান বসু, সূর্যকান্ত মিশ্র, সীতারাম ইয়েচুরি। আলিমুদ্দিন স্ট্রিট, জুন ২০১৫। ছবি: সুদীপ্ত বন্দ্যোপাধ্যায়।

ভারতে ও পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থীদের ভবিষ্যত্‌ সম্পর্কে বিশেষ ভরসা হয় না। এটা কেন হল?

বামপন্থীদের তো সমস্ত ভারতবর্ষেই নিদারুণ অবস্থা। ত্রিপুরা আর কেরল ছাড়া অন্যত্র মনে হচ্ছে বামপন্থা যেন একেবারে শেষ পর্যায়ে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের দিকে তাকালে মনে হয় কেমন একটা ভগ্ন, ক্লান্ত অবস্থা। নেতারা অনেকে বয়স্ক, কেউ কেউ অসুস্থ। কিন্তু বিশেষ করে দেখা যাচ্ছে, সবারই কেমন একটা দিশাহারা ভাব। আমার মনে হয় এই দিশার দিকটা নিয়ে একটু চিন্তা করা দরকার। পশ্চিমবঙ্গের পরিপ্রেক্ষিতে তো এটা জরুরি বটেই, সমস্ত ভারতবর্ষে যা ঘটছে, এই দক্ষিণপন্থী এবং মৌলবাদীদের রমরমা, তাতে একটা প্রতিরোধের দরকার, যেটা কেবল স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান বা এনজিও’দের দিয়ে হবে না। এনজিও’রা অনেকে খুব ভাল কাজ করছে, কিন্তু তাদের তো গণ সংগঠন নেই। গণ সংগঠন ছাড়া এই দক্ষিণপন্থা, এই মৌলবাদকে প্রতিরোধ করা যাবে না। সেই জন্যে বাম সংগঠনের পুনরুজ্জীবনের ভীষণ প্রয়োজন। পশ্চিমবঙ্গে তো বিশেষ করে। এই রাজ্যে বাম সংগঠন এখন ভীষণ দুর্বল।

Advertisement

ওঁদের নতুন করে চিন্তা করা দরকার।

ওই চিন্তা করার কথা বললেই বামপন্থী নেতারা দুটো জিনিস বলেন। একটা হল, ‘আমাদের কিছু কিছু কৌশলগত অ্যালায়ান্স করতে হবে, দেখতে হবে কার সঙ্গে জোটা যায়,’ ইত্যাদি। আর বলেন, ‘তৃণমূলের সন্ত্রাস’। আর হ্যাঁ, মাঝে মাঝেই বলেন, ‘আমাদের কিছু ভুল হয়েছিল’। কিন্তু জনসাধারণের কাছে পরিষ্কার নয়, ভুলটা ঠিক কী। জনসমক্ষে বলা উচিত, এই এই ভুল হয়েছিল। এবং এটা বলেও লাভ নেই যে, ‘সেই সব ভুল নিয়ে পার্টির ভেতর আলোচনা হচ্ছে।’ ও-সব ছেঁদো কথা আর কেউ শুনতে চায় না। সব কিছু খোলাখুলি আলোচনা করতে হবে, বিচার করতে হবে। বামপন্থী নেতাদের ওই ‘ভুল হয়েছিল’ শুনলে আমার সোনার কেল্লা-র সেই বাচ্চাটার কথা মনে পড়ে, দুষ্টু লোকেরা যাকে ভুল করে তুলে নিয়ে গিয়েছিল, তাদের কাহিনি শোনাতে গিয়ে সে বলেছিল, ‘মিশটেক, মিশটেক’! মাঝে মাঝে মনে হয়, এঁরাও যেন মাথা নেড়ে বলছেন, ‘মিশটেক, মিশটেক’। মানুষ যখন এই মিসটেকটা শোনেন, তাঁরা ভাবেন, সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম নিয়েই বোধহয় এঁদের আফশোসটা হচ্ছে। হ্যাঁ, সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম নিয়ে ভুল ওঁদের হয়েছিল। কিন্তু সেটা একটা ছোট অংশ।



এ বিষয়ে আপনারা সমীক্ষা করেছেন...

আমরা নব্বইটা গ্রাম নিয়ে বড় সমীক্ষা করে বোঝার চেষ্টা করেছি কেন বামপন্থীরা হারল। তাতে দেখেছি, সিঙ্গুর থেকে যত দূরে যাচ্ছি, ভোটের ফলাফলের ক্ষেত্রে সেখানকার ঘটনার গুরুত্ব ততই কমে আসছে। অর্থাত্‌ ওই ঘটনা দিয়ে গোটা রাজ্যের ফল ব্যাখ্যা করা যায় না। তবে যেটা সব জায়গায় উঠে আসে, তা হল এদের দৌরাত্ম্য, দম্ভ, তোলাবাজি, বিশেষ করে স্থানীয় স্তরে। এই একটা পার্টি, যার একটা শৃঙ্খলা ছিল। সেটা নষ্ট হয়ে গেল, লোকাল কমিটির আর সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বাড়তেই লাগল। এর ফলে সারা রাজ্যের মানুষ অত্যন্ত ক্ষুব্ধ। ‘তৃণমূলের সন্ত্রাস’ বললে তাঁরা বলেন, ‘তোমরাই বা কী এমন কম করেছ?’ আর সংগঠন? ওই মাস্তানরা এখন দল ছেড়ে দিয়ে অন্য পার্টিতে চলে গেছে। আগে যারা লোকাল কমিটি করত, এখন তাদের অনেকে তৃণমূলের ছাতার তলায় সিন্ডিকেট ইত্যাদি করছে। ফলে তৃণমূলের দৌরাত্ম্যে যাঁরা ক্ষুব্ধ, তাঁরাও বিশেষ তফাত দেখছেন না। তাঁরা বলছেন, তোমাদের সব কাণ্ডকারখানা তো চৌত্রিশ বছর দেখলাম, এ বার না হয় দেখি ওরা কী করে।

এই ধারণার মোকাবিলা করা কঠিন।

এই ধারণাটা দূর করার জন্য বামপন্থীদের কয়েকটা নতুন ধরনের কাজ করতে হবে বলে আমি মনে করি। এখনও যে অল্প কিছু জায়গায় তাঁদের কিছুটা প্রভাব আছে, সেখানে দলের লোকেরা দৌরাত্ম্য করলে তাদের জনসমক্ষে শাস্তি দিতে হবে, যাতে লোকে বুঝতে পারে, এরা সত্যিই নিজেদের ভুলটা বুঝতে পেরেছে, প্রতিকারের একটা চেষ্টা করছে। এতে হয়তো আপাতত সংগঠন আরও দুর্বল হবে, যে ক’জন মস্তান এখনও হাতে আছে, তারাও বেরিয়ে চলে যাবে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি মঙ্গলের জন্যে সেই ক্ষতিটা ওঁদের মেনে নিতে হবে। হ্যাঁ, ২০১৬’য় নির্বাচন আছে, লড়তে হবে, সে জন্যে হয়তো কৌশলগত জোট তৈরি করতে হবে, সীতারামকে আমি চিনি, তিনি প্রকাশ কারাটের মতো গোঁয়ার নন, মনে হয় এ ব্যাপারে আলিমুদ্দিনের কথা মেনে নেবেন। কিন্তু যা দেখছি, তাতে আমার অন্তত মনে হয় না ২০১৬’য় বামপন্থীদের বড় রকমের সাফল্যের সম্ভাবনা আছে। সেই জন্যেই দীর্ঘমেয়াদি ভাবনা নিয়ে কতকগুলো জিনিস ওঁদের করা উচিত। তাতে ২০১৬’য় হয়তো জিততে পারবেন না, কিন্তু লোকের মনে অন্তত এই ধারণাটা তৈরি হতে পারে যে, না, এরা আবার আস্তে আস্তে শক্ত হচ্ছে, দানা বাঁধছে। তা হলেই একটা ভিত তৈরি হবে। তা না করে, এই ভোটের দিকে তাকিয়ে যদি ওঁরা গুন্ডা বদমাশদের শাস্তি না দেন, মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরে পাবেন না।

আর একটা ব্যাপার হল দলীয় পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ। বামপন্থীরা যখন ক্ষমতায় ছিলেন তখন শোনা যেত, তাঁরা সব সরকারি সুযোগসুবিধে বেছে বেছে নিজের লোকদের দেন। এখন তৃণমূল সম্বন্ধেও যে অভিযোগটা শোনা যাচ্ছে। এক বামপন্থী নেতা নিজেই আমাকে বলেছিলেন, যে, ‘হ্যাঁ, গরিবদেরই দিলাম, কিন্তু একশো জন গরিব, তার মধ্যে তিরিশ জনকে দিলাম, ফলে বাকি সত্তর জন তো আমাদের ওপর চটে গেল।’ এই ‘সিলেকটিভ বেনিফিট’ হলে শেষ পর্যন্ত জনমত শাসকদের বিরুদ্ধে চলে যায়। এখন বামপন্থীরা যে কিছু জায়গায় কিছু কিছু ক্ষমতা ভোগ করছে, শিলিগুড়িই হোক বা অন্য কোথাও, সেখানে তাদের এটা দেখাতে হবে যে, তারা সুযোগসুবিধার বণ্টনে পক্ষপাতিত্ব করছে না, তৃণমূলী বলে কাউকে বঞ্চিত করছে না। দৃষ্টান্ত হিসেবেই এটা তৈরি করতে হবে।

এর থেকে আর একটা বড় ব্যাপার আসে। বামপন্থীদের প্রাইভেট বেনিফিট বা ব্যক্তিস্তরে পাইয়ে দেওয়া ছেড়ে ছেড়ে পাবলিক গুডস বা বৃহত্তর জনস্বার্থের দিকে যেতে হবে, যাতে সবাই উপকৃত হবে, সে সিপিএমই হোক, তৃণমূলই হোক। এ দিক থেকে, বিজেপি একটা ব্যাপার ধরতে পেরেছে। দেখবে, ওদের স্লোগান হচ্ছে ‘বিজলি সড়ক পানি’।

যেগুলো সবই পাবলিক গুডস।

হ্যাঁ। গুজরাতে ওদের সাফল্যের বড় কারণ এই বিজলি-সড়ক-পানির ব্যাপারে সাফল্য। বিপিএল কার্ড বা এনআরইজিএ’র কাজ কাকে দেব, তা ঠিক করার সময় স্থানীয় স্তরে তালিকা তৈরিটা কিন্তু ওই স্তরের ক্ষমতাশালীদের হাতে। সেখানেই পক্ষপাতিত্বের ভয় চলে আসে। ওই, তিরিশ জনকে বেছে বেছে দেওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বিজলি সড়ক পানির মতো পাবলিক গুডসের ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনা অনেকটা কম। তাই আমার মতে, বামপন্থীরা যেখানে যেটুকু ক্ষমতায় আছেন, সেখানে এই পাবলিক গুডসের দিকে নজর ঘোরাতে হবে। আর, সাধারণ ভাবে, তাঁরা নিজেদের আন্দোলনগুলোকেও এই দিকে চালনা করতে পারেন, বিজলি সড়ক পানির মতো জিনিসগুলোর দাবি তুলতে পারেন, প্রাপ্তিযোগের রাজনীতি থেকে নিজেদের সরাতে পারেন।

দীর্ঘমেয়াদি আর একটা পরিবর্তনের কথা বলতে চাই। আমি অনেক দিন ধরেই বলছি, পশ্চিমবঙ্গে কৃষিতে সমবায় খুব দরকার। ভূমি সংস্কার দিয়ে বড় মাপের আর কিছু হবে না, এক সময় কিছুটা কাজ হয়েছিল, কিন্তু মোটামুটি নব্বইয়ের দশকেই তার সম্ভাবনা ফুরিয়ে গেছে। পরিবারের সংখ্যা বেড়েছে, ছোট ছোট জমি আরও ভাগ হয়েছে। এমনিতেই পশ্চিমবঙ্গে জমির তুলনায় জনসংখ্যা অনেক বেশি, তাই জমি বণ্টন করে আর বিশেষ কিছু হবে না। এখানেই আমি মনে করি সমবায়ের গুরুত্ব। সম্প্রতি আনন্দবাজারেই পড়লাম, উত্তর চব্বিশ পরগনায় বারাসতের কাছে বাবপুর নামে একটি গ্রামের চাষিরা উদ্যোগী হয়ে সমবায় প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছেন। এই ধরনের সমবায় যৌথ চাষ নয়, চাষ যে যার নিজেরাই করবেন। কিন্তু ওঁরা যখন সার বা বীজ কিনছেন, কিংবা টিউবওয়েলের জল, এককাট্টা হয়ে কিনছেন। যখন শস্য নিয়ে বাজারে যাচ্ছেন কিংবা হিমঘরের সঙ্গে চুক্তি করছেন, তখনও সেটা একসঙ্গে করছেন। এর ফলে তাঁদের দর কষাকষির সামর্থ্য বাড়ছে, প্রত্যেকেই উপকৃত হচ্ছেন। এ ধরনের সমবায় যদি বামপন্থীরা দৃষ্টান্ত হিসেবে করে দেখাতে পারেন, ধরা যাক রাজ্যের অন্তত শ’খানেক গ্রামে এমন উদ্যোগ করতে পারেন, আমার মনে হয় খুবই ভাল কাজ হবে। কিন্তু এ নিয়ে অনেক বামপন্থী নেতার সঙ্গে কথা বলে দেখেছি, অনেকেই একটা কথা বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে সমবায় হয় না।’ এটা শুনলে আমার ভীষণ রাগ হয়ে যায়। আমি বলি, ‘আচ্ছা, আপনি তো নিজেকে কমিউনিস্ট বলেন। তা, কমিউন তো হচ্ছে সমবায়ের আর একটা উঁচু স্তর, সবচেয়ে উঁচু স্তর। সমবায়ই যদি না হয়, তা হলে কমিউনিজ্ম তো হবেই না, তা হলে নিজেকে কমিউনিস্ট বলবেন না, অন্য কিছু বলুন। সমবায় জিনিসটা যে বিশ্বাস করে না, আমি মনে করি তার নিজেকে কমিউনিস্ট বলার কোনও অধিকারই নেই।

আর একটা ধরনের সমবায় প্রতিষ্ঠানের কথাও বলা দরকার। সেটা শিল্পে। দেখ, নয়া উদারতন্ত্র বা ধনতন্ত্রকে শুধু গাল দিয়ে কোনও লাভ নেই, যদি না বিকল্প কিছু করে দেখাতে পারি। ‘শিল্প হচ্ছে না’ বলে এত শোরগোল, তো, ছোট ছোট শিল্প প্রতিষ্ঠান মিলে সমবায় তৈরি করে ঋণ— আজকাল তো ঋণ পাওয়ার নানা সুযোগ— কাঁচামাল ইত্যাদি জোগাড় করা যায়, বিপণনেরও ব্যবস্থা করা যায় সমবায়ের ভিত্তিতেই। এবং গোটা উদ্যোগের নিয়ন্ত্রণটা শ্রমিকদের হাতেই থাকবে।

এই চেষ্টাটা তো এ দেশের বামপন্থীরা বিশেষ করেনইনি কখনও।

অনেক দিন আগের কথা, তখন কেরলে সিপিআইয়ের সরকার। অচ্যুত মেনন মুখ্যমন্ত্রী। ওঁরা ঠিক করলেন প্লান্টেশনগুলো সরকার নিয়ে নেবে। কী করে সেগুলো চালানো হবে সে বিষয়ে আমার পরামর্শ চেয়েছিলেন। সেই সূত্রে সারা কেরল ঘুরেছিলাম। এক এক করে প্রত্যেকটা ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে মিটিং করেছিলাম। দেখলাম, সরকার বাগিচাগুলো নিয়ে নিক, এটা বামপন্থী, দক্ষিণপন্থী সব ট্রেড ইউনিয়নই চায়। কিন্তু যখন বললাম, ‘হ্যাঁ, সরকার নিয়ে নিক, কিন্তু শ্রমিকদেরই বাগিচা চালানোর দায়িত্ব নিতে হবে। মুখ্যমন্ত্রীকে আমি বলব, সরকার যাতে ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে গ্যারান্টরের কাজ করে এবং ঝুঁকি সামলানোর জন্য বিমার বন্দোবস্ত করে দেয়। কিন্তু এই দুটোর ব্যবস্থা হলে সরকারের অধিগৃহীত বাগিচাগুলি আপনাদের চালাতে হবে।’ আমার এখনও মনে আছে, বোধহয় গোটা কুড়ি-বাইশ ইউনিয়নের নেতাদের প্রত্যেককে এই এক প্রস্তাব দিয়েছিলাম। সবাই বললেন, ‘আমরা চাই না।’ কমিউনিস্ট ট্রেড ইউনিয়নও শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণ চায় না! আসলে এঁরা ‘চলছে না চলবে না’ নেতিবাচক বাগাড়ম্বরেই আছেন, গঠনমূলক কিছু করতে বললেই নানা অজুহাত। কিন্তু এই বিকল্প কিছু করে দেখানোর দায়িত্ব না নিলে ধনতন্ত্রকে গাল পাড়ার কোনও হক এঁদের আছে বলেই আমি মনে করি না। ধনতন্ত্রের অনেক সমস্যা, আমি জানি, কিন্তু তোমরা কী করছ? বড় শিল্প না পারলে অন্তত শ্রমিক-নিয়ন্ত্রিত কিছু ছোট আর মাঝারি উদ্যোগ করো, করে দেখাও।

বিভিন্ন দেশে তো এ-রকম উদ্যোগ...

অন্য দেশে যাওয়ার দরকার নেই, ভারতবর্ষেও কিছু নজির আছে। সবগুলোই যে সফল হচ্ছে তা নয়, কিন্তু চেষ্টা চলছে নানা জায়গাতেই। চেষ্টা তো করে যেতে হবে। চেষ্টা যাঁরা করছেন না, আমি বলব তাঁরা যদি ‘ধনতন্ত্র নিপাত যাক’ স্লোগান দেন, সেটা নেহাতই মুখের কথা, আসলে তাঁরা ধনতন্ত্রই চান, তাঁদের মনের কথা হল, ‘ধনতন্ত্র হবে, আমরা চেঁচামিচি করে মাইনে বাড়াব।’ বিশেষ করে যেখানে এত এত বেকার ছেলেমেয়ে বসে আছে, শিল্প নষ্ট হয়ে গেছে, সেখানে অন্তত কিছু ছেলেমেয়েকে নিয়ে একটা কোনও চেষ্টা করা ভীষণ দরকার। খুব ছোট করেও শুরু করা যায়, একটা রিটেল দোকান, বা একটা ছোট কারখানা, ধরা যাক কোনও ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিকে জোগান দেবে, তার জন্য সমবায়ের ভিত্তিতে উদ্যোগ নেওয়া যায়। বামপন্থীরা এটা করে দেখাতে পারলে লোকের মনে ধারণা হবে যে, একটা বিকল্প ব্যবস্থায় তাঁরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

এর থেকে আর একটা জিনিস আসে। গোটা ভারতেই বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়নের একটা বড় ব্যর্থতা আছে, যে জন্যে তারা ক্রমশই দুর্বল হয়ে গেছে, সেটা হল অসংগঠিত শিল্পে। জাতীয় নমুনা সমীক্ষার হিসেবে, এ দেশের প্রায় ৯৩ শতাংশ শ্রমিক হয় অসংগঠিত শিল্পে কাজ করেন, নয়তো তাঁরা সংগঠিত শিল্পের অ-সংগঠিত শ্রমিক, অর্থাত্‌ ঠিকা কর্মী। এই দেশে কয়েক জনের মাইনে বাড়ানোর বা চাকরি পাকা করার শ্রমিক আন্দোলনে বেশি দূর এগোনো কঠিন। তো, ভারতে কি অসংগঠিত শ্রমিকদের সংগঠিত করার নজির নেই? আছে। কিন্তু সেটা বামপন্থীরা করেননি, অনেক সময় করেছেন গাঁধীবাদীরা। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে সফল যে প্রতিষ্ঠান— সেবা, মানে সেল্ফ এমপ্লয়েড উইমেন’স অ্যাসোসিয়েশন, সেটা তো গাঁধীবাদী এলা ভট্টের নেতৃত্বে তৈরি ও চালিত। গাঁধীবাদীরা পারলে, বামপন্থীরা এটা পারেন না কেন? শ্রমিক-নিয়ন্ত্রিত সংস্থার মতোই অসংগঠিত বা স্বনিযুক্ত কর্মীদের সংগঠিত করার দিকে ঝোঁক না দিলে বামপন্থীরা নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা ফিরে পাবেন না। এগুলো সবই দীর্ঘমেয়াদি, বলছি না এগুলো করে ২০১৬’র ভোটে ভাল ফল পাওয়া যাবে। কিন্তু শুরু তো করা দরকার। এত দিনেও চেষ্টাটা শুরুই হয়নি, এর কোনও মানে হয়?

শুরু করার পক্ষে এটা প্রশস্ত সময়ও বটে। দেওয়ালে একেবারে পিঠ ঠেকে গেলে তো ঘুরে দাঁড়ানোই একমাত্র উপায়।

আমি ওঁদের বলব, যাঁরা অন্য রকম ভাবে চেষ্টা করছেন, তাঁদের কাছে শিখুন। কিছু এনজিও, কিছু গাঁধীবাদী প্রতিষ্ঠান, তারা তো তাদের মতো করে চেষ্টা করছে। ওঁদের সঙ্গে কথা বললে প্রচুর জিনিস জানা যায়। আমি তো সেবা-র রেনানা ঝাববালার সঙ্গে কথা বলেছি। সেবা’য় রেনানার স্থান দুই বা তিন নম্বরে। তিনি আমাকে বলেছিলেন, স্বনিযুক্ত কর্মীদের একটা বড় সমস্যা হচ্ছে ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে। তো, সেবা বিভিন্ন এজেন্সি থেকে তদবির করে ঋণের ব্যবস্থা করে, নিজেরা গ্যারান্টি দেয়। এলআইসি’তে গিয়ে কথা বলে বিমার ব্যবস্থা করে। বড় প্রতিষ্ঠান বলে ওঁরা ঝুঁকিটা ভাগ করে নিতে পারছেন, প্রিমিয়াম কম পড়ছে। এখন বামপন্থীরা এমন উদ্যোগের কথা কেন ভাবেন না? পার্টি বা পার্টির মতো অন্য কোনও গোষ্ঠী যদি অনেকের ঝুঁকিটা একত্রিত করে সরকারের কাছে, বা বেসরকারি ঋণ কিংবা বিমা প্রতিষ্ঠানের কাছে তদবির করতে পারে, তা হলে তো কাজ হয়।

এ-সব প্রস্তাব দিলে হয়তো শুনতে হবে, ‘এখানে সেই কালচার নেই।’ কিন্তু কালচার তো আকাশ থেকে পড়বে না!

মার্ক্স তো বাঙালি ছিলেন না, তা হলে মার্ক্সের কথা বলা কেন? মার্ক্সের কালচার তো বাঙালি কালচার নয়! তার পরে আর একটা কথা বলি। ভারতবর্ষে নানান জনকল্যাণমূলক প্রোগ্রাম হচ্ছে, জঁ দ্রেজরা যেগুলো নিয়ে অনেক দিন ধরে লড়ে গেছেন, এখন আবার বিজেপি সরকার কিছু কিছু কাটছাঁট করছে, তা নিয়ে তর্ক হচ্ছে। জনকল্যাণ প্রকল্পে, বিশেষ করে আমাদের মতো দেশে, অনেক চুরিচামারি হয়, সরকার যে টাকাটা দেয়, তার একটা বিরাট অংশই গরিবের হাতে পৌঁছয় না। এই অজুহাতে দক্ষিণপন্থীরা আবার জনকল্যাণের বরাদ্দ কাটছাঁট করার পক্ষে সওয়াল চালায়।

কিন্তু একটা বিকল্পের কথাও ভাবা যেতে পারে। সেটা নিয়ে ইউরোপে এবং অন্য কোথাও কোথাও ভাবনাচিন্তা চলছে। ওয়েলফেয়ার স্টেটকে কী ভাবে চালানো যায়, সে বিষয়ে এই সব ভাবনাচিন্তা থেকে আমাদের শেখার আছে। ২০১০ সালে দিল্লিতে এক সভায় আমি সে বিষয়ে বলেছিলাম। সেখানে সনিয়া গাঁধী উপস্থিত ছিলেন, জঁ দ্রেজ, অরুণা রায়, ওঁদের ন্যাশনাল অ্যাডভাইজরি কমিটির অন্য সদস্যরাও ছিলেন। আমার বক্তব্য ছিল, জনকল্যাণে সরকারি উদ্যোগ দরকার, খরচ করা দরকার, আমিও তা মনে করি, কিন্তু এই যে এত চুরির অভিযোগ, এর একটা উত্তর তো দিতে হবে! সরকারি বণ্টন ব্যবস্থার খুব কম অংশই জনসাধারণের কাছে পৌঁছচ্ছে, তার একটা বিকল্প হয় তো! আমি বলছি না সেটাই একমাত্র বিকল্প। কিন্তু কিছুটা চেষ্টা করে তো দেখা যায়।

যেমন, ইউরোপে গ্রিন পার্টি বলছে, ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে সবাইকে একটা নির্দিষ্ট টাকা অনুদান দেওয়া। এ ধরনের ব্যবস্থা হলে রেশন দোকানে বা বিপিএল কার্ড ইত্যাদি নিয়ে যে রকম দুর্নীতি ও ভুলভ্রান্তি হয় তা কমে যাবে। আমি একটা মোটা হিসেব কষেছি। দিল্লির এনআইপিএফপি’র একটা হিসেবে দেখেছি, এ দেশে কেন্দ্র রাজ্য মিলিয়ে মোট যত টাকা ভর্তুকি দেয়, সেটা জাতীয় আয় বা জিডিপি’র ১৪-১৫ শতাংশ, আর তার দুই-তৃতীয়াংশ, অর্থাত্‌ জিডিপি’র প্রায় ৯ শতাংশ চলে যায় অবস্থাপন্নদের কাছে। আমার বক্তব্য, ওই ৯ শতাংশের সবটা নেওয়া রাজনৈতিক ভাবে কঠিন হবে, কিন্তু এর তিন ভাগের এক ভাগ, মানে জিডিপি’র ৩ শতাংশ নেওয়া হোক এবং সেই টাকায় একটা সর্বজনীন অনুদান দেওয়া হোক। যার আধার কার্ড বা এই রকম কোনও একটা নির্ধারিত কোনও নথি আছে, সে-ই এই অনুদান পাবে, গরিব, বড়লোক, সবাই। আমি হিসেব কষে দেখেছি, অবস্থাপন্নরা যে ভর্তুকিটা পাচ্ছে, তার এক-তৃতীয়াংশ নিয়ে সেটা ঢালাও অনুদান হিসেবে দিলে, ২০১৪’র জিডিপি’র হিসেবে, ভারতের প্রত্যেক পরিবারকে প্রতি মাসে অন্তত হাজার টাকা দেওয়া যাবে। কোনও নতুন কর বসাতে হবে না, সরকারের কোনও বাড়তি খরচ হবে না। এতে আর একটা ব্যাপার হবে, যে চুরিচামারির অজুহাত দেখিয়ে দক্ষিণপন্থীরা জনকল্যাণে সরকারি খরচ ছেঁটে দিতে বলে, সেই চাপটাও একটু কমবে।

একটা প্রচলিত ধারণা হল, নগদ টাকা দিলে লোকে মদ খেয়ে বা অন্য ভাবে উড়িয়ে দেবে, যে কারণে বলা হয়, টাকা যদি দিতেই হয় তবে মেয়েদের হাতে দেওয়া হোক। তো, সেবা থেকে রেনানা-রা মহারাষ্ট্রের কিছু এলাকায় একটা পরীক্ষা করেছেন। বেশ কিছু গ্রামে এ-রকম একটা সর্বজনীন অনুদান দিয়ে, তার পর সমীক্ষা করে দেখা গেছে, সেখানে খুব কম লোকই টাকাটা মদ খেয়ে উড়িয়েছে, বেশির ভাগ লোকই সেটা ঠিকঠাক খরচ করেছে, হয়তো ঋণ শোধ করেছে, কিংবা ঘরের ভেঙে-যাওয়া চালটা সারিয়েছে, বা এ-রকম কিছু। রেনানারা এই নিয়ে একটা বই লিখেছেন। এই রকম চেষ্টা করা যেতেই পারে। বলছি না, এনরেগা বা অন্য কল্যাণ প্রকল্প উঠিয়ে দাও। কিন্তু কিছুটা টাকা এই ভাবে ব্যবহার করে দেখা যায়।

কিছু জিনিস এ ভাবে হবে না, সেটাও ঠিক। যেমন গরিবের হাতে টাকা দিয়ে দিলে স্বাস্থ্যের জন্য ঠিকঠাক খরচ হবে না। কিন্তু একটা অন্য কথা ওঠে। ভারতে স্বাস্থ্যের অবস্থা খুব খারাপ, কিন্তু ভোটের সময় সেটা কারও কর্মসূচিতে থাকে না। আমি বোধহয় আমার একটা বইতে বলেছিলাম, উচ্চবর্গের এক জন কেউ যদি নিম্নবর্গের কারও সম্বন্ধে এমন একটা বেফাঁস কথা বলে ফেলে যাতে তার সম্মানে আঘাত লাগে, তা হলে ব্যস, হয়ে গেল, সে আর ভোটে জিততে পারবে না। অথচ আমি রাজনৈতিক নেতা, বেফাঁস কথা বলি না, কিন্তু স্বাস্থ্যের প্রশ্নটা অবহেলা করি বলে প্রতি বছর নিম্নবর্গের হাজার হাজার শিশু মরে যাচ্ছে, সেটা ভোটের কোনও বিষয় নয়। অদ্ভুত দেশ!

এই প্রশ্নগুলো ভোটের এজেন্ডায় থাকে না, এর পিছনেও বামপন্থীদের দায় নেই কি?

অবশ্যই। এ সব জিনিস নিয়ে অন্যত্র যত আলোচনা হচ্ছে, আমাদের বামপন্থীদের মধ্যে তার ছিটেফোঁটাও দেখি না। এ বার শেষ দুটো কথায় আসি। জনকল্যাণের কথা সাধারণ ভাবে সবাই বলে। আমার মনে হয়, বামপন্থীরা এমন কিছু দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ করে দেখাতে পারেন, যাতে মানুষ সেগুলো লক্ষ করে এবং তাঁদের কাজ বলে চিহ্নিত করে। দৃষ্টান্ত হিসেবে দুটো নির্দিষ্ট কাজের কথা বলব। একটা হল, বামপন্থীদের যেখানে যেটুকু ক্যাডার অবশিষ্ট আছে, তাঁদের যদি এই কাজে লাগিয়ে দেওয়া যায় যে, স্কুলে বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেখানেই শিক্ষক বা ডাক্তার-নার্স আসেননি, সেখানেই তা নিয়ে আন্দোলন করা। ওঁরা আগে থেকে খবর না দিয়ে হঠাত্‌ হঠাত্‌ এক একটা জায়গায় যাবেন, যেখানে দেখবেন কর্মীরা অনুপস্থিত, সেখানেই বিক্ষোভ দেখাবেন, অবস্থান করবেন এবং, মারধর নয়, হিংসা নয়, কিন্তু ফাঁকিবাজদের লজ্জা দেবেন। বলবেন, ‘তোমরা মাইনে নিচ্ছ প্রতি মাসে, কিন্তু আসছ না’, এই নিয়ে জনসমক্ষে তাঁদের অপদস্থ করবেন। অশোক রুদ্র অনেক দিন আগে আনন্দবাজারেই লিখেছিলেন একটা ঘটনার কথা। সিউড়িতে এক ডাক্তার বাজার করতে গেছেন, কিছু ছেলে তাঁকে ঘেরাও করেছে। ভদ্রলোক সিউড়ির হাসপাতালে বড় ডাক্তার, মাইনে নেন, কিন্তু কাজে যান না, প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেন। ছেলেরা বাজারের মধ্যে তাঁকে ঘিরে ধরে বলেছে, ‘কান মোলো।’ ওখানেই তাঁকে দিয়ে কান মলিয়েছে। অশোক রুদ্রের সেই লেখার শিরোনামটা ছিল: কানমলার সামাজিক ভূমিকা। আমি কান মলতেও বলছি না। আমি বলছি, এই রকম অন্যায় যারা করে, তাদের কিছু কিছু লোক চিহ্নিত করে তাদের সম্বন্ধে একটা জোরদার প্রচার করা যায়, জনসমক্ষে চেঁচিয়ে বলা যায়, পথনাটিকা করা যায়। পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে সিপিএমের ক্যাডাররা যদি এই নিয়ে পথনাটিকা করেন যে, অমুক ডাক্তার ক্লিনিকে আসেন না, পয়সা নিয়ে যান, নিজের প্র্যাকটিস করেন, বা অমুক মাস্টার স্কুলে যান না, প্রাইভেট টিউশন করেন, একেবারে নাম করে করে যদি প্রচার করেন, এটা যদি করতে থাকেন, লোকে আস্তে আস্তে এই উদ্যোগগুলোকে ওই পার্টির সঙ্গে যুক্ত করবে, বলবে, ‘হ্যাঁ, ওরা এই নিয়ে ধরে লড়ে যাচ্ছে’।

আর একটা জিনিসও আমার মনে হয় করা ভীষণ দরকার। তাতে বাধা একটু বেশি পাবে, কিন্তু করা উচিত। যেখানে যেখানে নাবালিকাদের বিয়ে দেওয়া হচ্ছে, সেখানেই পার্টির মেয়ে ক্যাডাররা প্রতিবাদ এবং বিক্ষোভ করতে পারে। এ রকম ভাবে কতকগুলো সামাজিক আন্দোলন তৈরি করা যায়।

কিছু কিছু জায়গায় মেয়েরা নিজেরাই এমন ব্যক্তিগত প্রতিবাদ, প্রতিরোধ করছেন।

তাঁরাও এতে জোর পাবেন। বলতে পারবেন যে, ‘আমি আরও পড়ব, এখনই বিয়ে নয়।’ যদি এটা একটা প্রকাশ্য কর্মসূচি হিসেবে নানা জায়গায় ক্রমাগত করা যায়, অনেক মেয়ে তাতে যোগ দেবেন। বামপন্থী ক্যাডাররা এটা করতে পারলে মানুষ বামপন্থী পার্টিগুলোর সঙ্গে এই ধরনের সামাজিক আন্দোলনকে মনে মনে জড়িয়ে নেবে। এতে আখেরে পার্টিরও রাজনৈতিক লাভ হবে।

মেয়ে পাচার আর একটা বড় সমস্যা, এবং সে ক্ষেত্রেও স্থানীয় স্তরে সামাজিক চাপ তৈরি করলে কাজ হতে পারে।

নিশ্চয়ই, স্থানীয় স্তরে চেঁচামিচি করলে কাজ হবে। এতে অশান্তি হবে, কিছু কিছু জায়গায় পাচারের গুন্ডাদের হাতে মার খেতে হবে হয়তো, কিন্তু আখেরে কাজ হবেই। তার পর ধরা যাক, পণপ্রথা। পণের দাপট তো এখনও বহু জায়গায় আছে, খুবই আছে। সেখানেও, ওই, ‘লজ্জা দেওয়া’ যায়। অমুক পরিবার পণ নিচ্ছে, তাদের বাড়ির সামনে প্রচার করা, পথনাটিকা করা যায়। তা, এই কাজে ফাঁকি, কম বয়সে বিয়ে, মেয়ে পাচার, পণপ্রথা, এ-রকম কয়েকটা বিষয় বেছে নিয়ে জনসমক্ষে অপদস্থ করার একটা কর্মসূচি যদি বামপন্থীরা চালাতে পারেন, সমস্ত পশ্চিমবঙ্গে যদি তাঁদের ক্যাডারদের এটা করতে দেখা যায়, তা হলে সামাজিক আন্দোলনের একটা নতুন ধারা তৈরি হবে এবং সেটাকে জনসাধারণ বামপন্থীদের উদ্যোগ বলেই দেখবেন।

আর শেষ কথাটা হচ্ছে স্বাস্থ্য। এঁরা যদি সমস্ত জনকল্যাণ প্রকল্পে জোর না দিয়ে শুধু স্বাস্থ্যের কতকগুলো ব্যাপারে, যেগুলো আমাদের পক্ষে অত্যন্ত জরুরি, সেগুলোতে জোর দেন, তা হলে ভাল কাজ হতে পারে। যেটা বামপন্থীরা একেবারে করেন না। বিশেষ করে, সমস্ত গবেষণাতেই দেখা যাচ্ছে, শিশুকল্যাণের মূল ভিত্তি হচ্ছে ৬ বছরের নীচের শিশুদের স্বাস্থ্য বা পুষ্টির ব্যাপারটা। তাই অঙ্গনওয়াড়ি প্রকল্প, যেটা পশ্চিমবঙ্গে বহু বছর ধরে ধুঁকছে, তাকে উজ্জীবিত ও শক্তিশালী করাটা বামপন্থীদের আন্দোলনের একটা বড় নিশানা হতে পারে। পাশের একটা গরিব দেশের সঙ্গে তুলনা করে আমি তো বলব, বামপন্থীরা খানিকটা লজ্জার মাথা খেয়েই বলতে পারেন যে, আজ থেকে দশ বছরের মধ্যে আমরা বাংলাদেশের সমকক্ষ হব। এটা বলতে আমাদের, পশ্চিমবঙ্গের বাবুদের মাথা হেঁট হয়ে যাবে, যে, ২০২৫ সালের মধ্যে স্বাস্থ্যের কতকগুলো সূচকে আমরা বাংলাদেশের সমান হব, এই আমাদের স্লোগান। টিকে দেওয়া, প্রসূতির মৃত্যু কমানো, শিশুমৃত্যু কমানো, এমন অনেকগুলো সূচক আছে। এ-রকম একটা সময়বাঁধা লক্ষ্য স্থির করে যদি তাঁরা লাগাতার আন্দোলন করেন, পার্টির ইস্তেহার থেকে শুরু করে সমস্ত স্তরে এগুলোর জন্য প্রচার করেন, তা হলে তাঁদেরও মঙ্গল, রাজ্যের মানুষেরও।

সাক্ষাৎকার: অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়

আরও পড়ুন

Advertisement