সোমা মুখোপাধ্যায়ের ‘যারা শাস্তি দিতে পারে না, তারা মুখ লুকোক’ (১২-৩) শীর্ষক প্রতিবেদনটির প্রথম অনুচ্ছেদ পড়ে মনে হল— অ্যাসিড শুধু শরীর নয়, মানুষের মনকেও চিরকালের জন্য পুড়িয়ে দেয়।
গত মার্চ মাসে কলকাতায় ‘অ্যাসিড আক্রান্তদের আরোগ্য, মর্যাদা ও ক্ষমতায়ন’ শীর্ষক একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। উপস্থিত ছিলেন ২০ জন অ্যাসিড-আক্রান্ত মহিলা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অভিযোগ, প্রেমের প্রস্তাবে সাড়া দেননি, তাই আক্রান্ত। ছাড় পাননি বিবাহিত মহিলারাও এবং আক্রান্ত হওয়ার পর স্বামীরা তাঁদের পরিত্যাগ করেছেন। অ্যাসিড হামলায় ঝলসে যাওয়া মুখ, নষ্ট হয়ে যাওয়া চোখ নিয়েও কিন্তু তাঁরা হার মানেননি। কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে প্রতি দিন লড়াই করে বেঁচে থাকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আর একটি বিধানসভা ভোট দোরগোড়ায়। ঝলসে যাওয়া শরীর ও মন নিয়ে এ বারও তাঁরা গণতন্ত্রের মান্যতা বজায় রেখে ইভিএম-এর বোতাম টিপে কর্তব্যটুকু পালন করবেন ঠিকই, কিন্তু তাঁদের প্রতি দায়িত্ব পালনের ইচ্ছা বা অবকাশ কি রয়েছে রাজনৈতিক দলগুলির! লক্ষ্মীর ভান্ডারের টাকা তাঁরা হয়তো পাচ্ছেন, কিন্তু আর কোনও দায়িত্ব কি নেই তাঁদের প্রতি? অথচ, ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো-র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে পশ্চিমবঙ্গেই সবচেয়ে বেশি অ্যাসিড হামলার ঘটনা ঘটেছে।
সুপ্রিম কোর্ট, হাই কোর্টের একাধিক নির্দেশ অনুযায়ী, বার বার অ্যাসিড হানা রোধ কিংবা অ্যাসিড-আক্রান্তদের পরিচর্যা বা পাশে দাঁড়ানোর কথা মনে করানো হয়েছে প্রশাসনকে। কিন্তু এ রাজ্যে কি তা হয়েছে? পঞ্জাব অ্যাসিড-আক্রান্তদের জন্য মাসে ১০,০০০ টাকা এবং হরিয়ানা মাসে ৯,০০০ টাকার কাছাকাছি বরাদ্দ করেছিল; যদিও সেটা মানসিক, শারীরিক, সামাজিক ক্ষতির তুলনায় যৎসামান্যই। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ ক্ষতিপূরণের নিরিখেও অনেক পিছিয়ে। আমাদের দেশে অ্যাসিড-আক্রমণের ঘটনাগুলি বেশির ভাগই ঘটে সমাজে আর্থিক ভাবে পিছিয়ে পড়া অংশের মধ্যে। ভুক্তভোগীদের চিকিৎসার জন্য এক হাসপাতাল থেকে আর এক হাসপাতালে ঘুরতে হয়, বিচারের জন্য কোর্টে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। মামলা করেও অপরাধীর শাস্তি তো দূর, অনেক সময় যথাযোগ্য ক্ষতিপূরণও জোটে না। এক জন অপরাধী যখন শাস্তি না-পেয়ে ঘুরে বেড়ায় তখন আমাদের চার পাশের সমাজে সেই অপরাধের মান্যতা তৈরি হয়। আর, এই ক্ষোভই ভুক্তভোগীরা উগরে দেন নানা দাবির মাধ্যমে। খোলা বাজারে অ্যাসিড বিক্রি বন্ধ হোক, এটা তাঁদের প্রধান দাবি। কিন্তু কে শোনে সে কথা! চিকিৎসার জন্য, আইনি কাজে তাঁদের কলকাতায় ছুটে আসতে হয় বার বার। সেই কারণেই, কলকাতায় তাঁদের থাকার একটি হোম তৈরির দাবিতেও তাঁরা সরব হয়েছেন। কিন্তু সে সব দাবির কতটুকু পূরণ হয়েছে?
সুপ্রিয় দেবরায়, বারাসত, উত্তর ২৪ পরগনা
দুরবস্থা
আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের পরিপ্রেক্ষিতে, কয়েক কিস্তিতে প্রকাশিত সোমা মুখোপাধ্যায়ের প্রতিবেদন রাজ্যে ‘কেমন আছেন মেয়েরা’ পড়লাম। গরিব, প্রান্তিক স্তরের মানুষের মর্মস্পর্শী বিবরণ বিমর্ষ, বিষণ্ণ করে তোলে। স্বাধীনতা লাভের এত বছর পরেও কেন এত অশিক্ষা, দারিদ্র, কেন স্বাস্থ্যব্যবস্থার এত তলানিতে পড়ে থাকা? রাজ্যের কন্যাশ্রী প্রকল্প, যা শুরু হয়েছিল অনেক সাড়া জাগিয়ে, যে প্রকল্প সর্বোচ্চ জনসেবা পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছে রাষ্ট্রপুঞ্জ দ্বারা, দেখা যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের মহিলাদের উন্নয়নের ক্ষেত্রে তা যথেষ্ট নয়।
পশ্চিমবঙ্গের গ্রামের দরিদ্র মহিলাদের অবস্থার জন্য যে কারণগুলিকে প্রধান বলে মনে হয় তা হল অশিক্ষা, দারিদ্র, সামাজিক ও আইনি সঙ্কট নিরসনে প্রশাসনের উদাসীনতা। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ভাবনায় নারীর শরীর, তাঁর সৌন্দর্যই সবচেয়ে বড় সম্পদ। তাই নারীকে শাস্তি দিতে অ্যাসিড ঢেলে পুড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয় তাঁর মুখমণ্ডল, অন্ধ করে দেওয়া হয় তাঁকে। প্রশাসনের ব্যর্থতা ও বিচার বিভাগের দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীকে বেপরোয়া করে তোলে। আর যদি অপরাধীর মাথার উপর প্রভাবশালী কারও হাত থাকে, তবে তো সোনায় সোহাগা। আশার কথা, এই মেয়েরা ঘুরে দাঁড়াচ্ছেন। এখন আর মুখ না লুকিয়ে লড়াই করতে এগিয়ে আসছেন। এই ঘুরে দাঁড়ানোই সামান্য হলেও আশার আলো জ্বালায়।
পশ্চিমবঙ্গ এক সময় ছিল উদার মনের, কুসংস্কারহীন মুক্ত মানুষদের পীঠস্থান। এখানে জন্মগ্রহণ করেছেন রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মতো কুসংস্কারমুক্ত, যুক্তিবাদী, বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনার মনীষী। অবাক লাগে, সেই সমাজেই এখনও ডাইনি প্রথা বেঁচে আছে। আসলে, শিক্ষার মধ্যে যদি যুক্তিবাদ না থাকে, যদি কোনও ঘটনাকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করতে শেখানো না হয়, তা হলে শিক্ষা মানুষকে প্রগতির দিকে না ঠেলে পিছনের দিকে টানতে থাকে। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় যুক্তিবাদ, বৈজ্ঞানিক চিন্তা-ভাবনা তুলে দিয়ে, কোনও বিষয়ে প্রশ্ন করার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষ আজ এই রাজনৈতিক দাবা খেলার বোড়েতে পর্যবসিত হয়েছে।
সুরজিৎ কুন্ডু, উত্তরপাড়া, হুগলি
ভগ্নস্বাস্থ্য
সোমা মুখোপাধ্যায়ের ‘সব থাকা সত্ত্বেও নিঃস্ব’ (১০-৩) প্রবন্ধটি বাস্তবধর্মী। তাঁর বক্তব্যের সমর্থনে আরও কিছু সংযোজন করতে চাই। প্রথমেই বলতে হয় ওয়েস্ট বেঙ্গল হেলথ স্কিম-এর কথা। এই প্রকল্পের অধীনে থাকা বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের অভিযোগ, তাঁদের জন্য নির্ধারিত চিকিৎসা বা শল্য চিকিৎসার সাম্মানিক দক্ষিণা অপর্যাপ্ত রাখা হয়েছে। উপরন্তু, অপারেশন থিয়েটারে প্রয়োজনীয় উন্নত মানের যন্ত্রসামগ্রীর অভাবও লক্ষিত হয়। এর ফলে, অনেক অভিজ্ঞ চিকিৎসকই এই স্কিমে চিকিৎসা করতে অস্বীকার করেন। তাই সরকারি কর্মচারীরা এক প্রকার বাধ্য হন অনভিজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে গিয়ে সুচিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হতে।
সরকারি হাসপাতালগুলিতে অভিজ্ঞ চিকিৎসকমণ্ডলীর দ্বারা বিনামূল্যে সুচিকিৎসার ব্যবস্থাপনা অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু সেই হাসপাতালগুলির ইনডোরে শয্যা পেতে গেলে দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে হতভাগ্য রোগীর পরিবারকে বহু টাকা জলাঞ্জলি দিতে হয়। রাজ্য সরকার পরিচালিত ন্যায্য মূল্যের ওষুধের দোকানের কথাও বলা জরুরি। সেখানকার ওষুধের গুণগত মান প্রসঙ্গে খাস সরকারি হাসপাতালের ডাক্তারদেরই অনেক সময় সন্দিহান হতে দেখা যায়।
পরিশেষে প্রশ্ন, প্রবন্ধকার এতগুলি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার পরও কি রাজ্য সরকার তাদের কঙ্কালসার স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়ে মিথ্যার বড়াই করে চলবে? না কি ক্লাবগুলির বড় অঙ্কের অনুদান হ্রাস করে, সেই টাকার কিয়দংশ স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নতিকল্পে ব্যয় করবে?
শান্তনু ঘোষ, শিবপুর, হাওড়া
জটলা
হাওড়া স্টেশনের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের মাঝখানে যাত্রীদের মালপত্র নিয়ে জাঁকিয়ে বসে থাকার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, যাত্রীরা সপরিবারে প্ল্যাটফর্মের চলাচলের মূল পথ আটকে বসে থাকেন, এমনকি সেখানে বিশ্রাম বা খাওয়াদাওয়াও সারেন। ফলে যাত্রীরা, যাঁরা ট্রেন ধরার জন্য তাড়াহুড়ো করে প্ল্যাটফর্মে ঢোকেন অথবা ট্রেন থেকে নেমে দ্রুত স্টেশনের বাইরে যেতে চান, বিশেষত প্রবীণ, শিশু এবং অসুস্থদের প্রবল সমস্যায় পড়তে হয়। মালপত্রে হোঁচট খেয়ে দুর্ঘটনাও ঘটে। প্ল্যাটফর্মে কর্তব্যরত নিরাপত্তারক্ষী ও রেল পুলিশ কেন এ ব্যাপারে নির্বিকার? নির্দিষ্ট বিশ্রামাগার থাকা সত্ত্বেও কেন প্ল্যাটফর্মের মাঝখানে এ ভাবে জটলা করতে দেওয়া হয়?
দেবাশিস চক্রবর্তী, মাহেশ, হুগলি
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)