E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: ফিরুক চেতনা

দুর্ভাগ্যবশত কৌশলী পদক্ষেপ সেই ঐক্যকে আঘাত করেছে। রাজনীতির সঙ্কীর্ণ রং যখন কোনও মানবিক দাবির উপর প্রলেপ দেয়, তখন সত্য আড়াল হয়ে যায়।

শেষ আপডেট: ২৩ এপ্রিল ২০২৬ ০৬:৫০

শিবাজীপ্রতিম বসুর ‘নতুন পথের সন্ধানে’ (১৮-৩) প্রবন্ধটি বাঙালির উন্নয়নের পথপ্রদর্শক। সেই প্রসঙ্গে কিছু কথা। বাঙালি জাতির পরিচয় তার মেধা, মনন এবং প্রতিবাদী চেতনায়। “বাঙালি আজ যা ভাবে, ভারত তা ভাবে আগামী কাল”— এই উক্তিটি কেবল আবেগ নয়, বরং বাঙালির চিন্তাশীলতা ও দূরদর্শিতার স্বীকৃতি। আড্ডা, সাহিত্য-সংস্কৃতি আর রাজনীতি বাঙালির মজ্জাগত। কিন্তু বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে সেই ঐতিহ্যবাহী ‘রাজনৈতিক সচেতনতা’ কি কেবল দলাদলি আর হানাহানির রূপ নিয়েছে? এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই।

স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু কিংবা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রশ্নে বাঙালির দৃঢ় অবস্থান তার উজ্জ্বল উদাহরণ। আর জি করের আন্দোলন বাঙালির প্রতিবাদী চরিত্রের এক অনন্য নজির। কোনও রাজনৈতিক পতাকা ছাড়াই সাধারণ মানুষ যখন বিচার চেয়ে রাস্তায় নেমেছিলেন, তখন মনে হয়েছিল— বাঙালির মেরুদণ্ড আজও সোজা। দল-মত নির্বিশেষে নারী-পুরুষের সেই গর্জন প্রমাণ করেছিল, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বাঙালি এখনও গর্জে উঠতে জানে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত কৌশলী পদক্ষেপ সেই ঐক্যকে আঘাত করেছে। রাজনীতির সঙ্কীর্ণ রং যখন কোনও মানবিক দাবির উপর প্রলেপ দেয়, তখন সত্য আড়াল হয়ে যায়।

বর্তমানের অন্যায়কে প্রতিষ্ঠিত করতে অতীতের দোহাই দেওয়া মেধাবী জাতির পরিচয় হতে পারে না। এই মনোভাব বাঙালির প্রগতিকে রুদ্ধ করছে। দেখা যাচ্ছে, জনস্বার্থের চেয়ে দলীয় স্বার্থ বড় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ফলে কয়েক লক্ষ সাধারণ মানুষ তাঁদের নাগরিক অধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। বাঙালির আবেগ এবং প্রতিবাদী সত্তা যদি কেবল দলদাসের ভূমিকায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তবে আমাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও মানবিক মূল্যবোধ বিলীন হওয়া অনিবার্য। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বাঙালির অগ্রগতি থমকে যেতে বাধ্য।

তাই প্রয়োজন রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে মানবিকতা ও ন্যায়ের বোধকে প্রাধান্য দেওয়া। বাঙালির প্রকৃত শক্তি তার ব্যক্তিসত্তা, ঐক্য এবং প্রতিবাদী চেতনা; সেই চেতনাকে পুনরুজ্জীবিত করাই হোক আজকের দিনের প্রধান চ্যালেঞ্জ। এখনই সময় আত্মোপলব্ধির। রাজনৈতিক মতভেদ থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু তা যেন বাঙালির মৌলিক ঐক্য এবং সত্যের অনুসন্ধানকে গ্রাস না করে।

গৌতম পতি, তমলুক, পূর্ব মেদিনীপুর

দুর্ভাগ্যজনক

শিবাজীপ্রতিম বসুর লেখা ‘নতুন পথের সন্ধানে’ প্রবন্ধটি মন ছুঁয়ে গেল। সত্যিই বাঙালিরা যেন চিরদিন বঞ্চিত, শোষিত, অভিভাবকহীন। দেশের স্বাধীনতার জন্য বাঙালিরা প্রাণপাত করেও যোগ্য মর্যাদা পেলেন কি?

দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশভাগ হল। পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা ধীরে ধীরে এ-পার বাংলায় আসতে শুরু করলেন। যাঁরা সেই সময়ে আসতে পারেননি, ১৯৭১ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর তাঁদের অধিকাংশই এ দেশে চলে আসেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই আন্দামান, কুপার্স ক্যাম্প, নৈনীতাল, মধ্যপ্রদেশ, দণ্ডকারণ্য— বিভিন্ন জায়গায় মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নিয়েছিলেন। বাকিরা থেকে যান পশ্চিমবঙ্গেই। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাঁদের প্রশ্রয় দিয়েছে, অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের দায়িত্ব নিয়েছে। কিন্তু নাগরিকত্ব নিয়ে তাঁদের কোনও দিন সমস্যায় পড়তে হয়নি। অথচ ২০২৬ সালে এসে এসআইআর-এর নাম করে যে ভাবে তাঁদের হেনস্থা করা হচ্ছে এবং নাগরিকত্ব অস্বীকার করে ‘বাংলাদেশি’ তকমা ও ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।

এ দেশে ৬০-৭০ বছর বসবাসকারী বাঙালিদের আজ প্রমাণ দিতে হচ্ছে— তাঁরা ভারতীয় কি না। অবাঙালি ভারতীয়দের একাংশের মধ্যে কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের প্রতি বিদ্বেষ, হিংসা ও দমিয়ে রাখার প্রবণতা ছিল; বর্তমানে তা আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। ভোটসর্বস্ব রাজনীতিতে বাইরের অবাঙালিরা যে ভাবে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের সঙ্গে ব্যবহার করছেন, তাতে আজ বাঙালির অস্তিত্বই বিপন্ন হতে বসেছে।

স্বপন আদিত্য কুমার বিশ্বাস, অশোকনগর, উত্তর ২৪ পরগনা

ঐতিহ্যের প্রেরণা

‘নতুন পথের সন্ধানে’ শীর্ষক প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা।

বাংলার স্বাতন্ত্র্য সম্পর্কে চিত্তরঞ্জন দাশ এতটাই দৃঢ়মনস্ক ছিলেন যে, ১৯২৫ সালে ফরিদপুরে তাঁর বক্তৃতায় তিনি প্রদেশগুলির স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে সওয়াল করেন— যেখানে প্রতিটি প্রদেশ তার নিজস্বতা বজায় রেখে একটি বৃহত্তর ভারতীয় কাঠামোর অংশ হবে।

প্রমথ চৌধুরীও ‘বাঙালি-পেট্রিয়াটিজম্’ (নানা-কথা) শীর্ষক দীর্ঘ প্রবন্ধে লিখেছেন: বাঙালি পেট্রিয়াটিজ়মকে মনে আশ্রয় ও প্রশ্রয় দেওয়াটা বাঙালির পক্ষে যদি দোষের হয় তা হলে সে দোষে আমি চিরদিনই দোষী আছি।

বাঙালি জাতির হৃতগৌরব পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সততার সঙ্গে একত্রে থাকার প্রচেষ্টায় বাঙালিকে ঐতিহ্য থেকে পাঠগ্রহণ করে প্রখর চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতে হবে। ঠিক যেমন সাম্প্রতিক অতীতে আন্দোলনের হাত ধরে প্রতিস্পর্ধী হয়ে উঠে বাঙালি জাতি তার শিরদাঁড়া খুঁজে পেতে সচেষ্ট হয়েছিল।

চটজলদি ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের বিষয়টি বাঙালির আত্মশ্লাঘায় যে আঘাত করেছে, তা বোঝাই যাচ্ছে। এ ছাড়াও ভারত জুড়ে বিভিন্ন প্রান্তে বাংলা বলার ‘অপরাধ’-এ বাঙালি পরিযায়ীদের হেনস্থা করা কিংবা ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক বিভাজনের ঘটনাগুলি যুক্তিবাদী বাঙালির আত্মমর্যাদায় আঘাত করেছে। নিরামিষ-আমিষ বিতর্কেও বার বার বিদ্ধ হয়েছে বাঙালি। তাই ঐতিহ্যের হাত ধরে প্রতিস্পর্ধী বাঙালিকে প্রমাণ করতে হবে যে, বিবর্তনের ধারায় সমাজের প্রগতিতে তাঁরাও পিছিয়ে নেই।

সঞ্জয় রায়, দানেশ শেখ লেন, হাওড়া

আলোর দিশারি

এসআইআর-কে কেন্দ্র করে বাঙালির প্রতিবাদী চরিত্র এবং তার তর্কপ্রিয়তাকে সুন্দর ভাবে শিবাজীপ্রতিম বসু তাঁর ‘নতুন পথের সন্ধানে’ শীর্ষক প্রবন্ধে আবার প্রাসঙ্গিক করে তুললেন।

কয়েকশো বছর আগে নবদ্বীপ নামে বাংলারই এক ভূখণ্ডে, জন্মগ্রহণ করেছিলেন নিমাই (পরবর্তী কালের ‘শ্রীচৈতন্য’) নামের এক জাতক। যে সময়ে সারা বাংলায় শ্রেণিস্বার্থের দ্বন্দ্ব, জাতিগত বিভেদ এবং সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়েছিল, সেই সময়ে বহু বাধা এবং সংগ্রাম মাথায় করে জাতি-বর্ণ-ধর্ম নির্বিশেষে মানুষের মধ্যে সাম্যের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি।

তিনি তখন জোর দিয়ে বলেছিলেন— নামের আগে অন্য কোনও সাধন দরকার নেই; আর এ ভাবেই তিনি বিচূর্ণ করেছিলেন পুরনো শাস্ত্রের অনুশাসন এবং মুছে দিয়েছিলেন সামাজিক বৈষম্যের বিষময় অস্তিত্ব। বাংলায় ‘আলোকায়ন’-এর এই হল সূচনা।

শ্রীচৈতন্যের ধারায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সহজ ভাবসাধনায় সঞ্জীবিত হয়েছিলেন আরও বহু হিন্দু-মুসলমান বাউল কবি, যাঁদের মধ্যে প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় গীতিকার তথা গায়ক লালন সাঁই-এর নাম। কালক্রমে বঙ্গদেশে ঘটল আরও অনেক চিন্তকের আবির্ভাব— রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রামকৃষ্ণ, রবীন্দ্রনাথ, জগদীশচন্দ্র, প্রফুল্লচন্দ্র, বিবেকানন্দ, দেশবন্ধু, নেতাজি থেকে হাল আমলের ঋত্বিক, সলিল, সত্যজিৎ, মৃণাল সেন হয়ে শঙ্খ ঘোষ, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, অমর্ত্য সেনদের মতো মানুষ সমৃদ্ধ করলেন।

বিতর্কেরও তো আবার রকমফের আছে। কোনওটা লাগে মাথা খাটানোর কাজে, কোনওটা আবার লাগে অকারণ ঝগড়ায়। বাঙালি যদিও উভয় প্রকারেই সিদ্ধহস্ত, বিষয়ের প্রতি সুবিচারের লক্ষ্যে দ্বিতীয়টিতে না গিয়ে প্রথমটিতেই আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখাটা তাই সমীচীন হবে বলেই আমার মনে হয়।

গৌতম নারায়ণ দেব, কলকাতা-৭৪

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Bengali Community

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy