E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: স্কুলশিক্ষার পরিবর্তন

তবে কী নেই যার জন্য বেহাল হচ্ছে সরকারি স্কুলশিক্ষা? সদিচ্ছা এবং বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা। সদিচ্ছা থাকলে প্রথম যে কাজটি জরুরি তা হল— বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি।

শেষ আপডেট: ০৬ জুন ২০২৬ ০৭:১৪

সুমন কল্যাণ মৌলিকের ‘দেশে সরকারি স্কুলশিক্ষার হাল’ (২৫-৫) শীর্ষক তথ্যবহুল প্রবন্ধের প্রেক্ষিতে কিছু সংযোজন। কেবল শহর নয়, গ্রামের স্কুলবাড়িগুলির অধিকাংশেরই এখন বেহাল দশা। সাধারণ লোকমুখে ‘ভোটবাড়ি’গুলির জীর্ণতাই বুঝিয়ে দেয় স্কুলশিক্ষার প্রতি পূর্ববর্তী সরকারের দরদ ছিল না। অর্থনৈতিক ভাবে সচ্ছলেরা ইতিমধ্যেই খুঁজে নিয়েছেন বিকল্প পথ— বেসরকারি স্কুল। বাকিরা বাধ্য হচ্ছেন বেহাল শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নিতে। অথচ সরকারি স্কুলে ‘আছে’-র তালিকা বেশ দীর্ঘ— কঠিন প্রতিযোগিতায় পাশ করে আসা দক্ষ শিক্ষক-শিক্ষিকা, মিড-ডে মিল, বিনামূল্যে খাতা-পোশাক-ট্যাব-সাইকেল ইত্যাদি।

তবে কী নেই যার জন্য বেহাল হচ্ছে সরকারি স্কুলশিক্ষা? সদিচ্ছা এবং বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা। সদিচ্ছা থাকলে প্রথম যে কাজটি জরুরি তা হল— বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি। স্কুলস্তরের ছাত্রছাত্রীরাই আগামী দিনের ভোটার, যাদের হাতে থাকবে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ভার। সেই জন্যই ছাত্রছাত্রীদের অবহেলা না করে সমাদর করাই বুদ্ধিমানের কাজ। সিংহভাগ স্কুলেই এখন গ্রন্থাগার নেই। ফলে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে পাঠ্যের বাইরের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে উঠছে না। বহু পড়ুয়া আছে, যাদের সহায়িকা বই কেনার সামর্থ্য নেই। তারা বঞ্চিত হচ্ছে। নেই কর্মশিক্ষা ও শারীরশিক্ষার স্থায়ী শিক্ষকও। ফলে হাতেকলমে কাজ শেখা বা নিয়মানুগ খেলাধুলার বিষয়টি অবহেলিত হচ্ছে। যে সব স্কুলে প্র্যাকটিক্যাল ল্যাব আছে, সেখানেও বিশেষ ব্যস্ততা দেখা যায় না। উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের ছাত্রছাত্রীরা ভাল করেই জানে যে, প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা হবে স্কুলে। তাই প্রায় পুরো নম্বরই তারা পেয়ে যাবে স্কুলের শিক্ষকদের থেকে। পড়ুয়াদের স্বার্থেই এর বদল জরুরি। লিখিত পরীক্ষার মতো প্র্যাকটিক্যাল অন্য স্কুলে হওয়া উচিত। এতে পড়ার তাগিদ বাড়বে। সেই তাগিদ পড়ুয়াদের নিয়মিত পৌঁছে দেবে প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসে। তবেই সম্পূর্ণ হবে বিজ্ঞানশিক্ষা।

‘জেন জ়ি’ প্রজন্মের মনের দিকটিতেও নজর দেওয়া জরুরি। পরিচিত বেশ কয়েকটি স্কুল নিজেদের উদ্যোগে প্রায় প্রতি মাসে স্কুল চত্বরে মূল্যবোধের শিক্ষার ব্যবস্থা করে। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে বৃহত্তর এলাকায়। এমনই সব আলোচনাচক্র, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও শিক্ষামূলক ভ্রমণ মৃতপ্রায় সরকারি স্কুলশিক্ষাকে প্রাণবন্ত করে তুলতে পারে। তবে বিদ্যালয়ের এই নবযজ্ঞের মূল হোতা হলেন মাননীয় শিক্ষক-শিক্ষিকারা। নিয়োগ জটে তাঁদের সংখ্যা বর্তমানে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। তাঁদের বিন্যাসেও রয়েছে সমস্যা। কোথাও ছাত্র বেশি শিক্ষক কম। অন্যত্র শিক্ষকের তুলনায় শিক্ষার্থী হাতেগোনা। নতুন শিক্ষক ও প্রধানশিক্ষক নিয়োগ, সর্বোপরি ছাত্র-শিক্ষক অনুপাতকে বাস্তবসম্মত করলে সরকারি স্কুলগুলি প্রকৃত জ্ঞানপীঠ হয়ে উঠতে পারে।

পার্থ পাল, মৌবেশিয়া, হুগলি

রাজ্যে স্কুলশিক্ষা

সুমন কল্যাণ মৌলিকের ‘দেশে সরকারি স্কুলশিক্ষার হাল’ প্রবন্ধটির পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। পশ্চিমবঙ্গের স্কুলশিক্ষার অবস্থা সম্পর্কে কয়েকটি দিক আলোচনা করা দরকার। বর্তমানে ১৪-১৬ বছর বয়সের দরিদ্র পরিবারের সন্তানরা সংসারের অভাবের তাড়নায় রাজ্যের বাইরে কাজের জন্য চলে যাচ্ছে। এ ছাড়াও যে-হেতু এই বয়সের ছেলেমেয়েরা প্রতিনিয়ত দেখছে, এ রাজ্যে কাজের কোনও সুযোগ নেই, বড়রা লেখাপড়া শিখে বেকার হয়ে হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছে, তাই তারা সেই পরিস্থিতি এড়াতে স্কুলে এসে ‘সময় নষ্ট’ করতে চাইছে না।

বহু বিদ্যালয়ে প্রতি বছর শিক্ষার্থী ভর্তির সংখ্যা কমছে। প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক, শ্রেণিকক্ষের অভাবে এক-একটি ক্লাসে প্রচুর শিক্ষার্থীকে রাখতে হচ্ছে। ফলে যত্ন সহকারে পাঠদান হচ্ছে না। আবার, এমনও বিদ্যালয় আছে, যেখানে ছাত্রছাত্রীর তুলনায় শিক্ষক-শিক্ষিকার সংখ্যা বেশি। খুব সহজেই শিক্ষকদের পুনর্বণ্টন করে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব হত, যেটা করা হয়নি। এ ছাড়া গ্রামাঞ্চলে মানুষ তাঁদের অভিজ্ঞতা দিয়ে দেখছেন, সরকারি স্কুলগুলিতে পঠন-পাঠনের মান ক্রমশ নিম্নগামী হচ্ছে। বহু বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় গ্রামেগঞ্জে গড়ে উঠেছে। দেখা যাচ্ছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাদের স্বল্প বেতনে নিয়োজিত শিক্ষক-শিক্ষিকারা যে ভাবে পাঠদান করছেন, তাতে অভিভাবকরা খুশি।

আমাদের রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সমস্যা ‘শ্যাডো এডুকেশন’ বা প্রাইভেট টিউশন। এই বিষয় নিয়ে বিশেষজ্ঞরা বহু বার তাঁদের রিপোর্টে সতর্ক করেছেন। এমন কিছু বিদ্যালয় বা কলেজ আছে, যেখানে ছাত্রদের কোনও রকম প্রাইভেট টিউশন নিতে হয় না বা কর্তৃপক্ষ সে বিষয়ে ছাত্রদের কোনও অনুমতি দেন না। স্কুল বা কলেজে ছাত্ররা নিয়মিত যে ক্লাসগুলি করছে তার উপরে ভিত্তি করেই তাদের সুন্দর ফলাফল হচ্ছে। তেমন প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক পরিবেশ, ছাত্রদের প্রকৃত মানুষ গড়ার শিক্ষার ব্যবস্থাপনাই এর প্রধান কারণ। আর, সরকারি স্কুলগুলিতে একেবারে প্রাথমিক স্তর থেকে অধিকাংশ শিক্ষার্থী গৃহশিক্ষকতার উপর নির্ভর করে। ফলে বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একাংশের মধ্যে উদাসীনতা ও দায়িত্বহীনতা ক্রমবর্ধমান।

সুতরাং, সামগ্রিক ভাবে রাজ্যের শিক্ষার হাল ফেরাতে এক দিকে যেমন আর্থিক বরাদ্দের পরিমাণ যথেষ্ট পরিমাণ বৃদ্ধি করতে হবে, তেমনই শিক্ষার উৎকর্ষ বৃদ্ধির জন্য কঠোর নিয়মনীতি সর্বস্তরে চালু করতে হবে। আর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন শিক্ষার আঙিনাকে রাজনীতির নিম্নমানের প্রভাব থেকে মুক্ত করে কঠোর শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। বিদ্যালয়ের শিক্ষা যাতে সমাজের কঠোর নজরে থেকে শৃঙ্খলা-পরায়ণ হয়ে ওঠে তার ব্যবস্থা করা এখন ভীষণ প্রয়োজন।

সন্দীপ সিংহ, হরিপাল, হুগলি

অনুপ্রেরণা

“ঘুমের মধ্যে যে স্বপ্ন দেখি তা স্বপ্ন নয়। স্বপ্ন হল সেটাই যা আমাদের ঘুমোতে দেয় না”— বলেছিলেন এ পি জে আব্দুল কালাম। ‘মনের জোরে’ (২২-৫) সম্পাদকীয়তে এ বছর উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় নবম স্থানাধিকারী বর্ধমানের কালনার সাগর মণ্ডলের সাফল্যের কথা-কাহিনি পড়তে পড়তে কালামের এই কথাটি মনে পড়ল। সাফল্যের এই শিখরে পৌঁছতে সাগরকে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে যুঝতে হয়েছে দারিদ্র এবং তীব্র আর্থিক সঙ্কটের সঙ্গে। লক্ষণীয়, পরিবারে অর্থের টানাটানি থাকলেও তার জীবনে এতটুকু ঘাটতি ছিল না নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষার, যা আজও দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের জীবনের অন্যতম অবলম্বন।

এক সময় সাগরের স্বপ্ন ছিল ডাক্তারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বড় ডাক্তার হওয়া। কিন্তু নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর সংসারে সর্বদাই পেটের টান চলে। তাই, কিছু আর্থিক উপার্জনের আশায় উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পরেই সে পাড়ি দেয় গুজরাতে, যেখানে তার বাবা-মা আগে থেকেই সাফাইকর্মীর কাজে যুক্ত। টাকার অভাবে বিজ্ঞান বিভাগে পড়তে না পারলেও সে থমকে যায়নি। উল্টে, সম্পূর্ণ নিজের আত্মবিশ্বাস ও পরিশ্রমকে পুঁজি করে সাগর মণ্ডল কলাবিভাগে পড়ে উচ্চ মাধ্যমিকে রাজ্যে মেধাতালিকায় প্রথম দশে নিজের স্থান অর্জনে সমর্থ হয়েছে, আগামী দিনে তার স্বপ্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করে সর্বভারতীয় সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আইএএস অফিসার হওয়া। সাগরের মতো প্রতিভাবান এবং লড়াকু মানসিকতার পড়ুয়া আজকের মোবাইলে আসক্ত, পথভ্রষ্ট তরুণ প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের কাছে প্রকৃতই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

অরুণ মালাকার, কলকাতা-১০৩

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Government Schools

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy