E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: অদ্ভুত আঁধার

বিনোদনের জগতেও অসংখ্য সম্প্রচারমাধ্যম নিরন্তর বিনোদনের উপাদান সরবরাহ করে চলেছে। গিগ-শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও আয়ের জন্য স্মার্টফোন ব্যবহার প্রায় অপরিহার্য।

শেষ আপডেট: ০৪ জুন ২০২৬ ০৭:১৯

‘স্বেচ্ছা-বিস্মরণ’ (১০-৫) সম্পাদকীয় প্রসঙ্গে কিছু কথা। ‘চিন্তাশক্তি’ ও ‘কল্পনাশক্তি’ মানুষের ভাবনার আঁতুড়ঘর। ইন্টারনেট-নির্ভর কৃত্রিম মেধা এবং মোবাইল ফোনের হাত ধরে সেই আঁতুড়ঘরেরই দখল নেওয়ার উদ্যোগ চলছে। অবশ্য মানুষ যদি পুরোপুরি ভাবতে ভুলে যায়, তা হলে সে প্রযুক্তিকেও ঠিক ভাবে ব্যবহার করতে পারবে না। কারণ প্রযুক্তি ব্যবহার করতেও আগে কিছু না কিছু ভাবতে হয়, তার পরেই প্রযুক্তির প্রয়োগ সম্ভব হয়।

শব্দের ঠিক বানান কিংবা অর্থ খুঁজতে অভিধানের ব্যবহার প্রযুক্তির আগমনে অনেকটাই কমে গিয়েছে। আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুদের ফোন নম্বর, জন্মদিন কিংবা দৈনন্দিন প্রয়োজনের নানা তথ্য মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য ক্যালেন্ডার বা ডায়েরির গুরুত্বও কমেছে। শুভেচ্ছা বিনিময়, খোঁজখবর নেওয়া কিংবা কোনও অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানোর প্রয়োজন হলেই মোবাইল ফোনের সাহায্য এখন প্রায় অনিবার্য। শিল্পী গানের খাতার বদলে মোবাইল ফোনে গান দেখে মঞ্চে পরিবেশন করছেন। আমাদের মতো পঁচাত্তরে পা-দেওয়া প্রবীণরাও এখন কাগজ-কলমের বদলে স্মার্টফোন বা ট্যাবেই দিব্যি লেখালিখি করে চলেছি। আর্থিক লেনদেন থেকে ওষুধপত্র-সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা— সবই এখন স্মার্টফোন-নির্ভর হয়ে উঠছে। যাত্রী-পরিবহণ পরিষেবার সৌজন্যে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ট্যাক্সির জন্য দীর্ঘ ক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় না। বিনোদনের জগতেও অসংখ্য সম্প্রচারমাধ্যম নিরন্তর বিনোদনের উপাদান সরবরাহ করে চলেছে। গিগ-শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও আয়ের জন্য স্মার্টফোন ব্যবহার প্রায় অপরিহার্য। ফলে এখন মোবাইল ফোনের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার সম্ভব হলেও, তাকে পুরোপুরি বর্জন করা সম্ভব নয়। তাই এই মুহূর্তে মানবমস্তিষ্ক থেকে ভাবনার সম্পূর্ণ নির্বাসন ঘটবে— এমন আশঙ্কা হয়তো এখনও সত্যি হয়নি।

তবে মানুষের অগোচরেই যন্ত্র যে ভাবে মানবমস্তিষ্কের উপর নিয়ন্ত্রণ বিস্তার করতে শুরু করেছে, তা অদূর ভবিষ্যতে গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে। ডিজিটাল নির্ভরতা যত বাড়ছে, ততই তথ্য মনে রাখার ইচ্ছা ও ক্ষমতা— উভয়ই কমছে। সম্ভবত এখানেই ‘ডিজিটাল বিস্মৃতি’র নাগপাশ তৈরি হচ্ছে। অনেকেই যেন দল বেঁধে সেই অদ্ভুত আঁধারের দিকে এগিয়ে চলেছেন। যাঁরা এখনও কয়েকটি মোবাইল নম্বর স্মৃতি থেকে বলতে পারেন, তাঁদের সমস্যা তুলনায় কম। কিন্তু নতুন প্রজন্মের ভবিষ্যতের জন্য এই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবা জরুরি। ছোটবেলা থেকেই সৃষ্টিশীল কাজ এবং শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীতচর্চার প্রতি আগ্রহ তৈরি করে মস্তিষ্কের নিয়মিত অনুশীলনে উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন। তবেই ‘স্বেচ্ছা-বিস্মরণ’ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব হতে পারে।

নিজের বিচারবুদ্ধির নিত্য ও ক্রমাগত চর্চা প্রয়োজন। পাশাপাশি মানুষ, প্রকৃতি ও প্রাণিজগতের সঙ্গে নৈকট্যের বন্ধন যাতে আলগা না হয়, সে দিকেও নজর দিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং পরিবারের সচেতন উদ্যোগই ‘স্বেচ্ছা-বিস্মরণ’-এর ভয়াবহ পরিণতি থেকে রক্ষা করতে পারে।

রতন রায়চৌধুরী, পানিহাটি, উত্তর ২৪ পরগনা

পথরোধ?

‘কেন্দ্রীভূত’ (১২-৫) শীর্ষক সম্পাদকীয়টিতে একটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও উদ্বেগজনক বিষয়ের অবতারণা করা হয়েছে। এক সময় বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে অর্থবরাদ্দের উদ্দেশ্যে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন গঠিত হয়েছিল। পরে দেখা গেল, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন-সহ আরও কয়েকটি সংস্থা উচ্চশিক্ষার নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে, আর সরকার সরাসরি অর্থবরাদ্দ করছে। এখন এই নতুন বিল আইনে পরিণত হলে সমগ্র উচ্চশিক্ষা একটি মাত্র কেন্দ্রীয় সংস্থার নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।

রাশিয়ার নবজাগরণের সময় শিক্ষাপ্রসারে শাসকের ভূমিকা দেখে লিয়ো টলস্টয় বলেছিলেন, ‘একটি সরকারের শক্তি নিহিত থাকে তার জনগণের অজ্ঞতার মধ্যে। সরকার সেটা জানে। তাই সে যথার্থ শিক্ষার প্রসারে বাধা দেয়।’ ইউরোপীয় নবজাগরণের অন্তিম পর্বে এই মনীষী শাসকের যে ভূমিকা লক্ষ করেছিলেন, আজও নানা শাসকের মধ্যে সেই চরিত্রের প্রতিফলন দেখা যায়। সেই কারণেই রাজা রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে শিক্ষায় অর্থব্যয়ের অনুমোদনের জন্য ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে লড়তে হয়েছিল। শিক্ষার স্বাধিকার রক্ষার প্রশ্নে আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ব্রিটিশ সরকারের হস্তক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। এমনকি প্রয়োজনে জনসাধারণের সাহায্যে বিশ্ববিদ্যালয় চালানোর পক্ষেও তিনি মত দিয়েছিলেন।

গণতান্ত্রিক শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামো তাই গড়ে উঠেছে স্বাধিকারের ভিত্তির উপর। সরকার অর্থ জোগাবে, কিন্তু শিক্ষার নীতি নির্ধারণে হস্তক্ষেপ করবে না। অথচ আজ সেই ধারণাটিকেই উল্টে দিতে চাওয়া হচ্ছে। যত সরকারি নিয়ন্ত্রণ বাড়ছে, ততই বাজেটে শিক্ষাখাতে ব্যয় কমছে। সব দেশের শাসকরাই কোনও না কোনও সময়ে মুক্তচিন্তার প্রসারকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছে। বর্তমান ‘বিকশিত ভারত শিক্ষা অধিষ্ঠান ২০২৫’-এর লক্ষ্য নিয়েও তাই প্রশ্ন উঠছে। আশঙ্কা জাগছে, প্রযুক্তিসর্বস্ব, যন্ত্রনির্ভর, মূল্যবোধহীন এবং চিন্তনক্ষমতাহীন এক মনুষ্যপ্রজন্ম তৈরির দিকেই কি শিক্ষাকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে?

তপন চক্রবর্তী, কলকাতা-৩৪

কঠিন সঙ্কট

‘সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা-প্রশ্নে প্যালেস্টাইনেরও পিছনে ভারত’ (১-৫) শীর্ষক প্রতিবেদনটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ১৮০টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১৫৭তম। উল্লেখযোগ্য, গত বছর ভারতের স্থান ছিল ১৫১তম। স্বাভাবিক ভাবেই সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব হওয়ার প্রশ্নে আঙুল উঠছে প্রশাসনের দিকেই। সংবাদমাধ্যম শাসক দলের বিরোধিতা করলেই অনেক ক্ষেত্রে সরকারের চক্ষুশূল হয়ে উঠছে।

সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সম্পর্কিত এক মামলায় মাদ্রাজ হাই কোর্টের বিচারপতি পি এন প্রকাশ মন্তব্য করেছিলেন, ফোর্থ এস্টেট তথা সংবাদপত্র ভারতীয় গণতন্ত্রের স্তম্ভ। যদি তার কণ্ঠরোধ করা হয়, ভারত একটি নাৎসি রাষ্ট্র হয়ে উঠবে, আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং সংবিধান প্রণেতাদের কঠিন পরিশ্রম বিফলে যাবে।

কিন্তু গণতন্ত্রের এই চতুর্থ স্তম্ভ আজ সত্যিই এক কঠিন সঙ্কটের মুখোমুখি। আত্মসমর্পণ না স্বাধীন সত্তা বজায় রাখা— এই উভয়সঙ্কটের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের সংবাদমাধ্যম।

রাজশেখর দাশ, কলকাতা-১২২

শিশুর কষ্ট

ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা আগের তুলনায় অনেকটাই বেড়ে গিয়েছে। স্কুলে সচেতনতামূলক শিবির করা হচ্ছে, প্রাথমিক স্তর থেকেই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের চিহ্নিত করে তাদের জন্য পৃথক সহায়তার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। কিন্তু অনেক অভিভাবকই এই বিষয়গুলি সহজে মেনে নিতে চান না। ফলে যে শিশুদের বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন, তারা সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়।

অন্য দিকে, বাড়ির পরিবেশেও অনেক সময় শিশুদের উপর অতিরিক্ত পড়াশোনার চাপ তৈরি করা হয়। প্রথম হতে হবে, নব্বই শতাংশের বেশি নম্বর পেতেই হবে— এই ধরনের প্রত্যাশা শিশুমনে গভীর মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। তার নিজের ইচ্ছা, স্বপ্ন কিংবা অনুভূতির জায়গা ধীরে ধীরে সঙ্কুচিত হয়ে আসে। সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ডিজিটাল দুনিয়ার প্রভাব, যেখানে শিশুরা ক্রমশ আরও একাকী হয়ে পড়ছে। বয়ঃসন্ধিকালের স্বাভাবিক পরিবর্তন ও মানসিক অস্থিরতার সঙ্গে যখন এই চাপগুলি মেশে, তখন অনেকেই ভেঙে পড়ে এবং ভুল পথে চালিত হতে পারে।

শুধু শিশু নয়, অভিভাবকদের জন্যও সচেতনতামূলক শিবির অত্যন্ত জরুরি। তাঁদের বোঝানো প্রয়োজন, মানসিক সুস্থতা পরীক্ষার নম্বরের থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

অর্পিতা মজুমদার, কলকাতা-১৫৪

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Digital Artificial Intelligence

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy