E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: গণতন্ত্রের আসল রূপ

‘সবকা সাথ সবকা বিকাশ’-এর মরসুমেও দেখতে হয় ওড়িশার কেওনঝড়ে দিদির মৃত্যু প্রমাণ করতে কঙ্কাল কাঁধে নিয়ে জিতু মুন্ডাকে ব্যাঙ্কে প্রবেশ করতে

শেষ আপডেট: ০৩ জুন ২০২৬ ০৭:২৩

‘হাঁটতে হাঁটতে অনন্তে’ (৮-৫) শীর্ষক প্রবন্ধে তাপস সিংহ প্রান্তিকতার যে মর্মান্তিক উপাখ্যান উপস্থিত করেছেন, তা এ দেশের গণতন্ত্রের প্রকৃত চরিত্র বুঝতে সাহায্য করে। ‘সবকা সাথ সবকা বিকাশ’-এর মরসুমেও দেখতে হয় ওড়িশার কেওনঝড়ে দিদির মৃত্যু প্রমাণ করতে কঙ্কাল কাঁধে নিয়ে জিতু মুন্ডাকে ব্যাঙ্কে প্রবেশ করতে, ব্যয়সাপেক্ষ শববাহী যান জোগাড় করতে না-পারার কারণে স্ত্রী আমাং দেই-এর শবদেহ কাঁধে নিয়ে নাবালিকা মেয়েকে সঙ্গে করে ওড়িশার কালাহান্ডি জেলার দানা মাঝিকে হাসপাতাল থেকে ১০ কিলোমিটার দূরের গ্রামে ফিরে যেতে, কোভিডকালে পুলিশ-প্রশাসনের চোখ এড়িয়ে জঙ্গলের ভিতর দিয়ে তেলঙ্গানা থেকে বাড়ির পথে দেড়শো কিলোমিটার হাঁটতে হাঁটতে খাদ্য-পানীয়ের অভাবে অনন্ত বিশ্রামে চলে যাওয়া ছত্তীসগঢ়ের বিজাপুর জেলার পরিযায়ী শ্রমিক বারো বছরের বালিকা জামলো মকদমকে। গণতন্ত্রের এই রূপই বোধ হয় এ দেশের গণতন্ত্রের অভ্যন্তরীণ রূপ।

সম্প্রতি এ রাজ্যেও নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আমরা গণতন্ত্রের এমন রূপ এক ঝলক দেখলাম। ভোটদানের অধিকার থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষকে বাইরে রেখেই সমাপ্ত হল নির্বাচন। ষাট লক্ষাধিক নাম বাদ যাওয়া বিচারাধীন ভোটারের মধ্যে যাঁরা ট্রাইব্যুনালে গিয়ে বিচার পেয়ে ভোটার তালিকায় ফিরতে পেরেছেন, তাঁরাই পেয়েছেন ভোটদানের সুযোগ। কিন্তু সংখ্যায় তাঁরা কতটুকু? যা প্রমাণ করার দায়িত্ব ছিল রাষ্ট্রের, তা প্রমাণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এমন এক বিশাল সংখ্যক মানুষকে যাঁরা প্রান্তিক, যাঁদের অনেকে ‘ট্রাইবুনাল’ শব্দটি প্রথম শুনছেন। তাঁদেরই কেউ কেউ এ বারের ভোটার তালিকায় নাম ‘ডিলিটেড’ কিংবা ‘আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন’ দেখে ভয় পেয়েছেন, কেউ বা অনন্ত বিশ্রামের পথে এগিয়ে গিয়েছেন।

গৌরীশঙ্কর দাস, খড়্গপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর

দুর্ব্যবহার

‘হাঁটতে হাঁটতে অনন্তে’ শীর্ষক তাপস সিংহের উত্তর-সম্পাদকীয়ের কিছুটা পড়তেই যেন শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে এল। আমরা, যারা প্রায়ই ব্যাঙ্কে যাতায়াত করি, এ ছবি তো আমাদের নিত্য দেখা। জনজাতি শ্রেণিভুক্ত মানুষ তো দূরের কথা, একটু মধ্যবিত্ত বা গরিব মানুষের প্রতি ব্যাঙ্কের এক শ্রেণির কর্মচারীদের দুর্ব্যবহার আমাদের সকলের চেনাজানা, অথচ মোটা অঙ্কের আমানতকারীদের জন্য কত খাতির। দরিদ্র সাধারণ মানুষ ব্যাঙ্ক কর্মচারীদের কাছে ভাল ব্যবহার পাবেন না কেন? কেন অনুন্নত-অশিক্ষিত মানুষের আবেদন, সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচিত হবে না? জিতু মুন্ডাকে ১৯ হাজার ৪০২ টাকার জন্য কবর খুঁড়ে দিদির মৃতদেহ বয়ে আনতে হয়, অথচ হাজার হাজার কোটি টাকা গায়েব হয়ে গেলেও সরকার-ঘনিষ্ঠ শিল্পপতিদের টিকি খুঁজে পাওয়া যায় না। আসলে, এগিয়ে থাকা মানুষেরা পিছিয়ে পড়া মানুষের চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছে।

স্বপন কুমার ঘোষ, মধ্য ঝোড়হাট, হাওড়া

শুনবে কে

‘হাঁটতে হাঁটতে অনন্তে’ শীর্ষক প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। কতটা পথ পেরোলে তবে পথিক বলা যায়! ছত্তীসগঢ়ের সুরগুজা জেলার ঈশ্বর দাস হেঁটেছিলেন সাত বছরের মেয়ের মৃতদেহ কাঁধে (সন্তানের দেহ নিয়ে পথ হাঁটছেন ঈশ্বর, ২৭-৩-২০২২)। অতিমারির রেশ ফিকে হতেই জীবনপথিক ঈশ্বর মেয়ের মৃতদেহ কাঁধে পথ হাঁটতে হাঁটতে অনুভব করেছিলেন, এটাই আমার আসল ভারত। দেশের অজস্র আলোকোজ্জ্বল চালচিত্রের সামনে আবছা হয়ে আসে ঈশ্বরের ‘আত্মনির্ভর বিকশিত ভারত’। মৃতদেহ বহনকারী সরকারি শকটের জন্য ঈশ্বররা অপেক্ষা করেন না। বলিষ্ঠ দুই কাঁধে আত্মনির্ভর ভারতকে বহন করার শক্তি তাঁদের আছে। কালাহান্ডির মেলঘার গ্রামের দানা মাঝির কোনও শববাহী গাড়ি ভাড়া নেওয়ার ক্ষমতা না থাকায় দশ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছিলেন স্ত্রীর মৃতদেহ বহন করে। অতিমারিতে বাড়িতে ফেরার পথে শিশুশ্রমিক জামলো মকদমের মৃত্যু হয়েছিল শরীর নির্জলা হয়ে যাওয়ায়। তেলঙ্গানা থেকে বিজাপুর দীর্ঘ পদব্রজের ক্লান্তি জামলোকে মৃত্যুমুখে টেনে নিয়ে গিয়েছিল।

অন্তহীন এই পথচলা যুগ যুগ ধরে দেখে এসেছে সমাজ। এই সে দিনও সমাজ আবার দেখল ওড়িশার কেওনঝড়ের জিতু মুন্ডাকে। মৃত দিদির অ্যাকাউন্টের ১৯ হাজার ৪০২ টাকা জিতু তুলতে পারছিলেন না। ও-দিকে নিয়ম অনুসারে ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষের কাছে টাকা তোলার শর্ত ছিল জিতুর দিদির মৃত্যুর শংসাপত্র এবং আইনি উত্তরাধিকারীর শংসাপত্র। কিন্তু অতি দরিদ্র জিতুরা তো এই সব কাগজপত্রের অর্থই বোঝেন না! অগত্যা জিতু মুন্ডা কবর থেকে কঙ্কালরূপী দিদিকেই বয়ে নিয়ে যান ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষের নিকট দিদির মৃত্যুর প্রমাণ হিসাবে। অশিক্ষার আঁধারে ঢাকা জিতুকে কি আর একটু বুঝিয়ে বলতে পারতেন না ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ!

বিকশিত ভারতে জনজাতি গোষ্ঠীর নিরক্ষর মানুষগুলি আইনি উত্তরাধিকার বোঝেন না। প্রবন্ধকার যথার্থই বলেছেন, সংবিধান ও গণতন্ত্র বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টায় সব দলের নেতানেত্রী নাওয়াখাওয়া ভুলে পথে নেমেছেন। আম আদমির কথা ভেবে তাঁরা হাঁটছেন, তবে কিনা তাঁদের হাঁটাকে হাঁটা বলে না, বলতে হয় পদযাত্রা। মনে পড়ে এমনই এক পদযাত্রা এক সময় সংগঠিত করেছিলেন দেশের কৃষকরা। রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত পায়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তাঁরা পাড়ি দিয়েছিলেন দীর্ঘ পথ, তাঁদের অধিকারের দাবিতে।

তবে জিতু মুন্ডারা মাঝেমধ্যে বিকশিত ভারতকেও বিড়ম্বনায় ফেলে দেন! রাষ্ট্র তাঁদের জন্য সংরক্ষণের বন্দোবস্ত করতে উঠে পড়ে লাগে। জনজাতিভুক্তদের বিকাশে সংসদ-বিধানসভায় হাজার হাজার শব্দ ব্যয় হয়। তবুও যুগের পর যুগ অনন্তের পথে তাঁরা হাঁটতেই থাকেন। সভ্যতার সোনার কাঠির পরশে তাঁদের জীবনগুলো বেঁচেও মরেই থাকে। তাঁদের এই ‘কাণ্ডজ্ঞানহীন’ আচরণ নীরবে সমাজের বুকে কত কিছুই তো বলে যায়, কিন্তু শোনে কে? সেই শোনার কানটুকু কি সভ্যতার রয়েছে?

সঞ্জয় রায়, দানেশ শেখ লেন, হাওড়া

দাবদাহ

এই মুহূর্তে ভারতের আবহাওয়ায় এক অদ্ভুত ও চরম বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে। দেশের একটা বড় অংশ যখন তীব্র দাবদাহে পুড়ছে, অন্য অংশে বর্ষার আগমনী বার্তা এবং বৃষ্টির দাপট শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিক কালে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে উত্তর, উত্তর-পশ্চিম এবং মধ্য ভারতে। গত কয়েক দিনে তাপমাত্রা ৪৪ থেকে ৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁয়ে ফেলেছে। উত্তরপ্রদেশের বান্দা জেলার তাপমাত্রা রেকর্ড ছুঁয়েছে, যা প্রায় ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি।

দিল্লিতে গত ১৪ বছরের মধ্যে মে মাসের উষ্ণতম রাত রেকর্ড করা হয়েছে। রাতের তাপমাত্রাই থাকছে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে। ফলে রাতেও মানুষ শান্তি পাচ্ছেন না। গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ (যার মধ্যে দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলি পড়ে) এবং ওড়িশার উপকূলবর্তী এলাকায় তাপমাত্রা উত্তর ভারতের মতো ৪৮ ডিগ্রি না ছাড়ালেও, এখানকার প্রধান সমস্যা হল অতিরিক্ত আর্দ্রতা। তীব্র গরমের সঙ্গে বাতাসে কিছু জলীয় বাষ্পের জন্য এক অস্বস্তিকর পরিবেশের সৃষ্টি হচ্ছে।

দেশ জুড়ে যখন গরমের হাহাকার, তখন দক্ষিণ ভারত (কেরল, তামিলনাড়ু, কর্নাটক) এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলিতে (অসম, মেঘালয়, অরুণাচল) কিন্তু বেশ ভাল বৃষ্টিপাত হচ্ছে। বর্তমানে আমরা যে তীব্র এবং অস্বাভাবিক গরমের মুখোমুখি হচ্ছি, তার সিংহভাগ দায় মানুষেরই। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে আবহাওয়া পরিবর্তন হয় ঠিকই, কিন্তু বিগত কয়েক দশকে আমরা যে ভাবে প্রকৃতির উপর অত্যাচার করেছি, তারই ফল আজ ভুগতে হচ্ছে।

সৌমিক চট্টোপাধ্যায়, অভিরামপুর, পূর্ব বর্ধমান

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Election Commission Voter List

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy