রাজ্যের সেরা সরকারি হাসপাতাল এসএসকেএমে চার বছর ধরে চলছে বন্ধ্যত্ব চিকিৎসার বহির্বিভাগ। অথচ, এত বছরে সেখানে আসা রোগীদের মধ্যে মাত্র ৮৭ জনের শরীরে আইভিএফ প্রক্রিয়ায় ভ্রূণ স্থাপন হওয়ার পরে গর্ভবতী হয়েছেন মেরেকেটে ৩৩ জন। এসএসকেএমে বন্ধ্যত্ব চিকিৎসা কেন্দ্রে ভর্তি হয়ে সেই ৩৩ জনের মধ্যে সন্তান হয়েছে সাকুল্যে ছ’জনের!
কেন এই দুরবস্থা? আইভিএফ প্রক্রিয়ায় গর্ভবতী হওয়া রোগীরা মাঝপথে কি অন্যত্র চলে যাচ্ছেন? এই সব নিয়েই এ বার রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর তদন্ত করবে বলে জানিয়েছেন বিজেপির চিকিৎসক-বিধায়ক তথা মন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়।
২০২১ সালে দরপত্রের মাধ্যমে এসএসকেএমে সরকারের সঙ্গেযৌথ ভাবে বন্ধ্যত্ব চিকিৎসার ‘সেন্টার অব এক্সেলেন্স’ চালুর দায়িত্ব পেয়েছিলেন তৃণমূলের প্রাক্তন চিকিৎসক-বিধায়ক তথা মন্ত্রী সুদর্শন ঘোষদস্তিদার। তাঁর ছেলে বিশ্বনাথ ঘোষদস্তিদার এসএসকেএমের স্ত্রী-রোগ বিভাগের শিক্ষক-চিকিৎসক। বাবার সঙ্গে তিনিও এই বন্ধ্যত্ব চিকিৎসা কেন্দ্র পরিচালনায় যুক্ত।
বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরেই এসএসকেএমে তাঁদের বন্ধ্যত্ব চিকিৎসা কেন্দ্র প্রশ্নের মুখে পড়ায় সুদর্শন ও বিশ্বনাথের বক্তব্য, ‘‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রস্তাব ফেলতে না পারায় আমরা ফেঁসে গিয়েছি।’’
কী ভাবে? চিকিৎসক পিতা-পুত্রের দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে তাঁরা যথেষ্ট কম টাকায়, সপ্তাহে তিন দিন এসএসকেএমে বন্ধ্যত্ব চিকিৎসার কেন্দ্রটি চালাতে সম্মত হন। আউটডোর চালানোর খরচ বাবদ মাসে সরকারের তরফে তাঁদের দেওয়ার কথা ছিল সাড়ে ছ’লক্ষ টাকা। কিন্তু অভিযোগ, ২০২২ সালে ওই কেন্দ্রটি চালুর পর থেকে এক টাকাও দেয়নি তৎকালীন তৃণমূল সরকার। তৈরি হয়নি আইভিএফ ল্যাবরেটরিও।
সুদর্শনের দাবি, ‘‘বিনা পয়সাতেই আউটডোর শুরু করেছিলাম। কিন্তু ল্যাবরেটরির অভাবে যখন ২০২৩ সালেও কোনও রোগীর আইভিএফ হল না, তখন বিক্ষোভ শুরু হল। প্রায় ৪৭০০ রোগী অপেক্ষমাণ তালিকায় ছিলেন। অবস্থা সামলাতে তৎকালীন স্বাস্থ্যসচিব রাজীব সিংহ ১০০ জন রোগীকে বেছে ভবানীপুরে আমার ব্যক্তিগত বন্ধ্যত্ব চিকিৎসা কেন্দ্রে আইভিএফ করতে বলেন। জানান, এর জন্য সরকার ১ কোটি ১৬ লক্ষ টাকা দেবে।’’
সুদর্শন জানান, ওই ১০০ জনের মধ্যে ৮৭ জনের দেহে ভ্রূণ প্রতিস্থাপন করা হয়। শেষ পর্যন্ত গর্ভবতী হন৩৩ জন। কিন্তু এসএসকেএমের বন্ধ্যত্ব ক্লিনিকের জন্য নির্দিষ্ট ওয়ার্ডে ভর্তি হয়ে সন্তান হয়েছে তাঁদেরমধ্যে মাত্র ছ’জনের। কিন্তু বাকি রোগীরা কোথায় গিয়েছেন, সে সম্পর্কে কোনও তথ্য তাঁদের কাছে নেই। সরকার যে ১ কোটি ১৬ লক্ষ টাকা দেবে বলেছিল, তার মধ্যেএখনও ১১ লক্ষ টাকা বকেয়া। টাকার অভাবে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির পর থেকে আর কারও দেহে ভ্রূণ প্রতিস্থাপনও হয়নি। অপেক্ষমাণ তালিকায় রোগীর সংখ্যা পাঁচ হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছে।
স্বাস্থ্য দফতরের এক শীর্ষ কর্তার কথায়, ‘‘এসএসকেএমের বন্ধ্যত্ব কেন্দ্র থেকে রোগীদের সুদর্শন ঘোষদস্তিদারের ক্লিনিকে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং সেখানে টাকা নিয়ে চিকিৎসা হচ্ছে বলে অভিযোগ এসেছে। তৃণমূলের ওই প্রাক্তন চিকিৎসক-বিধায়ককে সুবিধা করে দিতেই এসএসকেএমে সরকারি আইভিএফ ল্যাবরেটরি তৈরি হয়নি বলেও অভিযোগ।’’
মন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘প্রথমত, কোন আগ্রহে সুদর্শন ঘোষদস্তিদার লক্ষ লক্ষ টাকার বোঝা ঘাড়ে নিয়ে আউটডোর চালাচ্ছেন? দ্বিতীয়ত, সরকারি আউটডোর থেকে রোগীকে তিনি ব্যক্তিগত কেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে আইভিএফ করবেন, এমন চুক্তি কি হয়েছিল? তৃতীয়ত, কেন এত বছরেও এসএসকেএমে আইভিএফ ল্যাবরেটরি হল না? চতুর্থত, সরকারি টাকায় আইভিএফ হওয়ার পরে ৩৩ জন গর্ভবতীর মধ্যে মাত্র ছ’জনের প্রসব এসএসকেএমে হল। বাকিরা কোথায় গেলেন, কেউ খোঁজ রাখবে না?’’
সুদর্শনের কথায়, ‘‘কত বার এই ক্লিনিকের সমস্যা নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও এসএসকেএমের অধিকর্তা মণিময় বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছি। তাঁরা দেখা করেননি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অফিসে গিয়ে চিঠি দিলেও উত্তর পাইনি।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)