‘সরকারি হাসপাতালে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে জন্ম টেস্টটিউব বেবির।’ বছর দেড়েক আগে এসএসকেএমের এই সাফল্য-সংবাদ পড়ে বহু দম্পতি যেতে শুরু করেছিলেন সেখানে। কিন্তু সত্যিই কি ব্যয়বহুল ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজ়েশন (আইভিএফ) বিনামূল্যে হচ্ছে এসএসকেএমে?
চিকিৎসা করাতে যাওয়া একাধিক দম্পতির অভিযোগ, একটি বেসরকারি আইভিএফ কেন্দ্র রোগী ধরার পন্থা খুলে বসেছে এসএসকেএমের ছত্রচ্ছায়ায়। রোগীদের কাউন্সেলিংয়ের সময়ে প্রস্তাব দেওয়া হয়, তাঁরা ওই বেসরকারি কেন্দ্রে গেলে মোট খরচের ১০ শতাংশ ছাড় পাবেন। আইভিএফ ক্লিনিকে বসে সেই প্রস্তাব দিচ্ছেন বেসরকারি ওই কেন্দ্রের কর্মীই।
স্বাস্থ্য ভবন সূত্রের খবর, এসএসকেএমে আইভিএফ চিকিৎসার উৎকর্ষ কেন্দ্র গড়ে তুলতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে ‘ঘোষদস্তিদার ইনস্টিটিউট ফর ফার্টিলিটি রিসার্চ’-কে নলেজ পার্টনার করা হয়েছিল। ২০২২ সালের মে মাসে ওই ক্লিনিকের উদ্বোধন হয়।
মিতা বসুমল্লিক নামে এক রোগী জানাচ্ছেন, এসএসকেএমের স্ত্রী-রোগের চিকিৎসক তাঁকে দেখে ওই হাসপাতালের আইভিএফ ক্লিনিকে যাওয়ার পরামর্শ দেন। সেখানে দু’দিন তাঁকে দেখেন এসএসকেএমের সেন্টার অব এক্সেলেন্স ইন অ্যাসিস্টেড রিপ্রোডাক্টিভ টেকনোলজি (এআরটি)-র প্রসূতি ও স্ত্রী-রোগ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক বিশ্বনাথ ঘোষদস্তিদার। শেষ দিনে মিতাকে দেখেন চিকিৎসক সুদর্শন ঘোষদস্তিদার। মিতার কথায়, ‘‘দশ মিনিট কথার মধ্যে সুদর্শনবাবু তিন বার কাউন্সেলিং করাতে বলেন।’’
পাশের ঘরে কাউন্সেলিংয়ে এক ব্যক্তি মিতাকে জানান, এসএসকেএমে আইভিএফ চিকিৎসা শুরু হতেই আড়াই বছর লাগবে। তাই তিনি সুদর্শন ঘোষদস্তিদারের গড়িয়াহাটের ক্লিনিকে ওই চিকিৎসা করাতে পারেন। এসএসকেএমের রোগী হওয়ার সুবাদে সেখানে ১০ শতাংশ ছাড় দিয়ে ১ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা পড়বে। মিতার প্রশ্ন, এসএসকেএমে নিখরচায় টেস্টটিউব বেবির জন্মের সংবাদটা তবে কী? মিতার দাবি, তাঁকে জানানো হয়, সেই সময়ে আইভিএফ পদ্ধতিতে নিখরচায় কিছু শিশুর জন্ম হয়েছিল গড়িয়াহাটের ওই ক্লিনিকের তত্ত্বাবধানে।
দেশের প্রথম সরকারি হাসপাতাল হিসেবে এসএসকেএমে বিনামূল্যে আইভিএফ পরিষেবা দেওয়ার কথা। তা হচ্ছে না কেন? পিপিপি মডেলে চলা চিকিৎসায় নাম নথিভুক্ত করা রোগীর খরচ দেওয়ার কথাও সরকারের। তা হলে কেন এসএসকেএমে আইভিএফ চিকিৎসায় রোগীকে ১ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা দিতে হবে?
এসএসকেএমের স্ত্রী-রোগ বিভাগের প্রধান গৌরীশঙ্কর কামিল্যার বক্তব্য, গড়িয়াহাটের ওই ক্লিনিকটি এখানে কী ভাবে কাজ করে, সেই ধারণা তাঁর নেই। তবে তিনি এ-ও বলেন, ‘‘পিপিপি মডেলের চিকিৎসায় হাসপাতালের রোগীর খরচ সরকারের তরফে সংশ্লিষ্ট বেসরকারি সংস্থাকে দেওয়ার কথা। কত টাকা, সেটা বলতে পারব না। তবে এখানে আসা রোগীকে এ ধরনের প্রস্তাব যদি কেউ দিয়ে থাকেন, তা অনৈতিক।’’ আইভিএফ পদ্ধতিতে এসএসকেএমে ক’টি প্রসব হয়েছে? গৌরীশঙ্কর বলেন, ‘‘বহু বেসরকারি আইভিএফ ক্লিনিক থেকে প্রসূতিদের এখানে পাঠানো হয়। ফলে এসএসকেএমের তরফে নির্দিষ্ট বেসরকারি আইভিএফ কেন্দ্রের মাধ্যমে কত জন প্রসূতির প্রসব হয়েছে, আমার জানা নেই।’’
বিশ্বনাথ ঘোষদস্তিদার এসএসকেএমের স্ত্রী-রোগ বিভাগের চিকিৎসক। তিনি ‘ঘোষদস্তিদার ইনস্টিটিউট ফর ফার্টিলিটি রিসার্চ’-এর মালিক সুদর্শন ঘোষদস্তিদারের ছেলে। প্রশ্ন উঠেছে, একটি হাসপাতালের এক নির্দিষ্ট বিভাগের এক জন চিকিৎসক কী ভাবে সেই বিভাগেরই পিপিপি মডেলে যুক্ত হতে পারেন? স্বাস্থ্য ভবন থেকে এর উত্তর মেলেনি।
১২ বছর আগে স্ত্রী-রোগ চিকিৎসক গৌতম খাস্তগীরকে দিয়ে আইভিএফ ক্লিনিক শুরুর প্রস্তাব দিয়েছিলেন চিকিৎসক ত্রিদিব বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই প্রসঙ্গে রাজ্যের প্রাক্তন স্বাস্থ্য-শিক্ষা অধিকর্তা প্রদীপ মিত্র বলেন, ‘‘রাজি হইনি। তখন বলেছিলাম, যিনিই আসুন, এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্টের মাধ্যমে আসতে হবে। নিয়ম হল, চিকিৎসার ক্ষেত্রে এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্টের মাধ্যমে ইচ্ছুক সংস্থা আগ্রহ দেখায়। সরকারের দেওয়া মাপকাঠি মেনে এবং কোন সংস্থা সরকারকে ভাল অফার দিচ্ছে, তার ভিত্তিতে নির্বাচন হয়। ‘ঘোষদস্তিদার ইনস্টিটিউট ফর ফার্টিলিটি রিসার্চ’-এর ক্ষেত্রে সেটা হয়নি।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)