ইন্দ্রজিৎ সেনগুপ্তের ‘জীবনে এক বার মাত্র একটি মূর্তির সামনে প্রণত হতে চেয়েছিলেন কবি’ (রবিবাসরীয়, ৩-৫) শীর্ষক প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকটি কথা। রবীন্দ্রনাথের কাছে গৌতম বুদ্ধ যেন মূর্তিমান অসীম প্রজ্ঞা ও অসীম করুণার প্রতীক। মহামানব বুদ্ধকে রবীন্দ্রনাথ বার বার স্মরণ করেছেন। বলেছেন, তাঁর প্রেম ও অহিংসার বাণীই হিংসার তাণ্ডবে উন্মত্ত পৃথিবীকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে। বুদ্ধদেবের জীবন ও বাণী, বৌদ্ধধর্ম ও সংস্কৃতি রবীন্দ্রনাথের গান, কবিতা, নাটক প্রবন্ধে সহস্রধারায় প্রবাহিত। অমিতাভ বুদ্ধের ধর্ম, শিক্ষা ও দর্শন বিশিষ্ট ভাবমূর্তিতে উজ্জ্বলতা পেয়েছে রবীন্দ্ররচনায়। বৌদ্ধধর্মের ত্যাগ, তিতিক্ষা, প্রেম, মৈত্রী, করুণা, অহিংসা ও অস্পৃশ্যতা-বর্জনের আদর্শ রবীন্দ্র-জীবনসাধনার সঙ্গে মিলেমিশে মহিমান্বিত রূপ গ্রহণ করেছে।
শুধু মালিনী, রাজা, অচলায়তন বা নটীর পূজা নয়, চণ্ডালিকা, বিসর্জন প্রভৃতি সৃষ্টিসম্ভারেও বৌদ্ধধর্মের প্রতি কবির আগ্রহ ও অনুরাগ ব্যক্ত হয়েছে। বৌদ্ধ কাহিনি তাঁর লেখনীতে বিশেষ তাৎপর্যমণ্ডিত হয়ে উঠেছে। চণ্ডালিকা-য় বৌদ্ধধর্মের মানবতাবাদ নতুন রূপ লাভ করেছে, রয়েছে বৌদ্ধ আখ্যানের সুস্পষ্ট প্রভাব। সামাজিক মজ্জাগত অভিশাপ অস্পৃশ্যতা এখানে রবীন্দ্রনাথের হাতে অপরূপ নাট্যরূপ পেয়েছে। জাতপাত ও অস্পৃশ্যতার ঊর্ধ্বে মানবাত্মার মহত্ত্ব ঘোষিত হয়েছে এই নাটকে।
রবীন্দ্রনাথের বিসর্জন নাটকেও বৌদ্ধ আদর্শ স্পষ্ট ভাবে ব্যক্ত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে মানবধর্ম, করুণা ও অহিংসার যে আদর্শ ব্যক্ত হয়েছে, তার মধ্যে বৌদ্ধ নৈতিকতার সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়। রাজা গোবিন্দমাণিক্যের চরিত্রে আচারসর্বস্ব ধর্মের পরিবর্তে মানবকল্যাণ ও প্রেমের আদর্শই গুরুত্ব পেয়েছে। জয়সিংহের আত্মত্যাগ, রঘুপতির মানসিক রূপান্তর এবং অপর্ণার মানবিকতা— সব মিলিয়ে এই নাটকে করুণা, প্রেম ও অহিংসার এক মানবতাবাদী আদর্শ প্রকাশ পেয়েছে।
আবার বাল্মীকি প্রতিভা-য় ব্যাধের বাণে ক্রৌঞ্চের মৃত্যুর ঘটনায় বাল্মীকির মনে যে গভীর করুণাবোধের সঞ্চার হয়, তার মধ্যেও বুদ্ধ-দর্শনের মানবিক বোধের প্রকাশ লক্ষণীয়। আসলে বৌদ্ধধর্মের নৈতিক আদর্শ রবীন্দ্রনাথকে গভীর ভাবে নাড়া দিয়েছিল। তাকেই তিনি সর্বান্তঃকরণে গ্রহণ করেছিলেন। বুদ্ধদেবের মতো তিনিও মানুষের অন্তর্নিহিত শ্রেয়বোধ ও কল্যাণশক্তির মহিমাকে জাগ্রত করতে চেয়েছিলেন। মানুষের আত্মশক্তি ও বিকাশক্ষমতাকে সর্বাধিক মর্যাদা দিয়েছিলেন। আত্মশক্তিকে সংহত করে মোহ, বাসনা ও আকাঙ্ক্ষার ঊর্ধ্বে উত্তরণের পথের সন্ধান দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন মানবধর্মে বিশ্বাসী, মৈত্রী ধর্মের উপাসক। সেই কারণেই বৌদ্ধ দর্শনের সঙ্গে রবীন্দ্রচিন্তার গভীর আত্মীয়তা অনুভূত হয়। জ্ঞান, প্রেম ও কর্মের সমন্বিত রূপেই নিহিত রয়েছে তাঁর জীবনদর্শনের প্রধান পরিচয়।
রবীন্দ্রনাথের কাছে বুদ্ধ শুধু করুণাঘন নন, জগতের হিংসা ও দ্বন্দ্বের পরিত্রাতাও। তাই বারে বারে তিনি শরণ নিয়েছেন সকল দুর্গতি, ভয় ও বিনাশের অবসানকারী বুদ্ধের।
সুদেব মালতিসা, হুগলি
মোহনবাঁশি
নীলাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘এই বাঁশিটি বাজালো কে?’ (১০-৫) প্রবন্ধে ধরা পড়েছে কবির জীবনদেবতার প্রতি অগাধ বিশ্বাস। আসলে কবি আশৈশব অনুভব করেছেন গহন গভীরের আকুতি। “ওগো সুদূর, বিপুল সুদূর, তুমি যে বাজাও ব্যাকুল বাঁশরি—/ মোর ডানা নাই, আছি এক ঠাঁই সে কথা যে যাই পাশরি।” এ সবের মূলে রয়েছে কবির ভ্রমণপিপাসু মন। “দূরে কোথায় দূরে দূরে/ আমার মন বেড়ায় গো ঘুরে ঘুরে।” কলকাতায় যখন প্লেগ মহামারির আকার নিয়েছিল তখন রবীন্দ্রনাথের পরিবারের কয়েক জন সদস্য পেনেটির বাগানবাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। চোখে পড়ত গঙ্গায় ভেসে চলা পালতোলা নৌকার বহর। সুদূরপিয়াসি মন যেন বিনা ভাড়ায় সওয়ারি হয়ে বসত, পাড়ি দিত নাম না-জানা দেশে। পিতার সঙ্গে হিমালয় ভ্রমণও এ প্রসঙ্গে মনে রাখার। যখন যেখানে গিয়েছেন, সেখানেই যেন শুনেছেন বাঁশির সুর। হাতে তুলে নিয়েছেন লেখনী।
কৈশোরে কবির অন্তর জুড়ে বিরাজমান ছিল কালিদাস, জয়দেব, বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাসের সৃষ্টি-সম্ভারের সুরমূর্ছনা। বিদ্যাপতির রাধাকৃষ্ণের পদ কবিকে গভীর ভাবে আকৃষ্ট করেছিল। রবীন্দ্রসাহিত্যে— কাব্য, কবিতা, নাটক, বিশেষ করে সঙ্গীতে— সর্বত্রই বহুমাত্রিক প্রতীক হিসাবে মিশে রয়েছে বাঁশির সুর। কখনও তাঁর সৃষ্টির নাম ‘বাঁশরী’, কখনও বা সানাই।
উপনিষদে আস্থাশীল কবি অন্তরের উৎসারিত আলোয় দেখেছিলেন, কৃষ্ণবিরহে কাতর রাধার মতোই তাঁরও জগদীশ্বরের প্রতি অসীম আকর্ষণ। মাধ্যাকর্ষণ শক্তির মতোই বিশ্বপ্রকৃতি কবিকে নিজের কাছে টেনেছে। কৈশোরে বিহারীলাল চক্রবর্তীকে গুরুপদে বরণ করে নাম দিয়েছিলেন ‘ভোরের পাখি’। বিহারীলালের কাব্যে কৃষকের বাঁশের বাঁশিটি বাজানোর গ্রাম্য প্রকৃতির বর্ণনা পড়ে তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন। পরবর্তী জীবনে তারই ছাপ রবীন্দ্রসৃষ্টির সর্বত্র সুস্পষ্ট।
তাঁর সৃষ্টির পাতায় পাতায় কৃষ্ণের বংশীর সুর যেন জীবাত্মাকে আহ্বান জানায়— জীবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার মিলনের আহ্বান। মায়া থেকে মুক্ত হয়ে আনন্দযজ্ঞে উপনীত হওয়ার আহ্বান। রবীন্দ্রনাথের সেই বাঁশিটি তাঁর সৃষ্টি-শলাকা, অর্থাৎ লেখনী।
সূর্যকান্ত মণ্ডল, কলকাতা-৮৪
বিজ্ঞানদৃষ্টি
সিদ্ধার্থ মজুমদারের ‘আদ্যোপান্ত এক বিজ্ঞান-মন’ (৯-৫) শীর্ষক প্রবন্ধটি প্রসঙ্গে কিছু কথা। কবি, সাহিত্যিক, সুরস্রষ্টা, দার্শনিক রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বিস্তর আলোচনা হলেও তাঁর বিজ্ঞানমনস্ক সত্তা আজও অনেকাংশে আড়ালে। অথচ বর্তমান সময়ে এই দিকটিই সম্ভবত আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
“আকাশভরা সূর্যতারা, বিশ্বভরা প্রাণ,/ তাহারই মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান,/ বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান।”— এই পঙ্ক্তিগুলির মধ্যে শুধু কাব্যিক সৌন্দর্য নয়, মানুষের মহাবিশ্ব-সচেতনতার এক গভীর অনুভূতিও লুকিয়ে আছে। মানুষ যে এই অসীম বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ক্ষুদ্র অংশ হয়েও তাকে জানার চেষ্টা করে, সেই বিস্ময় রবীন্দ্রনাথ অনুভব করেছিলেন শিল্পীর সংবেদনশীলতা এবং বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের কৌতূহলের এক আশ্চর্য মেলবন্ধনে। তিনি কঠিন বিজ্ঞানকেও সহজ ভাষায় অনুভবের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করেছিলেন। তাই বিজ্ঞান তাঁর কাছে ছিল আনন্দের বিষয়। তিনি কখনও যান্ত্রিক সভ্যতার অন্ধ অনুকরণে বিশ্বাস করেননি। তাঁর আশঙ্কা ছিল, প্রযুক্তি যদি মানবিক মূল্যবোধকে অতিক্রম করে যায়, তবে সভ্যতা নিজেই সঙ্কটে পড়বে।
শৈশবের বিস্ময় থেকেই রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞানীসুলভ দৃষ্টির জন্ম। আকাশ, প্রকৃতি, নক্ষত্র ও জীবনের রহস্য তাঁকে প্রশ্ন করতে শিখিয়েছিল। সেই কারণেই তাঁর বিজ্ঞানচেতনা ছিল শুধু তথ্যনির্ভর নয়, বিস্ময়নির্ভরও। আজ যদি বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে রবীন্দ্রনাথের এই বিজ্ঞানমনস্ক মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও গুরুত্ব দিয়ে অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তবে নতুন প্রজন্ম বিজ্ঞানকে যথাযথ অনুভব করতে শিখবে।
অলোক কুমার মুখোপাধ্যায়, সোদপুর, উত্তর ২৪ পরগনা
বাধা যেখানে
অশোক মুখোপাধ্যায় লিখিত ‘তিনি ও আমাদের থিয়েটার’ (৯-৫) প্রবন্ধ প্রসঙ্গে একটি কথা। দেখা যায়, শেক্সপিয়রের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের একটি বড় মিল হল— সংলাপের তুলনায় মঞ্চনির্মাণ বা অভিনয়-সংক্রান্ত নির্দেশ নাটকে কম। ফলে পরিচালকের প্রধান দায়িত্ব হয়ে ওঠে নাটকের আত্মার স্পন্দন উপলব্ধি করে তাকে সামগ্রিক ভাবে মঞ্চে রূপ দেওয়া। কিন্তু এই উপযুক্ত মঞ্চস্থাপনের জন্য যে তীব্র অনুশীলন, গভীর নাট্যবোধ ও অভিনয়-সমৃদ্ধ প্রস্তুতি প্রয়োজন, তা আজ ক্রমশই দুর্লভ হয়ে উঠছে।
শান্তি প্রামাণিক, হাওড়া
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)