E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: বাঙালির হেঁশেল

বাঙালি চিরকালই ভোজনপ্রিয়। বিভিন্ন কবি সাহিত্যিকদের রচনায় বারে বারে সে সব কথা উঠে এসেছে। যদি ঠাকুরবাড়ি দিয়ে শুরু করা যায়, তা হলে প্রথমেই বলতে হয় মৃণালিনী দেবীর রান্নাঘরের কথা। রবীন্দ্রনাথ নিজে ছিলেন অত্যন্ত ভোজনরসিক।

শেষ আপডেট: ১০ জানুয়ারি ২০২৬ ০৭:৫১

বিশ্বজিৎ রায় ‘খাদ্যাখাদ্যের উটকো হাওয়া’ (১৯-১২) শীর্ষক প্রবন্ধে নিরামিষ বা আমিষ আহারের বৈচিত্রের কারণে বাঙালির হেঁশেলে যে কোনও লড়াই ছিল না, তা প্রকৃতই বলেছেন। বাঙালি জীবনে বারো মাসে তেরো পার্বণের সীমানা পেরিয়ে আরও পার্বণ যোগ হয়েছে। ফলে রান্নাঘরে রকমারি পদের প্রস্তুতি বারো মাস লেগেই থাকে।

বাঙালি চিরকালই ভোজনপ্রিয়। বিভিন্ন কবি সাহিত্যিকদের রচনায় বারে বারে সে সব কথা উঠে এসেছে। যদি ঠাকুরবাড়ি দিয়ে শুরু করা যায়, তা হলে প্রথমেই বলতে হয় মৃণালিনী দেবীর রান্নাঘরের কথা। রবীন্দ্রনাথ নিজে ছিলেন অত্যন্ত ভোজনরসিক। মৃণালিনী দেবীর রান্নাঘরে আমিষ ও নিরামিষের অসাধারণ সব পদ পাওয়া যেত। ঠাকুরবাড়ির নিরামিষ পদে থাকত খেজুরের পোলাও, রকমারি কোফতা ইত্যাদি আর আমিষের পদে ছিল নারকেল চিংড়ি, রোস্ট করা মুরগি, টার্কি কাবাব, কই মাছের পাততোলা ইত্যাদি। অতিরিক্ত মশলা ছাড়া নিত্যনতুন স্বাদের রান্না ঠাকুরবাড়ির বৈশিষ্ট্য ছিল। মিষ্টির মধ্যে ছিল নতুনত্ব। যেমন— মানকচুর জিলিপি, দইয়ের মালপোয়া, পাকা আমের মিঠাই, চিঁড়ের পুলি ইত্যাদি। খাদ্যরসিক কবির লেখনীতে উঠে এসেছিল— “আমসত্ত্ব দুধে ফেলি, তাহাতে কদলী দলি,/ সন্দেশ মাখিয়া দিয়া তাতে—/ হাপুস হুপুস শব্দ চারিদিক নিস্তব্ধ, পিঁপিড়া কাঁদিয়া যায় পাতে।” এ ছাড়া ‘দামোদর শেঠ’ কবিতায়ও কবির খাদ্যরসিক স্বভাবটির প্রমাণ মেলে। সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর আদর্শ হিন্দু হোটেল-এ সাধারণের ভোজন রসিকতার কথা বর্ণনা করেছেন যা বাঙালির খাদ্য সংস্কৃতির এক প্রতিফলন। যোগীন্দ্রনাথ সরকার লিখেছেন— “দাদ্‌খানি চাল, মুসুরির ডাল/ চিনি-পাতা দৈ,/ দু’টা পাকা বেল, সরিষার তেল,/ ডিম-ভরা কৈ।” শোনা যায়, রাজা রামমোহন রায় নাকি প্রায় গোটা পাঁঠার মাংস ও ডজনখানেক আম খেয়ে ফেলতে পারতেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ মাংস পোলাও খেয়েও বিশ-ত্রিশটা রসগোল্লা খেতে পারতেন। আসলে বাঙালি সত্যিই যতটা ভেতো ততটাই আবার মেছো। বলা হয়, বাঙালি জমিদার বা যৌথ পরিবারের হেঁশেলে আগুন নিবত না। দুপুরে খেয়ে হাত না শুকোতেই রাতের রান্নার প্রস্তুতি শুরু হয়ে যাওয়ার কথাও প্রচলিত ছিল। ভোজনরসিক বাঙালি ধার-দেনা করেও তার রসনা তৃপ্ত করতে চায়। বাঙালির পাতে ভাপা ইলিশ, সর্ষে ইলিশ, চিতল মুইঠ্যা, তেল কই, ট্যাংরা বা বোয়াল ঝাল, রুই কালিয়া, দই কাতলা, ভেটকি পমফ্রেট ফ্রাই, মৌরলার টক থাকবে না, এমনটা কি ভাবা সম্ভব? খাদ্যরসিক বাঙালির এমন খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের ভাবনা নিছক বোকামির নিদর্শন। তাই নিশ্চিত ভাবে উত্তর ভারতীয় নিরামিষাশী হিন্দুত্বের উটকো হাওয়া এ-হেন হাত পাত চেটেপুটে খাওয়া ভোজনরসিক বাঙালির হেঁশেলে কেউ প্রবেশ করাতে চাইলে সেটা আকাশকুসুম কল্পনামাত্র।

স্বরাজ সাহা, কলকাতা-১৫০

অন্য পাতে উঁকি

বিশ্বজিৎ রায়ের উত্তর-সম্পাদকীয়টি পাঠ করে প্রথম যে প্রশ্নটি মনে আসে, তা অত্যন্ত সোজা— বাঙালির থালা কবে থেকে বিতর্কের মঞ্চ হয়ে উঠল? খাদ্য ছিল অভ্যাস, ভূগোল ও স্বাদের বিষয়— নৈতিকতার আদালত নয়। তবে যদি আজ এই খাদ্য-বিতর্ক ‘উটকো হাওয়া’ হয়ে থাকে, তা হলে সেই হাওয়া বইছে কোথা থেকে? শূন্য থেকে তো ঝড় ওঠে না। খাদ্য নিয়ে যে আজ এত আগ্রহ, এত পাহারা, এত বিচার— তা কি কেবল বাইরের আমদানি, না কি আমরা নিজেরাই আনন্দের সঙ্গে অন্যের থালায় উঁকি দেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি করেছি? প্রবন্ধকার সঠিক ভাবেই দেখিয়েছেন, খাদ্যকে পরিচয় ও শুদ্ধতার মানদণ্ডে পরিণত করার প্রবণতা আসলে ক্ষমতার ভাষা। কিন্তু সেই ক্ষমতা কেবল রাষ্ট্র বা রাজনীতির হাতে সীমাবদ্ধ— এই ধারণাটি স্বস্তিদায়ক হলেও সম্পূর্ণ নয়। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সমাজ নিজেই নৈতিক পাহারাদারের ভূমিকায় নামছে। কে কী খাচ্ছে, কেন খাচ্ছে— এই প্রশ্নে কৌতূহলের চেয়ে বিচারবোধই বেশি কাজ করছে।

এখানে সমস্যাটি মাছ-মাংস বা নিরামিষের নয়। সমস্যাটি হল— একটি ব্যক্তিগত পছন্দকে সামাজিক অনুমোদনের অপেক্ষায় দাঁড় করানো। আজ খাদ্য নিয়ে নাক সিঁটকোনো কাল অন্য কোনও আচরণ, পোশাক বা বিশ্বাস নিয়েও একই ধরনের শুদ্ধতার শংসাপত্র দাবি করা হবে— এই আশঙ্কা অমূলক নয়। বাঙালি সংস্কৃতি কখনও একরৈখিক ছিল না। সেই বহুত্বকে হঠাৎ করে ‘সঠিক’ ও ‘ভুল’-এর তালিকায় সাজানোর চেষ্টা মানে ইতিহাসকে নতুন করে লিখে নেওয়া। সহাবস্থান যদি নীতিকথায় পরিণত হয়, আর দৈনন্দিন চর্চা থেকে সরে যায়, তবে দায় কেবল সময়ের নয়— আমাদের নিজেদেরও।

বিশ্বজিৎ রায়ের লেখার গুরুত্ব এখানেই যে, তা প্রশ্ন ছুড়ে দেয়। কিন্তু সেই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়াতে গেলে শুধু বাইরের চাপের দিকে আঙুল তুললেই চলবে না, নিজেদের ভিতরের নিয়ন্ত্রণের লালসাটিকেও স্বীকার করতে হবে। কারণ, যে সমাজ অন্যের থালা দেখে চরিত্র বিচার করতে শেখে, সে সমাজ খুব দ্রুত চিন্তা ও মতামতকেও খাদ্যতালিকার মতো ছেঁটে ফেলতে শুরু করে।

দীপেন্দু দাস, রানাঘাট, নদিয়া

নেই ক্ষতিপূরণ

রঞ্জিত শূর তাঁর ‘বাঘে খেয়েছে, প্রমাণ কই’ (৩-১) শীর্ষক প্রবন্ধে সুন্দরবনের দ্বীপাঞ্চলের এক বাঘ-বিধবার প্রকৃত যন্ত্রণাক্লিষ্ট কাহিনি সঠিক ভাবে তুলে ধরেছেন। বাঘে আক্রান্ত পরিবারের কথা বিশ্বাস করে, প্রমাণ জোগাড় করতে জঙ্গলে ঢুকে সরেজমিন তদন্তের মাধ্যমে মৃত বা আহত ব্যক্তির নমুনা সংগ্রহ করে সঠিক তথ্য পরিবেশন করুক বন দফতর। অনেক সময় ক্ষতিপূরণ না-দেওয়ার জন্য পঞ্চায়েত থেকে বন দফতর, উপরতলার আধিকারিকেরা অহেতুক ভয় দেখান। মিথ্যা কেসের কথা বলে সত্য ঘটনাকে আড়াল করতে চান। দিন-আনা-দিন-খাওয়া মানুষেরা পুলিশ-আদালতকে সত্যিই ভয় পান। তাঁরা পুলিশ, উকিলের টাকা কী ভাবে জোগাড় করবেন?

বাঘ-বিধবাদের চোখের জলের দাম কেউ কখনও দেয়নি। তাঁদের পরিবার সন্তান-সন্ততি, রোজগেরে মানুষকে হারিয়ে কেমন আছে, কেউ স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে খোঁজ নিতেও আসে না। এলাকায় বিকল্প জীবিকার সন্ধান না-পেয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে বাধ্য হয়ে পরিবারের বড় সন্তান অথবা মহিলারা আবার সেই বাঘের ডেরায় জীবিকার সন্ধানে যান। নদী, খাঁড়িতে মাছ, কাঁকড়া ধরতে নামেন। হাই কোর্টের রায়, কোর এরিয়া বা বাফার এরিয়া যেখানেই হোক না কেন, বাঘের আক্রমণে মৌলে বা মৎস্যজীবীর মৃত্যু হলে ক্ষতিপূরণ দিতেই হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, রায় ঘোষণার পরে মাত্র কয়েকজন ক্ষতিপূরণ পেলেও সবাই পাননি। আইনি জটিলতায় বন দফতরের গাফিলতিতে স্বামীহারাদের দুঃখের দিন শেষ হয় না। জীবন যুদ্ধে তাঁরা ক্রমশ হেরে যেতে থাকেন।

রতন নস্কর, সরিষা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা

কুয়াশার দাপট

হাড় কাঁপানো ঠান্ডা, সঙ্গে উত্তরের বাতাস, অনেক বছর পর দিনে-রাতে শীতের তীব্র অনুভূতি বঙ্গবাসী বেশ ভালই টের পাচ্ছেন। তবে ঘন কুয়াশার দাপটে পথচলতি মানুষজনকে বেজায় সমস্যায় পড়তে হয়েছে। রাজ্য জুড়ে প্রায় সর্বত্র মাঝেমধ্যেই কুয়াশার ঘন সাদা চাদর দেখা মিলেছে। কুয়াশার কারণেই দৃশ্যমানতা অনেকটাই কমে তলানিতে এসে ঠেকছে প্রায়শই। এই সময় পথচলতি মানুষ এবং গাড়ি চালকদের বিশেষ সর্তকতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। কুয়াশার কারণে ছোট বড় নানা ধরনের পথ-দুর্ঘটনা মাঝেমধ্যেই ঘটছে। অসতর্ক হয়ে রাস্তা কিংবা রেললাইন পারাপার বিপদ ডেকে আনতে পারে। গাড়িচালকদেরও এই সময় সতর্ক থাকা প্রয়োজন, গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।

সৌরভ সাঁতরা, জগদ্দল, উত্তর ২৪ পরগনা

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Bengali Food Culture Bangali Food Culture

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy